খারিজচলচ্চিত্রটি নিয়ে আমাদের আজকের আলোচনা-মৃণাল সেন পরিচালিত একটি চলচ্চিত্র । এই চলচ্চিত্রটি রমাপদ চৌধুরীর কাহিনী অবলম্বনে ১৯৮২ সালে মুক্তি পেয়েছিল ।
একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের অপ্রাপ্তবয়স্ক চাকর রান্নাঘরের ভিতরে রাত্রে রহস্যজনকভাবে মারা যায় । পুলিশের তদন্ত এবং পোস্টমর্টেম থেকে জানা যায় যে রান্নাঘরের মধ্যে জ্বলন্ত কয়লা থেকে নির্গত কার্বন-মনোক্সাইড থেকে তার মৃত্যু হয়েছে । অপরাধবোধ, পুলিশ কেস এবং লোকলজ্জার ভয়ে তারা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে । শেষ পর্যন্ত তাদের কিছুই হয় না । কিন্তু এই ঘটনা পরিবারটিকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত ও বিবেকের কাছে পরাজিত করে দেয় ।
খারিজ চলচ্চিত্র
- প্রযোজনা – নীলকণ্ঠ ফিল্মস।
- কাহিনি – রমাপদ চৌধুরী।
- চিত্রনাট্য ও পরিচালনা – মৃণাল সেন।
- চিত্রগ্রহণ – কে কে মহাজন।
- সংগীত পরিচালনা – বি ভি করস্থ।
- শিল্প নির্দেশনা — গীত রায়।
- সম্পাদনা — গঙ্গাধর নস্কর।
খারিজ চলচ্চিত্রে যারা অভিনয় করেছেন —
অঞ্জন দত্ত, মমতাশঙ্কর, ইন্দ্রনীল মৈত্র, দেবপ্রতিম দাশগুপ্ত, দেবতোষ ঘোষ, নীলোৎপল দে, শ্রীলা মজুমদার, গীতা সেন, বিমল চট্টোপাধ্যায়।
খারিজ চলচ্চিত্রের কাহিনি—
পালান মেদিনীপুরের কোনো একটি গ্রামের বালক, কলকাতায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের কাজের ছেলে। পরিবারে আছে স্বামী (অঞ্জন), স্ত্রী (মমতা) এবং একটি ছোট সন্তান। কাজের ছেলে হিসাবে পালান খাওয়া, পরা এবং মাইনে পেত, ঐ পরিবারের কেউ একদিকে যেমন তার সাথে খারাপ ব্যবহার করত না, আবার তেমনি অন্যদিকে পালানের সাথে মানসিক সংযোগের কোনো চেষ্টাও তাদের দিক থেকে ছিল না।
পালান রান্নাঘরে ঘুমাত, একদিন দরজা বন্ধ করে ঘুমন্ত অবস্থায় পালান মারা যায়। জানা যায় যে শীতের জন্য উনুনে আগুন ছিল এবং বদ্ধ ঘরে কার্বন মনো অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে পালানের মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের স্বামী-স্ত্রী এবং ঐ বাড়ির বাড়িওয়ালা আতঙ্কিত হয় পুলিসের ভয়ে, পালানের আত্মীয় স্বজনদের ভয়ে, সর্বোপরি নিজেদের বিবেকের কাছে তারা অপরাধী। পালানের বাবা আসেন ছেলের অন্ত্যেষ্টি করতে, কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি সবাইকে নমস্কার করে বিদায় নেন।
মধ্যবিত্ত তথাকথিত ভদ্রলোক এমনকী সেই মানুষরা যদি প্রগতিশীল আন্দোলনের কর্মীও হয়ে থাকেন তাও তারা তাদের বাড়িতে কাজের লোকেদের সাথে কোনো মানবিক সম্পর্ক স্থাপন করেন না, সর্বত্রই তাদের নিম্ন শ্রেণির মানুষ হিসাবেই গণ্য করা হয়।
নিজের শ্রেণির মানুষকে, অপেক্ষাকৃত নিম্ন আয়ের মানুষদের একটু সহানুভূতির সাথে দেখা ও তাদের সাথে কিছুটা মানবিক সংযোগ গড়ে তোলা দরকার, এটা পরিচালক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

পুরস্কার —
১৯৮২ সালে নির্মিত ২য় সেরা ছবি হিসাবে ভারতের রাষ্ট্রপতির জাতীয় সম্মানের পাশাপাশি বাংলা ভাষায় নির্মিত সেরা ছবির জন্য পুরস্কৃত হয়। শিল্প নির্দেশক হিসাবে নীতীশ রায় এবং সেরা চিত্রনাট্যকার হিসাবে মৃণাল সেন সম্মানিত হন। ছবিটি ১৯৮৩ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার, শিকাগো চলচ্চিত্র উৎসবে ১৯৮৩ সালে রোজ হুগো পুরস্কার এবং ভ্যালাডাইড চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন স্পাইক লাভ করে।
