কমল নায়েক ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক উল্লেখযোগ্য চিত্রগ্রাহক, যিনি তাঁর ক্যামেরার মাধ্যমে চলচ্চিত্রকে কেবল দৃশ্যায়িত করেননি, বরং ছবির আবহ, মেজাজ এবং দার্শনিক তাৎপর্য ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর কাজ বাংলা সমান্তরাল ধারার সিনেমা এবং জনপ্রিয় বাণিজ্যিক ছবির মধ্যেই এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল।
কমল নায়েক – জীবন ও কর্ম
জন্ম ও শিক্ষা
কমল নায়েকের জন্ম কলকাতায়। প্রথাগত শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ করার পর তিনি চিত্রগ্রহণের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। চলচ্চিত্রকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে তিনি ভর্তি হন ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া (FTII), পুনে-তে। সেখান থেকে ১৯৭০ সালে চিত্রগ্রহণে ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
কর্মজীবনের সূচনা
ডিপ্লোমা সম্পূর্ণ করে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং প্রথমে কিছুদিন সহকারী চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই সময়ে তিনি আলো, ক্যামেরার মুভমেন্ট এবং ফ্রেমের নান্দনিকতা নিয়ে গভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
স্বাধীন চিত্রগ্রাহক হিসেবে তাঁর প্রথম কাজ ছিল চিদানন্দ দাশগুপ্ত পরিচালিত বিলেত ফেরত (১৯৭৩), যেখানে তিনি ধ্রুবজ্যোতি বসুর সঙ্গে যুগ্মভাবে কাজ করেন। এই ছবিই তাঁর শিল্পীসত্তার প্রাথমিক পরিচয় তুলে ধরে।
জাতীয় স্বীকৃতি ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ
কমল নায়েকের সাফল্যের শিখরে পৌঁছনোর পথ শুরু হয়েছিল বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত পরিচালিত নিম অন্নপূর্ণা (১৯৮০) ছবির মাধ্যমে। এই ছবির চিত্রগ্রহণের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক সম্মান লাভ করেন। আলো-অন্ধকারের কাব্যময় ব্যবহারে তিনি এই ছবিতে এক বিশেষ মাত্রা যুক্ত করেছিলেন, যা পরবর্তী কালে তাঁর স্বাক্ষর হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি শুধু বুদ্ধদেব দাশগুপ্তই নন, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের বহু দিকপাল পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- অরুন্ধতী দেবী
- তপন সিংহ
- সরোজ দে
- রাজা মিত্র
- অঞ্জন চৌধুরী
- প্রভাত রায়
তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি সমানভাবে কার্যকর ছিল সাহিত্যনির্ভর কাহিনি, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং বাণিজ্যিক ছবির চাহিদা অনুযায়ী।
বৈশিষ্ট্য
কমল নায়েকের ক্যামেরার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—
- আলো ও ছায়ার কাব্যিক ব্যবহার
- চরিত্রের আবেগ ও মানসিক অবস্থাকে ফ্রেমে প্রতিফলিত করা
- লোকেশন–ভিত্তিক বাস্তবতার সূক্ষ্ম উপস্থাপন
- সমান্তরাল সিনেমার শিল্পগুণ ও বাণিজ্যিক ছবির জনপ্রিয়তার ভারসাম্য রক্ষা
চলচ্চিত্রপঞ্জি (নির্বাচিত)
- ১৯৭৩ – বিলেত ফেরত
- ১৯৮০ – নিম অন্নপূর্ণা
- ১৯৮৩ – অভিনয় নয়, মুক্তির দিন
- ১৯৮৪ – দীপার প্রেম
- ১৯৮৬ – আতঙ্ক, ডাক্তার বৌ, কোনি
- ১৯৮৭ – রাধারাণী
- ১৯৮৮ – অপরাধী, তুমি কত সুন্দর
- ১৯৯০ – মানদণ্ড, একটি জীবন, শেষ আঘাত
- ১৯৯১ – মানব প্রেমিক নিমাই, নবাব, প্রেম পূজারী, সিঁদুর
- ১৯৯২ – ইন্দ্রজিৎ
- ১৯৯৩ – ঈশ্বর পরমেশ্বর, মায়া মমতা, পুরস্কার
- ১৯৯৪ – আব্বাজান, গীত সংগীত
- ১৯৯৫ – কুমারী মা, সেজ বৌ, সংঘর্ষ
- ১৯৯৬ – হিমঘর
- ১৯৯৭ – দানব, একালের কালপুরুষ, যোদ্ধা, মনের মানুষ
- ১৯৯৮ – গঙ্গা
- ১৯৯৯ – সুন্দর বৌ, অগ্নিশিখা
- ২০০০ – কুলাঙ্গার, মধুর মিলন
- ২০০১ – ময়না, জনক জননী
- ২০০৩ – চোর ভগবান, কে আপন কে পর
মূল্যায়ন
কমল নায়েক ছিলেন এমন এক চিত্রগ্রাহক, যিনি তাঁর ক্যামেরার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গল্পকে আরও গভীর ও সমৃদ্ধ করতেন। তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রে ৭০ থেকে ৯০-এর দশকের ভিজ্যুয়াল ভাষার অন্যতম নির্মাতা। সমান্তরাল ও মূলধারার চলচ্চিত্রের মধ্যকার ব্যবধান মুছে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ভালো সিনেমাটোগ্রাফি কেবলমাত্র প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, এটি এক শিল্প, যা দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।