চুম্বন থেকে সঙ্গম, সবেতেই ক্যামেরার সামনে সাবলীল যেসব হেভিওয়েট বাঙালি নায়িকা

চুম্বন থেকে সঙ্গম—পর্দার সামগ্রিক সাহসিকতায় যাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনয় করেছেন, আজকের আলোচনায় রয়েছেন সেই সব হেভিওয়েট বাঙালি অভিনেত্রীরা, যাঁরা ক্যামেরার সামনে নিজেদের চরিত্রের প্রয়োজনে ভেঙেছেন সমাজের প্রচলিত গণ্ডি, গড়ে তুলেছেন অভিনয়ের নতুন ব্যাকরণ।

চলচ্চিত্রের চাহিদা অনুযায়ী, বিভিন্ন সময় সাহসী দৃশ্যে অভিনয় করেছেন বহু অভিনেত্রী। কখনও হয়েছেন সমালোচনার নিশানা, আবার কখনও পেয়েছেন ‘সাহসী নারী’র স্বীকৃতি ও প্রশংসা। কিন্তু প্রশংসায় তাঁরা যেমন বিনম্র থেকেছেন, তেমনি সমালোচনার পিচ্ছিল পথে হোঁচট খেয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন দৃপ্ততায়।

চুম্বন থেকে সঙ্গম, সবেতেই ক্যামেরার সামনে সাবলীল

 

সাহসী দৃশ্য ও শোবিজের পরিবর্তিত ট্রেন্ড

শোবিজ দুনিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে এক প্রবণতা—লাভ সিন, হট মোমেন্টস, অথবা ন্যুড সিন। অনেকেই এই চ্যাপ্টার থেকে দূরে থাকলেও, বেশিরভাগ অভিনেত্রীই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সাহসী দৃশ্যের পর্দার ভাষায় নিজেদের উপস্থাপন করেছেন সাবলীল দক্ষতায়।

বিশ্বের চলচ্চিত্রে, বিশেষ করে হলিউড সাহসী উপস্থাপনায় বরাবরই এক ধাপ এগিয়ে। আর সেই পথ অনুসরণ করে ধীরে ধীরে বলিউডের অনেক অভিনেত্রীও নিজেদের চরিত্রকে সাহসিকতায় রাঙাতে শুরু করেছেন।

 

রূপা গাঙ্গুলি

টেলিভিশনের ইতিহাসে কালজয়ী চরিত্র দ্রৌপদী দিয়ে রূপোলি পর্দায় অভিষেক হয়েছিল যাঁর, তিনি রূপা গাঙ্গুলি বি আর চোপরা পরিচালিত মহাভারত ধারাবাহিকে দ্রৌপদীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় মুগ্ধ করেছিল কোটি দর্শককে। তবে শুধুমাত্র দ্রৌপদী নয়রূপার ক্যারিয়ারে রয়েছে একাধিক সাহসী চরিত্র, যা তাঁকেসাহসী নায়িকা মর্যাদা এনে দিয়েছে।

রূপা গঙ্গোপাধ্যায় [ Roopa Ganguly ]
রূপা গঙ্গোপাধ্যায় [ Roopa Ganguly ]

রূপা গাঙ্গুলি অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • অন্তরমহল’ (পরিচালনায় রীতুপর্ণ ঘোষ): এখানে তিনি এক রক্ষণশীল পরিবারে বন্দী এক নারীর আত্মদহন ও সাহসী প্রতিবাদের প্রতিমূর্তি।
  • মহুলবনীর সেরেং’: যেখানে সম্পর্ক, যৌনতা ও নারীর সামাজিক অবস্থান জটিল বাস্তবতায় ধরা পড়েছে।
  • শূন্য বুকে’: যেখানে শারীরিক সম্পর্ক ও মানসিক বন্ধনের দ্বন্দ্ব উন্মোচিত হয় সংবেদনশীল সাহসিকতায়।

এই সিনেমাগুলিতে রূপা কেবল সাহসী দৃশ্য উপস্থাপন করেননি, বরং নারীর শরীর মানসিকতা—উভয়েরই গভীর পাঠ উপহার দিয়েছেন দর্শককে। তিনি ঋতুস্রাবের মতো নিষিদ্ধপ্রায় সামাজিক বিষয়ের চিত্রায়ণেও ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত।

রূপার অভিনয়ে সাহসিকতা কখনোই অশ্লীলতার সীমায় পৌঁছায়নি। বরং তাঁর অভিনয় ছিল চরিত্রের প্রয়োজন, সামাজিক বার্তা শিল্পের দায়বদ্ধতায় পূর্ণ। সাহসী দৃশ্য মানে কেবল নগ্নতা নয়—এটি সমাজ, শরীর এবং অস্তিত্ব নিয়ে খোলামেলা কথা বলার এক অনন্য ভাষা। রূপা সেই ভাষায় নিজেকে বারবার বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত

বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন দুনিয়ায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। ১৯৯০-এর দশকে বাণিজ্যিক ছবির মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের অভিনয়জীবনকে নতুন রূপ, গভীরতা এবং সাহসিকতায় নির্মাণ করেছেন।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে জনপ্রিয় জুটির রসায়ন যেমন তাঁকে দিয়েছিল বক্স অফিসের সাফল্য, তেমনই মাঝে মাঝে সেই সম্পর্ক ঘিরে তৈরি হয়েছে গুঞ্জন ও বিতর্ক। কিন্তু ঋতুপর্ণা থেমে থাকেননি। একের পর এক ছবিতে সাহসী চরিত্রে তিনি যেভাবে নিজেকে তুলে ধরেছেন, তা নিঃসন্দেহে তাঁকে আলাদা স্তরে উন্নীত করেছে।

তান’, ‘তিন কন্যা’, ‘তৃষ্ণা’ — এই ছবিগুলোতেই আমরা দেখতে পাই এক আত্মবিশ্বাসী, পরিণত, এবং চরিত্রপ্রেমী অভিনেত্রীকে, যিনি নিজেকে ‘নায়িকা’ থেকে ‘নাটকের প্রাণ’ করে তোলেন।

গহীন হৃদয় - কৌশিক সেন এবং ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত
গহীন হৃদয় – কৌশিক সেন এবং ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত

সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি গহীন হৃদয়’ যেন তাঁর সাহসিকতা ও সংবেদনশীলতার নতুন উচ্চতা ছুঁয়েছে। একাধিক সঙ্গম দৃশ্যে তাঁর পরিণত ও সংযত অভিনয় দেখে সমালোচকরা বলেছেন—

❝ বলিউডের বহু নামজাদা অভিনেত্রীর অভিনয় ঋতুপর্ণার এক দৃশ্যের দৃষ্টান্তের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারে না। ❞

এই চরিত্রে তাঁর সাহসী উপস্থিতি শারীরিক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে নয়, বরং মানসিক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে দর্শককে আকৃষ্ট করে।

টলিউডে বিকিনি পরা নিয়ে যে চর্চা বর্তমানে প্রায় স্বাভাবিক—তার শুরুটা কিন্তু হয়েছিল ঋতুপর্ণার হাত ধরেই।
তৃষ্ণা’ ছবিতে তাঁর বিকিনি লুক সে সময় তৈরি করেছিল প্রচণ্ড আলোড়ন। কেউ প্রশংসা করেছেন, কেউ বা কটাক্ষ করেছেন তাঁর দেহপ্রকৃতি সাহসী পোশাক বেছে নেওয়ার জন্য

কিন্তু এখানেই তিনি অন্যদের থেকে আলাদা। নিজের শরীর, বয়স, অবস্থান—সব কিছু সত্ত্বেও তিনি পর্দার সাহসী ভূমিকা থেকে পিছু হটেননি। বরং, তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন—

সাহস মানে শুধুই শরীর দেখানো নয়, সাহস মানে নিজেকে চরিত্রের হাতে তুলে দেওয়া, নিঃশর্তভাবে।

ঋতুপর্ণা সেই অভিনেত্রী, যিনি ঋতুপর্ণ ঘোষ বা অপর্ণা সেনের মতো দিকপাল পরিচালকের সঙ্গে কাজ করে বুঝেছেন কীভাবে সাহসিকতা, সংবেদন বাস্তবতাকে পর্দায় মেলানো যায়। সেদিনের কিশোরী আজ হয়ে উঠেছেন গহীন হৃদয়’-এর প্রাপ্তবয়স্ক ব্যাখ্যাকারী — যিনি শুধু অভিনয় করেন না, বরং নিজের মধ্যে দিয়ে চরিত্রটিকে বাঁচিয়ে তোলেন

 

শ্রীলেখা মিত্র

টলিউডের বহুমাত্রিক ও অনন্য অভিনেত্রীদের তালিকায় শ্রীলেখা মিত্র একটি আলাদা নাম। তাঁর অভিনয়জীবন যেমন বিচিত্র, তেমনই তাঁর ব্যক্তিজীবনও সাহস, স্পষ্টবাদিতা ও আত্মনির্ভরতার প্রতিচ্ছবি। এক সন্তানের জননী ও ডিভোর্সী হয়েও তিনি সমাজের ছাঁচে নিজেকে গলাতে যাননি; বরং নিজস্ব ঢংয়ে নিজের মতো করে জীবন বেছে নিয়েছেন।

পর্দায় তিনি কখনো স্নিগ্ধ ভালোবাসার মুখ, কখনো বা সিডাকটিভ ক্যারিশমায় মুগ্ধ করেছেন দর্শকদের। তাঁর সৌন্দর্য শুধুই বাহ্যিক নয়—সেই সৌন্দর্য অভিব্যক্তিতে, আত্মবিশ্বাসে এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে ছড়িয়ে থাকে।

 

শ্রীলেখা মিত্র [ Sreelekha Mitra ]
শ্রীলেখা মিত্র [ Sreelekha Mitra ]
শ্রীলেখা মিত্র নিজেকে কখনও কোনও ঘরানায় আটকে রাখেননি। তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, চরিত্রের গূঢ়তা ফুটিয়ে তুলতে শরীরী উপস্থাপনই সব নয়, বরং সাহস, সূক্ষ্মতা ও অভিনয়শৈলীর গভীরতাই মুখ্য।

উড়ো চিঠি’, ‘আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘হ্যালো কলকাতা’, ‘কাঁটাতার’-এর মতো সিনেমাগুলিতে তিনি সাহসী দৃশ্যে যেমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধরা দিয়েছেন, তেমনই রেখেছেন শৈল্পিকতা ও সংযমের ছাপ। তাঁর এই কাজগুলোতে শরীর কখনো উদ্দেশ্য নয়, বরং একটি চরিত্রের বাস্তবতার ধারক

আজ যখন তিনি পঞ্চাশের দোরগোড়ায়, তখনও তাঁর গ্ল্যামারে কুপোকাত অগণিত অনুরাগী। তাঁর রূপ নয়, তাঁর ব্যক্তিত্বই তাকে বিশেষ করে তোলে।

তিনি প্রমাণ করেছেন—সাহসী দৃশ্য মানেই খোলামেলা নয়, বরং তা হতে পারে চরিত্রের এক দুর্বার প্রকাশ

শ্রীলেখা মিত্র সেই অভিনেত্রীদের একজন, যিনি সাহসিকতাকে শুধু চেহারায় নয়, জীবনচর্যায় ধারণ করেন। পর্দায় সাহসিকতা ও জীবনে আত্মমর্যাদার অনন্য মিশেলে তিনিই টলিউডের সাহসী সুন্দরী।

 

স্বস্তিকা মুখার্জি

টলিউড ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সাহসী ও বহুমাত্রিক অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় (Swastika Mukherjee)। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু অভিনেত্রী হিসেবেই নিজেকে প্রমাণ করেননি, বরং নারী স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবেও উঠে এসেছেন—নিজস্ব মতামত, সাহসিকতা ও শিল্পে দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে।

চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতে গিয়ে স্বস্তিকা বারবার ভেঙেছেন সামাজিক গণ্ডি ও ছকবাঁধা নারীকাঠামো। যৌনতা, সম্পর্ক, শরীর — এই সমস্ত বিষয় যখনও গল্প বা চরিত্রের অঙ্গ হয়ে উঠেছে, তিনি তা নিঃসংকোচে গ্রহণ করেছেন।

স্বস্তিকার সাহসিকতার অন্যতম উদাহরণ মৈনাক ভৌমিক পরিচালিতটেক ওয়ান ছবিটি। এখানে তিনি অভিনয় করেন দোয়েল মিত্র নামের এক জনপ্রিয় অভিনেত্রীর ভূমিকায়, যিনি একদিকে যেমন পেশাগতভাবে সফল, অন্যদিকে ব্যক্তিজীবনে নানান টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছেন। ছবিতে তাঁর যৌনদৃশ্য ছিল চরিত্রের মনস্তত্ত্ব ও জটিলতার সঙ্গে জড়িত, কিন্তু ছবির মুক্তির আগেই সেই একটি দৃশ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে এবং সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা।

এক সন্তানের মা এই অভিনেত্রীকে নানা কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়, কিন্তু তিনি নিজের অবস্থান থেকে এক পা-ও পিছিয়ে আসেননি। বরং এক সাক্ষাৎকারে বলেন:

“যৌনদৃশ্য আমার কাছে শুধুই অভিনয়ের একটি অংশ। এটাও ক্যামেরার সামনে আর পাঁচটা সংলাপ বা অভিব্যক্তির মতোই।”

এই মনোভাবই তাঁকে আলাদা করে তোলে—যেখানে তিনি অভিনয়কে শুধু বাহ্যিক চমক নয়, চরিত্রের গভীরতাকে তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে দেখেন।

 

স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, Swastika Mukherjee
স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, Swastika Mukherjee

 

স্বস্তিকার নামের সঙ্গে বিতর্ক বরাবর জড়িয়ে থেকেছে। বিশেষত, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন ও প্রকাশ্য মতামতের জন্য তিনি বারবার ট্রোলড হয়েছেন। চল্লিশোর্ধ এই অভিনেত্রী যখন বিকিনি ফটোশুট করেন বা সাহসী ছবি শেয়ার করেন, তখন অনেকেই তাঁকে ‘বয়সের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন’ বলে বিদ্রুপ করে।

কিন্তু এখানেই স্বস্তিকার ব্যক্তিত্বের অন্য এক দিক প্রকাশ পায়। তিনি বোঝাতে চান—নারীর বয়স, শরীর বা পোশাক কখনও তার ক্ষমতা, সৌন্দর্য কিংবা স্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না।

স্বস্তিকার প্রথম বিকিনি পরা বড়পর্দার চরিত্র ছিল মৈনাক ভৌমিকেরআমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস ছবিতে। সেখানে তিনি সাহসিকতা, আত্মবিশ্বাস ও নারীবাদী অবস্থানের এক বিকল্প ভাষা তৈরি করেন।

স্বস্তিকা কখনও বাণিজ্যিক ছবির গ্ল্যামার ট্র্যাপে আটকে থাকেননি। বরং তিনি একের পর এক বেছে নিয়েছেন ভিন্ন স্বাদের, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ভরা চরিত্র। “শব্দ”, “ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী”, “পাতাললোক”, “গুলমোহর”—এই সবকটি কাজেই তিনি প্রমাণ করেছেন যে তিনি শুধু সাহসী নন, বরং অসাধারণ একজন শিল্পী

 

ঋ সেন

বাংলা চলচ্চিত্রে এমন অভিনেত্রী খুব কমই রয়েছেন যাঁরা সাহসিকতাকে শুধুমাত্র ‘পোশাকহীনতা’ নয়, বরং একধরনের চরিত্রগত আত্মপ্রকাশ শিল্পচর্চা বলে বিশ্বাস করেন। সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন সেন—একজন অভিনেত্রী যিনি ক্যামেরার সামনে সাহসী দৃশ্যকে শুধু “দেখানোর জন্য” নয়, বলবার জন্য ব্যবহার করেন।

ঋ-র অভিনয়জীবনে ফ্রন্টাল ন্যুডিটি’, স্বমেহন, এমনকি অবাধ যৌনতার দৃশ্য—সবকিছুই এসেছে একপ্রকার আত্মবিশ্বাসী সাবলীলতায়, যা বাংলা চলচ্চিত্রে একধরনের বাঁকবদল ঘটিয়েছে।

ঋ সেনের অভিনীত সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ছবি কসমিক সেক্স’ (2012)। এখানে শরীর, কাম, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার এক বুনোট নির্মাণ করেছেন পরিচালক অমৃতা মুখোপাধ্যায়।
এই ছবিতে ঋর চরিত্র শুধুমাত্র যৌনতা প্রকাশ করে না, বরং যৌনতা এক ধরণের সাধনা’—এই দর্শনকে তুলে ধরে। একাধিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রশংসিত এই ছবিটি এখনো পর্যন্ত গুগলে অন্যতম সর্বাধিক সার্চড বাংলা সিনেমার তালিকায়।

 

ঋ সেন
ঋ সেন

 

ঋ নিজেই একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন—

❝ যৌনতা আমার কাছে কোনো ট্যাবু নয়। এটি শরীর ও আত্মার সম্মিলন। আমি ক্যামেরার সামনে যেমন বাস্তব, তেমনই সত্য। ❞

ঋ সেন শুধুমাত্র ‘কসমিক সেক্স’ নয়, বরং আরও বেশ কিছু প্রান্তিক, সাহসী এবং বিকল্প ধারার ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে এক অনন্য নারীমূর্তি গড়ে তুলেছেন। তার মধ্যে অন্যতম:

  • গান্ডু’ (2010) – কৌশিক মুখার্জির (Q) পরিচালিত এই ছবিতে ঋর উপস্থিতি ছিল প্রতিবাদী ও ভাঙচুর-প্রবণ সমাজ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
  • তাসের দেশ’ (2012) – রূপকের আড়ালে নারীস্বাধীনতা ও যৌনতার নানামুখী রূপ তুলে ধরেছেন ঋ।
  • বিষ’ (2020) – নারীর ভেতরের বিষ, ভাঙন এবং কামনার অভিব্যক্তিতে ঋ-র অনবদ্য অভিনয় প্রশংসিত হয়।

এই সব ছবিতে ঋ যেমন নিজের শরীরকে চরিত্রের বাহন করে তুলেছেন, তেমনই তুলে ধরেছেন একজন নারীর ব্যক্তিগত সত্তা, ইচ্ছা, অনুভূতির সপ্রতিভ চিত্র

বাংলা সিনেমায় অনেকেই তাঁকে সেক্স বম্ব’ আখ্যা দিয়েছেন, কিন্তু ঋ সেই গণ্ডি অনেক আগেই অতিক্রম করেছেন। তাঁর কাছে যৌনতা শুধুমাত্র শারীরিক আবেদন নয়—এটি একধরনের আত্ম-অনুসন্ধান শিল্পীসত্তার প্রকাশ। তিনি সাহসী নন শুধুমাত্র পর্দায় নগ্ন হওয়ার জন্য, বরং সাহসী—কারণ তিনি নিজের বিশ্বাসকে ন্যায়সঙ্গত ভেবেছেন এবং সেই অনুযায়ী অভিনয় করেছেন, সামাজিক প্রথার তোয়াক্কা না করে।

 

পাওলি দাম

বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সাহসী এবং আত্মবিশ্বাসী অভিনেত্রী হিসেবে পাওলি দাম-এর নাম এখন এক অনিবার্য পরিচিতি। যাঁরা বাঙালি পর্দায় সাহস ও সৌন্দর্যের মেলবন্ধন খুঁজে পান, তাঁদের কাছে পাওলি এক অনন্য নাম। তাঁর অভিনয়ে যেমন রয়েছে আবেগের সূক্ষ্মতা, তেমনি রয়েছে শরীরচর্চার সাহসিক প্রকাশ।

২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শ্রীলঙ্কান পরিচালক ভিমুক্তি জয়সুন্দর পরিচালিত ছত্রাক’ ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে সাহসিকতার এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এই ছবিতে পাওলি দামের অভিনয় শুধু আলোচনা নয়, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

ছবিতে নগ্ন দৃশ্যের উপস্থাপনা এবং যৌনতাকে শিল্পের আঙ্গিকে পরিবেশন করার প্রয়াসে যেমন দর্শক বিভাজিত হয়ে পড়ে, তেমনি একটি প্রশ্নও সামনে আসে—বাংলা সিনেমা কি সত্যিই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠেছে?

পাওলি নিজে সেই বিতর্কে একটুও বিচলিত হননি। বরং এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেন,

“আমি নগ্ন হয়েছিলাম, কারণ দৃশ্যটির জন্য সেটাই প্রয়োজন ছিল। আমার কো-স্টারও নগ্ন হয়েছিল। আমাদের চরিত্র সেই মুহূর্তে পরিতৃপ্তি অনুভব করছিল—এটাই বোঝানো ছিল দৃশ্যটির মূল কথা।”

এই স্পষ্টবাদিতা এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশের প্রস্তুতিই তাঁকে এনে দেয় সাহসী শিল্পী’-র উপাধি।

পাওলি দাম
পাওলি দাম

‘ছত্রাক’-এর পর পাওলি অভিনয় করেছেন একাধিক সাহসী সিনেমায়—

  • হেট স্টোরি’ (২০১২): বলিউডে তাঁর অভিষেক ঘটে এই সুপার বোল্ড থ্রিলার দিয়ে। এখানে তাঁর অভিনয় ছিল সাহসিকতা ও আবেগের এক নিখুঁত সমন্বয়।
  • ইয়ারা সিলি সিলি’ এবং অভিশপ্ত নাইটি’-তে তিনি নগ্নতা, প্রেম, যৌনতা এবং মেলবন্ধনের দৃশ্যগুলোতে সাবলীল উপস্থিতি দেখিয়েছেন।
  • কালবেলা’-তেও চরিত্রের প্রয়োজনে আবেগ ও সাহসিকতার মিশেলে তিনি দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

এমনকি বিকিনি লাঞ্ছনাজনক পোশাকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে কখনও দ্বিধা করেননি তিনি। তাঁকে ঘিরে একদিকে যেমন সমালোচনার ঝড় ওঠে, অন্যদিকে তৈরি হয় এক বিশাল অনুরাগী শ্রেণি—যাঁরা তাঁকে নারী-আত্মমর্যাদার সাহসী মুখ বলে মনে করেন।

একটি প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে—ক্যামেরার সামনে নিজের দেহ উন্মুক্ত করা কি শুধুই বাজারের খেলা? নাকি এটি শিল্পের একটি শাখা?

এই প্রশ্নে পাওলির উত্তর ছিল দৃঢ় ও চিন্তাশীল। তিনি বলেন,

“পুরো বিষয়টিই মনের উপর নির্ভর করে। মানসিকভাবে দৃশ্যটির জন্য আমি পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম। কারণ সিনেমা আমার কাছে কেবল পেশা নয়, প্যাশনও। আমরা যৌনতার সময় কি পোশাক পরে থাকি?”

এই একটাই বক্তব্য প্রমাণ করে, তাঁর সাহসিকতা নিছক প্রদর্শনের জন্য নয়—বরং তা এক প্রকার চরিত্র বিশ্লেষণ দার্শনিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ

যাঁরা ভাবেন সাহসিকতা মানেই অশালীনতা, তাঁদের জন্য পাওলির জীবনই একটি জবাব। এক যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা এবং পড়াশোনায় তুখোড় এই অভিনেত্রী পরবর্তীতে অভিনয়কেই নিজের কেরিয়ার হিসেবে বেছে নেন। তাঁর ভিতরে রয়েছে একদিকে যেমন কবিত্বময় নারীত্ব, তেমনি রয়েছে পেশাগত পরিশ্রম ও সততা।

পাওলি দামের নাম উচ্চারণ করলেই আজ অনেকের কপালে ভাঁজ পড়ে, আবার অনেকের চোখে আসে শ্রদ্ধা। তিনি বিতর্কে ভয় পান না, সমালোচনার মুখোমুখি হতে কুণ্ঠাবোধ করেন না—এই সাহসই তাঁকে আলাদা করে তোলে। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, একজন অভিনেত্রীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাঁর প্রস্তুতি, উপলব্ধি এবং আত্মবিশ্বাস

এই কারণেই, তিনি শুধুই ‘সেক্সি নায়িকা’ নন—তিনি একজন চিন্তাশীল, স্পষ্টভাষী, সাহসী এবং পরিণত শিল্পী

 

 

google news , গুগল নিউজ
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

বাংলা চলচ্চিত্রের একসময়ের সীমাবদ্ধ পরিসর আজ অনেকটাই প্রসারিত। সাহসী দৃশ্য মানেই এখন আর শুধুমাত্র চোখ ধাঁধানো যৌনতা নয়—এটি হয়ে উঠেছে চরিত্রের গভীরতা প্রকাশের একটি মাধ্যম, যেখানে শরীর নয়, আত্মা নগ্ন হয়। যে সমস্ত বাঙালি অভিনেত্রী এই রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে পর্দায় নিজেদের উন্মোচন করেছেন—তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপই আমাদের কাছে এক ধরনের শিল্পচর্চার, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার প্রকাশ।

পাওলি দাম, স্বস্তিকা মুখার্জি, ঋ সেন—তাঁরা কেবল সাহসী নয়, বরং একেকজন সংবেদনশীল শিল্পী, যাঁরা সমাজের মুখে আঙুল তুলতে জানেন, চরিত্রে প্রবেশ করতে জানেন, এবং প্রয়োজনে শরীরকে পর্দার ভাষায় রূপান্তর করতে জানেন।

সমালোচকরা হয়তো প্রশ্ন তোলেন, কিন্তু সময়ের স্রোত প্রমাণ করেছে—এই অভিনেত্রীদের অবদান বাংলা সিনেমাকে একটি পরিণত, আন্তর্জাতিক ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গির স্তরে তুলে এনেছে। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, নারী শুধু পর্দার অলঙ্কার নয়—সে একজন চিন্তাশীল, দায়বদ্ধ ও বলিষ্ঠ শিল্পী

আজকের দিনে এই সাহসী নারীদের কেবল “বোল্ড নায়িকা” বললে ভুল হবে—তাঁরা আসলে বাংলা সিনেমার ভাষা, বিস্তার ও ভাবনার রূপান্তরের পুরোধা

 

Leave a Comment