অগ্রদূত গোষ্ঠী বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য যৌথ পরিচালনা দল, যা ১৯৪০-এর দশকের শেষভাগে গঠিত হয়। এটি একক পরিচালকের পরিবর্তে প্রযুক্তিবিদ, ক্যামেরাম্যান এবং অন্যান্য কলাকুশলীর যৌথ প্রচেষ্টার ফসল, যারা “অগ্রদূত” নামে ক্রেডিট নিতেন। এই মডেল বাংলা সিনেমায় বিরল, যা দেশভাগ-উত্তর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং সৃজনশীলতার মিলনে জন্ম নেয়। গোষ্ঠীটি MP প্রোডাকশনের অধীনে বেশিরভাগ ছবি নির্মাণ করে এবং ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত সক্রিয় থাকে।
প্রাথমিক সদস্যরা ছিলেন:
- বিভূতি লাহা (১৯১৫–১৯৯৭): গ্রুপের নেতা এবং ক্যামেরাম্যান। তিনি ১৯৩০-এর দশকে নিউ থিয়েটার্সে ক্যামেরাম্যান হিসেবে শুরু করেন এবং পরে পরিচালনায় যোগ দেন।
- যতীন লাহা রায়: শব্দ গ্রহণকারী।
- শৈলেন ঘোষাল: ল্যাবরেটরি কাজ।
- নিতাই ভট্টাচার্য: স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং দৃশ্যকল্পকার।
- বিমল ঘোষ: প্রোডাকশন কন্ট্রোলার।
পরে যোগ দেন সরোজ দে, সলিল দত্ত, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, সত্যেন চৌধুরী প্রমুখ। বিভূতি লাহা গ্রুপের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন এবং তাঁর ক্যামেরা ওয়ার্ক অগ্রদূতের ছবিতে স্পষ্ট।

অগ্রগামী গোষ্ঠী
কর্মজীবন ও সাফল্য
অগ্রদূতের প্রথম ছবি সংকল্প (১৯৪৯)। ১৯৫০-এর দশকে তারা উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেন জুটির অনেক হিট ছবি পরিচালনা করে, যা বাংলা সিনেমার বক্স অফিসে বিপ্লব ঘটায়। গ্রুপটি সাহিত্যিক অবলম্বনে (যেমন তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) ছবি তৈরি করে শিল্পগত মান রক্ষা করে। তারা প্রায় ৪০টি ছবি নির্মাণ করে, যা মোট বক্স অফিসে কোটি কোটি টাকা আয় করে (যুগ বিবেচনায়)।
অগ্রদূতের ছবি সামাজিক বার্তা (যেমন দারিদ্র্য, সম্পর্ক, সাম্প্রদায়িকতা) বহন করত এবং বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করে। উত্তমকুমারের ক্যারিয়ারে অগ্রদূতের অবদান বিশাল, কারণ তাদের ছবিতে উত্তম “রোম্যান্টিক হিরো” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রপঞ্জি
অগ্রদূতের কিছু বিখ্যাত ছবি (বছরসহ বিস্তারিত):
- ১৯৪৯: সংকল্প — প্রথম ছবি, সামাজিক নাটক।
- ১৯৫১: বাবলা — উত্তমকুমারের প্রথম ছবি অগ্রদূতের সাথে।
- ১৯৫১: সহোদর — ভাই-বোনের সম্পর্ক নিয়ে।
- ১৯৫২: অন্নপূর্ণার মন্দির — তারাশঙ্করের উপন্যাস অবলম্বনে, দারিদ্র্য নিয়ে।
- ১৯৫৪: অগ্নিপরীক্ষা — উত্তম-সুচিত্রা জুটির প্রথম হিট, বক্স অফিসে রেকর্ড।
- ১৯৫৫: সবার উপরে — রহস্যময় নাটক, উত্তম-সুচিত্রা জুটি।
- ১৯৫৫: অনুপমা — রোমান্টিক নাটক।
- ১৯৫৭: পথে হল দেরি — উত্তম-সুচিত্রার আরেক হিট।
- ১৯৫৮: লালু ভুলু — অন্ধ-বধির গল্প, সামাজিক বার্তা।
- ১৯৬০: খোকা বাবুর প্রত্যাবর্তন — কমেডি নাটক।
- ১৯৬২: ভগিনী নিবেদিতা — স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা নিবেদিতার জীবনী, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত।
- ১৯৬২: বিপাশা — রোমান্টিক নাটক।
- ১৯৬৩: উত্তরায়ণ — সামাজিক নাটক।
- ১৯৬৭: অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি — বাংলা ফোক সংগীত নিয়ে, উত্তমকুমারের আইকনিক রোল, জাতীয় পুরস্কার (সেরা অভিনেতা)।
- ১৯৬৯: চিরদিনের — রোমান্টিক নাটক।
- ১৯৭১: চড়াইবেশি — কমেডি।
- ১৯৭২: হার মানা হার — শেষ উল্লেখযোগ্য ছবি।
অনেক ছবি উত্তমকুমার অভিনীত এবং বক্স অফিসে সুপারহিট।
অগ্রগামী গোষ্ঠী ইতি:
অগ্রগামী গোষ্ঠী (Agragami) স্পষ্টভাবে “ভেঙ্গে যাওয়ার” কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা কেলেঙ্কারির কারণে বন্ধ হয়নি। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই গোষ্ঠীটি ধীরে ধীরে কার্যক্রম কমিয়ে দেয় এবং শেষ ছবি স্বাতী (১৯৭৭) নির্মাণের পর সক্রিয়তা হারায়। প্রধান কারণগুলো নিম্নরূপ:
প্রধান কারণসমূহ
- প্রাকৃতিক সমাপ্তি এবং সময়ের পরিবর্তন: ১৯৭০-এর দশকের শেষে বাংলা চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক ধারা পরিবর্তিত হয়। উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেন জুটির সোনালি যুগ শেষ হয়ে যায়, এবং নতুন ধরনের ছবি (যেমন সমান্তরাল সিনেমা) উঠে আসে। অগ্রগামীর মতো যৌথ গ্রুপের বাণিজ্যিক-সাহিত্যিক ছবির চাহিদা কমে যায়।
- সদস্যদের একক ক্যারিয়ারে যাওয়া: গোষ্ঠীর নেতা সরোজ দে পরবর্তীকালে এককভাবে কাজ করেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি কোনি (১৯৮৪) পরিচালনা করেন, যা জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। এটি ইঙ্গিত করে যে গ্রুপের সদস্যরা (নিশীথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ) নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়তে চেয়েছিলেন বা যৌথ কাজের মডেল আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
- অভ্যন্তরীণ সৃজনশীল বা প্রশাসনিক পার্থক্য: যদিও স্পষ্ট কোনো কেলেঙ্কারি বা ঝগড়ার উল্লেখ নেই, যৌথ গ্রুপের মতো অগ্রদূত বা অগ্রগামীতে সদস্যদের মধ্যে মতভেদ স্বাভাবিক। সরোজ দে-র নেতৃত্বে গ্রুপ চললেও, অন্য সদস্যরা কম সক্রিয় হয়ে পড়েন বা আলাদা পথ নেন।
- শিল্পের সামগ্রিক পরিবর্তন: ১৯৭০-এর পর বাংলা সিনেমায় নতুন পরিচালক (যেমন মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায়ের প্রভাব) এবং টিভি-র উত্থানে থিয়েটারের দর্শক কমে। যৌথ গ্রুপের মতো পুরনো মডেল আর লাভজনক হয়নি।
অগ্রগামী গোষ্ঠী অগ্রদূতের মতোই যৌথ পরিচালনার সাফল্য দেখিয়েছে, কিন্তু সময়ের স্রোতে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। কোনো নাটকীয় “ভাঙন” নয়, বরং প্রাকৃতিক সমাপ্তি।

প্রভাব এবং উত্তরাধিকার
অগ্রদূত বাংলা চলচ্চিত্রে যৌথ কাজের মডেল প্রচার করে, যা পরে অগ্রগামী গোষ্ঠীকে অনুপ্রাণিত করে। বিভূতি লাহা ১৯৯৭ সালে মারা যাওয়ার পর গ্রুপের কার্যক্রম থেমে যায়। গ্রুপের সদস্যরা (যেমন সরোজ দে) পরে এককভাবে কাজ করেন এবং পুরস্কার লাভ করেন (যেমন কোনি, ১৯৮৪ — জাতীয় পুরস্কার)। অগ্রদূতের ছবি বাংলা সিনেমার সোনালি যুগের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং উত্তমকুমারের স্টারডমে অবদান রাখে।
