চরাচর চলচ্চিত্র

চরাচর — বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কাব্যিক ও দার্শনিক চলচ্চিত্র—বাংলা সিনেমার এক অনন্য সৃষ্টি, যেখানে মানুষ, পাখি, প্রকৃতি এবং অস্তিত্বের সীমারেখা এক হয়ে গেছে। ১৯৯৩ সালে নির্মিত এই ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের নবজাগরণ ধারার এক শীর্ষস্থানীয় নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।

 

চরাচর চলচ্চিত্র । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান

চরাচর চলচ্চিত্র

 

প্রযোজনা ও নির্মাণ দল

  • প্রযোজনা: শঙ্কর গোপ, গীতা গোপ

  • কাহিনি: প্রফুল্ল রায়

  • চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

  • চিত্রগ্রহণ: সৌমেন্দু রায়

  • সংগীত: বিশ্বদেব দাশগুপ্ত

  • শিল্প নির্দেশনা: শতদল মিত্র

  • শব্দগ্রহণ: জ্যোতি চট্টোপাধ্যায়

  • সম্পাদনা: উজ্জ্বল নন্দী

 

অভিনয় শিল্পী

  • রজত কাপুর — লখীন্দর

  • লাবণী সরকার — সারী

  • সাধু মেহের — ভূষণ

  • ইন্দ্রাণী হালদার — গৌরী

  • মনোজ মিত্র — সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠ

  • শঙ্কর চক্রবর্তী — নটবর

 

 

কাহিনি সংক্ষেপ ও দার্শনিক তাৎপর্য

‘চরাচর’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র লখীন্দর (রজত কাপুর) — এক পাখিধরা মানুষ, যার জীবিকা পাখি শিকার করে বিক্রি করা, কিন্তু আত্মা পাখির মুক্তির সঙ্গে একাত্ম। পুরুষানুক্রমে পাখি ধরা তার বংশগত পেশা, কিন্তু লখীন্দর তার ভিতরে এক ব্যতিক্রমী সত্তা — সে পাখিদের কষ্টে নিজেকে অপরাধী মনে করে।

তার একমাত্র সন্তান নিতাই-এর মৃত্যুর পর লখীন্দরের ভিতরে মানুষের জগতের প্রতি বিরাগ জন্মে, আর পাখিদের প্রতি মমতা আরও গভীর হয়। স্ত্রী সারী (লাবণী) এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন সহ্য করতে না পেরে নটবর (শঙ্কর)-এর সঙ্গে চলে যায়। লখীন্দর তাকে আটকায় না—বরং মেনে নেয় জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ হিসেবে।

লখীন্দরের জীবনের একমাত্র আলোর ঝলক আসে তার সহচর ভূষণ (সাধু মেহের) এবং ভূষণের কন্যা গৌরী (ইন্দ্রাণী হালদার)-এর সান্নিধ্যে। গৌরী লখীন্দরকে ভালোবাসে, কিন্তু লখীন্দরের মন বন্দী হয়ে থাকে পাখিদের জগতে। সে ধীরে ধীরে সমাজ থেকে, মানবিক সম্পর্ক থেকে সরে গিয়ে “চরাচর”—অর্থাৎ জীবিত ও অজীব জগতের এক সামগ্রিক চেতনার সঙ্গে মিশে যায়।

চলচ্চিত্রটি শেষ হয় এক কাব্যিক ও প্রতীকী পরিণতিতে, যেখানে লখীন্দর যেন মানুষ নয়, বরং প্রকৃতির এক অংশ হয়ে ওঠে—এক মুক্ত পাখির মতো।

 

google news , গুগল নিউজ
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

চিত্রগ্রহণ ও দৃশ্যনন্দনতা

চলচ্চিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন সৌমেন্দু রায়, যিনি সত্যজিৎ রায়ের দীর্ঘদিনের সহযোগী ছিলেন। তাঁর ক্যামেরা এখানে এক আলাদা ভাষা তৈরি করেছে —

  • ধূসর মাটির রঙ,

  • নিস্তব্ধ নদীর বুকে প্রতিফলিত পাখির ছায়া,

  • আর ধীরে বয়ে যাওয়া গ্রামীণ জীবনের ছন্দ — সবকিছুই এক কবিতার মতো।

প্রকৃতি এখানে কেবল পটভূমি নয়, বরং এক প্রধান চরিত্র, যার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনও মায়াময়, কখনও দ্বন্দ্বপূর্ণ।

সংগীত ও শব্দনকশা

সংগীত পরিচালনা করেছেন বিশ্বদেব দাশগুপ্ত, যিনি পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ভাই। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক অত্যন্ত সংযত, প্রায় নিঃশব্দের মতো।
পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ, নৌকার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ—সবই এখানে সংগীতের উপাদান। এই সংযমই চলচ্চিত্রটিকে দেয় এক ধ্যানমগ্ন আবহ।

দার্শনিক ও সাহিত্যিক ব্যঞ্জনা

‘চরাচর’ কেবল একটি গল্প নয় — এটি মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের এক গভীর ধ্যান।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত প্রফুল্ল রায়ের গল্পকে ব্যবহার করেছেন এক অস্তিত্ববাদী কবিতা হিসেবে, যেখানে মানুষ পেশা ও প্রবৃত্তির, প্রেম ও পাপের, মানবতা ও বন্যতার দ্বন্দ্বে দুলে ওঠে।

এখানে লখীন্দর কেবল এক পাখিধরা নয় — তিনি মানব অস্তিত্বের প্রতীক, যিনি পাপ ও পুণ্যের সীমানা অতিক্রম করে এক মুক্ত আকাশের সন্ধান করেন।

পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

‘চরাচর’ মুক্তির পরই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়।

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩):
    শ্রেষ্ঠ কাহিনিচিত্র (Best Feature Film)

  • বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (১৯৯৪):
    Golden Bear Award লাভ করে, যা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যায়।

এই চলচ্চিত্রের পর বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে সমালোচকরা “কবিতার পরিচালক” (Poet of Cinema) বলে অভিহিত করতে শুরু করেন।

প্রেক্ষাপট ও প্রভাব

‘চরাচর’-এর সময়কাল ছিল এমন এক পর্ব, যখন ভারতীয় চলচ্চিত্রে বাস্তববাদ ও শিল্পনন্দনতার নতুন সংলাপ শুরু হচ্ছিল।
একদিকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের যুগ, অন্যদিকে গ্রামীণ জীবনের বিচ্ছিন্নতা—এই দুই মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ‘চরাচর’ মানুষের অন্তর্লোকের গল্প বলে।

পরবর্তীতে এই চলচ্চিত্র প্রভাব ফেলেছিল গৌতম ঘোষ, অপর্ণা সেন, এবং সঞ্জয় নাগ প্রমুখ পরিচালকদের কাজেও।

চরাচর: অর্থ ও প্রতীক

“চরাচর” শব্দটির আক্ষরিক অর্থ — জীবজগৎ ও অজীবজগৎ মিলিত যে বিশ্ব। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এই শব্দকে ব্যবহার করেছেন অস্তিত্বের সার্বিক সমন্বয় বোঝাতে। পাখি, মানুষ, গাছ, নদী—সবই এখানে এক জীবনের স্রোতে যুক্ত। চলচ্চিত্রের প্রতিটি দৃশ্য যেন একটি চিত্রকবিতা, প্রতিটি নীরবতা যেন একটি প্রশ্ন—
মানুষের স্বাধীনতা কোথায় শেষ হয়, এবং প্রকৃতির স্বাধীনতা কোথা থেকে শুরু?

সমালোচনামূলক গ্রহণযোগ্যতা

চলচ্চিত্র সমালোচক চিদানন্দ দাসগুপ্ত লিখেছিলেন—

“চরাচর আমাদের শেখায়, সিনেমা কেবল গল্প নয়; এটি এক ধ্যান, এক কবিতা, এক অন্তর্জগৎ।”

আন্তর্জাতিক সমালোচকরা ছবিটিকে তুলনা করেছিলেন আন্দ্রেই তারকোভস্কির ‘Mirror’ এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-এর সঙ্গে—
কারণ তিনটিতেই মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কের অন্তর্গত বোধ একই গভীরতায় প্রকাশ পেয়েছে।

‘চরাচর’ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অমর ধ্রুপদী সৃষ্টি — যেখানে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একদিকে গল্প বলেছেন, অন্যদিকে সৃষ্টি করেছেন এক চিরন্তন দৃশ্যকাব্য। এটি এমন এক চলচ্চিত্র, যা কেবল দেখা নয়, অনুভব করার; এমন এক কবিতা, যা পাখির ডাকে, বাতাসের সুরে, আর মানুষের নিঃসঙ্গতায় প্রতিধ্বনিত হয়।

“চরাচর আমাদের শেখায় — মানুষ প্রকৃতি থেকে আলাদা নয়,
বরং প্রকৃতিরই এক ক্ষণস্থায়ী প্রতিধ্বনি।”

Leave a Comment