১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চিড়িয়াখানা হল কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় পরিচালিত একটি বাংলা রহস্যচিত্র, যা বিখ্যাত সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ব্যোমকেশ বক্সী সিরিজের একই নামের গল্প অবলম্বনে নির্মিত। এই চলচ্চিত্রে ব্যোমকেশ চরিত্রে অভিনয় করেন মহানায়ক উত্তম কুমার। চমৎকার কাহিনির গাঁথুনি ও রহস্যময় পরিবেশ সত্ত্বেও ছবিটি সমালোচকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল এবং বক্স অফিসেও প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।

চিড়িয়াখানা চলচ্চিত্র । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান
চিড়িয়াখানা (১৯৬৭)
একটি গোয়েন্দা থ্রিলার চলচ্চিত্র
পরিচালনায়: সত্যজিৎ রায়
ভিত্তি: শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সী কাহিনি
চলচ্চিত্র নির্মাণ টিম
| বিভাগ | নাম |
| প্রযোজক | হরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (স্টার প্রোডাকশনস) |
| কাহিনি | শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় |
| ✍ চিত্রনাট্য, সংগীত, পরিচালনা | সত্যজিৎ রায় |
| চিত্রগ্রহণ | সৌমেন্দু রায় |
| শিল্প নির্দেশনা | বাণী চন্দ্রগুপ্ত |
| শব্দগ্রহণ | নৃপেন পাল, অতুল চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ |
| ✂️ সম্পাদনা | দুলাল দত্ত |
অভিনয় শিল্পীরা
উত্তম কুমার, কণিকা মজুমদার, গীতালি রায়, সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়, সুধীরা রায়, কলিন মেন্ডিজ, শুতে চট্টোপাধ্যায়, শৈলেন মুখোপাধ্যায়, সুশীল মজুমদার, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল ঘোষাল, বঙ্কিম ঘোষ, প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নীলোৎপল দে, কালীপন চক্রবর্তী, চিন্ময় রায়, শৈলেন গঙ্গোপাধ্যায়, অশোক মিত্র, বিনয় দত্ত, দেবী নিয়োগী, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, রমেন গুপ্ত।
কাহিনির মূলপট
অবসরপ্রাপ্ত বিচারক নিশানাথ সেন গোলাপ কলোনি নামক এক ব্যতিক্রমধর্মী ফার্ম হাউস তৈরি করেন, যেখানে তিনি সমাজ থেকে বিচ্যুত, নানা রকমের ব্যতিক্রমী জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষদের আশ্রয় দেন। তবে এই নির্জন স্থানে রহস্য জমতে শুরু করে—কারা যেন নিশানাথের গাড়ি নষ্ট করে, এবং পরে হঠাৎ করে নিশানাথ খুন হন।
নিশানাথের অনুরোধে ব্যোমকেশ বক্সী এবং তাঁর সঙ্গী অজিত ছদ্মবেশে তদন্তে নামেন। গোলাপ কলোনিতে ছদ্মনামে আশ্রয় নেয়া এক সময়ের চলচ্চিত্র নায়িকা সুনয়না, যিনি এখন বনলক্ষ্মী নামে পরিচিত—তাঁর পরিচয়, অতীত ও বর্তমানে ঘটা খুনগুলোর সঙ্গে জড়িত রহস্য একে একে উন্মোচিত হয়।
পরবর্তীতে পান্গুপাল নামের এক বোবা চরিত্রও খুন হয়, কারণ সে খুনিকে চিনে ফেলেছিল। শেষ পর্যন্ত জানা যায়, ভুজঙ্গধর ও বনলক্ষ্মী মিলে নিশানাথ ও পান্গুপালকে খুন করে। বনলক্ষ্মী আসলে সুনয়নাই, যিনি প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে নিজের চেহারা বদলে ফেলেছিলেন। চূড়ান্ত পরিণতিতে দুজনেই আত্মহত্যা করে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র
| চরিত্রের নাম | অভিনেতা/অভিনেত্রী | চরিত্র পরিচিতি |
| ব্যোমকেশ বক্সী | উত্তম কুমার | গোয়েন্দা |
| নিশানাথ সেন | সুশীল মজুমদার | অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, খুনের শিকার |
| বনলক্ষ্মী/সুনয়না | গীতালি রায় | ছদ্মনামে লুকানো খুনী |
| ভুজঙ্গধর দাস | শ্যামল ঘোষাল | প্রাক্তন চিকিৎসক, খুনে অংশীদার |
| অজিত | শৈলেন মুখার্জী | ব্যোমকেশের বন্ধু |
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
| বছর | বিভাগ | বিজয়ী |
| ১৯৬৭ | সেরা পরিচালক (জাতীয়) | সত্যজিৎ রায় |
| ১৯৬৭ | সেরা অভিনেতা (জাতীয়) | উত্তম কুমার (এই ছবি ও “এন্টনি ফিরিঙ্গী” ছবির জন্য) |
গ্রহণযোগ্যতা ও সমালোচনা
যদিও “চিড়িয়াখানা” একটি গোয়েন্দাকাহিনি-ভিত্তিক চলচ্চিত্র, এবং এতে উত্তম কুমারের মতো মহানায়ক ও সত্যজিৎ রায়ের নির্মাণশৈলী যুক্ত ছিল, তবু এটি দর্শক ও সমালোচক মহলে প্রত্যাশিত প্রশংসা অর্জন করতে পারেনি। অনেকেই মনে করেন এটি সত্যজিৎ রায়ের অন্যান্য ছবির মতো আবেগপ্রবণ বা গাঢ় শৈল্পিকতায় পৌঁছায়নি। তা সত্ত্বেও এটি একটি সাহিত্যনির্ভর গুরুত্বপূর্ণ চিত্রনাট্য হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

“চিড়িয়াখানা” এমন একটি চলচ্চিত্র যা একদিকে ব্যোমকেশ বক্সীর রহস্য রোমাঞ্চ এবং অন্যদিকে সত্যজিৎ রায়ের নির্মাণগুণ—এই দুইয়ের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে। যদিও এটি আর্থিকভাবে সফল না হলেও, এটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। আজও এটি ব্যোমকেশ অনুরাগী ও সত্যজিৎভক্তদের জন্য এক প্রাসঙ্গিক সিনেমা।
