কানাই দে ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম বিশিষ্ট চিত্রগ্রাহক (Cinematographer)। তাঁর ক্যামেরার কাজ বাংলা ছবিকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল, যেখানে বাস্তবতা, আবহ এবং আবেগ একত্রিত হয়ে পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। প্রায় চার দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নানা প্রজন্মের পরিচালক, অভিনেতা ও কলাকুশলীর সাথে কাজ করেছেন এবং বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।
কানাই দে – জীবন ও কর্ম
প্রারম্ভিক জীবন ও চলচ্চিত্রে সূচনা
কানাই দে চলচ্চিত্রজীবন শুরু করেছিলেন সহকারী চিত্রগ্রাহক হিসেবে। এই সময়ে তিনি আলো, ফ্রেমিং ও ক্যামেরা-চালনার সূক্ষ্ম কৌশল শিখেছিলেন। স্বাধীন চিত্রগ্রাহক হিসাবে তার প্রথম কাজ ছিল দিলীপ সে চৌধুরী পরিচালিত জনপ্রিয় কৌতুক চলচ্চিত্র ভানু পেলো লটারী (১৯৫৮)। এই ছবিই তাকে শিল্পমহলে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
কর্মজীবন ও সহযোগিতা
কানাই দে’র চলচ্চিত্রজীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। তিনি প্রায় ৪৫টি ছবির চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছেন। বাংলা সিনেমার সোনালি যুগে তিনি যে সব বিশিষ্ট পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন তাদের মধ্যে ছিলেন—
- মঙ্গল চক্রবর্তী
- হীরেন নাগ
- উত্তমকুমার (পরিচালক হিসেবেও)
- অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়
- পীযূষ বসু
- পার্থপ্রতিম চৌধুরী
- সলিল দত্ত
তাঁর ক্যামেরা কেবল গল্পকে রূপ দেয়নি, বরং সিনেমার আবহ ও দর্শনীয়তাকে আরও বর্ণময় করেছে। বিশেষত নাটকীয় দৃশ্য, আবেগময় মুহূর্ত এবং গ্রামীণ পটভূমি ফুটিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন দক্ষ।
উল্লেখযোগ্য কাজ ও শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে তার সিনেমাটোগ্রাফি বিশেষ প্রশংসিত হয়। যেমন—মহাতীর্থ কালীঘাট (১৯৬৪)-এ ধর্মীয় আবহের সাথে কলকাতার ভিড় ও রঙিন মেলবন্ধন, মৌচাক (১৯৭৫)-এ শহুরে কৌতুক ও জীবনধারার রঙিন চিত্রায়ণ, কিংবা বনপলাশীর পদাবলী (১৯৭৩)-এর ঐতিহাসিক আবহে তিনি ক্যামেরাকে ব্যবহার করেছিলেন গল্প বলার এক অনন্য ভাষা হিসেবে।
৮০ ও ৯০-এর দশকে, যখন বাংলা সিনেমা পরিবর্তনের পথে, কানাই দে তার কারিগরি দক্ষতাকে সময়োপযোগী করে তুলেছিলেন। তাঁর ক্যামেরা কাজ শুধু গল্প বলার মাধ্যমই ছিল না, বরং একধরনের ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশন, যা সময়ের সঙ্গে আজও মূল্যবান।
চলচ্চিত্রপঞ্জি (নির্বাচিত)
- ১৯৫৮ – ভানু পেলো লটারী, পুরীর মন্দির
- ১৯৬৩ – শেষ অঙ্ক, দুই বাড়ী, ন্যায়ও, দেয়ানেয়া
- ১৯৬৪ – মহাতীর্থ কালীঘাট
- ১৯৬৫ – থানা থেকে আসছি
- ১৯৬৬ – কাল তুমি আলেয়া
- ১৯৬৭ – জীবন মৃত্যু, দুষ্টু প্রজাপতি
- ১৯৭০ – মেঘ কালো
- ১৯৭২ – অন্ধ অতীত
- ১৯৭৩ – রৌদ্রছায়া, বনপলাশীর পদাবলী
- ১৯৭৪ – বিকেলে ভোরের ফুল, বিসর্জন, যদুবংশ, রোদনভরা বসন্ত
- ১৯৭৫ – মৌচাক, স্বয়ংসিদ্ধা, প্রিয় বান্ধবী
- ১৯৭৬ – সুদূর নীহারিকা
- ১৯৭৯ – বনবাসর
- ১৯৮১ – পাহাড়ী ফুল
- ১৯৮২ – প্রফুল্ল, সতী সাবিত্রী সত্যবান
- ১৯৮৪ – অগ্নিশুদ্ধি
- ১৯৮৭ – সম্রাট ও সুন্দরী
- ১৯৯০ – রক্তঋণ
- ১৯৯১ – আনন্দ
- ১৯৯৩ – অনুভব
- ১৯৯৪ – ভালোবাসার আশ্রয়, প্রত্যাঘাত
- ১৯৯৫ – দৃষ্টি, প্রেম সংঘাত
- ১৯৯৭ – দশ নম্বর বাড়ী, নির্জন দ্বীপ, প্রেম জোয়ারে
- ১৯৯৮ – শেষ কর্তব্য
- ২০০০ – বসতির মেয়ে রাধা
- ২০০১ – এটাই স্বর্গ, বিনয় বাদল দীনেশ
- ২০০২ – ছেলেবেলা
মূল্যায়ন
কানাই দে ছিলেন সেইসব চলচ্চিত্রকারদের একজন, যাদের পেছনের কাজ সামনে দৃশ্যমান না হলেও চলচ্চিত্রের সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। তাঁর ক্যামেরা কাহিনিকে বর্ণনা করার পাশাপাশি আবেগকে দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি ছিলেন সৃজনশীল কারিগর, যিনি প্রযুক্তি ও শিল্পকে একত্রিত করে বাংলা চলচ্চিত্রে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছিলেন।