অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা চলচ্চিত্র, নাটক ও সংগীত—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সমানভাবে অবদান রাখা এক বহুমুখী শিল্পী। অভিনেতা, নাট্যকার, নাট্যপরিচালক ও সংগীত পরিচালকের ভূমিকায় তিনি দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন। তাঁর শিল্পচর্চা প্রমাণ করে যে তিনি ছিলেন একাধারে মঞ্চ ও পর্দার মানুষ।
অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়
জন্ম ও শিক্ষা
অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম কলকাতায়। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি বি.কম. ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রথাগত শিক্ষা সমাপ্তির পর চাকরিতে যোগ দেন এবং কর্মসূত্রে দীর্ঘ সময় ধরে ভারত সরকারের প্রচার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ ও কাজ
মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন। অজিত গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত “হংসরাজ” (১৯৭৬) ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের নজরে আসেন। পরবর্তী সময়ে প্রায় ২০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
তিনি অভিনয় করেছেন একাধিক প্রখ্যাত পরিচালকের ছবিতে, যেমন—
- অজিত গঙ্গোপাধ্যায়
- নারায়ণ চক্রবর্তী
- পিনাকী মুখোপাধ্যায়
- প্রভাত রায়
- অপর্ণা সেন
- শতরূপা সান্যাল
- সনৎ দত্ত
২০০১ সালে নীতীশ মুখোপাধ্যায় ও মনোজ মিত্রের যৌথ পরিচালিত “নরক গুলজার“ ছবিতে তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি নেপথ্য সংগীত পরিচালনাও করেন, যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় বহন করে।
নাট্যজীবন ও নাট্যচর্চা
অভিনয়ের পাশাপাশি অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় মূলত একজন নাট্যব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯৭৬ সাল থেকে পেশাদার রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে যুক্ত। নাটক রচনা, পরিচালনা এবং সংগীত পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।
তাঁর নিজের নাট্যদলের নাম “নাট্যচর্চা”, যার মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মঞ্চে আনার কাজও করেছেন।
তিনি কাজ করেছেন একাধিক কিংবদন্তি নাট্যব্যক্তিত্বের সঙ্গে—
- অনুপকুমার
- জোছন দস্তিদার
- রাসবিহারী সরকার
- দুলাল লাহিড়ী
- আনেশ মুখোপাধ্যায়
- গণেশ মুখোপাধ্যায়
নাটক ছাড়াও তিনি বিভিন্ন দূরদর্শন ধারাবাহিকেও অভিনয় করেছেন, যা তাঁর জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করেছে।
অভিনয়শৈলী ও বৈশিষ্ট্য
- তরুণ বয়সে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিত হলেও, পরবর্তীতে তিনি চরিত্রাভিনয়ে স্বচ্ছন্দ হন।
- নাটক ও চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় সংযত অথচ শক্তিশালী ছিল।
- সংগীতনির্ভর নাটক বা আবহসঙ্গীতে তিনি বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছেন।
- নিজের নাট্যদল নাট্যচর্চা-র মাধ্যমে তিনি নাট্যচর্চাকে এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে এগিয়ে নিয়েছেন।
চলচ্চিত্রপঞ্জি (নির্বাচিত)
- ১৯৭৬ – হংসরাজ
- ১৯৭৯ – মাদার
- ১৯৮৩ – যিনি রাম তিনি কৃষ্ণ — একই দেহে রামকৃষ্ণ
- ১৯৮৫ – যোগবিয়োগ
- ১৯৯০ – অগ্নিকন্যা, সতী
- ১৯৯১ – মান মর্যাদা
- ১৯৯২ – মণিকাঞ্চন
- ১৯৯৪ – আমিও মা, নীলাঞ্জনা
- ১৯৯৯ – খেলাঘর
- ২০০০ – প্রেম প্রীতি ভালবাসা
- ২০০১ – নরক গুলজার
- ২০০৪ – কালো চিতা, সমুদ্রসাক্ষী
মূল্যায়ন
অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন এক বহুমুখী শিল্পী, যিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি মঞ্চনাটক ও সংগীত পরিচালনায় সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে শিল্পী মানে শুধু অভিনেতা নয়, বরং নাট্যকার, পরিচালক, সংগীতকার—সবকিছুর সমন্বয়। তাঁর কাজ বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্র উভয় ক্ষেত্রেই এক অবিচ্ছেদ্য অবদান রেখে গেছে।