জলসাঘর চলচ্চিত্র (ইংরেজি: Jalsaghar, “The Music Room”) তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়ের কাহিনী নিয়ে ১৯৫৮ সালে নির্মিত বিখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের চতুর্থ চলচ্চিত্র । ছবির শুটিং হয় মুর্শিদাবাদ থেকে ১০ কিমি দূরে নিমতাতা গ্রামের নিমতিতা রাজবাড়ীতে। এতে অভিনয় করেছেন ছবি বিশ্বাস, পদ্মা দেবী, পিনাকী সেনগুপ্ত, গঙ্গাপদ বসু, কালী সরকার, এবং উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান।
জলসাঘর চলচ্চিত্র । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান
- প্রযোজনা – সত্যজিৎ রায় প্রোডাকসন্স।
- কাহিনি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
- প্রযোজনা, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা- সত্যজিৎ রায়
- সংগীত- ওস্তাদ বিলায়েত হোসেন খাঁ।
- চিত্রগ্রহণ – সুব্রত মিত্র।
- শিল্প নির্দেশনা – বংশী চন্দ্রগুপ্ত।
- শব্দগ্রহণ – দুর্গাদাস মিত্র।
- সম্পাদনা – দুলাল দত্ত।
- নৃত্য— রোশনকুমারী।
- কন্ঠসংগীত ও সুরারোপ – আখতারীবাঈ (ফৈজাবাদী), সালামত খাঁ, বিসমিল্লা খাঁ, ওয়াহেদ খাঁ, লড্ডন খাঁ, দক্ষিণামোহন ঠাকুর ।
অভিনয় :
ছবি বিশ্বাস, পদ্মা দেবী, গঙ্গাপদ বসু, তুলসী লাহিড়ী, কালী সরকার, পিনাকী সেনগুপ্ত, প্রতাপ মুখোপাধ্যায়।
কাহিনি:
জমিদার বিশ্বম্ভর রায় (ছবি বিশ্বাস) তাদের জমিদারির সপ্তম পুরুষ, মূলত তাঁর অপবারের ফলেই তার জমিদারি ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। বিশ্বম্ভর পুরোনো দিনের চালচলন বদলাতে কোনো ভাবেই রাজি নন। একমাত্র পুত্রের উপনয়ন উপলক্ষে তিনি পিতৃপুরুষের সঞ্চিত অলঙ্কার বন্ধক দিয়ে বিশাল উৎসবের আয়োজন করেন। স্ত্রী মহামায়ার (পদ্মা দেবী) বারবোর নিষেধ সত্ত্বেও গান, বাজনা, আতশবাজিতে রায়বাড়ি মুখরিত হয়।
উৎসবের কিছুদিন পরে মহামায়া পুত্রকে নিয়ে বাপের বাড়ি যাওয়ার সময়ও বারংবার স্বামীকে অনুরোধ করেন অপব্যয় বন্ধ করার জন্য। গ্রামের মহাজনের ছেলে মহিম গাঙ্গুলী (গঙ্গাপদ) নিজেও বড় ব্যবসাদার। গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে মহিম অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং এই অনুষ্ঠানে বিশ্বম্ভরকে আমন্ত্রণ জানায়। বিশ্বম্ভর মহিমের আর্থিক উন্নতিকে তাঁর প্রতি অবজ্ঞা হিসাবে চিহ্নিত করেন এবং ঐদিন রায়বাড়িতে পাল্টা অনুষ্ঠান হিসাবে পুণ্যাহ পালনের সিদ্ধান্ত নেন। নায়েব তারাপ্রসন্নকে দিয়ে বিশ্বম্ভর অবশিষ্ট গয়না বন্ধক দেওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং স্ত্রীর কাছে খবর পাঠান ফিরে আসার জন্য।
উৎসবের দিন সকাল থেকেই ঝড় ওঠে, রায়বাড়ির জলসাঘরে যখন ওস্তাদ উজীর খাঁর গান হচ্ছে সেই সময় খবর আসে বজরাডুবিতে বিশ্বম্ভরের স্ত্রী ও পুত্রের মৃত্যু হয়েছে। সংবাদে বিশ্বম্ভর প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পান। আর্থিক কারণে নায়েব তারাপ্রসন্ন (তুলসী) এবং খানসামা অনন্ত (কালী) ছাড়া অন্য কর্মচারীদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
চার বছর পর নিঃসঙ্গ বিশ্বম্ভরের কাছে আবার মহিম গাঙ্গুলীর পদার্পণ হয়। তার বাড়িতে জলসাঘর উদ্বোধনে বিশ্বম্ভরের নিমন্ত্রণ। এবার বিশ্বম্ভর অসুস্থতার অজুহাতে নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। অনুষ্ঠানের রাতে কৃষ্ণাবাইয়ের নাচের শব্দে বিচলিত বিশ্বম্ভর সিদ্ধান্ত নেন তার বাড়িতেও কৃষ্ণাবাইয়ের অনুষ্ঠান হবে।
শেষ কপর্দক ব্যয় করে রায়বাড়ির জলসাঘরে নাচের অনুষ্ঠানে বিশ্বম্ভর তাঁর শেষ সঞ্চিত মোহরগুলি বাইজিকে ইনাম দিয়ে রায়বাড়ির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং মহিমকে অপদস্থ করার আনন্দে অতিরিক্ত মদ্যপান করে মত্ত অবস্থায় তাঁর ঘোড়া তুফানের পিঠে সওয়ার হয়ে উদ্দাম বেগে ছুটতে গিয়ে নিজের পতন এবং মৃত্যু ডেকে আনেন।
এই ছবিতে সত্যজিৎ সামন্ততন্ত্রকে মহিমান্বিত করেছেন বলে সমালোচিত হয়েছিলেন, যদিও ছবির নায়ক বিশ্বস্তর রায়ের সংগীতপ্রীতিকে সত্যজিৎ অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ছবি বিশ্বাসের অভিনয়, বিলায়েত ধীর সংগীত পরিচালনা, রোশনকুমারীর নৃত্য পরিবেশনা, আত্তারী বাই, সালামত খাঁ, বিসমিল্লাহ লন খাঁ এবং দক্ষিণামোহন ঠাকুরের সংগীত ও যন্ত্রসংগীত ছবিটির সম্পদ। দেশে আর্থিক সাফল্য না পেলেও প্যারিসে ছয়টি প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি টানা ৬ মাস প্রদর্শিত হয়।
প্রকাশনা :
ছবির চিত্রনাট্য এক্ষণ পত্রিকায় ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।
