আগন্তুক চলচ্চিত্রটি নিয়ে আমাদের আজকের আলোচনা- সত্যজিৎ রায় পরিচালিত একটি নাট্য চলচ্চিত্র যা ১৯৯১ সালে মুক্তি পায়। এটি সত্যজিতের শেষ চলচ্চিত্র। তারই লেখা ছোটগল্প অতিথি অবলম্বনে এটি তৈরি করেছেন।
কলকাতায় বসবাসরত একটি উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার, বাবা সুধীন্দ্র বোস, মা অনীলা এবং একটি ছোট ছেলে। হঠাৎ একদিন অনীলার কাছে একটি চিঠি আসে, ৩৫ বছর আগে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া তার ছোট মামার কাছ থেকে। ৩৫ বছর পর তিনি ফিরে আসছেন, কিছুদিন কলকাতায় তাদের বাড়িতে থাকতে চান। ১৯৫৫ সালে মামা যখন দেশ ছাড়েন তখন অনীলার বয়স মাত্র ২ বছর, তাই এ নিয়ে তার কোন স্মৃতিই নেই। তাছাড়া বর্তমানে এই ছোট মামার রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় বলতে একমাত্র সেই। সুতরাং তার পরিচয় নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার কোনই উপায় নেই। স্বামী প্রচণ্ড সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে যা কিছুটা ভর করে স্ত্রীর উপরও। আর ছোট ছেলেটি শুরু থেকে সম্ভাব্য জাল দাদুর আগমনে রোমাঞ্চ অনুভব করতে থাকে। আগন্তুক মামা মনোমোহন মিত্র কলকাতায় পৌছানোর পরই কাহিনী শুরু হয়।

আগন্তুক চলচ্চিত্র
- প্রযোজনা-ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন।
- কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংগীত ও পরিচালনা – সত্যজিৎ রায়।
- চিত্রগ্রহণ—বরুণ রাহা।
- শিল্প নির্দেশনা—অশোক বসু।
- সম্পাদনা—দুলাল দত্ত।
- শব্দগ্রহণ — সুজিত সরকার।
আগন্তুক চলচ্চিত্রে যারা অভিনয় করেছেন —
দীপঙ্কর দে, মমতাশঙ্কর, বিক্রম ভট্টাচার্য, উৎপল দত্ত, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়, প্রমোদ গঙ্গোপাধ্যায়, অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়।

আগন্তুক চলচ্চিত্রের কাহিনি
সুধীন্দ্র বোসের (দীপঙ্কর) স্ত্রী অনিলা (মমতা) হঠাৎ তার নিরুদ্দিষ্ট মামা মনোমোহন মিত্রের (উৎপল) কাছ থেকে একটি চিঠি পায় এবং জানতে পারে দীর্ঘ ৩৫ বছর বাদে দেশে ফিরে মনোমোহন তার বাড়িতে এক সপ্তাহের জন্য আতিথ্য নেবেন।
অনিলা জীবনে তার মামাকে দেখে নি, তার জন্মের আগেই এই মামা গৃহত্যাগ করে দেশের বাইরে চলে যান। মামাকে আগে না দেখলেও সে মামাকে অভ্যর্থনার জন্য তৈরি হয়। অনিলার স্বামী সুধীন্দ্র বিষয়টিকে সহজ ভাবে নিতে পারে না, তার ধারণা কোনো ঠগ মনোমোহন নাম নিয়ে তাদের প্রতারিত করার চেষ্টা করছে। মনোমোহনের উপস্থিতিতে অনিলার সংশয়মুক্তি হলেও সুধীন্দ্র সন্দেহমুক্ত হতে পারে না, অনিলা-সুধীন্দ্রর পুত্র সাত্যকির (বিক্রম) সাথে মনোমোহনের সম্পর্ক সহজ, তিনি নাতিকে দেশ বিদেশের গল্প বলেন।
সুধীন্দ্র তার এক ব্যারিস্টার বন্ধু পৃথ্বীশের (ধৃতিমান) সহযোগিতায় মনোমোহনকে জেরা করার চেষ্টা করে, তাদের ধারণা একটি জাল লোক সম্পত্তির লোভে তার বাড়ি এসে উঠেছে। পরের দিন মনোমোহন গৃহত্যাগ করে শান্তিনিকেতন চলে যান, সুধীন্দ্র, অনিলা তার খোঁজে শান্তিনিকেতন যায়। মনোমোহন পৈতৃক সম্পত্তিতে তাঁর নিজের অংশের টাকা অনিলার হাতে তুলে দিয়ে আবার দেশত্যাগ করেন। কারণ তিনি চরৈবেতি মন্ত্রে বিশ্বাস করেন।
সুদী লজ্জিত হয়। সত্যজিতের শেষ ছবিতে আমরা তথাকথিত সভ্য সমাজের প্রতি তীব্র ব্যঙ্গের সাথে মানুষের প্রতি বিশ্বাসের ধ্বনিও শুনতে পাই।
পুরস্কার
১৯৯১ সালের সেরা ছবি হিসাবে ভারতের রাষ্ট্রপতির সম্মানের পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় সেরা পরিচালকের জাতীয় সম্মান লাভ করেন। মমতাশঙ্কর এই ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে বিশেষ সম্মান পান।
প্রকাশনা :
ছবির চিত্রনাট্য ১৯৯৩ সালে এক্ষণ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।