চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত। এই দীর্ঘ সময়ে অভিনয়ের ধারা, কৌশল এবং দর্শন ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। নীরব যুগের অতিরঞ্জিত অঙ্গভঙ্গি থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল যুগের সূক্ষ্ম বাস্তবধর্মী অভিনয়—প্রতিটি ধাপেই বিশ্ব চলচ্চিত্রে অভিনয়ের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
বিশ্ব চলচ্চিত্রে অভিনয়ের রূপান্তর — নীরব যুগ থেকে ডিজিটাল যুগ
১. নীরব যুগের অভিনয় (Silent Era: ১৮৯০–১৯২০ দশক)
- নীরব চলচ্চিত্রের সময়ে সংলাপ ছিল না। তাই আবেগ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম ছিল মুখের অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা ও শরীরী ভঙ্গি।
- অভিনয় ছিল অনেকটাই নাট্যমূলক (theatrical)—বড় বড় অঙ্গভঙ্গি, অতিরঞ্জিত দৃষ্টি ও হাতের ভঙ্গি ব্যবহার করা হতো যাতে দর্শক সহজে আবেগ বুঝতে পারে।
- চার্লি চ্যাপলিন, বস্টার কিটন, হ্যারল্ড লয়েড প্রমুখ এই সময়ের কিংবদন্তি। তাঁদের কমেডি ও ট্র্যাজেডি মিশ্রিত শরীরী অভিনয় আজও বিশ্ব চলচ্চিত্রের ক্লাসিক নিদর্শন।
২. শব্দ যুগ ও বাস্তবতার সূচনা (Sound Era: ১৯২৭–১৯৪০ দশক)
- ১৯২৭ সালে The Jazz Singer ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে প্রথমবার সংলাপের সংযোজন ঘটে।
- এর ফলে অভিনয়ের ধরনে আসে বিরাট পরিবর্তন। অতিরঞ্জিত ভঙ্গির বদলে অভিনেতাদের গুরুত্ব দিতে হয় কণ্ঠস্বর, উচ্চারণ, সংলাপ প্রক্ষেপণ ও টোনে।
- বাস্তবধর্মী অভিনয়ের সূচনা হয়, যেখানে ছোটখাটো ভ্রূকুটি বা কণ্ঠস্বরের ওঠানামাই চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
- এই সময়ে গ্রেটা গার্বো, হামফ্রে বোগার্ট, ক্লার্ক গেবল প্রমুখ অভিনয়শিল্পীরা আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি পান।
৩. হলিউডের সোনালি যুগ ও তারকাখ্যাতি (১৯৪০–১৯৬০ দশক)
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হলিউডে গড়ে ওঠে “তারকাপদ্ধতি” (Star System)। অভিনেতারা শুধুমাত্র শিল্পী নন, তারা হয়ে ওঠেন আইকন ও ব্র্যান্ড।
- অভিনয়ে আবেগ ও সংলাপের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি গ্ল্যামারকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
- মেরিলিন মনরো, জেমস ডিন, অড্রে হেপবার্ন, মার্লন ব্র্যান্ডো—এরা কেবল অভিনেতা ছিলেন না, বরং এক যুগের প্রতীক।
- মার্লন ব্র্যান্ডো A Streetcar Named Desire (১৯৫১)-এ “Method Acting” জনপ্রিয় করেন, যা অভিনয়কে আরও বাস্তব ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা দেয়।
৪. পদ্ধতিগত অভিনয় ও নিউ ওয়েভ (১৯৬০–১৯৮০ দশক)
- ইউরোপীয় নিউ ওয়েভ আন্দোলন ও আমেরিকান “নিউ হলিউড” অভিনয়ে বিপ্লব ঘটায়।
- এখানে অভিনয়ের মূল লক্ষ্য ছিল প্রাকৃতিকতা (naturalism)। অভিনেতারা নিজেদের অভিজ্ঞতা, আবেগ ও স্মৃতিকে কাজে লাগিয়ে চরিত্র নির্মাণ করতেন।
- স্ট্যানিস্লাভস্কির পদ্ধতি (Stanislavski’s System) ও লিস স্ট্র্যাসবার্গের মেথড অ্যাক্টিং নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের জন্য মডেল হয়ে ওঠে।
- এই সময়ে রবার্ট ডি নিরো, আল পাচিনো, মেরিল স্ট্রিপ, ডাস্টিন হফম্যান অভিনয়কে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
৫. বৈশ্বিক প্রভাব ও বহুমাত্রিক অভিনয় (১৯৮০–২০০০ দশক)
- বিশ্ব সিনেমায় এই সময়ে এশিয়ান, আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকান চলচ্চিত্র শিল্প দৃঢ় অবস্থান তৈরি করে।
- ভারতীয় চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন-এর ছবিতে বাস্তবধর্মী অভিনয়ের স্বাক্ষর মেলে।
- জাপানি পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়ার ছবিতে তোশিরো মিফুনে-র অভিনয় অনন্য।
- এ সময়ে অভিনয়শিল্পীদের বহুমাত্রিক চরিত্রে দেখা যায়—একদিকে হিরো, অন্যদিকে ভিলেন বা অ্যান্টি-হিরো।
৬. ডিজিটাল যুগ ও অভিনয়ের নতুন পরিসর (২০০০–বর্তমান)
আজকের দিনে অভিনয় কেবল ক্যামেরার সামনে নয়, বরং প্রযুক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
① কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজারি (CGI)
- অনেক সময় অভিনেতাকে কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে অভিনয় করতে হয়, যেটি পরবর্তীতে CGI-র মাধ্যমে তৈরি হয়।
- অভিনেতাকে সম্পূর্ণ কল্পনার জগতে দাঁড়িয়ে আবেগ প্রকাশ করতে হয়।
② মোশন ক্যাপচার অভিনয় (Motion Capture)
- বিশেষ সেন্সরযুক্ত স্যুট পরে অভিনেতার শরীর ও মুখের সূক্ষ্ম নড়াচড়া রেকর্ড করা হয়।
- অ্যান্ডি সার্কিস (The Lord of the Rings-এ গলুম, Planet of the Apes-এ সিজার) এই ধারার অভিনয়ের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
③ ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ও পারফরম্যান্স ক্যাপচার
- এখন চলচ্চিত্র শুধু সিনেমা হলেই সীমাবদ্ধ নয়, VR (Virtual Reality) ও AR (Augmented Reality)-তেও অভিনয় হচ্ছে।
- এখানে দর্শক ইন্টারঅ্যাক্টিভ অভিজ্ঞতা পান, আর অভিনেতাকে অভিনয় করতে হয় নতুন প্রযুক্তির মাপকাঠি মেনে।
বিশ্ব চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ইতিহাস হলো অতিনাটকীয়তা থেকে সূক্ষ্ম বাস্তবতার যাত্রা।
- নীরব যুগে যেখানে শরীরী ভাষাই ছিল সব,
- শব্দ যুগে সেখানে সংলাপ ও কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পেল,
- নিউ ওয়েভ ও মেথড অ্যাক্টিং অভিনয়ে যোগ করল মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা,
- আর আজকের ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি ও অভিনয় মিলে তৈরি করছে অভিনয়ের নতুন দিগন্ত।
অভিনয় আজ শুধু পর্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাস্তব ও ভার্চুয়াল জগতের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ভার্চুয়াল অভিনেতা ও হাইপার-রিয়াল ডিজিটাল অবতার এই যাত্রাকে আরও বহুমুখী করে তুলবে।