চলচ্চিত্র সম্পাদক অর্ঘ্যকমল মিত্র

অর্ঘ্যকমল মিত্র  বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম প্রভাবশালী ও সূক্ষ্মদৃষ্টি সম্পন্ন চলচ্চিত্র সম্পাদক (Film Editor)। তিনি সেই বিরল শ্রেণির শিল্পী, যাঁরা পর্দার আড়ালে থেকে চলচ্চিত্রের ছন্দ, গতি ও আবেগকে জীবন্ত করে তোলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে গত দুই দশকে নান্দনিক ও প্রযুক্তিগত পরিশীলনের যে নতুন ধারা গড়ে উঠেছে, তার অন্যতম প্রধান কারিগর হলেন অর্ঘ্যকমল মিত্র।

তাঁর সম্পাদনা শুধু কৌশল নয়, বরং এক ধরনের সাংস্কৃতিক পাঠ ও মনস্তাত্ত্বিক অনুধাবন, যা প্রতিটি দৃশ্যের গভীরতা বাড়িয়ে তোলে।

 

অৰ্ঘকমল মিত্র, চলচ্চিত্র সম্পাদক

 

অর্ঘ্যকমল মিত্র

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা

অর্ঘ্যকমল মিত্রের জন্ম কলকাতায়। শৈশব থেকেই তিনি শিল্প, সিনেমা ও গল্প বলার জগতে মুগ্ধ ছিলেন। তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় সাউথ পয়েন্ট স্কুল, কলকাতায়। পরবর্তীতে তিনি শ্রীরামপুরে টেক্সটাইল টেকনোলজি বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন, কিন্তু সেখান থেকে খুব বেশি আগ্রহ পাননি।

চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর অনুরাগ এতটাই গভীর ছিল যে তিনি জীবনের দিক পরিবর্তন করে ভর্তি হন ভারতের অন্যতম নামী প্রতিষ্ঠান ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া (FTII), পুনে-তে। সেখানে তিনি সম্পাদনা (Editing) বিষয়ে পেশাগত প্রশিক্ষণ নেন। এই সময়েই তিনি সিনেমাকে শুধুমাত্র বিনোদন নয়, বরং এক চিন্তাশীল শিল্পরূপ হিসেবে দেখতে শেখেন।

 

চলচ্চিত্রে সূচনা

ফিল্ম স্কুল থেকে বেরিয়েই অর্ঘ্যকমল মিত্র স্বাধীন সম্পাদক হিসেবে নিজের যাত্রা শুরু করেন। তাঁর প্রথম কাজ ছিল মলয় ভট্টাচার্য পরিচালিত “কাহিনী” (১৯৯৭) ছবিতে। এই চলচ্চিত্রেই তাঁর দক্ষতা, ছন্দবোধ ও সময়ের প্রতি সংবেদনশীলতা শিল্পমহলে নজর কাড়ে।

এরপর তিনি একে একে কাজ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট সব নির্মাতার সঙ্গে — অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী, সুমন মুখোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত, অনিক দত্ত, সৌকর্য ঘোষাল, রাজা সেন এবং বৌদ্ধায়ন মুখার্জি-র মতো পরিচালকরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন এবং প্রত্যেকে তাঁর কাজে গভীর আস্থা রেখেছেন।

তাঁর সম্পাদনায় তৈরি ছবিগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই শুধু বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি, বরং নান্দনিকতা ও গল্প বলার মানে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।

 

সম্পাদনার দর্শন ও শিল্পভাবনা

অর্ঘ্যকমল মিত্র মনে করেন, “Editing is not cutting — it is rhythm.” তাঁর সম্পাদনার ধরন দর্শকের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু কখনোই তা দৃশ্যমান হয় না। তাঁর কৌশল হল নিঃশব্দে দর্শককে গল্পের গভীরে টেনে নেওয়া।

তাঁর মতে, সম্পাদক চলচ্চিত্রের “চতুর্থ চিত্রনাট্যকার” — যিনি পরিচালক ও চিত্রগ্রাহকের পর ক্যামেরায় ধরা বাস্তবকে আবেগে রূপান্তরিত করেন।

তিনি প্রায়ই সম্পাদনা কক্ষে কাজ করেন একান্ত নীরবতায়, যেখানে প্রতিটি কাট, প্রতিটি শট তাঁর কাছে একটি সঙ্গীতের মতো। তাঁর কাজে একটি সংগীতবোধ ও ছন্দের অনুপম সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়, যা বাংলা সিনেমাকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা।

ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে সৃজনশীল যুগলবন্দি

অর্ঘ্যকমল মিত্রের কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল ঋতুপর্ণ ঘোষ-এর সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা। তাঁদের যুগলবন্দি বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।

তিনি ঋতুপর্ণের একাধিক চলচ্চিত্রে সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন — উৎসব, চোখের বালি, শুভ মহরত, অন্তরমহল, সব চরিত্র কাল্পনিক, এবং আবহমান

বিশেষ করে আবহমান (২০১০) ছবির জন্য তাঁর সম্পাদনাকর্ম তাঁকে এনে দেয় ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (National Film Award) – শ্রেষ্ঠ সম্পাদক (Best Editing) সম্মান। এই ছবিতে তিনি সময় ও স্মৃতির মিশ্রণকে এমন নিপুণভাবে বুনেছিলেন যে চলচ্চিত্রটি হয়ে ওঠে এক মনস্তাত্ত্বিক সংগীত।

ঋতুপর্ণ ঘোষ একবার বলেছিলেন,

“Arghya understands silence better than anyone else. He edits emotions, not just images.”

পরিচালক হিসেবে পদার্পণ

সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর অর্ঘ্যকমল মিত্র ২০০৫ সালে “এক মুঠো ছবি” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালনায় অভিষেক করেন। এটি ছিল একটি যৌথ পরিচালনা, যেখানে তিনি ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রভাত রায়ের সঙ্গে মিলিতভাবে কাজ করেন। ছবিটি সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে এবং তাঁর শিল্পদৃষ্টির নতুন দিক উন্মোচিত করে।

বহুমাত্রিক কাজ ও সহযোগিতা

অর্ঘ্যকমল মিত্র কেবল আর্ট ফিল্ম বা মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ নন। তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারি ও বিজ্ঞাপনচিত্রেও কাজ করেছেন। তাঁর সম্পাদনা কাজের পরিধি শহর, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রেম ও মানসিক দ্বন্দ্বের নানান স্তরকে স্পর্শ করে।

তাঁর সহযোগী পরিচালকরা প্রায়ই বলেন, তিনি গল্পের প্রতি এতটাই নিবেদিত থাকেন যে সেটে না থেকেও তিনি “অদৃশ্য সহকারী পরিচালক”-এর ভূমিকা পালন করেন।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (National Film Award, ২০১০)আবহমান চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পাদক

  • একাধিক রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্ম সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার বিশেষ স্বীকৃতি

  • আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতেও তাঁর সম্পাদিত বেশ কিছু চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে (যেমন কায়রো, মন্ট্রিয়াল, টোকিও, কলকাতা ও গোয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব)

 

চলচ্চিত্রপঞ্জি (নির্বাচিত)

১৯৯৭: কাহিনী (মলয় ভট্টাচার্য)
১৯৯৮: দহন (ঋতুপর্ণ ঘোষ)
২০০০: উৎসব, চক্রব্যূহ
২০০১: তিতলি
২০০২: গান্ধবী, দেশ, পারমিতার একদিন
২০০৩: শুভ মহরত, চোখের বালি
২০০৪: জয়যাত্রা, দেবীপক্ষ, তিন এক্কে তিন
২০০৫: অন্তরমহল, এক মুঠো ছবি*
২০০৬: হারবার্ট
২০০৭: কৃষ্ণকান্তের উইল
২০০৮: খেলা
২০০৯: সব চরিত্র কাল্পনিক, আবহমান
২০১০: একটি তারার খোঁজে, হাঁদা ভোঁদা, মহানগর @ কলকাতা, ব্যোমকেশ বক্সী, অন্তিম শ্বাস সুন্দর

* চিহ্নিত ছবি তিনি পরিচালনা করেছেন

উত্তরাধিকার ও প্রভাব

অর্ঘ্যকমল মিত্র কেবল একজন দক্ষ সম্পাদকই নন, তিনি একজন দর্শনশীল গল্পকার, যিনি বিশ্বাস করেন — চলচ্চিত্রের আসল জাদু ঘটে কাঁচা ফুটেজের মধ্যে নয়, বরং সম্পাদনার কক্ষে। তাঁর কাজ বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনেছে, যেখানে সংবেদনশীলতা ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটে পরিপূর্ণ ভারসাম্যে।

আজকের প্রজন্মের অনেক তরুণ সম্পাদক তাঁর কাজ থেকে অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, নিঃশব্দে বসে থেকেও একজন শিল্পী চলচ্চিত্রের হৃদস্পন্দন নির্ধারণ করতে পারেন।

অৰ্ঘকমল মিত্র, চলচ্চিত্র সম্পাদক

 

অর্ঘ্যকমল মিত্র বাংলা চলচ্চিত্রের এক নিঃশব্দ স্থপতি, যাঁর ছোঁয়ায় গল্প পায় নতুন গতি, দৃশ্য পায় নতুন অর্থ, আর দর্শক পায় এক গভীর অনুভবের অভিজ্ঞতা।

তাঁর সম্পাদনা যেন এক নিঃশব্দ কবিতা — যেখানে শব্দ নেই, কিন্তু প্রতিটি কাটে থাকে এক অদৃশ্য ছন্দের স্পন্দন।
তিনি নিঃসন্দেহে সেই অল্পসংখ্যক শিল্পীদের একজন, যাঁরা প্রমাণ করেছেন — “চলচ্চিত্রের আত্মা সম্পাদনায় বাস করে।

 

 

Leave a Comment