কৌশিক সেন – বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের অগ্রগণ্য অভিনেতা

কৌশিক সেন (জন্ম: ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৬২) কলকাতা ভিত্তিক একজন খ্যাতনামা ভারতীয় বাঙালি অভিনেতা, যিনি চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও নাট্য মঞ্চে সমানভাবে সক্রিয়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি অভিনয়ের জগতে একাধারে পথিকৃৎ ও পরীক্ষামূলক শিল্পী হিসেবে পরিচিত। তাঁর অভিনয়শৈলী বাস্তববাদী, প্রাঞ্জল এবং গভীর আবেগপ্রবণতার জন্য দর্শক ও সমালোচকদের কাছে প্রশংসিত। বিশেষত তিনি সামাজিক-রাজনৈতিক নাটক ও চলচ্চিত্রে তাঁর চরিত্রগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন।

 

জন্ম ও শৈশব

কৌশিক সেন ১৯৬২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল শিল্পকলার পরিবেশে ভরপুর—পিতা শ্যামল সেন একজন সুপরিচিত অভিনেতা এবং মাতা চিত্রা সেন ছিলেন জনপ্রিয় নাট্য ও চলচ্চিত্রাভিনেত্রী। এই সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হওয়ার ফলে শৈশব থেকেই কৌশিক নাটক ও অভিনয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।

তিনি কলকাতার জুলিয়েন ডে স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে সাউথ সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সক্রিয়ভাবে নাট্যচর্চায় যুক্ত থাকেন এবং কৈশোরেই থিয়েটারের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

 

অভিনয় জীবন – প্রারম্ভ

প্রথমবার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন মৃণাল সেন পরিচালিত একদিন প্রতিদিন (১৯৮০) ছবিতে। যদিও তিনি তখন তরুণ শিল্পী, তবুও তাঁর অভিনয় লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে মৃণাল সেনের আরও কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন এবং ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র জগতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।

একই সময়ে তিনি মঞ্চনাটকের প্রতিও আকৃষ্ট হন। ১৯৯২ সালে তিনি নিজস্ব নাট্যদল স্বপ্নসন্ধানী প্রতিষ্ঠা করেন। এই দলটি আজও সমকালীন বাংলা নাট্যচর্চার অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। ‘স্বপ্নসন্ধানী’ তাদের পরীক্ষামূলক নাটক, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সমকালীন সমাজের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গির জন্য প্রশংসিত।

 

নাট্যকর্ম

কৌশিক সেনের জীবনের অন্যতম বড় পরিচয় তাঁর নাট্যকার্য। স্বপ্নসন্ধানী প্রযোজিত নাটকগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • তিথির অতীত (মহাশ্বেতা দেবীর গল্প অবলম্বনে)
  • রাজা লিয়ার (শেক্সপিয়ারের অনুবাদ ও রূপান্তর)
  • রক্তকরবী (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
  • গণশত্রু (ইবসেন অবলম্বনে)
  • গণদেবতা (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে)

এই নাটকগুলির মাধ্যমে কৌশিক নাট্যজগতে একটি স্বতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে রাজনৈতিক সচেতনতা, সমাজের অন্ধকার দিক এবং মানুষের অন্তর্গত সংগ্রাম উঠে আসে।

 

চলচ্চিত্রে অবদান

কৌশিক সেন ৯০-এর দশক থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বিশেষত তপন সিংহ, প্রভাত রায়, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, পিনাকী চৌধুরী, রাজা সেন প্রমুখ পরিচালকের সঙ্গে কাজ করে তিনি সমালোচক মহলে সমাদৃত হন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • হুইল চেয়ার (১৯৯৪) – নান্টু চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হন।
  • আমার ভুবন (২০০২) – মেহের চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য বিএফজেএ (BFJA) পুরস্কার পান।
  • আজব গাঁয়ের আজব কথা (১৯৯৮) – এক ভিন্নধর্মী সামাজিক কাহিনি।
  • চক্রব্যূহ (২০০০), ফেরারী ফৌজ (২০০২), শূন্য বুকে (২০০৫), দ্বন্দ্ব (২০০৯) প্রভৃতি।

 

টেলিভিশনে অভিনয়

চলচ্চিত্র ও নাটকের পাশাপাশি কৌশিক সেন টেলিভিশনেও নিয়মিত অভিনয় করেছেন। দূরদর্শন ও বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে তাঁর অভিনীত ধারাবাহিকগুলো জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁর টেলিভিশন চরিত্রগুলো সাধারণত মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট, মূল্যবোধ এবং সামাজিক দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছে।

 

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

কৌশিক সেন তাঁর অভিনয় জীবনে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • বিএফজেএ (BFJA) পুরস্কারআমার ভুবন চলচ্চিত্রে সেরা পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতা (২০০২)।
  • বাংলা নাট্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার – নাট্যকর্মে বিশেষ অবদানের জন্য।
  • বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে অভিনয় দক্ষতার স্বীকৃতি।

 

ব্যক্তিগত জীবন

কৌশিক সেনের স্ত্রী রেশমি সেন একজন থিয়েটার ব্যক্তিত্ব ও নাট্যপরিচালক। তাঁদের পুত্র ঋদ্ধি সেন সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্র ও নাটকের এক উজ্জ্বল নাম। অল্প বয়সেই ঋদ্ধি অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। এভাবেই কৌশিক-চিত্রা-শ্যামল-রেশমি-ঋদ্ধি—একটি পরিবার শিল্প ও অভিনয়ের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

 

সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা

কৌশিক সেন শুধু অভিনেতাই নন, তিনি একজন সচেতন নাগরিক। বিভিন্ন সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে মতামত ব্যক্ত করেছেন। নাগরিক আন্দোলন, গণআন্দোলন, প্রগতিশীল ভাবধারার পক্ষে তাঁর অবস্থান সুস্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করেন, নাটক ও শিল্প মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে।

 

উত্তরাধিকার ও প্রভাব

কৌশিক সেনের কাজ বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তিনি নাট্যদল পরিচালনা, নবীন অভিনেতাদের প্রশিক্ষণ এবং সমাজসচেতন নাটক প্রযোজনার মাধ্যমে এক প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের অনুপ্রাণিত করেছেন।

 

চলচ্চিত্রপঞ্জি (সংক্ষিপ্ত)

  • ১৯৮০ – একদিন প্রতিদিন
  • ১৯৯০ – পাপী
  • ১৯৯৩ – প্রজাপতি
  • ১৯৯৪ – বিদ্রোহিনী, হুইল চেয়ার
  • ১৯৯৬ – সোপান, হিমঘর, লাঠি
  • ১৯৯৮ – সংঘাত, আজব গাঁয়ের আজব কথা
  • ২০০০ – চক্রব্যূহ
  • ২০০২ – আমার ভুবন, ফেরারী ফৌজ
  • ২০০৫ – শূন্য বুকে
  • ২০০৭ – এক মুঠো ছবি
  • ২০০৯ – দ্বন্দ্ব

 

কৌশিক সেন আজ বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের এমন এক নাম, যিনি অভিনয়কে শুধু পেশা নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও গ্রহণ করেছেন। মঞ্চ ও ক্যামেরার সামনে তাঁর প্রতিটি চরিত্র নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। তাঁর অবদান বাংলা সংস্কৃতি ও শিল্পজগতে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Comment