অভিনেত্রী ববিতা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র ফারিদা আখতার পপি, যিনি ববিতা নামে সুপরিচিত, তার অভিনয় দক্ষতা এবং বহুমাত্রিক প্রতিভার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। ১৯৭০-এর দশকে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং সত্যজিৎ রায়ের “অশনি সংকেত” চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেন।

 

ফরিদা আক্তার ববিতা
ফরিদা আক্তার ববিতা

 

প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা

ববিতা ১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই বাগেরহাট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা নিজামুদ্দীন আতাউর ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং মাতা জাহানারা বেগম ছিলেন একজন চিকিৎসক। বাবার চাকরির সূত্রে পরিবারটি বাগেরহাটে অবস্থান করলেও তাদের পৈতৃক নিবাস যশোর জেলায়। শৈশব ও কৈশোরের প্রথমার্ধ যশোর শহরের সার্কিট হাউজের সামনে রাবেয়া মঞ্জিলে কাটে। তিনি যশোর দাউদ পাবলিক স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বড় বোন সুচন্দার চলচ্চিত্রে আগমনের ফলে পরিবারসহ ঢাকায় স্থানান্তরিত হন এবং গেন্ডারিয়ার গ্লোরিয়া স্কুলে পড়াশোনা করেন। চলচ্চিত্রে ব্যস্ততার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে না পারলেও তিনি ইংরেজিসহ কয়েকটি বিদেশি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং নিজেকে একজন আদর্শ শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলেন।

ফরিদা আক্তার ববিতা
ফরিদা আক্তার ববিতা

পারিবারিক জীবন

ববিতার পরিবারে তিন বোন ও তিন ভাই রয়েছেন। বড় বোন সুচন্দা এবং ছোট বোন চম্পা দুজনেই চলচ্চিত্র জগতের সুপরিচিত মুখ। তার ভগ্নিপতি ছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান। ববিতার একমাত্র পুত্র অনীক ইসলাম কানাডায় পড়াশোনা করেছেন।

ফরিদা আক্তার ববিতা
ফরিদা আক্তার ববিতা

চলচ্চিত্রে আগমন ও কর্মজীবন

বড় বোন সুচন্দার অনুপ্রেরণায় ববিতা চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। জহির রায়হানের “সংসার” চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে, যেখানে তিনি রাজ্জাক ও সুচন্দার মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। প্রথমদিকে তার নাম ছিল “সুবর্ণা”, তবে জহির রায়হানের “জ্বলতে সুরুজ কি নিচে” চলচ্চিত্রে কাজ করার সময় তার নাম পরিবর্তন করে “ববিতা” রাখা হয়।

১৯৬৯ সালে তিনি প্রথমবারের মতো নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন এবং সেই বছরই তার মা মারা যান। পরবর্তী সময়ে তিনি “টাকা আনা পাই”, “স্বরলিপি”, “নয়নমণি”, “গোলাপী এখন ট্রেনে” এবং “গোলাপী এখন ঢাকায়” সহ বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।

১৯৭৩ সালে সত্যজিৎ রায়ের “অশনি সংকেত” চলচ্চিত্রে “অনঙ্গ বউ” চরিত্রে তার অভিনয় আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয় এবং চলচ্চিত্রটি ২৩তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন বেয়ার পুরস্কার অর্জন করে।

ফরিদা আক্তার ববিতা
ফরিদা আক্তার ববিতা

পুরস্কার ও সম্মাননা

ববিতা তার অভিনয় জীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। নিচে তার প্রাপ্ত কিছু উল্লেখযোগ্য পুরস্কার তালিকাভুক্ত করা হলো:​

বছরপুরস্কারবিভাগচলচ্চিত্রফলাফল
১৯৭৫জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীবন্দী থেকে বেগমবিজয়ী
১৯৭৬জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীনয়নমণিবিজয়ী
১৯৭৭জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীবসুন্ধরাবিজয়ী
১৯৮৫জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীরামের সুমতিবিজয়ী
২০০২জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারশ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীহাসন রাজাবিজয়ী
২০১১জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারশ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীকে আপন কে পরবিজয়ী
২০১৬জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারআজীবন সম্মাননা
বিজয়ী

 

এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার, বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার (ভারত) এবং পাকিস্তানের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন।

ফরিদা আক্তার ববিতা
ফরিদা আক্তার ববিতা

সাম্প্রতিক কার্যক্রম

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ববিতা সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। তিনি অ্যাসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি এবং লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছেন। ২০১১ সালে তিনি ডিস্ট্রেসড চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্টস ইন্টারন্যাশনালের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে নিযুক্ত হন।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ টেক্সাসের রিচার্ডসন শহরের মেয়র বব ডুবি ৫ আগস্ট দিনটি “ববিতা দিবস” হিসেবে ঘোষণা করেন, যা তার দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।

 

Google News অভিনেত্রী ববিতা
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

ববিতা তার প্রতিভা, পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে একটি স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো আজও দর্শকদের মনে স্থান করে নিয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের জন্য তিনি অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে রয়েছেন।

Leave a Comment