অভিনয় ও চলচ্চিত্রের অভিধান “অ”

অভিনয় ও চলচ্চিত্রের অভিধান যুক্ত করার চেষ্টা করলাম আমরা এখানে। যারা অভিনয় বা চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত তারা অনেক সময় অনেক সময় এই শিল্প সংশ্লিষ্ট শব্দের অর্থ খোঁজেন, তাদের সহযোগিতা করবে।

গুগুল নিউজ এ আমাদের ফলো করুন

অগ্নিপরীক্ষা | ছায়াছবি | ১৯৫৪, সাদাকালো, ৩৫ মিমি, ১২৫ মিনিট

নব্য শিক্ষায় শিক্ষিত তাপসীর (সুচিত্রা) মা চিত্রলেখা (চন্দ্রাবতী) বিলেত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার পাত্র কিরীটি মুখার্জীর (উত্তম) সাথে কন্যার বিয়ে দিতে চান। তাপসী এর আগে মার মনোনীত অন্য পাত্রদের প্রত্যাখ্যান করতে পারলেও কিরীটিকে উপেক্ষা করতে পারে না, সে একটা অদ্ভুত দোলাচলে ভুগতে থাকে। বিস্তারিত দেখুন

অভিনয় ও চলচ্চিত্রের অভিধান "অ" - অগ্নিপরীক্ষা [ Agni Pariksha, Bengali Film - 1954 ]
অগ্নিপরীক্ষা [ Agni Pariksha, Bengali Film – 1954 ]

অগ্নীশ্বর | ছায়াছবি | ১৯৭৫, সাদাকালো, ৩৫ মিমি, ১২৫ মিনিট

প্রযোজনা প্রতিভা পিকচার্স। চিত্রনাট্য ও পরিচালনা — অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। কাহিনি— বনফুল। চিত্রগ্রহণ—বিজয় ঘোষ। শিল্প নির্দেশনা—সুনীতি মিত্র। সম্পাদনা – অমিয় মুখোপাধ্যায়। শব্দগ্রহণ–শ্যামসুন্দর ঘোষ। সংগীত পরিচালনা – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

গীতরচনা—দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নেপথ্য কণ্ঠ—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। অভিনয়—উত্তমকুমার, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়, সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়, সুলতা চৌধুরী, কাজল গুপ্ত, দিলীপ রায়, তরুণকুমার, অসিতবরণ, জহর রায়, হরিধন মুখোপাধ্যায়, পার্থ মুখোপাধ্যায়।

কাহিনি—ইংরেজ শাসনাধীন ভারতবর্ষে ডাক্তার অগ্নীশ্বর মুখোপাধ্যায় (উত্তমকুমার) ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হন। এবং চাকরি নেন বিহারের একটি রেলওয়ে হাসপাতালে। সৎ, নিঃস্বার্থ এবং উন্নতচেতা অগ্নীশ্বর সমগ্র চাকরি জীবনে একদিকে যেমন নীচ স্বার্থসর্বস্ব লোকেদের দেখেছেন, তেমনি নিঃস্বার্থ ভালো মানুষদের সংস্পর্শেও এসেছেন। তাঁর প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব ও নিঃস্বার্থ সেবায় বিরুদ্ধ পক্ষের লোকজনরাও তাঁর প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছে।

অগ্নীশ্বর সুছন্দাকে (সুমিত্রা) অবিবাহিত অবস্থায় গর্ভবর্তী দেখে মর্মাহত হলেও তার চিকিৎসা করেন, পরে বিপ্লবী খগেনের (দিলীপ) কাছ থেকে জানতে পারেন সুছন্দা তার দেহ বিক্রির টাকায় রিভলভার কিনে তা বিপ্লবীদের হাতে তুলে দিত। তিনি দেখেছেন স্টোরবাবুর (হরিধন) দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী সরমা (কাজল) নিজেকে বঞ্চিত করে আগের পক্ষের ছেলেমেয়েদের যত্ন করতে গিয়ে নিজেই টিবিতে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি সরমা, সুছন্দার প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হন। বিবাহিত জীবনে অগ্নীশ্বরের ব্যক্তিত্ব তাঁদের দাম্পত্যে কিছুটা অসুবিধা সৃষ্টি করলেও তাঁর স্ত্রী (মাধবী) স্বামীর জন্য গর্বিত ছিলেন।

স্ত্রীর মৃত্যুর পর অগ্নীশ্বর ছেলের (পাথ) সাথে থাকতেন। অন্য জাতে ছেলের বিয়ে তিনি মেনে নিলেও শ্বশুরের অর্থে ছেলের বড়লোক হওয়ার ইচ্ছার প্রতিবাদ করেন। ছেলেও বাবার আদেশ মেনে নেয়। পরবর্তীকালে অগ্নীশ্বর উপলব্ধি করেন তাঁর প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব ছেলে এবং ছেলের বৌএর স্বাভাবিক দাম্পত্যে অসুবিধা সৃষ্টি করছে। তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে অজানা একটি গ্রামে একটি ছোট হাসপাতাল তৈরি করে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

অন্য দিকে দেশ স্বাধীন হয়, স্বাধীন দেশের সরকার একটি নতুন হাসপাতালের দায়িত্ব অগ্নীশ্বরের মতো সৎ মানুষের হাতে দিতে চায়। যখন অগ্নীশ্বরের খবর পাওয়া যায় দেখা যায় একটি ছোট মেয়ের জন্য রক্ত দিতে গিয়ে তিনি নিজেই মারা গিয়েছেন। ছবিটি সমালোচকদের সাথে দর্শকদের প্রশংসা পেয়েছিল। অগ্নীশ্বর-উপন্যাসের একটি পর্ব অবলম্বনে তরুণ মজুমদার ‘আলোর পিপাসা’ (১৯৬৫) ছবি তৈরি করেন। প্রকাশনা: ছবির চিত্রনাট্য ‘বৈশাখী’ পত্রিকায় (১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ১৪০৮) প্রকাশিত হয়।

অগ্রগামী | ছায়াছবি | ১৯৭৫, সাদাকালো, ৩৫ মিমি, ১২৫ মিনিট

সরোজ দে, নিশীথ মুখোপাধ্যায় এবং বিমল ভৌমিক যৌথ ভাবে অগ্রগামী গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা

করেন। এঁরা সকলেই আগে অগ্রদূত গোষ্ঠীতে সহপরিচালক হিসাবে কাজ করতেন। ১৯৫৬

থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত অগ্রগামী দশটি ছবি পরিচালনা করে। এদের প্রথম ছবি নিতাই ভট্টাচার্যের কাহিনি অবলম্বনে সাগরিকা (১৯৫৬)। উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন অভিনীত এই ছবি এবং পরবর্তী ছবি শিল্পী (১৯৫৬) বাণিজ্যসফল ছবি হিসাবে অগ্রগামীকে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। অগ্রগামী পরিচালিত তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে ডাক হরকরা (১৯৫৮) এবং রবীন্দ্রনাথের কাহিনি অবলম্বনে নিশীথে (১৯৬৩) ছবি দুটি রাষ্ট্রপতির পুরস্কারে (সার্টিফিকেট

অব মেরিট) ভূষিত হয়। এদের শেষ ছবি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে স্বাতী (১৯৭৭) দর্শকদের পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই গোষ্ঠীর অন্তর্গত বিমল ভৌমিক নারায়ণ চক্রবর্তীর সাথে যুগ্মভাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে দিবারাত্রির কাব্য (১৯৭০) পরিচালনা করেন এবং ছবিটি বছরের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ছবি হিসাবে রাষ্ট্রপতির সম্মান লাভ করে। মাধবী মুখোপাধ্যায় সেরা অভিনেত্রীর সম্মানে ভূষিত হন। পরবর্তী কালে এই গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য সরোজ সে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রযোজনায় নির্মাণ করেন কোনি (১৯৮৬)। এই ছবিটিও বছরের সেরা ছবি হিসাবে ভারতের রাষ্ট্রপতির পুরস্কার (স্বর্ণকমল) লাভ করে।

চলচ্চিত্রপঞ্জি–১৯৫৬ সাগরিকা, শিল্পী; ১৯৫৮ : ডাক হরকরা; ১৯৫৯ হেডমাষ্টার; ১৯৬২ : কান্না; ১৯৬৩ : নিশীথে; ১৯৬৬ শঙ্খবেলা; ১৯৭০: বিলম্বিত লয়: ১৯৭৪: যে যেখানে দাঁড়িয়ে; ১৯৭৭ : স্বাতী।

অগ্রদূত | ছায়াছবি | 

গোষ্ঠী পরিচালক হিসাবে অগ্রদূত গোষ্ঠী বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক বিস্তৃতি লাহার নেতৃত্বে চিত্রনাট্যকার নিতাই ভট্টাচার্য, শব্দযন্ত্রী যতীন দত্ত, রসায়নাগার কর্মী শৈলেন ঘোষাল এবং প্রযোজনা তত্ত্বাবধায়ক বিমল ঘোষ মিলিত ভাবে অগ্রদূতকে গড়ে তোলেন। অগ্রদূত পরিচালিত প্রথম ছবি স্বপ্ন ও সাধনা (১৯৪৭)। এই গোষ্ঠীর পরিচালনায় নির্মিত মোট ৩৩টি ছবির বেশির ভাগই বক্স অফিসে সাফল্য পেয়েছিল।

উত্তমকুমার এই গোষ্ঠীর পরিচালনায় নির্মিত ১৯টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। বিভিন্ন সময়ে সদস্যদের অনেকেই গোষ্ঠী ছেড়ে চলে গেলেও বিস্তৃতি লাহা ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত এই গোষ্ঠীর নামে চলচ্চিত্র পরিচালনার কাজ করেছেন যদিও চিত্রগ্রাহক হিসাবে কাজের সময় তিনি নিজের নামই ব্যবহার করতেন।

এই গোষ্ঠীর পরিচালনায় নির্মিত বাবলা (১৯৫১) ৭ম কার্লো ভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সামাজিক অগ্রগতির দিশারী’ হিসাবে পুরস্কৃত হয়।

চলচ্চিত্রপঞ্জি–১৯৪৭: স্বপ্ন ও সাধনা; ১৯৪৮ : সমাপিকা; ১৯৪৯ : সঙ্কল্প; ১৯৫১: সহযাত্রী, বাবলা; ১৯৫৪ : অগ্নিপরীক্ষা; ১৯৫৫ : অনুপমা, সবার উপরে; ১৯৫৬ : ত্রিযামা; ১৯৫৭: পথে হল দেরী; ১৯৫৮ : সূর্য্যতোরণ; ১৯৫৯: লালু ভুলু, ১৯৬০ : কুহক, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন; ১৯৬১: অগ্নিসংস্কার, বিপাশা, নবদিগন্ত; ১৯৬৩ উত্তরায়ণ, বাদশা; ১৯৬৫ : অন্তরাল, সূর্যতপা, তাপসী; ১৯৬৬: নায়িকা সংবাদ; ১৯৬৭ : কখনো মেঘ; ১৯৬৯: চিরদিনের; ১৯৭০: মঞ্জুরী অপেরা; ১৯৭১ : ছদ্মবেশী; ১৯৭৩ : সোনার খাঁচা; ১৯৭৫ : সেদিন দুজনে; ১৯৭৭ : দিন আমাদের; ১৯৮১ : সূর্যসাক্ষী; ১৯৮৯ : অপরাহ্নের আলো।

অর্ঘ্যকমল মিত্র (১৯৬২-) | ছায়াছবি | 

জন্ম কলকাতায়। সাউথ পয়েন্ট স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে শ্রীরামপুরে টেক্সটাইল টেকনোলজি পাঠক্রমে ভর্তি হন, পরে পুনায় অবস্থিত ফিল্ম এ্যন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে সম্পাদনা বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

স্বাধীন সম্পাদক হিসাবে প্রথম কাজ মলয় ভট্টাচার্য পরিচালিত কাহিনী (১৯৯৭) ছবিতে। মলয় ভট্টাচার্য ছাড়াও কাজ করেছেন অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, রাজা সেন, অঞ্জন দত্ত, সুমন মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি পরিচালকের সাথে। ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রভাত রায়ের সাথে যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন একমুঠো ছবি (২০০৫)। ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত আবহমান (২০১০) ছবি সম্পাদনার কারণে শ্রেষ্ঠ সম্পাদকের জাতীয় সম্মান লাভ করেন।

চলচ্চিত্রপঞ্জি–১৯৯৭ : কাহিনী; ১৯৯৮ দহন; ২০০০ উৎসব, চক্রব্যূহ, ২০০১: তিতলি; ২০০২ : গান্ধবী, দেশ, পারমিতার একদিন; ২০০৩: শুভ মহরত, চোখের বালি, ২০০৪: জয়যাত্রা, দেবীপক্ষ, তিন একে তিন; ২০০৫ : অন্তরমহল; ২০০৬: হারবার্ট; ২০০৭ : *এক মুঠো ছবি, কৃষ্ণকান্তের উইল; ২০০৮: খেলা: ২০০৯ : সব চরিত্র কাল্পনিক, আবহমান; ২০১০ একটি তারার খোঁজে, হাঁদা ভোঁদা, মহানগর @ কলকাতা, ব্যোমকেশ বক্সী, অন্তিম শ্বাস সুন্দর। • চিহ্নিত ছবি পরিচালনা করেন।

অঙ্কুশ  | ছায়াছবি | ১৯৫৪, সাদাকালো, ৩৫ মিমি, ১১৫ মিনিট

প্রযোজনা—লিটল পিকচার্স। কাহিনি ও সংলাপ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। চিত্রনাট্য—তপন সিংহ, বলীন সোম। পরিচালনা— তপন সিংহ। সংগীত পরিচালনা — কালীপদ সেন। চিত্রগ্রহণ – অনিল বন্দ্যোপাধ্যায়। শিল্প নির্দেশনা— বিজয় বসু। সম্পাদনা— রবি সেন। শব্দগ্রহণ—গৌর দাস। নৃত্য পরিচালনা—অনাদিপ্রসাদ। গীতিকার—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। অভিনয় — অনুভা গুপ্তা, মঞ্জু দে, অভি ভট্টাচার্য, বীরেশ্বর সেন, বলীন সোম, শ্যাম লাহা, প্রীতি মজুমদার, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, ননী মজুমদার, সলিল দত্ত, পারিজাত বসু, জহর রায়, বিশ্ববন্ধু সান্যাল, ঋষি বন্দ্যোপাধ্যায়।

কাহিনি—জমিদার চন্দ্র চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র পুত্র ইন্দ্র (অভি) জমিদারির মালিক হয়। ইন্দ্র তার স্ত্রী ইন্দ্রাণীকে (অনুভা) নিয়ে কলকাতা থেকে তাদের জমিদারিতে আসে। তার দীর্ঘদিনের বিশ্বাস তাদের জমিদারির মধ্যে একটা স্থানের নীচে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন লুকিয়ে আছে, এই নিদর্শন বৃহৎ বঙ্গের ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়নে সাহায্য করবে। এই অঞ্চলে বসবাস করে সাঁওতালরা যাদের একসময় চন্দ্র চৌধুরী এই স্থানে বসবাসের অধিকার দিয়ে ছিলেন। চন্দ্র চৌধুরীর জীবদ্দশায় ইন্দ্র সাঁওতালদের ভিটে থেকে উৎখাতের চেষ্টা করে নি, কারণ সে জানত এই কাজে সে পিতার সমর্থন পারে না।

আবার অন্যদিকে চন্দ্র চৌধুরীর প্রিয় হাতি নীলবাহাদুর আজ অবাঞ্ছিত। ইন্দ্র ও তার স্ত্রী এই আদিম যুগের বাহনটিকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করে। নীলবাহাদুর ইন্দ্রর ব্যবহৃত গাড়িটিকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে ভাবে, সে বোঝে তার অবহেলার প্রধান কারণ এই গাড়ি।

ইন্দ্রাণী নীলবাহাদুর এবং সাঁওতালদের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল হলেও ইন্দ্রের তাদের উপর কোনো সহানুভূতি নেই। ইন্দ্ৰ এক ঢিলে দুই পাখি মারার ব্যবস্থা নিয়ে সাত দিনের অভুক্ত নীলবাহাদুরকে সাঁওতালদের দিকে লেলিয়ে দেয়, আবার নিজের পেটোয়া লোকদের দিয়ে তাদের উপর গুলি চালায়। গুলিতে মোড়লের ছেলের মৃত্যু সাঁওতালদের খেপিয়ে দেয়, তারা তির ছুঁড়তে শুরু করে।

শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে ইন্দ্রাণী এই গোলমালের জায়গায় ছুটে আসে, সাঁওতালদের ছোঁড়া তিরে ইন্দ্রাণী আহত হয়।

ইন্দ্ৰ, ইন্দ্রাণীকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, অন্যদিকে আহত নীলবাহাদুরের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে গাড়িটার উপরে, সে গাড়িটাকে ধ্বংস করে নিজেও মারা যায়। সনাতনী যুগ বনাম যান্ত্রিক যুগের মধ্যকার সংগ্রামের এইভাবেই সমাপ্তি ঘটে।

প্রথম ছবি হিসাবে এই ধরনের বিষয়ের নির্বাচন তপন সিংহকে ব্যতিক্রমী চিত্রপরিচালক হিসাবেই চিহ্নিত করে। ছবিটি আর্থিকভাবে সফল না হলেও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছিল।

অজয় কর (১৯১৪-১৯৮৫) | ছায়াছবি |

জন্ম ১৯১৪ সালে কলকাতায়। আদি বাড়ি পূর্ববঙ্গের (বাংলাদেশ) ঢাকা জেলার তিকোরিয়া। পিতা প্রমোদচন্দ্র ছিলেন চিকিৎসক। কলেজে পড়াকালীন শিক্ষা অসম্পূর্ণ রেখে চিত্রগ্রহণ শিখবার জন্য ১৯৩৩ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম কোম্পানিতে যতীন দাসের অধীনে শিক্ষানবিশ হিসাবে কাজে যোগ দেন। পরবর্তীকালে ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতেও কিছুদিন শিক্ষানবিশ হিসাবে কাজ করেন। স্বাধীন ভাবে প্রথম চিত্রগ্রহণ করেন চারু রায় পরিচালিত এবং ইন্দ্র মুভিটোন প্রযোজিত পথিক (১৯৩৯) ছবিতে। পরে ‘সব্যসাচী’ নামে একটি যৌথ পরিচালক গোষ্ঠী স্থাপন করেন।

অজয় কর ছাড়াও সেখানে ছিলেন চিত্রনাট্যকার বিনয় চট্টোপাধ্যায়, শব্দযন্ত্রী যতীন দত্ত, শিল্প নির্দেশক বিশু চক্রবর্তী এবং সম্পাদক কমল গাঙ্গুলী। কানন দেবী প্রতিষ্ঠিত শ্রীমতী পিকচার্সের প্রযোজনায় সব্যসাচী পরিচালিত প্রথম ছবি অনন্যা (১৯৪৯), পরবর্তীকালে শ্রীমতী পিকচার্সের ব্যানারে তৈরি করেন বামুনের মেয়ে (১৯৪৯), এবং মেজদিদি (১৯৫০), শ্রীমতী পিকচার্সের হয়ে কাজ করার আগে তিনি জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে তিনটি, নিরঞ্জন পালের সাথে দুটি, নীরেন লাহিড়ীর চারটি, দেবকীকুমার বসুর একটি, শৈলজানন্দ মুখার্জীর দুটি এবং হেমেন গুপ্তর দুটি ছবির চিত্রগ্রহণের কাজ করেছেন।

স্বাধীন পরিচালক হিসাবে প্রথম ছবি জিঘাংসা (১৯৫১)। ছবিটির চিত্রগ্রহণের সাথে চিত্রনাট্য রচনাও করেছিলেন। এর আগে তিনি জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে যুগ্মভাবে রবীন মাষ্টার (১৯৪৯) ছবির চিত্রনাট্য রচনা করেন। সমগ্র চলচ্চিত্র জীবনে প্রায় ৪৫টি বাংলা ছবির চিত্রগ্রহণের পাশাপাশি ২৪টি ছবি পরিচালনা, ২টি ছবি প্রযোজনা এবং ৩টি ছবির চিত্রনাট্য রচনা করেছেন। কাজের সুবিধার জন্য ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ইন্ডিয়ান ফিল্ম ল্যাবরেটরি। প্রযোজিত ছবি দুটি হল পরিণীতা ও মাল্যদান।

চলচ্চিত্রপঞ্জি–১৯৩৯ : পথিক; ১৯৪১ : কর্ণার্জুন, রাসপূর্ণিমা, শকুন্তলা, শ্রীরাধা, ব্রাহ্মণ কন্যা; ১৯৪২ : পাষাণ দেবতা, গরমিল, মিলন, সহধর্মিণী, দ্বন্দ্ব, সমাধান; ১৯৪৩ : নীলাঙ্গুরীয়, দম্পতি, শহর থেকে দূরে, পোষ্যপুত্র; ১৯৪৫ : বন্দিতা, শ্রীদুর্গা, ভাবীকাল; ১৯৪৭ : রায়চৌধুরী, চন্দ্রশেখর; ১৯৪৮ : ভুলি নাই; ১৯৪৯ : রাঙামাটি, অনন্যা, অনুরাধা, পরিবর্তন, বামুনের মেয়ে; ১৯৫০ : মেজদিদি; ১৯৫১ : ‘জিঘাংসা; ১৯৫৪: গৃহপ্রবেশ; ১৯৫৫ : সাজঘর, পরেশ; ১৯৫৬ : শ্যামলী; ১৯৫৭: বড়দিদি, হারানো সুর, খেলাঘর; ১৯৬০ : সপ্তপদী, শুন বরনারী; ১৯৬২: অতল জলের আহ্বান; ১৯৬৩ : সাত পাকে বাঁধা, বর্ণালী; ১৯৬৪ : প্রভাতের রঙ; ১৯৬৬ : কাঁচ কাটা হীরে; ১৯৬৯ : পরিণীতা; ১৯৭১ : মাল্যদান; ১৯৭৩: কায়াহীনের কাহিনী; ১৯৭৯ : নৌকাডুবি; ১৯৮৪ : বিষবৃক্ষ; ১৯৮৮ : মধুবন।

. চিহ্নের পরের ছবিগুলি পরিচালনা করেছেন। এই ছবিগুলির প্রথম নয়টি ছবির চিত্রগ্রহণ ও অজয় কর নিজেই করেছিলেন।

মন্তব্য করুন