গণদেবতা চলচ্চিত্রটি নিয়ে আমাদের আজকের আলোচনা- গণদেবতা তরুণ মজুমদার পরিচালিত কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়এর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ১৯৭৮ সালের ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র।
এই চলচ্চিত্রটি ভারতের ২৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রতিযোগীতায় (১৯৭৮), “জনপ্রিয়তা ও সার্বিক মনোরঞ্জনের নিরিখে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র” বিভাগে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসাবে পুরস্কৃত হয়। “শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার” হিসাবে কাঞ্চন দে বিশ্বাস এই চলচ্চিত্রের জন্য পুরস্কার লাভ করেন।
এপিক উপন্যাসটি ১৯২০র দশকে ব্রিটিশ রাজ চলাকালীন শিল্পায়ন প্রভাবে ও অসহযোগ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামবাংলার আর্থ-সামাজিক কাঠামো ধ্বংস হওয়ার কাহিনি নিয়ে গড়ে উঠেছে। উপন্যাসটির জন্য লেখক ১৯৬৬ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন।

গণদেবতা চলচ্চিত্র
- প্রযোজনা—পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
- কাহিনি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
- চিত্রনাট্য — রাজেন তরফদার, তরুণ মজুমদার।
- পরিচালনা — তরুণ মজুমদার।
- সংগীত পরিচালনা – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
- চিত্রগ্রহণশক্তি বন্দ্যোপাধ্যায়।
- শিল্প নির্দেশনা – রবি চট্টোপাধ্যায়।
- সম্পাদনা- রমেশ যোশী।
- গীতিকার- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, মুকুল দত্ত, গঙ্গাচরণ সরকার, তরুণ মজুমদার।
গণদেবতা চলচ্চিত্রে যারা অভিনয় করেছেন —
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, শমিত ভঞ্জ, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপকুমার, দেবরাজ রায়, নিম্ন ভৌমিক, নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত, মাস্টার কাঞ্চন, মনু মুখোপাধ্যায়, বিমল দেব, গোবিন্দ চক্রবর্তী, মণি শ্রীমানী, সত্ত্ব মুখোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, পূর্ণিমা দেবী, সন্তোষ দত্ত, তপেন চট্টোপাধ্যায়, আলপনা গুপ্ত৷

নেপথ্য সংগীত —
মান্না দে, আরতি মুখোপাধ্যায়, শিপ্রা বসু, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
গণদেবতা চলচ্চিত্রের কাহিনি—
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী রাঢ়বাংলার একটি গ্রামের মানুষের কাহিনি অবলম্বনে এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র অনিরুদ্ধ (শমিত) পেশায় কামার। সে এবং গিরীশ ছুতোর (অনুপ) এই সময়কার গ্রামীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়, এই সময় গ্রামাঞ্চলে কাজের মজুরি হিসাবে বিনিময় প্রথার প্রচলন ছিল এবং এই প্রথায় অনেক ক্ষেত্রেই গ্রামের সম্পন্ন কৃষক এবং জোতদার ও জমিদাররা এই সব খেটে খাওয়া মানুষদের বঞ্চিত করত।
এই জমিদার বা সম্পন্ন কৃষকের প্রতিনিধিত্ব করে ছিরু পাল (অজিতেশ)। গ্রামের পণ্ডিত দেবনাথ (সৌমিত্র) যে একসময় অনিরুদ্ধর সঙ্গে এক সাথে পাঠশালায় পড়ত সেও ছিরু পালদের মতো সম্পন্ন কৃষকদের পক্ষ না নিলেও এতদিনের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে অনিরুদ্ধদের বিদ্রোহকে মেনে নিতে পারে না। অন্যদিকে ছিরু পাল গ্রামে নীচু জাতির বাইনদের বিদ্রোহ দমন করার জন্য তাদের বাড়িতে আগুন দেয়, আবার তাদেরই বাড়ির মেয়ে দুর্গার (সন্ধ্যা) কাছে ধরা পড়ে তার শর্ত মতো বাড়ি মেরামতের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়।
ছিরু পালের সাথে অনিরুদ্ধর বিরোধে, পুলিস ঘুষ খেয়ে, অন্যায় করা সত্ত্বেও ছিরু পালের পক্ষ নেয়। ব্রিটিশ শাসনে অবরুদ্ধ এক যুবককে নজরবন্দী হিসাবে ঐ গ্রামে রাখা হয়। ঐ বিপ্লবী যুবক গ্রামের মানুষকে এক হয়ে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শেখায়। স্কুল মাস্টার দেবনাথের নেতৃত্বে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ একত্রিত হয়, ছিরু পালের পাওয়া খবরে শাসকরা দেবনাথের উপর রুষ্ট হয়ে তার হাত থেকে স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব কেড়ে নেয় এবং তাকে জেলে পাঠানো হয়।
জেল থেকে ফিরে দেবনাথ সমাজ পরিবর্তনের কাজে আত্মনিয়োগ করে। তারাশঙ্করের বৃহৎ পটভূমিকায় লেখা উপন্যাসের সার্থক চলচ্চিত্রায়ণ এই ছবি ১৯৭৮ সালে ঐ বছরের সেরা ছবি হিসাবে রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক লাভ করে এবং ঐ ছবির শিশু অভিনেতা কাঞ্চন দে বিশ্বাস সেরা শিশু অভিনেতার পুরস্কার পায়। ছবিটি ইন্ডিয়ান প্যানোরামায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
প্রকাশনা –
ছবির চিত্রনাট্য ‘বৈশাখী’ পত্রিকায় তরুণ মজুমদার বিশেষ সংখ্যায় ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে।
