কমল মিত্র

কমল মিত্র ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক অসাধারণ চরিত্রাভিনেতা, যিনি তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। তিনি ৯ ডিসেম্বর ১৯১২ সালে ব্রিটিশ ভারতের বর্ধমান শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২ আগস্ট ১৯৯৩ সালে কলকাতায় পরলোকগমন করেন। চলচ্চিত্রে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৪৩ সালে এবং তিনি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন ।​

কমল মিত্র

কমল মিত্র । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান

 

প্রাথমিক জীবন শিক্ষা

কমল মিত্র বর্ধমানের রাজ কলেজিয়েট স্কুল এবং রাজ কলেজ থেকে প্রথাগত শিক্ষা লাভ করেন। শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি প্রথমে মিলিটারিতে এবং পরে জেলার সরকারি কালেক্টরি অফিসে চাকরি করেন। চাকরি জীবনের পাশাপাশি তিনি নাট্যাভিনয়ে আগ্রহী হন এবং শৌখিন নাট্যদলে অভিনয় শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি পেশাদার রঙ্গমঞ্চে যোগ দেন ।​

 

চলচ্চিত্রজীবন

কমল মিত্রের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে গুণময় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘নীলাঙ্গুরীয়’ (১৯৪৩) ছবির মাধ্যমে। তিনি ৯০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৯৫১), ‘নষ্টনীড়’ (১৯৫১), ‘মহিষাসুর বধ’ (১৯৫২), ‘নববিধান’ (১৯৫৪), ‘ঠাকুর হরিদাস’ (১৯৫৯), ‘শাপমোচন’ (১৯৫৫), ‘সাগরিকা’ (১৯৫৬), ‘দেয়া নেয়া’ (১৯৬৩), ‘পরিণীতা’ (১৯৬৯), ‘সাবরমতী’ (১৯৬৯), ‘হরমোনিয়াম’ (১৯৭৬) এবং ‘খেলার পুতুল’ (১৯৮১) ।​

তিনি প্রায়শই জমিদার, রাজা, পিতা বা গুরুজনের চরিত্রে অভিনয় করতেন এবং তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের জন্য এই ধরনের চরিত্রে তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত ছিলেন। তিনি চাবি বিশ্বাস এবং পাহাড়ি সান্যালের সাথে বাংলা চলচ্চিত্রের চরিত্রাভিনেতা হিসেবে সমানভাবে খ্যাতি অর্জন করেন ।​

 

থিয়েটার অন্যান্য কাজ

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি কমল মিত্র থিয়েটার ও যাত্রাপালায়ও সক্রিয় ছিলেন। তিনি প্রায় ত্রিশটি নাটকে অভিনয় করেছেন এবং রেডিও নাটকেও অংশগ্রহণ করেছেন । তিনি একজন আগ্রহী পাঠক ও বিরল বইয়ের সংগ্রাহক ছিলেন এবং তাঁর সংগ্রহ নন্দন চলচ্চিত্র কেন্দ্রকে দান করেন ।​

 

আত্মজীবনী

কমল মিত্রের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ফ্ল্যাশব্যাক’ ১৯৮৯ সালে মণ্ডল এন্ড সন্স থেকে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের জগতের অন্তরালের নানা দিক তুলে ধরেছেন।​

 

উত্তরাধিকার

কমল মিত্রের অবদান বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমূল্য। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি আজও দর্শকদের মনে গেঁথে আছে। তাঁর কর্মজীবন ও শিল্পকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।​

 

চলচ্চিত্রপঞ্জি—

  • ১৯৪৩ নীলাঙ্গুরীয়;
  • ১৯৪৬ সংগ্রাম, নিবেদিতা, সাত নম্বর বাড়ী, তুমি আর আমি;
  • ১৯৪৭ অভিযাত্রী, তপোভঙ্গ, পথের দাবী, রায় চৌধুরী, রাত্রি, পূর্বরাগ,
  • ১৯৪৮ বাঁকালেখা, সমাপিকা,
  • ১৯৪৯ কৃষ্ণাকাবেরী, আভিজাত্য, প্রতিরোধ, সঙ্কল্প, অনন্যা, সমর্পণ:
  • ১৯৫০ শ্রীতুলসীদাস, ইন্দিরা, জাগ্রত ভারত, বানপ্রস্থ, বিদ্যাসাগর, মর্য্যাদা, সহোদর,
  • ১৯৫১ কুলহারা, অপরাজিতা, অভিশপ্ত, সহযাত্রী, জিঘাংসা, দুর্গেশনন্দিনী, নষ্টনীড়, স্পর্শমণি, আনন্দমঠ, মিনতি,
  • ১৯৫২ আলাদিন ও আশ্চর্য প্রদীপ, কৃষ্ণকান্তের উইল, মধুরাত্রি, কা তব কাস্তা, সাবিত্রী সত্যবান, আবু হোসেন, ভুলের শেষে, মহিষাসুর বধ,
  • ১৯৫৩ সাত নম্বর কয়েদী, শ্রীশ্রী সত্যনারায়ণ,
  • ১৯৫৪ মা ও ছেলে, এটম বম, সতীর দেহত্যাগ, মা অন্নপূর্ণা, নববিধান, মণি আর মানিক, সতী, অমর প্রেম, ষোড়শী,
  • ১৯৫৫ সাজঘর, প্রতীক্ষা, শাপমোচন, বীর হাম্বীর, বিধিলিপি, কঙ্কাবতীর ঘাট, দেবী মালিনী, ভালবাসা, পরেশ, দৃষ্টি, শ্রীবৎসচিন্তা, সবার উপরে, আত্মদর্শন, কালিন্দী, সাগরিকা:
  • ১৯৫৬ কীর্তিগড়, সাহেব বিবি গোলাম, লক্ষহীরা, একটি রাত, অসমাপ্ত, ত্রিযামা, আশা, রাজপথ, শিল্পী, সিঁথির সিঁদুর, আমার বৌ: ১৯৫৭ হারজিৎ, শেষ পরিচয়, সিঁদুর, উল্কা, পঞ্চতপা, তাপসী, খেলা ভাঙার খেলা, পুনর্মিলন, দাতা কর্ণ,
  • ১৯৫৮ লৌহকপাট, যমালয়ে জীবন্ত মানুষ, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, নুপুর, ডেলি প্যাসেঞ্জার, ভানু পেলো লটারী, ডাক্তার বাবু, পুরীর মন্দির, যৌতুক, সূর্যতোরণ, শ্রীশ্রী তারকেশ্বর, কংস:
  • ১৯৫৯ দেড়শো খোকার কাণ্ড, বিভ্রান্ত, এ জহর সে াহর নয়, ঠাকুর হরিদাস, আম্রপালী:
  • ১৯৬০ উত্তর মেঘ, দুই বেচারা, ক্ষুধিত পাষাণ, সখের চোর, কোন একদিন, হসপিটাল, সুরের পিয়াসী:
  • ১৯৬১ লক্ষ্মীনারায়ণ, কাঞ্চনমূল্য আশায় বাঁধিনু ঘর, মিথুন লগ্ন,
  • ১৯৬২ বধু, খনা, মায়ার সংসার, শেষ চিহ্ন, রক্তপলাশ, ধূপছায়া:
  • ১৯৬৩ শেষ অঙ্ক, হাই ছিল, সেখানেয়া, বর্ণালী, শ্রেয়সী,
  • ১৯৬৪ বিভাগ, অগ্নিকন্যা, কষ্টিপাথর, সন্ধ্যাদীপের শিখা
  • ১৯৬৫ থানা থেকে আসছি, ও কে, রাজা রামমোহন, মুখুজ্যে পরিবার, তাপসী,
  • ১৯৬৬ সুশান্ত সা. মণিহার, অঙ্গীকার, রাজদ্রোহী, রামধাক্কা, জোড়াদীঘির চৌধুরী পরিবার, ফিরে চলো, কাল তুমি আলেয়া:
  • ১৯৬৭ দেবীতীর্থ কামরূপ কামাখ্যা, ৮০’তে আসিও না, জীবন মৃত্যু:
  • ১৯৬৮ চৌরঙ্গী, বৌদি:
  • ১৯৬৯ সাবরমতী, চিরদিনের, তিন ভুবনের পারে, পিতাপুত্র, পরিণীতা, আঁধার সূর্য,
  • ১৯৭০ সমান্তরাল, মুক্তিস্নান;
  • ১৯৭১ ত্রিনয়নী মা:
  • ১৯৭২ বিরাজ বৌ, ছিন্নপত্র:
  • ১৯৭৩ রৌদ্রছায়া, অগ্নিভ্রমর:
  • ১৯৭৪ যদি জানতেম, জীবন রহস্য, আলো আঁধারে
  • ১৯৭৫ ফুলু ঠাকুরমা,
  • ১৯৭৬ হারমোনিয়াম যুগমানব কবীর;
  • ১৯৭৭ অসাধারণ, অমৃতের স্বাদ, দিন আমাদের, শ্রীশ্রী মালক্ষ্মী
  • ১৯৭৯ যত মত তত পথ,
  • ১৯৮০ দক্ষযজ্ঞ, আরো এক জন, কালো চোখের তারা, ভাগ্যচক্র:
  • ১৯৮১ সূর্যসাক্ষী, পাহাড়ী ফুল:
  • ১৯৮২ খেলার পুতুল, ফয়সালা ।

Leave a Comment