অন্তরীক্ষ একটি ভারতীয় বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র যা ১৯৫৭ সালে মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন রাজেন তরফদার এবং প্রযোজনা করেছে সিনে আর্ট প্রোডাকশন। ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রে নিও-রিয়ালিজম ধারার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃত এবং গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা, নৈতিক দ্বন্দ্ব ও মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম চিত্রণের জন্য প্রশংসিত। এতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ছবি বিশ্বাস, প্রবীরকুমার, কাজল চট্টোপাধ্যায় (গুপ্ত), মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়, কালীপদ চক্রবর্তী ও প্রেমাংশু বসু প্রমুখ।

অন্তরীক্ষ চলচ্চিত্র
কাহিনি
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র জয়ন্ত (প্রবীরকুমার), রাজা মহেন্দ্র প্রতাপের (ছবি বিশ্বাস) জমিদারি সেরেস্তার একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী এবং মহেন্দ্র প্রতাপের পুত্র নরেন্দ্রর শৈশবের বন্ধু। জমিদার পরিবারের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা জয়ন্তের শিক্ষা, বিবাহ—সবকিছুই মহেন্দ্র প্রতাপের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়।
শালবনী গ্রামের জমিদার রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপের একমাত্র বংশধর কুমার নরেন্দ্রপ্রতাপের বিয়ের উৎসবে বাঈজীগানের আয়োজনের দায়িত্বও জয়ন্তের ওপর পড়ে। বাঈজীর খোঁজে বারাণসীতে গেলে এক অসতর্ক মুহূর্তে তার পকেট থেকে পার্স চুরি হয়ে যায়। সেই পার্সে টাকা ছাড়াও ছিল একটি চিঠি, যা জনসমক্ষে এলে জয়ন্তের সম্মানহানি ঘটবে।
ঘটনাচক্রে চিঠিটি গগন (কালীপদ চক্রবর্তী) নামের এক ব্যক্তির হাতে পড়ে, যিনি আসলে বাণীর (কাজল চট্টোপাধ্যায়) আগের পক্ষের স্বামী। বহু বছর আগে বিয়ের পর গগন নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি বাণীর জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। গগন চিঠির সুযোগ নিয়ে জয়ন্তকে ব্ল্যাকমেল করে এবং ২৫,০০০ টাকা দাবি করে।
বাণীর সম্মান রক্ষার্থে জয়ন্ত স্ত্রীকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়, সঙ্গে জমিদারি সেরেস্তার ২৫,০০০ টাকা। পথে গগন তাদের পথরোধ করলে সংঘর্ষ বাধে, যার মধ্যে বাণী আহত হয় এবং গগনের মৃত্যু ঘটে। জয়ন্তের বিরুদ্ধে হত্যা ও অর্থ তছরুপের মামলা হয় এবং সে কারাবন্দি হয়।
জেলেই বাণী এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়ে মারা যায়। পরে মহেন্দ্র প্রতাপের হাতে বাণীর দিদিমার দেওয়া চিঠি আসে, যা পড়ে তিনি ঘটনার সত্যতা উপলব্ধি করেন। প্রথমে আইনি কারণে জয়ন্তের পক্ষে দাঁড়াতে না পারলেও পরে সদ্যোজাত শিশুটিকে নিজের নাতির মতো বরণ করে নেন—যেমন একদিন জয়ন্তকেও পুত্রস্নেহে গ্রহণ করেছিলেন।

অভিনয়শিল্পী
- ছবি বিশ্বাস — মহেন্দ্র প্রতাপ
- প্রবীরকুমার — জয়ন্ত
- কাজল চট্টোপাধ্যায় (গুপ্ত) — বাণী
- কালীপদ চক্রবর্তী — গগন
- মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়
- প্রেমাংশু বসু
- দিলীপ রায়
- অমৃত দাশগুপ্ত
- হরিমোহন বসু
- পদ্মা দেবী
- রেবা বসু
- হাসি বন্দ্যোপাধ্যায়
- প্রতিমা মুখোপাধ্যায়
- সন্ধ্যা রায়
- রুনু মল্লিক
- কমলা অধিকারী
- কৃষ্ণা গুহ
- রীণা দাস
- স্বরূপলতা
প্রযোজনা ও কলাকুশলী
- প্রযোজনা সংস্থা — সিনে আর্ট প্রোডাকশন
- প্রযোজক — তুলসী লাহিড়ী
- পরিচালক — রাজেন তরফদার
- কাহিনি — তুলসী লাহিড়ী
- চিত্রনাট্য — রাজেন তরফদার
- সংগীত পরিচালক — ওস্তাদ আলী আকবর খান
- গীতিকার — পণ্ডিত ভূষণ
- নেপথ্য কণ্ঠ — প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বরূপলতা
- চিত্রগ্রহণ — দীনেন গুপ্ত
- শিল্প নির্দেশনা — বংশী চন্দ্রগুপ্ত, রবি চট্টোপাধ্যায়
- শব্দগ্রহণ — অবনী চট্টোপাধ্যায়, দেবেশ ঘোষ, সত্যেন চট্টোপাধ্যায়
- সম্পাদনা — সুকুমার সেনগুপ্ত

শৈলী ও গ্রহণযোগ্যতা
“অন্তরীক্ষ” নিছক বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নয়; এটি গ্রামীণ সমাজ, শ্রেণি-ভেদ, নৈতিক সংকট এবং সম্পর্কের জটিলতা ফুটিয়ে তুলেছে সংযত অথচ প্রাঞ্জল ভাষায়। পরিচালক রাজেন তরফদার তাঁর বাস্তবধর্মী চিত্রায়ণ, নাটকীয় উত্তেজনা সৃষ্টি এবং লোকজ পরিবেশ ফুটিয়ে তোলার দক্ষতার জন্য সমালোচকদের প্রশংসা পান।
যদিও ছবিটি আর্থিকভাবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি, সমালোচক ও চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে এটি শিল্পগুণসম্পন্ন নির্মাণের দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থান পেয়েছে এবং বাংলা নিও-রিয়ালিস্ট ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
সম্পর্কিত চলচ্চিত্র
- অনু (১৯৫৮)
- অধিকার (১৯৫৪)
- অতিথি (১৯৬৫)
- অতল জলের আহ্বান (১৯৭৯)
