গীতালি রায়

গীতালি রায় ছিলেন একাধারে কোমল, সংযত ও বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থিতির অধিকারী এক প্রতিভাবান বাঙালি চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। ১৯৬০-এর দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগে তিনি তাঁর সূক্ষ্ম অভিনয়, সংবেদনশীল চোখের ভাষা, এবং প্রাঞ্জল অভিব্যক্তির মাধ্যমে দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। যদিও তাঁর চলচ্চিত্রজীবন তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, তবুও গীতালি রায় বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক সুধী, অনন্য নাম হয়ে আছেন।

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা

গীতালি রায়ের জন্ম কলকাতায়, এক সুশিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে। তাঁর শৈশব কেটেছে সাহিত্য, সঙ্গীত ও নাটকের পরিবেশে। অল্প বয়স থেকেই তিনি নাট্যচর্চায় আগ্রহী ছিলেন, এবং স্কুলজীবনে নাটকে অংশগ্রহণ করে শিক্ষক ও দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করেন। তিনি ম্যাট্রিক পর্যন্ত প্রথাগত শিক্ষা গ্রহণ করেন, কিন্তু অভিনয়ের প্রতি টানই তাঁকে পরবর্তীতে চলচ্চিত্র জগতে নিয়ে আসে।

সেসময়ের কলকাতার বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নারীদের চলচ্চিত্রে কাজ করা সহজ ছিল না। তবুও গীতালি নিজের প্রতিভা, সাহস ও নিষ্ঠার মাধ্যমে একান্ত পরিশ্রমে জায়গা করে নিয়েছিলেন চলচ্চিত্রের পর্দায়।

চলচ্চিত্রে অভিষেক ও ক্যারিয়ারের সূচনা

গীতালি রায়ের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে খ্যাতনামা পরিচালক মৃণাল সেন-এর পুনশ্চ (১৯৬১) ছবির মাধ্যমে। এই ছবিতেই তিনি প্রথমবারের মতো নজর কাড়েন দর্শক ও সমালোচকদের কাছে। তাঁর অভিনয়ের ভঙ্গি ছিল স্বাভাবিক, সংলাপ ছিল সংযত, এবং আবেগপ্রকাশে ছিল এক ধরনের শুদ্ধতা — যা তাঁকে সমসাময়িক অভিনেত্রীদের মধ্যে আলাদা করে তোলে।

অল্প সময়ের মধ্যেই গীতালি রায়ের প্রতিভা নজরে আসে সত্যজিৎ রায়-এর। এরপর তিনি তাঁর চারটি বিখ্যাত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন — চারুলতা (১৯৬৪), মহানগর (১৯৬৩), মহাপুরুষ (১৯৬৫), এবং চিড়িয়াখানা (১৯৬৭)।

চারুলতা চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল সংযমী অথচ গভীর। সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরা তাঁর মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি ধরে রেখেছিল এমনভাবে, যা আজও স্মরণীয়। তিনি এমনভাবে নিজেকে চরিত্রের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতেন যে দর্শক প্রায় ভুলে যেতেন তিনি একজন অভিনেত্রী — মনে হতো, চরিত্রটি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

বৈচিত্র্যময় চলচ্চিত্রজীবন

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের পাশাপাশি গীতালি রায় অভিনয় করেছেন আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ছবিতে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে — বাক্সবদল (১৯৭০), যা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত; রাজকন্যা (১৯৬৫), শিউলিবাড়ি (১৯৬২), সূর্যতপা (১৯৬৫), শেষ তিন দিন (১৯৬৬), গৃহদাহ (১৯৬৭), অশ্রু দিয়ে লেখা (১৯৬৬), এবং নিশাচর (১৯৭১)।

এই সময় তিনি ছিলেন এক ব্যস্ত শিল্পী — প্রায় প্রতি বছরই একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। তাঁর চরিত্রগুলো ছিল নানা রকমের — কখনও আধুনিক শহুরে নারী, কখনও মফস্বলের স্নেহময়ী গৃহবধূ, আবার কখনও রহস্যময় আবহে ঘেরা সংবেদনশীল নারীচরিত্র। প্রতিটি ভূমিকায় তিনি নিয়ে এসেছিলেন বাস্তবতার ছোঁয়া ও মননশীলতার প্রকাশ।

অভিনয়শৈলী ও শিল্পভাবনা

গীতালি রায়ের অভিনয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সংযম ও সূক্ষ্মতা। তিনি কখনো অতিরঞ্জিত আবেগে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর মুখের অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা এবং কণ্ঠের মৃদু ওঠানামা দিয়েই তিনি চরিত্রের গভীরতা প্রকাশ করতেন।

তাঁর সহ-অভিনেতা ও সমসাময়িক চলচ্চিত্রকর্মীরা প্রায়ই উল্লেখ করেছেন যে, গীতালি রায় সেটে খুব মনোযোগী ও প্রস্তুত থাকতেন। তিনি পরিচালককে মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, এবং চরিত্রের পেছনের মনস্তত্ত্ব বুঝে অভিনয় করতেন।

তাঁর অভিনয়ে এক ধরনের নীরব তীব্রতা ছিল, যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করত। সত্যজিৎ রায় নিজেও এক সাক্ষাৎকারে গীতালির অভিনয়ের প্রশংসা করে বলেছিলেন,

“She had a rare understanding of silence on screen — her eyes could say what words often failed to.”

ব্যক্তিগত জীবন

চলচ্চিত্র জগতে কাজ করতে গিয়ে গীতালি রায়ের পরিচয় হয় পরিচালক সলিল দত্ত-এর সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া থেকে জন্ম নেয় এক সুন্দর সম্পর্ক, যা পরবর্তীতে বিবাহে রূপ নেয়। তাঁদের সম্পর্ক তখনকার চলচ্চিত্র মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

যদিও গীতালি বিবাহের পর কিছুটা দূরে সরে যান চলচ্চিত্র থেকে, তবে অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো নিভে যায়নি। পরবর্তীকালে তিনি নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়।

চলচ্চিত্রপঞ্জি (নির্বাচিত)

  • পুনশ্চ (১৯৬১) – মৃণাল সেন

  • শিউলিবাড়ি (১৯৬২)

  • বর্ণালী (১৯৬৩)

  • চারুলতা (১৯৬৪) – সত্যজিৎ রায়

  • বাক্সবদল (১৯৬৫) – নিত্যনন্দ দত্ত

  • রাজকন্যা (১৯৬৫)

  • মহাপুরুষ (১৯৬৫) – সত্যজিৎ রায়

  • সূর্যতপা (১৯৬৫)

  • শেষ তিন দিন (১৯৬৬)

  • অশ্রু দিয়ে লেখা (১৯৬৬)

  • গৃহদাহ (১৯৬৭)

  • চিড়িয়াখানা (১৯৬৭) – সত্যজিৎ রায়

  • হঠাৎ দেখা (১৯৬৭)

  • প্রস্তর স্বাক্ষর (১৯৬৭)

  • নিশাচর (১৯৭১)

 

 

যদিও গীতালি রায় খুব বেশি সংখ্যক চলচ্চিত্রে কাজ করেননি, তবুও তাঁর প্রতিটি কাজ ছিল মানসম্পন্ন এবং দর্শক-সমালোচক উভয়ের কাছেই প্রশংসিত। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি তাঁদের কাতারেই থাকবেন, যারা কম সংখ্যক কাজ করেও মান ও মর্যাদায় নিজেদের স্থান অমর করে রেখেছেন।

আজকের প্রজন্ম হয়তো তাঁকে খুব বেশি চেনে না, কিন্তু তাঁর অভিনীত চারুলতা, মহাপুরুষ বা চিড়িয়াখানা-র মতো কালজয়ী ছবিগুলোতে তাঁর উপস্থিতি এখনো সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি ছিলেন এক অনালোচিত রত্ন — বাংলা চলচ্চিত্রের সেই নীরব, দীপ্ত মুখ, যাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে আজও গেঁথে আছে।

Leave a Comment