বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন অনেক শিল্পী আছেন, যাঁদের কাজ পর্দার আড়ালে থেকেও ছবির প্রাণ হয়ে ওঠে। তাঁদের একজন হলেন গৌর পোদ্দার—একজন সৃজনশীল শিল্পনির্দেশক, যিনি প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলা চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়াল ও শৈল্পিক পরিমণ্ডলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন।
গৌর পোদ্দার
প্রারম্ভিক জীবন
গৌর পোদ্দারের জন্ম বাংলাদেশের ঢাকা শহরে। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল রং, রেখা ও আকার নিয়ে এক অদম্য কৌতূহল। তরুণ বয়সেই কলকাতায় চলে আসেন—সেই সময় কলকাতা ছিল উপমহাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এখানেই তিনি প্রথম সিনেমা স্টুডিওর পরিবেশে প্রবেশ করেন এবং চলচ্চিত্রজগতের নান্দনিক দিকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় লাভ করেন।
চলচ্চিত্রে প্রবেশ ও প্রশিক্ষণ
গৌর পোদ্দার তাঁর চলচ্চিত্রজীবন শুরু করেন শ্রীভারতলক্ষ্মী পিকচার্স-এ, প্রখ্যাত শিল্পনির্দেশক সত্যেন রায়চৌধুরী-এর সহকারী হিসেবে।
এই সময়েই তিনি সিনেমার সেট ডিজাইন, আলোক বিন্যাস, রঙ ও কম্পোজিশনের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
সত্যেনবাবুর কাছ থেকে তিনি শিখেছিলেন—
“চিত্রনাট্যের মেজাজ বোঝা ছাড়া শিল্পনির্দেশক হতে পারা যায় না।”
এই শিক্ষাই গৌর পোদ্দারের শিল্পজীবনের ভিত্তি স্থাপন করে।
স্বাধীন শিল্পনির্দেশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ
স্বাধীনভাবে তাঁর প্রথম কাজ ছিল চিত্ত বসু পরিচালিত ‘জ্যোতিষী’ (১৯৫৫)। এই চলচ্চিত্রেই তিনি তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও রঙবোধের ছাপ রাখেন। সেই সময় বাংলা চলচ্চিত্রে স্টুডিওভিত্তিক সেট ডিজাইনই প্রধান ছিল, কিন্তু গৌর পোদ্দার চেষ্টা করেছিলেন বাস্তবতা ও নান্দনিকতার সংমিশ্রণ ঘটাতে—যা পরবর্তী কালে তাঁর পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
নান্দনিকতা ও কাজের ধরন
গৌর পোদ্দারের শিল্পনির্দেশনার বৈশিষ্ট্য ছিল সূক্ষ্মতা ও বাস্তবতার নিখুঁত মেলবন্ধন। তিনি জানতেন কীভাবে সেট ও দৃশ্যপটের মাধ্যমে চরিত্রের মানসিকতা প্রকাশ করা যায়।
তাঁর শিল্পের মূল বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য —
রঙ ও আলোর সংবেদনশীল ব্যবহার,
স্থান ও কালের সঠিক উপস্থাপন,
চরিত্রের মানসিক পরিবেশ অনুযায়ী নকশা,
এবং গ্রামীণ ও নগরজীবনের বৈচিত্র্যময় বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলা।
তাঁর সেটে কোনও কৃত্রিমতা ছিল না; বরং প্রতিটি দৃশ্য যেন চরিত্রের অভ্যন্তরীণ অনুভূতির প্রতিফলন।
সহযোগী পরিচালক ও যুগলবন্দি
দীর্ঘ কর্মজীবনে গৌর পোদ্দার কাজ করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের বহু বিশিষ্ট পরিচালকের সঙ্গে।
তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য —
বিকাশ রায়
অর্ধেন্দু সেন
সলিল সেন
অজিত গঙ্গোপাধ্যায়
পার্থপ্রতিম চৌধুরী
গুরু বাগচী
চিত্ত বসু
প্রতিটি পরিচালকের নিজস্ব শৈলীর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে গৌর পোদ্দার তাঁর কাজের মাধ্যমে গল্পের আবহকে আরও গভীর করেছেন।
প্রতীকী ও শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি
গৌর পোদ্দার শুধু সেট ডিজাইন করতেন না; তিনি গল্পের মেজাজ বোঝার চেষ্টা করতেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো চরিত্রের একাকিত্ব বোঝাতে তিনি আলো কমিয়ে রাখতেন, বা দুঃখের দৃশ্যে প্রাকৃতিক রঙের পরিবর্তে ম্লান ধূসর বা বাদামি শেড ব্যবহার করতেন।
তাঁর সেট ডিজাইন অনেক সময় চিত্রকলার কম্পোজিশনের মতো নিখুঁত ছিল—যেখানে প্রতিটি উপাদান ছিল অর্থবাহী।
চলচ্চিত্রপঞ্জি (নির্বাচিত কাজ)
গৌর পোদ্দারের বিস্তৃত কর্মজীবনে প্রায় সত্তরটিরও বেশি ছবির শিল্পনির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন।
তাঁর চলচ্চিত্রপঞ্জির কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ:
১৯৫৫: জ্যোতিষী, হ্রদ
১৯৫৬: সাবধান, পাপ ও পাপী, সূর্যমুখী, ধূলার ধরণী
১৯৫৭: রাত্রিশেষে
১৯৫৮: বাঘাযতীন
১৯৫৯: জন্মান্তর, অভিশাপ
১৯৬০: দুই বেচারা, প্রবেশ নিষেধ
১৯৬১: আজ কাল পরশু
১৯৬২: খনা
১৯৬৩: দুই বাড়ী, হাই হিল, হাসি শুধু হাসি নয়
১৯৬৪: সিঁদুরে মেঘ
১৯৬৬: অঙ্গীকার, কলঙ্কী রাত, হারানো প্রেম, অশ্রু দিয়ে লেখা, ফিরে চল
১৯৬৮: পথে হল দেখা
১৯৭২: মা ও মাটি
১৯৭৩: আবীরে রাঙানো
১৯৭৪: যদুবংশ
১৯৭৬: বিশ্বমঙ্গল, নন্দিতা, দত্তা
১৯৭৭: হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ
১৯৭৮: জয় মা তারা
১৯৭৯: সমাধান, ডুব দে মন কালী বলে
১৯৮০: বাতাসী, ভাগ্যচক্র, বিচার
১৯৮১: মানিকচাঁদ
১৯৮২: রাজবধূ, রসময়ীর রসিকতা, সমর্পণ
১৯৮৩: মাতা আগমেশ্বরী, নিশিভোর
১৯৮৫: টগরী
১৯৮৬: অমর বন্ধন, অচেনা মুখ, প্রেম ও পাপ, শাপমুক্তি, তিন পুরুষ
১৯৮৭: জবাব, পাপপুণ্য
১৯৮৮: পথে যেতে যেতে
১৯৮৯: আশা, বান্ধবী, মনে মনে
১৯৯০: ব্যবধান, ন্যায়দণ্ড
১৯৯১: কথা দিলাম, মান মর্যাদা, শুভ কামনা
১৯৯২: পেন্নাম কলকাতা
১৯৯৩: তপস্যা, ভ্রাত্তপথিক, দান প্রতিদান
১৯৯৫: বৌমণি
১৯৯৭: চন্দ্রগ্রহণ
১৯৯৯: নিয়তি
এই তালিকা বাংলা চলচ্চিত্রের প্রায় অর্ধশতাব্দীর ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
বাংলা চলচ্চিত্রে অবদান
গৌর পোদ্দার বাংলা সিনেমার শিল্পনির্দেশনা বা production design-কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর কাজের মাধ্যমে শিল্পনির্দেশনা শুধুমাত্র “সেট সাজানো” নয়, বরং “গল্পের ভিজ্যুয়াল রূপায়ণ”-এর এক অনন্য ভাষা হয়ে ওঠে।
তিনি ছিলেন “দৃশ্যের স্থপতি” — যিনি পরিচালক ও ক্যামেরার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতেন।
উত্তরাধিকার ও প্রভাব
গৌর পোদ্দারের কাজ পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পনির্দেশকদের কাছে এক শিক্ষণীয় নকশা হিসেবে রয়ে গেছে। তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন অনেক তরুণ শিল্পী, যেমন—অঞ্জন ঘোষ, শঙ্কর রায়, ও ভবতোষ ভট্টাচার্য প্রমুখ। তাঁর তৈরি নান্দনিক বাস্তবতার ধারা বাংলা সিনেমায় এখনো বহমান, বিশেষ করে আধুনিক রিয়েলিস্ট ধারার ছবিগুলোতে।
গৌর পোদ্দার ছিলেন এমন এক শিল্পনির্দেশক, যিনি নেপথ্যে থেকেও বাংলা সিনেমার চিত্ররূপ নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর সৃষ্ট দৃশ্যপট, আলো-ছায়ার খেলা, আর নিপুণ নকশা বাংলা চলচ্চিত্রকে দিয়েছে এক নিজস্ব পরিচয়।
“চিত্রনাট্যের ভাষা যদি শব্দে বলা যায়,
তবে গৌর পোদ্দার তা আঁকতেন আলো ও রঙে।”
