গিরীশ পাধিয়ার: চলচ্চিত্রগ্রাহক জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায়

ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রে যারা চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম গিরীশ পাধিয়ার। তিনি ছিলেন নামকরা চিত্রগ্রাহক দেওজী ভাই-এর পুত্র, ফলে ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সিনেমাটোগ্রাফির প্রতি এক ধরনের স্বাভাবিক আগ্রহ জন্মায়। পরবর্তী জীবনে সেই আগ্রহই তাঁকে গড়ে তোলে একজন দক্ষ ও পরিশ্রমী চিত্রগ্রাহক হিসেবে।

 

শৈশব ও প্রারম্ভিক জীবন

গিরীশ পাধিয়ারের শৈশব কেটেছে চলচ্চিত্রের আবহে। তাঁর বাবা দেওজী ভাই ছিলেন খ্যাতনামা চিত্রগ্রাহক। ফলে খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি স্টুডিওর আলো–ক্যামেরা–সেটের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হন। বাবার কাজ দেখেই তিনি শিখেছিলেন ক্যামেরার ভাষা ও আলোর ব্যবহার। চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত দিক এবং ভিজ্যুয়াল কাহিনি বলার কৌশল তাঁর মনে এক বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।

 

সহকারী থেকে স্বাধীন চিত্রগ্রাহক

চলচ্চিত্র জীবনের প্রথম দিকে গিরীশ বাবার সহকারী হিসেবেই কাজ শুরু করেন। সেই সময়ে তিনি আলোকসজ্জা, ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, ফ্রেম কম্পোজিশন প্রভৃতি বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা ও পরিশ্রমের ফলে সুযোগ আসে স্বাধীনভাবে কাজ করার।

স্বাধীন চিত্রগ্রাহক হিসেবে তাঁর প্রথম কাজ ছিল অসীম বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত বাঁশরী (১৯৮০)। এই ছবিতে তিনি কানাই দে-এর সঙ্গে যুগ্মভাবে চিত্রগ্রহণ করেছিলেন। ছবিটি মুক্তির পর চলচ্চিত্র মহলে তাঁর কাজ বিশেষভাবে নজর কেড়েছিল এবং এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর পূর্ণাঙ্গ সিনেমাটোগ্রাফি জীবনের পথচলা।

 

চলচ্চিত্রজগতে অবদান

গিরীশ পাধিয়ার প্রায় তিরিশটিরও বেশি বাংলা চলচ্চিত্রে চিত্রগ্রাহকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য ছিল ছবির আবহ ও মেজাজ অনুযায়ী আলোর ব্যবহার এবং বাস্তবধর্মী ভিজ্যুয়াল তৈরি করা। তিনি কখনো অতি আড়ম্বরপূর্ণ চিত্রগ্রহণে বিশ্বাস করতেন না; বরং কাহিনি ও চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্রেম সাজাতেন।

তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের একাধিক প্রখ্যাত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—

  • দিলীপ রায়
  • জহর বিশ্বাস
  • সলিল দত্ত
  • অজিত গঙ্গোপাধ্যায়
  • প্রভাত রায়
  • হরনাথ চক্রবর্তী

এছাড়াও আরও অনেক পরিচালক তাঁর ক্যামেরার নৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করেছেন।

 

বাংলা ছবির বাইরে কাজ

শুধু বাংলা ছবিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না গিরীশ। কর্মজীবনের শেষ দশ বছরে তিনি বেশ কয়েকটি গুজরাটি প্রযোজনায় কাজ করেন। এভাবেই তিনি আঞ্চলিক চলচ্চিত্র শিল্পের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য ভাষার চলচ্চিত্রেও নিজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা প্রয়োগ করেন।

 

উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রপঞ্জি

গিরীশ পাধিয়ারের সিনেমাটোগ্রাফি করা ছবিগুলির মধ্যে অনেকগুলোই জনপ্রিয় হয়েছে। সেগুলির মধ্যে কয়েকটি—

  • ১৯৮০: বাঁশরী
  • ১৯৮২: অমৃতকুম্ভের সন্ধানে
  • ১৯৮৫: নীলকণ্ঠ, নিশাস্তে, সন্ধ্যাপ্রদীপ
  • ১৯৮৬: অনুরাগের ছোঁয়া, শ্যাম সাহেব
  • ১৯৮৭: যার যে প্রিয়
  • ১৯৮৮: অগ্নিসংকেত
  • ১৯৮৯: বিদায়
  • ১৯৯০: আবিষ্কার, গরমিল
  • ১৯৯১: আমার সাথী
  • ১৯৯২: অনন্যা, অনুতাপ, শ্বেত পাথরের থালা
  • ১৯৯৩: দুরন্ত প্রেম, গরম ভাত, শ্রদ্ধাঞ্জলি
  • ১৯৯৫: রক্ত নদীর ধারা, সন্ধ্যাতারা
  • ১৯৯৬: বেয়াদপ, বিয়ের ফুল, জামাইবাবু, লাঠি, নাচ নাগিনী নাচ রে, পূজা
  • ১৯৯৭: বিদ্রোহ
  • ১৯৯৮: শ্রীমান ৪২০

 

কাজের বৈশিষ্ট্য ও শৈলী

গিরীশ পাধিয়ারের চিত্রগ্রহণের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—

  1. বাস্তবধর্মী আলোকসজ্জা: গল্পের আবহ অনুযায়ী আলো ব্যবহার করে দৃশ্যকে জীবন্ত করে তোলা।
  2. প্রাকৃতিক দৃশ্যধারণে দক্ষতা: আউটডোর শ্যুটিংয়ে তিনি দৃশ্যের সৌন্দর্যকে স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলতেন।
  3. ড্রামাটিক ফ্রেমিং: আবেগঘন দৃশ্যে ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ও শট সিলেকশনে তাঁর দক্ষতা দর্শকের মনে গভীর প্রভাব ফেলত।
  4. প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার: সীমিত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি ক্যামেরার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতেন।

 

উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন

যদিও গিরীশ পাধিয়ার আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি, তথাপি বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি এক নিবেদিতপ্রাণ চিত্রগ্রাহক হিসেবে স্মরণীয়। তাঁর কাজ অনেক জনপ্রিয় ছবিকে ভিজ্যুয়ালি শক্তিশালী করেছে। যেসব পরিচালকের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, তাঁদের চলচ্চিত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়িত করতে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

চলচ্চিত্রপ্রেমী ও গবেষকদের মতে, ১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত সময়ে বাংলা বাণিজ্যিক ও সামাজিক ছবির ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনায় গিরীশ পাধিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

 

উপসংহার

গিরীশ পাধিয়ার ছিলেন এক নিভৃতচারী শিল্পী, যিনি আলো ও ক্যামেরার মাধ্যমে গল্পকে জীবন্ত করে তুলতেন। তিনি সংখ্যায় অনেক না হলেও প্রায় তিন দশকের চলচ্চিত্রগ্রাহক জীবনে বাংলা ও গুজরাটি চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর নাম হয়তো দর্শকের সামনে খুব একটা উচ্চারিত হয়নি, কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি থেকে যাবেন এক অনন্য ভিজ্যুয়াল গল্পকার হিসেবে।

Leave a Comment