সমান্তরাল নাট্য ধারার নাট্য সমালোচনা – আশিস গোস্বামী

আশিস গোস্বামীর “বাংলা নাট্য সমালোচনার কথা” বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে “সমান্তরাল নাট্য ধারার নাট্য সমালোচনা” নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের দেশে পরাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে উপহার দিয়েছিল দুর্ভিক্ষ, মহামারি, ব্ল্যাক আউট, ব্ল্যাক মার্কেট, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর ছিল স্বাধীনতার লড়াই। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৭২ থেকে চালু হওয়া পাবলিক থিয়েটার ১৯৪৩ থেকে ৪৬-এর মধ্যে পিছু হটতে শুরু করে।

চল্লিশের দশক নতুন নাটককালের দশক, নতুন ভাবনার দশক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধে সারা পৃথিবীর সঙ্গে ভারতবর্ষও বিচলিত। সারা পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে এদেশ গলা মিলিয়েছিল। কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী দল তৈরি হয়েছে এখানেও। তারই ছত্রছায়ায় ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এখন এক পটভূমিতে নাট্য-আন্দোলন নতুন ভূমিকা নিল। পেশাদার নাট্যচর্চার পরিবর্তে নতুন এক নাট্যধারার সূচনা হল।

পেশাদারি নাট্যচর্চার সাংগঠনিক ও দর্শনগত দিক থেকে ভিন্নতর এক পথ—অপেশাদার কিন্তু গভীরভাবে সমাজমনস্ক এক কমিটেড নাট্যধারা। এই ধারাকেই আমরা সমান্তরাল নাট্যচর্চার ধারা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চলের মধ্যে পনেরো লক্ষ মানুষের অনাহারে মৃত্যুর গলিত শবের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিছক নাট্যচর্চা ছিল অসম্ভব। তাই গণনাট্যের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা নাট্যচর্চায় ‘নবান্ন’ নাট্যপ্রযোজনা ওই সব নাট্যধারার সূচক হয়ে উঠল। গণনাট্যের সমাজমনস্কতা ও নাট্যচর্চার ভূমিকাকে প্রকাশ করার দায় নিয়েছিল কয়েকটি নাট্যপত্র।

[ সমান্তরাল নাট্য ধারার নাট্য সমালোচনা – আশিস গোস্বামী ]

গণনাট্য সংঘের মুখপত্র হিসেবে প্রথম নাট্যপত্র প্রকাশিত হয় ধীরেন রায় সম্পাদিত ‘লোকনাট্য’ ১৯৪৯ সালে। ১৯৫১ সালের ১ অক্টোবর দিগিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘নাট্যলোক’। যদিও এটি গণনাট্যের মুখপত্র নয় কিন্তু নতুন নাট্যচর্চার আলোচনাতেই সমৃদ্ধ ছিল। এরপর ১৯৫২ সালে সলিল চৌধুরীর সম্পাদনায় ‘গণনাট্য’ প্রকাশিত হয়। ‘বহুরূপী’ পত্রিকা প্রকাশের আগে আর মাত্র একটি নাট্যপত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। ১৯৫৪ সালে ‘নাট্য’ নামে একটি বুলেটিন আকারের নাট্যপত্রের সন্ধান মেলে।

এই পত্রিকাগুলিতে নাট্য সমালোচনা প্রকাশিত হত না। গণনাট্য আন্দোলনের খবরাখবরই বেশি থাকত। কেবলমাত্র ‘নাট্যলোক’ পত্রিকায় কয়েকটি সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন, ‘লোকনাট্য’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় গণনাট্য আন্দোলনের সাংগঠনিক নীতি বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। তাতে লেখা হয়েছিল—“গণনাট্য সংঘ ঘোষণা করেছে গণনাট্য সংঘ গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শিবিরের দলভুক্ত— সংগ্রামী মজদুর, কৃষক ও অন্যান্য সংগ্রামী শ্রমজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের যে গণতন্ত্রের লড়াই—সাম্যবাদের লড়াই তারই একধর্মী, গণনাট্য সংঘ আন্দোলনকে এই আদর্শে গড়তে শপথ নিয়েছে।

১) সচেতন ও বিরামহীন ভাবে গণনাট্য আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বিভিন্ন সংগ্রামী জনগণের লড়াই ও দৈনন্দিন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে।

২) সাংস্কৃতিক জগতে যে হামলা চলেছে, আর বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল মতবাদ চালানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে গড়ে তুলবে প্রতিরোধ আন্দোলন। পেশাদারী শোষিত শিল্পী ও সাহিত্যিকদের জীবনে যে অর্থনৈতিক সংকট এসেছে ও তাদের শিল্পকে যে প্রতিক্রিয়ার স্বার্থে ক্রয় করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলবে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শিল্পী ও লেখকদের এনে দাঁড় করাবে গণতান্ত্রিক মোর্চার আন্দোলনের মঞ্চে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে।”

[ সমান্তরাল নাট্য ধারার নাট্য সমালোচনা – আশিস গোস্বামী ]

আশিস গোস্বামী [ Ashish Goswami ] - সমান্তরাল নাট্য ধারার নাট্য সমালোচনা - আশিস গোস্বামী
সমান্তরাল নাট্য ধারার নাট্য সমালোচনা – আশিস গোস্বামী [ Ashish Goswami ]
এই ধরনের প্রতিবেদন ছাড়াও কিছু রিপোর্টও ছাপা হত এই পত্রিকায়। যেমন, “গত ২৭শে ফেব্রুয়ারী সারা ভারতে গণনাট্য সংঘের প্রতিটি শাখা ডিক্সন লেন হত্যাকাণ্ডে নিহত শিল্পীদের স্মরণে শহীদ দিবস পালন করে। এই অনুষ্ঠানের তাৎপর্য গতানুগতিক ধারায় শোকসভা করার নয়, এর বৈশিষ্ট্য ছিল ঐ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কার্য-কারণ অনুসন্ধান করে ঘটনাকে বিশ্লেষণ করা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতির দিক নির্ণয়।” অনুরূপ ভাবেই ‘গণনাট্য’ পত্রিকা প্রকাশের প্রথম পর্যায়ে গণনাট্যের আদর্শ ও লক্ষ্যের প্রচারটাই বড়ো ছিল। বরং ১৯৬৪ সালে চিররঞ্জন দাসের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘গণনাট্য’ পত্রিকার দ্বিতীয় পর্যায়ে গণনাট্যের সঙ্গে বিশ্বনাট্যধারাকে মিলিয়ে দেখার প্রয়াস ছিল।

প্রথম পর্যায়ের ‘গণনাট্য’ পত্রিকায় কতগুলি আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন উৎপল দত্তর ‘গণনাট্য আন্দোলনে নাটকের সমস্যা প্রবন্ধটিতে আত্মসমালোচনার সুর ছিল, “আন্দোলনের সুস্পষ্ট রূপ নির্ণয় করতে হলে দুটি দিক সম্বন্ধেই জানতে হবে। প্রথম হল গণনাট্যের দর্শক ও দ্বিতীয় তার নাটক ও বিষয়বস্তু। দেশের সংগ্রামরত সাধারণ মানুষ-মজুর, কৃষক, বুদ্ধিজীবী প্রভৃতির কাছে আমাদের পৌঁছতে হবে। দেশের সুদূরতম পল্লী অঞ্চলেও আমাদের পৌঁছতে হবে। কিন্তু আন্দোলন কি ততদূর পৌঁছতে পেরেছে?”

এদিক থেকে ‘নাট্যলোক’ যথেষ্ট স্বতন্ত্র ছিল। সেখানে নাট্য সমালোচনাকে প্রভূত গুরুত্ব দেওয়া হত। শচীন সেনগুপ্তর মত নাট্যব্যক্তিত্বের সমালোচনা সেখানে প্রকাশিত হয়েছে। ‘নতুন ইহুদী’ নাটকের বিস্তৃত সমালোচনাটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। সম্ভবত ‘নাট্যলোক’ পত্রিকাই প্রথম গণনাট্য সংঘের বাইরে সর্বস্তরের নাট্যচর্চার মুখপত্র হয়ে উঠতে চেয়েছিল। এই প্রয়াস পরবর্তী কালের ‘নাট্য’ পত্রিকাটিতেও ছিল। কিন্তু প্রচার পত্রের বাইরে নবনাট্যের মুখপত্র হয়ে উঠতে পারেনি। সুতরাং সমালোচনা প্রকাশ ছিল দূর অস্ত।

[ সমান্তরাল নাট্য ধারার নাট্য সমালোচনা – আশিস গোস্বামী ]

“বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলন বর্তমানে যে ব্যাপ্তিলাভ করেছে তার পক্ষে একটি শক্তিশালী নাট্য পত্রিকা অবশ্য প্রয়োজন। মুখপত্রের অভাব আমাদের নাট্য আন্দোলনের একটা বড় দুর্বলতা। ‘নাট্য’ বর্তমানে সে অভাব পূরণ করতে পারবে না কিন্তু আমরা এই আশা করি, বিভিন্ন নাট্য সংঘ ও নাট্যরসিক জনসাধারণের আন্তরিক সহযোগিতায় আমরা এই প্রচার পত্রটিকে কালক্রমে একটি নাট্য পত্রিকায় পরিণত করে নবনাট্য আন্দোলনের শক্তিশালী হাতিয়ার করে তুলতে পারব।” ‘নাট্য’-র এই আশা সফল হয়নি এবং সেই শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে পাবার জন্য অপেক্ষা করতে হল আরও একবছর।

১৯৫৫-এ প্রকাশিত হল ‘বহুরূপী’ পত্রিকা। এই পত্রিকা প্রকাশের পটভূমি রচনা করেছিল ‘লোকনাট্য’, ‘নাট্যলোক’, ‘নাট্য’, ‘গণনাট্য’ পত্রিকা, তার সঙ্গে আমরা পেয়ে যাই ‘অরণি’, ‘জনযুদ্ধ’-র মতো পত্রিকাগুলিকেও। এদের ভূমিকাও কম ছিল না। তবে এটা ঠিক, কোনোটিতেই নাট্য সমালোচনা প্রাধান্য পায়নি। তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ‘বহুরূপী’ নয় ‘গন্ধব’ নাট্যপত্র প্রকাশ পর্যন্ত। সময়কাল ১৯৫৯।

১৯৪৯ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত যে সমস্ত নাট্যপত্র প্রকাশিত হয়েছিল তার একটি তালিকা দেওয়া হল।

[ সমান্তরাল নাট্য ধারার নাট্য সমালোচনা – আশিস গোস্বামী ]

নাট্যপত্র [ প্রকাশকাল :] সম্পাদক

লোকনাট্য [ প্রকাশকাল : ১৯৪৯] সম্পাদক – ধীরেন রায়

নাট্যলোক [ প্রকাশকাল : ১৯৫১] সম্পাদক – দিগিন বন্দ্যোপাধ্যায়

গণনাট্য (১ম পর্যায়) [ প্রকাশকাল : ১৯৫২] সম্পাদক – সলিল চৌধুরি

নাট্য [ প্রকাশকাল : ১৯৫৪] সম্পাদক – **

বহুরূপী [ প্রকাশকাল : ১৯৫৫] সম্পাদক – গঙ্গাপদ বসু

পাদপ্রদীপ [ প্রকাশকাল : ১৯৫৬] সম্পাদক – উৎপল দত্ত

মঞ্চকথা*** [ প্রকাশকাল : ১৯৫৭] সম্পাদক – **

প্রসেনিয়াম [ প্রকাশকাল : ১৯৫৬] সম্পাদক – সমরেন্দ্র নাথ সরকার

গন্ধর্ব [ প্রকাশকাল : ১৯৫৯] সম্পাদক – নৃপেন্দ্র সাহা

নতুন থিয়েটার*** [ প্রকাশকাল : ১৯৬০] সম্পাদক – চিররঞ্জন দাস

রূপকার *** [ প্রকাশকাল : ১৯৬৩] সম্পাদক – **

শৌভনিক*** [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – **

গণনাট্য (২য় পর্যায়) [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – চিররঞ্জন দাস

দিশারী*** [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – **

সংলাপ *** [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – অহীন্দ্র ভৌমিক, সত্যেন সাহা

থিয়েটার [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – পবিত্র সরকার, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়

মঞ্চজগৎ [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – **

অভিনয় দর্পণ [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – ঋত্বিক ঘটক

এপিক থিয়েটার [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – উৎপল দত্ত

অভিনয়’ [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

রক্তকরবী [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – **

রূপমঞ্চ [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – কালীশ মুখোপাধ্যায়

নাট্য পাক্ষিক [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – দীপক শৰ্মাচার্য

দৃশ্যকাব্য[ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – সুনীল দত্ত

দর্শক[ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – দেবকুমার বসু

আসর [ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক – সত্যচরণ ঘোষ

সূত্রধার[ প্রকাশকাল : ] সম্পাদক –  বরুণ মুখোপাধ্যায়

(**সম্পাদকের নাম জানা যায়নি। আলোচ্য সময়সীমার মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু সুনির্দিষ্ট সালটি জানা যায়নি। *** পত্রিকার উল্লেখ নানাভাবে পেলেও পত্রিকার কোনো সংখ্যার সন্ধান পাইনি।)

[ সমান্তরাল নাট্য ধারার নাট্য সমালোচনা – আশিস গোস্বামী ]

আরও দেখুন:

নাট্য সমালোচনার লক্ষ্য – আশিস গোস্বামী

 

“সমান্তরাল নাট্য ধারার নাট্য সমালোচনা – আশিস গোস্বামী”-এ 9-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন