অগ্রদূত গোষ্ঠী বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য যৌথ পরিচালনা দল। এটি কোনো একক ব্যক্তির নাম নয়, বরং প্রযুক্তিবিদ এবং কলাকুশলীর একটি গ্রুপ, যারা যৌথভাবে ছবি পরিচালনা করতেন এবং ক্রেডিটে “অগ্রদূত” নাম ব্যবহার করতেন। এই মডেল বাংলা সিনেমায় বিরল এবং দেশভাগ-উত্তর (১৯৪৭-এর পর) অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে সৃজনশীলতার ফসল। গোষ্ঠীটি ১৯৪৬ সালে গঠিত এবং ১৯৮০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। এরা MP প্রোডাকশনের অধীনে বেশিরভাগ ছবি নির্মাণ করে, যা সোনালি যুগের (১৯৫০-১৯৭০) বাণিজ্যিক সাফল্য এবং শিল্পগত মানের প্রতীক। অগ্রদূতের ছবি সামাজিক বার্তা, রোমান্টিক নাটক এবং সাহিত্যিক অবলম্বনে নির্মিত হতো, যা উত্তমকুমারের স্টারডম গড়ে তোলে।
অগ্রদূত গোষ্ঠী
গঠন ও সদস্য
১৯৪৬ সালে গঠিত অগ্রদূত কোর ইউনিট, যার সদস্য ছিলেন বিভূতি লাহা (ক্যামেরাম্যান, ১৯১৫-১৯৯৭), যতীন দত্ত (শব্দ), শৈলেন ঘোষাল (ল্যাব), নিতাই ভট্টাচার্য (দৃশ্য এবং চিত্রনাট্যকার) এবং বিমল ঘোষ (উৎপাদন)। বিভূতি লাহাই অগ্রদূত ছদ্মনামে সিনেমা পরিচালনার প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন। গোষ্ঠী পরিচালক হিসাবে অগ্রদূত গোষ্ঠী বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক বিভূতি লাহার নেতৃত্বে চিত্রনাট্যকার নিতাই ভট্টাচার্য, শব্দযন্ত্রী যতীন দত্ত, রসায়নাগার কর্মী শৈলেন ঘোষাল এবং প্রযোজনা তত্ত্বাবধায়ক বিমল ঘোষ মিলিত ভাবে অগ্রদূতকে গড়ে তোলেন।
পরবর্তীকালে গ্রুপে যোগ দেন সরোজ দে (সহপরিচালক, পরে অগ্রগামী গোষ্ঠী গঠন করেন), সলিল দত্ত (পরিচালনা সহকারী), অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় (চিত্রনাট্য) প্রমুখ। বিভূতি লাহা (জন্ম কলকাতায়, নিউ থিয়েটার্সে ক্যামেরাম্যান হিসেবে শুরু) গ্রুপের প্রধান নেতা, যিনি ৫০টিরও বেশি ছবির সিনেমাটোগ্রাফি করেন। অন্য সদস্যরা চলে গেলেও লাহা ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত “অগ্রদূত” নামে কাজ করেন।

কর্মজীবন ও সাফল্য
অগ্রদূত পরিচালিত প্রথম ছবি স্বপ্ন ও সাধনা (১৯৪৭)। এই গোষ্ঠীর পরিচালনায় নির্মিত মোট ৩৩টি ছবির বেশির ভাগই বক্স অফিসে সাফল্য পেয়েছিল। ১৯৫০-এর দশকে উত্তমকুমার-সুচিত্রা জুটির সাফল্যে গ্রুপটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। উত্তমকুমার এই গোষ্ঠীর পরিচালনায় নির্মিত ১৯টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। বিভিন্ন সময়ে সদস্যদের অনেকেই গোষ্ঠী ছেড়ে চলে গেলেও বিভূতি লাহা ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত এই গোষ্ঠীর নামে চলচ্চিত্র পরিচালনার কাজ করেছেন যদিও চিত্রগ্রাহক হিসাবে কাজের সময় তিনি নিজের নামই ব্যবহার করতেন।
এই গোষ্ঠীর পরিচালনায় নির্মিত বাবলা (১৯৫১) ৭ম কার্লোভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সামাজিক অগ্রগতির দিশারী’ হিসাবে পুরস্কৃত হয়। গ্রুপটি সাহিত্যিক অবলম্বনে (তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) ছবি নির্মাণে দক্ষ ছিল এবং বক্স অফিসে কোটি কোটি টাকা আয় করে।
চলচ্চিত্রপঞ্জি
অগ্রদূত গোষ্ঠীর নির্মিত ছবিগুলোর বিস্তারিত তালিকা (বছরসহ):
| বছর | ছবির নাম | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|---|
| ১৯৪৭ | স্বপ্ন ও সাধনা | প্রথম ছবি, সামাজিক নাটক। |
| ১৯৪৭ | সব্যসাচী | অ্যাডভেঞ্চার নাটক। |
| ১৯৪৮ | সমাপিকা | রোমান্টিক নাটক। |
| ১৯৪৯ | সংকল্প | সামাজিক বার্তা যুক্ত। |
| ১৯৫১ | সহযাত্রী | ভাই-বোনের সম্পর্ক নিয়ে। |
| ১৯৫১ | বাবলা | আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত। |
| ১৯৫২ | রাত্রির তপস্যা | সামাজিক নাটক। |
| ১৯৫২ | অন্নপূর্ণার মন্দির | তারাশঙ্করের উপন্যাস অবলম্বনে, দারিদ্র্য নিয়ে। |
| ১৯৫৪ | অগ্নিপরীক্ষা | উত্তম-সুচিত্রার প্রথম হিট, বক্স অফিস রেকর্ড। |
| ১৯৫৫ | সবার উপরে | রহস্যময় নাটক, উত্তম-সুচিত্রা। |
| ১৯৫৫ | অনুপমা | রোমান্টিক নাটক। |
| ১৯৫৬ | ত্রিযামা | সামাজিক নাটক। |
| ১৯৫৭ | পথে হল দেরি | উত্তম-সুচিত্রার হিট। |
| ১৯৫৮ | সূর্যতোরণ | রোমান্টিক। |
| ১৯৫৯ | লালু ভুলু | অন্ধ-বধির গল্প, সামাজিক বার্তা। |
| ১৯৬০ | কুহক | রহস্য নাটক। |
| ১৯৬০ | খোকা বাবুর প্রত্যাবর্তন | কমেডি। |
| ১৯৬১ | অগ্নিসংস্কার | সামাজিক। |
| ১৯৬২ | ভগিনী নিবেদিতা | জীবনীমূলক, স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা নিবেদিতা নিয়ে। |
| ১৯৬২ | বিপাশা | রোমান্টিক। |
| ১৯৬৩ | উত্তরায়ণ | সামাজিক। |
| ১৯৬৩ | বাদশা | হিস্টোরিকাল। |
| ১৯৬৫ | অন্তরাল | রহস্য নাটক। |
| ১৯৬৫ | সূর্যতাপা | সামাজিক। |
| ১৯৬৫ | তাপসী | রোমান্টিক। |
| ১৯৬৭ | নায়িকা সংবাদ | সামাজিক নাটক। |
| ১৯৬৭ | কখনো মেঘ | রোমান্টিক। |
| ১৯৬৯ | চিরদিনের | রোমান্টিক। |
| ১৯৭০ | মঞ্জরী অপেরা | কমেডি। |
| ১৯৭১ | ছদ্মবেশী | কমেডি। |
| ১৯৭২ | হার মানা হার | রোমান্টিক। |
| ১৯৭৩ | সোনার খাঁচা | সামাজিক। |
| ১৯৭৫ | সেদিন দুজনে | রোমান্টিক। |
| ১৯৭৭ | দিন আমাদের | সামাজিক। |
| ১৯৮১ | সূর্যসাক্ষী | রোমান্টিক। |
| ১৯৮৯ | অপরাহ্নের আলো | শেষ ছবি, সামাজিক। |
পুরস্কার, প্রভাব ও উত্তরাধিকার
এই গোষ্ঠীর পরিচালনায় নির্মিত বাবলা (১৯৫১) ৭ম কার্লোভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সামাজিক অগ্রগতির দিশারী’ হিসাবে পুরস্কৃত হয়। ভগিনী নিবেদিতা (১৯৬২) এবং অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি (১৯৬৭) জাতীয় পুরস্কার লাভ করে (অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিতে উত্তমকুমার সেরা অভিনেতা)। অনেক ছবি বক্স অফিসে রেকর্ড আয় করে, যেমন অগ্নিপরীক্ষা।
অগ্রদূত বাংলা চলচ্চিত্রে যৌথ কাজের মডেল প্রচার করে এবং উত্তমকুমারের ১৯টি ছবিতে অবদান রাখে। গোষ্ঠীর প্রভাবে সরোজ দে প্রমুখ অগ্রগামী গোষ্ঠী গঠন করেন। এটি সোনালি যুগের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সাহিত্যিক অবলম্বনে বাণিজ্যিক ছবির ধারা প্রচার করে।
