অসিতবরণ মুখোপাধ্যায়ের (১৯১৩–১৯৮৪) পুরো নাম Asit Baran Mukherjee। অভিনয়ে তিনি পরিচিত অসিতবরণ নামে, এছাড়াও তাঁর ডাকনাম ছিল “কালো” । দক্ষিণে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তিনি ছিলেন একজন বাংলা চলচ্চিত্র ও মঞ্চ অভিনেতা, গায়ক, তবলা বাদক, এবং সফল থিয়েটার পরিচালক।

সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত
- জন্ম: ১৯ নভেম্বর ১৯১৩, কলকাতা, বৃটিশ ভারত।
- প্রথম জীবন সংগ্রাম: মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হলেও, ১৩ বছর বয়সে মাতৃত্বত্যাগ ও সংসার দেখাশোনার দায়িত্ব। শিক্ষা না শেষ করে তবলা শিল্পী হিসেবে চাকরি (কলকাতা বেতার ও গ্রামোফোন কোম্পানিতে) ।
- মৃত্যু: ২৭ নভেম্বর ১৯৮৪, কলকাতা।

সংগীত ও মঞ্চ
- তবলা শিক্ষাগুরু: জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ
- আলাপ ও প্ল্যাটফর্ম: All India Radio, গ্রামোফোন
- নিয়োগ: প্রথম ঠিকাদার হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ বেতার কেন্দ্রে
- পাইওনিয়ার: প্রথম ‘গায়ক-নায়ক’—New Theatres এর প্রযোজনায় গেয়েছেন ও অভিনয় করেছেন।
- থিয়েটার কাজ: ‘রঙ্গরস’ নামে নিজের নাট্যদল প্রতিষ্ঠা করে নাট্যাভিনয় ও বক্তৃতা—বিশেষত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশব্যাপী সমবেত কীর্তন আয়োজন হয়েছিল।
চলচ্চিত্র কর্মজীবন সংক্ষিপ্তসার
- প্রথম চলচ্চিত্র: প্রতিশ্রুতি (১৯৪১), পরিচালনা: হেমচন্দ্র চন্দ্র — চরিত্র: অরুণ (নায়কের ভাই)।
- প্রথম নায়ক চরিত্র: কাশীনাথ (১৯৪৩), পরিচালনা: নীতিন বসু।
- চলচ্চিত্রে দীর্ঘ ক্যারিয়ার: ১৯৪১–১৯৮৩ পর্যন্ত প্রায় ১৪০টি বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, নায়ক, পার্শ অভিনেতা, চরিত্রশিল্পী—সব ভূমিকাতেই সামিল।
পরিচালকদের সাথে কাজ
অসিতবরণ প্রখ্যাত পরিচালকদের সঙ্গে চিত্রায়িত হয়েছেন, যেমন:
- হেমচন্দ্র চন্দ্র
- নীতিন বসু
- সুবোধ মিত্র
- চিত্ত বসু
- কালীপ্রসাদ ঘোষ
- মৃণাল সেন
- অগ্রদূত
- ও আরও প্রায় ৩০ জন পরিচালক।
নেপথ্য গান ও শিক্ষা
- নেপথ্য গায়ক হিসেবে: প্রতিশ্রুতি (১৯৪১)–এর মাধ্যমে প্রথম; পরবর্তী ‘দৃষ্টিদান’ (১৯৪৮), ‘জাদের’ (১৯৫৪), ‘কথা কও’ (১৯৫৫), ‘পাপ ও পাপী’, ‘রাজপথ’, ‘ধূলার ধরণী’ (সব ১৯৫৬) চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন ।
- গায়ক অভিনয়কার্যে: বাংলা ও হিন্দি উভয় ভাষায় রেকর্ড প্রকাশ, যেমন ‘আমার প্রথম গান তোমাকে শোনাব বলে’।
ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক পটভূমি
- পৈতৃক নিবাস: যশোর, পরিবার: পিতা—তারাপদ, মা—বীণাপাণিদেবী, ভাই—প্রভাতবরণ ও বারিদবরণ, বোন—মায়া।
- বিয়ে: শিরীষচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা রাধারাণী; সন্তান: দুই পুত্র (তিমিরবরণ, রজতবরণ) ও দুই কন্যা (রমা, দীপা)।
- চলন্ত জীবনরত্ন: ঘর, শালার স্মৃতি। সাধারণ পোশাক, শান্ত জীবনধারা, পৌর জীবন-আচরণ—এতে একজন সুদর্শন যাদুকর চিত্র ফুটে ওঠে।
️ পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা
- নিউ থিয়েটার্সের প্রথম ‘গায়ক-নায়ক’ হিসেবে বিশেষ অবদান।
- উত্তম কুমারের বিশ্বাসে: তিনি ছিলেন ‘আদর্শ নায়ক’।
- সিনে–সঙ্গীত ও মঞ্চের সফলতার মিশেল: জনপ্রিয় ছিলেন ‘রঙ্গরস’ প্লে-গ্রুপ দিয়ে নাট্য ও ধর্মগীত পরিবেশনায়।
চলচ্চিত্রপঞ্জি (Filmography)
| সাল | চলচ্চিত্রসমূহ |
| ১৯৪১ | প্রতিশ্রুতি |
| ১৯৪৩ | কাশীনাথ |
| ১৯৪৭ | নার্স সিসি |
| ১৯৪৮ | দৃষ্টিদান |
| ১৯৪৯ | নিরুদ্দেশ |
| ১৯৫০ | সঞ্চালী, সুধার প্রেম, রূপকথা, ইন্দ্রজাল |
| ১৯৫১ | প্রত্যাবর্তন |
| ১৯৫২ | মেঘমুক্তি, কার পাপে, কবি চন্দ্রাবতী |
| ১৯৫৩ | হরিলক্ষ্মী, বৈমানিক, রোশেনারা, রামী চণ্ডীদাস, রাণী, নিষ্কৃতি, ব্লাইন্ড লেন |
| ১৯৫৪ | মন্ত্রশক্তি, জয়দেব |
| ১৯৫৫ | নিষিদ্ধ ফল, রাণী রাসমণি, দত্তক, ছোট বৌ, কথা কও, প্রশ্ন, হ্রদ, ব্রতচারিণী, অর্ধাঙ্গিনী |
| ১৯৫৬ | মহাকবি গিরিশচন্দ্র, মামলার ফল, চলাচল, পাপ ও পাপী, রাজপথ, ফন্তু, মা, দানের মর্যাদা, ধূলার ধরণী, শিল্পী, সিঁথির সিঁদুর |
| ১৯৫৭ | ঘুম, রাত্রিশেষে, পঞ্চতপা, তাপসী, পৃথিবী আমারে চায়, নতুন প্রভাত, পরের ছেলে |
| ১৯৫৮ | প্রিয়া, বন্ধু, মেঘমল্লার, যোগাযোগ, কালামাটি, সূর্যতোরণ |
| ১৯৫৯ | জন্মান্তর, বিভ্রান্ত, আম্রপালী, খেলাঘর, নৃত্যেরই তালে তালে |
| ১৯৬০ | ভয়, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, ইন্দ্রধনু, কোন একদিন, স্মৃতিটুকু থাক, অজানা কাহিনী |
| ১৯৬১ | মা, আশায় বাঁধিনু ঘর, মিথুন লগ্ন, সন্ধ্যারাগ |
| ১৯৬২ | কাচের স্বর্গ, ভগিনী নিবেদিতা, মায়ার সংসার, অভিসারিকা, আমার দেশ |
| ১৯৬৩ | অবশেষে, সৎভাই, আকাশ প্রদীপ, ত্রিধারা, বিনিময়, ন্যায়নণ্ড, পলাতক, সুর্য্যশিখা, বাদশা, শ্রেয়সী |
| ১৯৬৪ | কালস্রোত, অগ্নিকন্যা, সিঁদুরে মেঘ, রাধাকৃষ্ণ, মরুতৃষ্ণা, দুই পর্ব, মহাতীর্থ কালীঘাট |
| ১৯৬৫ | প্রথম প্রেম, পতি সংশোধনী সমিতি, রাজা রামমোহন, গুলমোহর, আলোর পিপাসা, একটুকু বাসা |
| ১৯৬৬ | লবঙ্কুশ, জোড়াদীঘির চৌধুরী পরিবার |
| ১৯৬৭ | দেবীতীর্থ কামরূপ কামাখ্যা, ৮০ তে আসিও না, সেবা, এন্টনী ফিরিঙ্গী, কেদার রাজা |
| ১৯৬৮ | আদ্যাশক্তি মহামায়া |
| ১৯৬৯ | মায়া |
| ১৯৭০ | বিলম্বিত লয়, দুটি মন |
| ১৯৭১ | নিশাচর, শচীমার সংসার, ত্রিনয়নী মা |
| ১৯৭২ | মা ও মাটি, নায়িকার ভূমিকায়, স্থিরপর |
| ১৯৭৪ | ছন্দপতন, যদি জানতেন, হারারে খুঁজি, জন্মভূমি, দাবী |
| ১৯৭৫ | শর্মিলা, সেদিন দুজনে, আমি সে ও সখা, অগ্নীশ্বর, বাঘবন্দী খেলা |
| ১৯৭৬ | হোটেল ছো ফক্স, হারমোনিয়াম |
| ১৯৭৭ | অমৃতের স্বাদ |
| ১৯৭৮ | ময়না |
| ১৯৭৯ | ভাগ্যলিপি |
| ১৯৮০ | গোপাল ভাঁড় |
| ১৯৮১ | খনাবরাহ, সুর্যসাক্ষী, কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী |
| ১৯৮২ | সতী সাবিত্রী সত্যবান, মা ভবানী মা আমার, শ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত |
| ১৯৮৩ | দুটি পাতা, উৎসর্গ |
| ১৯৮৭ | লালন ফকির, মন্দির |
| ১৯৮৮ | বিলে নরেন |
অসিতবরণ বাংলা চলচ্চিত্র ও থিয়েটারের এক মাল্টি–ট্যালেন্টেড প্রতিভা, যিনি তাঁর সুর, অভিনয় ও মঞ্চনাট্যে সূক্ষ্ম ঈর্ষণীয় ভূমিকা রেখেছেন। গায়ক–নায়ক হিসেবে নতুন পথিকৃৎ; নেপথ্য গায়ক ও চরিত্রশিল্পী হিসেবে পরিপ্রেক্ষিত; এবং থিয়েটার পরিচালক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
তিনি ছিলেন নীরব প্রতিভান, যার কর্মদিবস ও সময়ের সাথে সাথে বাংলা বিশ্বে আদর্শ গায়ক ও অভিনেতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করলেন।