চালচিত্র চলচ্চিত্রটি মৃণাল সেন এর একটি ছবি। কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেন মৃণাল সেন। অঞ্জন দত্ত, উৎপল দত্ত, গীতা সেন, কৌশিক সেন, – পূর্ণিমা দত্ত।

চালচিত্র চলচ্চিত্র
- প্রযোজনা — ডি কে ফিল্মস।
- কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা — মৃণাল সেন।
- চিত্রগ্রহণ – কে কে মহাজন।
- শিল্প নির্দেশনা – সুরেশচন্দ্র চন্দ।
- সংগীত পরিচালনা — অলোকনাথ দে।
- সম্পাদনা— গঙ্গাধর নস্কর।
কাহিনি:
কলকাতার ছেলে দীপু (অঞ্জন) তার বর্তমান অবস্থায় সন্তুষ্ট নয়, তার ইচ্ছে সে একজন লেখক হবে। দীপু এক দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকের (উৎপল) সঙ্গে দেখা করে। সম্পাদক মশাই দীপুকে তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা লেখা তৈরি করতে বলেন, শর্ত একটাই লেখাটির বিক্রয়মূল্য থাকতে হবে।
পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা দীপু একটা ভালো লেখার জন্য আন্তরিক ভাবে চেষ্ট করে, প্রথমে সে তাদের বারোয়ারি বাড়ির (এখানে একই বাড়িতে এগারোটা পৃথক পরিবার বাস করে) বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে একটা কাহিনি তৈরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়, পরে সে একজন হস্তরেখাবিনের ঘটনা নিয়ে এবং আরও পরে একজন ট্যাক্সিচালকের ঘটনা নিয়েও কাহিনি তৈরির চেষ্টা করে, কিন্তু এবারও সে ব্যর্থ।

শেষ পর্যন্ত সে জ্বালানি হিসাবে কালার ব্যবহার নিয়ে একটা লেখা ৈ কথা ভাবে, এই লেখার কথা ভাবতে ভাবতে দীপু এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখে। শেষ পর্যন্ত কাগজের সম্পাদকের পরামর্শে এবং একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিছুটা কম্প্রোমাইজ করে নিজের শ্রেণিস্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে কয়লার উনুন ব্যবহারের অসুবিধা ও অপকারিতা নিয়ে একটা লেখা তৈরি করে সম্পাদককে জমা দেয়। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে তার মায়ের (গীতা) জন্য একটি গ্যাস স্টোভ কিনে দেয়।
যেখানে তাদের প্রতিবেশীরা তখনও কয়লার উনুন ব্যবহার করে চলেছে। শ্রেণিস্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে দীপু অপেক্ষাকৃত উচ্চ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয়।
মৃণাল সেন:
মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলি মহল্লার এক বৈদ্যব্রাহ্মণ পরিবারে। তার বাবা দীনেশ সেন ছিলেন আইনজীবী, স্বদেশী, কংগ্রেসি ও বিপ্লবী বিপিনচন্দ্র পালের ঘনিষ্ঠ। তাদের বাড়িতে নিয়মিতই বিপ্লবীদের আনাগোনা ছিল। নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু দুবার তাদের বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন। দীনেশ সেন নিজের গাঁটের টাকায় বিপ্লবীদের মামলা লড়তেন, কারাগার থেকে জামিনের ব্যবস্থা করতেন। কেবল রাজনীতিবিদেরাই নন, তাদের বাড়িতে আসতেন কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদদীনের মতো বিখ্যাত কবিরা। ত্রিশের দশকে গান্ধীর আমরণ অনশনের সময় ফরিদপুরের আইনজীবীদের নিয়ে আদালত বর্জন করেছিলেন দীনেশ সেন। এজন্য তৎকালীন জেলা প্রশাসক তার কাছে কৈফিয়ত চাইলে দীনেশ সেন সেই কৈফিয়ত দেওয়া তো দূরের কথা ভেবে দেখার প্রয়োজনও বোধ করেননি। এজন্য অবশ্য তাকে ব্রিটিশ সরকারের শাস্তিও পেতেও হয়েছিল।
মৃণাল সেনের মা ছিলেন স্বাধীনতা অনুরাগী স্বশিক্ষিত। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের জনসভায় উদ্বোধনী গান গাইতেন তার মা। মাকে নিয়ে স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন মৃণাল সেন, ‘‘তখন দেখেছি কত অসংখ্য লোক আসতেন আমাদের বাড়িতে। আসতেন সে-সব লোক, যাঁরা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, যাঁদের পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। ফলে আমাদের বাড়িতে ক্ষণে ক্ষণে পুলিশের তল্লাশি চলতে লাগল। কী করে মানুষ পালিয়ে বেড়ায় এটা আমি খুব ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি। মানুষ ভয় পেয়ে পালায়, একজন মানুষ অনেক মানুষের জন্যেই পালায়। ছোটবেলা থেকেই আমি পুলিশ চিনেছি।’’
