চিরকুমার সভা চলচ্চিত্র (১৯৫৬)

চিরকুমার সভা একটি হাস্যরসাত্মক বাংলা চলচ্চিত্র যা ১৯৫৬ সালের এপ্রিল মাসে দীলিপ পিকচার্স ব্যানারে মুক্তি পায়৷ এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একই নামে নাটক অবলম্বনে নির্মিত, এবং দেবকী কুমার বসু (দেবকী বসু) পরিচালনা করেন। নির্ভুল ভাবনায় এটি শাস্ত্রীয় উপন্যাস থেকে পর্দায় উত্তোলনের একটি দৃষ্টান্ত।

চিরকুমার সভা চলচ্চিত্র । বাংলা চলচ্চিত্রের অভিধান

 

চিরকুমার সভা চলচ্চিত্র

 

প্রযোজনা ও কলাকুশলী

  • পরিচালনা: দেবকী বসু—যিনি বাংলা ও ভারতীয় সিনেমার এক দূরদর্শী পরিচালক ছিলেন, যে প্রথম সার্থক সবাক চলচ্চিত্র ও শব্দ–সঙ্গীত সংযোজনের পথপ্রদর্শক।
  • প্রযোজনা স্টুডিও: দীলিপ পিকচার্স (নিউ থিয়েটার্সের সহযোগী প্রযোজনা স্টুডিও)।
  • গীতিকার: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—তাঁর নাট্য রচনায় গানও অন্তর্ভুক্ত, পুরো রবীন্দ্রক থিয়েটারের গান চলচ্চিত্রে চিত্রায়িত হয়।
  • সংগীত পরিচালনা: সন্তোষ সেনগুপ্ত (Santosh Sengupta)।
  • চিত্রনায়ক: বিভূতি চক্রবর্তী হয়নি, বরং চিত্রগ্রহণ ও কাজে ছিল নীতিন বসু / বিষু চক্রবর্তী (বিভিন্ন সূত্রে)।
  • সম্পাদনা: গোবর্ধন অধিকারী; শব্দগ্রহণ: মুকুল বসু; শিল্পনির্দেশনা: পুলিন ঘোষ ও গোপি সেন।

 

পূর্ণাঙ্গ কাস্ট

চলচ্চিত্রে উপস্থিত ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সুপরিচিত অনেক শিল্পী:
উত্তম কুমার, অনিতা গুহ, অহীন্দ্র চৌধুরী, অজিত চ্যাটার্জী, জহর রায়, জীবন বোস, অপর্ণা দেবী, ভারতী দেবী, তুলসী চক্রবর্তী, জহর গাঙ্গুলি, তপতী ঘোষ, নীতীশ মুখোপাধ্যায়, শোভা সেন ও যমুনা সিনহা ইত্যাদি।

সহযোগী চরিত্রে ছিলেন: জিবেন বোস, জাহার গাঙ্গুলি, জাহার রায়, ঝামুনা সিনহা, ভারতী দেবী, আপর্ণা দেবী, তুলসী চক্রবর্তী, তপতী ঘোষ, নীতীশ মুখোপাধ্যায়, জিবেন বোস, দিঘীন বর্মা, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, দুর্গাদাস, ইন্দু মুখোপাধ্যায়, নিভাননী দেবী ইত্যাদিG

 

কাহিনি ও থিম

চিরকুমার সভার মূলে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামাজিক-হাস্যরসাত্মক নাটক, যেখানে কয়েকজন অবিবাহিত পুরুষ এক সভা গড়ে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে বিবাহবর্জন ও দেশোদ্ধার চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করেন। প্রধান চরিত্ররা হল:

  • চন্দ্রবাবু (অমর মল্লিক): সভার সভাপতি ও কলেজ অধ্যাপক;
  • পূর্ণ (দুর্গাদাস): গোপনে নির্মলাকে (মলিনা দেবী) ভালোবাসে;
  • শ্রীশ (ইন্দু মুখোপাধ্যায়) ও বিপিন (ফণি বর্মা): অন্যান্য সদস্য;
  • নির্মলা অংশ নেয় সভায়;
  • অক্ষয় (চাণী দত্ত): এককালীন সদস্য, বিবাহিত;
  • তিনভাইবোন—শৈলবালা, নীরবালাওনৃপবালা;
  • রসিক (মনোরঞ্জন): কৌতুকপ্রিয় চরিত্র।

 

বাস্তবায়ন অনুসারে:

অক্ষয় নিজের শৈলবালা—নরী শক্তিশালী নারী হিসেবে সভায় অন্তর্ভুক্ত করে; শেষে শীর্ষ সভাসভার অবসান ঘটে বিপিন–শ্রীশ–পূর্ণ ও মহিলা চরিত্রদের মিলনের মধ্য দিয়ে—যা এক সামাজিক ও বাণিজ্যিক বন্ধনের প্রতীক।

 

উৎপত্তি ও পুনর্নির্মাণ

চিরকুমার সভা প্রথমবার ১৯৩২ সালে প্রেমঙ্কুর অট্টরী পরিচালনায় নির্মিত হয়, সংগীত রইল R.C. Boral এর ও পরিচালনায় New Theatres থেকে। ১৯৫৬ সালের এই সংস্করণ মূল গল্পের চরিত্র পালন করে, কিন্তু তর্কাতীত ভাবে আধুনিক স্টাইল ও চলচ্চিত্রীয় বিন্যাসে ভিন্নতার ছাপ রেখেছে।

 

মুক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা

চলচ্চিত্রটি ভারতের বিভিন্ন গ্যালারিতে নিয়মিতভাবে প্রদর্শিত হয়—বিশেষ করে ১৪ এপ্রিল ১৯৫৬ নতুন এম্পায়ার, উত্তরা ও প্রাচী প্রেক্ষাগৃহে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পায়।
বক্স অফিসে এটি সাধারণ দর্শক সমাদর না পেলেও—with moderate commercial reception—it received সমালোচকদের প্রশংসা প্রধানত হাস্যরস, চিত্রনাট্য ও অভিনয়ের কারণে। আজও প্রখ্যাত বাংলা কমেডি ফিল্ম হিসেবে স্মরণীয়।

 

অপূর্ব অভিনেতা ও অভিনয়শৈলী

উত্তম কুমার এই ছবিতে সেন্ট্রাল চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যেখানে তাঁর দ্রুত রি‍অ্যাকশন, হাস্যরসাত্মক টাইমিং ও পরিস্কার সংলাপ অভিনেতার ভ্রাম্যমাণ উপস্থিতিকে জীবন্ত করে তোলে।

অনিতা গুহ নির্মলার চরিত্রে প্রামাণিকতা ও কোমলতা এনে দিয়েছেন; অপরদিকে অহীন্দ্র চৌধুরী ও অজিত চ্যাটার্জীর মতো অভিনেতার উপস্থিতি দৃশ্যগুলিতে স্ট্যাবিলিটি ও ভারসাম্য রেখে তোলে।

সহযোগী শিল্পীরা যেমন জিবেন বোস, তপতী ঘোষ, জাহর রায় ও তুলসী চক্রবর্তী—কমেডি ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দুইয়ে সমান অংশ রাখেন, যা পুরো নান্দনিকতা নিশ্চিত করে।

 

সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

  • এটিবাংলাচলচ্চিত্রেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম নাটক-চলচ্চিত্র রূপান্তর নয়; তবে এটি ছিল প্রথম সার্থক ‘হাসির বাংলা রবীন্দ্রনাথ’—যেখানে থ্যামসাঁতার ও ক্লাসিক সাহিত্যের সংমিশ্রণ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
  • পরিচালকদেবকীবসুনিজেইবাংলাওভারতীয়সিনেমায়শব্দওসঙ্গীতেরআধুনিকসংমিশ্রণশুরুকরেছিলেন।তাঁরপরিচালনায় ‘চণ্ডীদাস’, ‘সীতা’, ‘সাগরসঙ্গমে’ ইত্যাদিশ্রেষ্ঠবাংলা–হিন্দিচলচ্চিত্রেরঅংশছিলযাআন্তর্জাতিকস্তরেস্বীকৃত।
  • ‘চিরকুমারসভা’ দণ্ডায়মানইছিলনিউথিয়েটার্সেরএকটিদরদীপুনরুজ্জীবন১৯৫০-এরদশকে, যদিওএইদশকেস্টুডিওরপরিসরসংকুচিতহয়েগিয়েছিল।

 

সমালোচনা ও উত্তরাধিকার

চলচ্চিত্রটি যদিও ব্যতিক্রমী গল্প ও বিশিষ্ট অভিনয় উপহার দিলেও—দর্শক আকারে হয়তো তেমন সাফল্য লাভ করেনি। তবুও সমালোচকরাও প্রশংসা করেছেন—বিশেষত সঙ্গীত, নাট্যরূপান্তর ও রসাত্মক টোনের জন্য।

এই চলচ্চিত্রটি পরবর্তীতে “সেরা ভাষ্য” কিংবা “সেরা কমেডি” বিভাগে প্রতিপন্ন হয়নি, যদিও দর্শকের নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে এর জনপ্রিয়তা ছিল উল্লেখযোগ্য।
দেবকী বসুর চলচ্চিত্র পঞ্জিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে—যেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন দার্শনিক ও হাস্যরসের সঙ্গম ঘটাতে পারেন।

 

Google News চিরকুমার সভা চলচ্চিত্র (১৯৫৬)
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

চিরকুমার সভা (১৯৫৬)” বাংলা সিনেমার জন্য একটি সাংস্কৃতিক সম্পদযেখানে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, দেবকী বসুর পরিচালনাযোগ্য দর্শন, উত্তম কুমারের অভিনয় প্রতিভা এবং বাংলা বিনোদন দর্শকের তুলনাহীন সংশ্রবিত হয়েছে। এটি শুধুমাত্র একটিহাসির চলচ্চিত্রনয়, বরং সামাজিক রূপান্তর, মানবীয় সম্পর্ক সাংস্কৃতিক চেতনাকে প্রেক্ষাপটে রেখে নির্মিত। যদিও বাণিজ্যিকভাবে বড় সাফল্য না পেলেএর সমালোচনামূলক মূল্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার উজ্জ্বল অম্লান।

Leave a Comment