জি. কে. মেহতা (G. K. Mehta) ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের এক বিশিষ্ট ও প্রভাবশালী চিত্রগ্রাহক (Cinematographer), যিনি ১৯৪০ থেকে ১৯৬০-এর দশকের মধ্যে বাংলা, হিন্দি ও দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক অনন্য ছাপ রেখে গেছেন। আলো, ছায়া ও ফ্রেমের সূক্ষ্ম সংমিশ্রণে তিনি যে নান্দনিকতা সৃষ্টি করেছিলেন, তা আজও ভারতীয় সিনেমার প্রারম্ভিক যুগের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

জি কে মেহতা
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
জি. কে. মেহতার জন্ম অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্গত লাহোরে। তাঁর পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা। শৈশব থেকেই বিজ্ঞান ও শিল্প—উভয়ের প্রতিই তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। তিনি বিজ্ঞানের স্নাতক (B.Sc) ডিগ্রি অর্জন করেন, এবং পরবর্তীতে ডাক্তারি পড়া শুরু করেন।
তবে মেডিক্যাল পড়াশোনার মাঝপথেই তিনি অনুভব করেন, তাঁর আসল আগ্রহ “মানবদেহের অঙ্গসংস্থান” নয়, বরং “আলো ও দৃশ্যের গঠনশৈলী”তে। সেই কারণেই তিনি চিকিৎসাবিদ্যার পাঠ অসম্পূর্ণ রেখেই চলচ্চিত্র শিল্পে আত্মনিয়োগ করেন।

হলিউডে শিক্ষানবিশ: ক্যামেরার পেছনে নতুন দিগন্ত
চলচ্চিত্রে যোগদানের আগে তিনি পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য পাড়ি দেন হলিউডে, যেখানে কিছুদিন তিনি শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন। সে সময় হলিউড ছিল প্রযুক্তি, চিত্রগ্রহণ ও আলোক ব্যবস্থার এক শিক্ষাকেন্দ্র।
এই অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তা ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পরিবর্তন আনে। আলো, ছায়া, লেন্সের নির্বাচন, ক্যামেরা মুভমেন্ট—সব ক্ষেত্রেই তিনি আমেরিকান চলচ্চিত্রের আধুনিক পদ্ধতি আত্মস্থ করেন, যা পরবর্তীতে তাঁর ভারতীয় কাজগুলোতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে।
চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ: বাংলা ও হিন্দি সিনেমার সেতুবন্ধন
হলিউডে প্রশিক্ষণ শেষে জি. কে. মেহতা কলকাতায় ফিরে আসেন, যেখানে তখন ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক নবজাগরণ পর্ব চলছে। তিনি প্রথমে কিছু হিন্দি চলচ্চিত্রে চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ শুরু করেন, কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা চলচ্চিত্রের সৃষ্টিশীল পরিবেশে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করেন।
তাঁর প্রথম বাংলা ছবি ছিল “প্রতিশোধ” (১৯৪১) — ফিল্ম কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া প্রযোজিত এবং সুশীল মজুমদার পরিচালিত। এই চলচ্চিত্রেই প্রথমবার তাঁর ক্যামেরার দক্ষতা ও নান্দনিক বোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
কর্মজীবন ও চলচ্চিত্রে অবদান
পরবর্তী দুই দশকে জি. কে. মেহতা একাধিক খ্যাতিমান পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেন, যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
হিরণ্ময় সেন, মধু বসু, হেমেন গুপ্ত, নীরেন লাহিড়ী, সতীশ দাশগুপ্ত, নরেশ মিত্র, হরিদাস ভট্টাচার্য প্রমুখ।
তাঁর ক্যামেরা কেবল দৃশ্যধারণ করত না — বরং গল্পের ভেতরে থাকা আবেগ, উত্তেজনা ও প্রতীকার্থকে চিত্ররূপ দিত।
তাঁর সিনেমাটোগ্রাফিতে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় ছিল:
ছায়া ও আলোর মনস্তাত্ত্বিক ব্যবহার,
চরিত্রের অভিব্যক্তিকে প্রতিফলিত করে এমন ক্যামেরা কোণ,
প্রাকৃতিক আলোয় শুটিংয়ের প্রতি ঝোঁক,
ও সাদাকালো চলচ্চিত্রে “টেক্সচার”-এর গভীরতা।
১৯৪০ থেকে ১৯৬০ দশক পর্যন্ত ভারতীয় সিনেমার প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও শৈল্পিক বিবর্তনের অন্যতম সাক্ষী ছিলেন তিনি।
মাদ্রাজে কর্মজীবনের বিস্তার
কলকাতায় দীর্ঘদিন কাজ করার পর তিনি মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই)-এর একটি স্টুডিওতে যোগ দেন, যেখানে তিনি পরিস্ফুটনকর্ম (Processing & Developing Department)-এর ভারপ্রাপ্ত হন। সেখানে তিনি চলচ্চিত্র প্রক্রিয়াকরণ, রঙ প্রক্ষেপণ, এবং ল্যাব টেকনোলজির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এই সময় তিনি দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পেও প্রভাব ফেলেন, বিশেষ করে আলোকসজ্জা ও ক্যামেরা টেকনিকের আধুনিকীকরণে।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রসমূহ (Filmography)
| সাল | চলচ্চিত্রের নাম | মন্তব্য / পরিচালক |
|---|---|---|
| ১৯৪১ | প্রতিশোধ | পরিচালনা: সুশীল মজুমদার |
| ১৯৪৭ | বর্মার পথে | যুদ্ধ-ভিত্তিক চলচ্চিত্র |
| ১৯৪৮ | নারীর রূপ | সামাজিক নাট্যধর্মী ছবি |
| ১৯৪৯ | নিরুদ্দেশ | রোমাঞ্চধর্মী |
| ১৯৫০ | মাইকেল মধুসূদন | জীবনীমূলক ঐতিহাসিক |
| ১৯৫১ | নিয়তি, বিয়াল্লিশ | দেশপ্রেম ও মানবিক দ্বন্দ্বের ছবি |
| ১৯৫২ | পাশের বাড়ী | নাগরিক সম্পর্কনির্ভর |
| ১৯৫৩ | শেষের কবিতা | রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস অবলম্বনে |
| ১৯৫৪ | নববিধান | সামাজিক চলচ্চিত্র |
| ১৯৫৫ | দেবত্র, দুর্লভ জন্ম, বীর হাম্বীর, শ্রীকৃষ্ণ সুদামা | ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক ঘরানার ছবি |
| ১৯৫৬ | আশা, গোবিন্দদাস, মা, শুভলগ্ন | পারিবারিক ও আধ্যাত্মিক |
| ১৯৫৭ | উল্কা, আঁধারে আলো | রহস্য ও রোমান্টিক |
| ১৯৫৮ | রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, নূপুর, বাঘাযতীন | ক্লাসিক সাহিত্য ও দেশাত্মবোধমূলক |
| ১৯৬১ | ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্ত ও অম্লনয়নী | সাহিত্য অবলম্বিত রোমান্স |
এই চলচ্চিত্রগুলির অনেকগুলোই আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে ক্লাসিক হিসেবে গণ্য হয়, বিশেষ করে শেষের কবিতা, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, ও বাঘাযতীন।
চিত্রগ্রহণে নান্দনিকতা ও দর্শন
জি. কে. মেহতা বিশ্বাস করতেন, “Camera is not just a tool — it’s an eye that breathes.”
তিনি ক্যামেরাকে কেবল প্রযুক্তিগত উপকরণ নয়, বরং এক “নিরব গল্পকার” হিসেবে ব্যবহার করতেন।
তাঁর দৃশ্য বিন্যাসে একধরনের নাটকীয় প্রশান্তি দেখা যেত — যেমন, চরিত্রের মানসিক অবস্থার সঙ্গে আলো ও কোণের সম্পর্ক স্থাপন।
উদাহরণস্বরূপ, শেষের কবিতায় তিনি কবিতা ও রোমান্সকে এমন কোমল আলোয় ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে দৃশ্যগুলো নিজেই কাব্য হয়ে উঠেছিল।
উত্তরাধিকার ও প্রভাব
জি. কে. মেহতা বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাথমিক যুগে যে ভিজ্যুয়াল নন্দনশৈলী গড়ে তুলেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের বহু চিত্রগ্রাহক—যেমন সৌমেন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ দত্ত, বিকাশ সান্যাল প্রমুখ—কে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
তাঁর হাতে বাংলা সিনেমার দৃশ্যভাষা আরও আধুনিক, কাব্যিক ও বৈজ্ঞানিক হয়ে ওঠে।
তিনি ছিলেন সেই সেতুবন্ধনকারী শিল্পী, যিনি হলিউডের আধুনিক কৌশলকে কলকাতার মানবিক বাস্তবতার সঙ্গে একত্রিত করেছিলেন।
জি. কে. মেহতা ছিলেন সেইসব নিঃশব্দ কর্মীর একজন, যাঁদের আলোয় অন্যরা আলোকিত হয়। তাঁর ক্যামেরা কখনও আড়ম্বরপূর্ণ নয়, কিন্তু সর্বদা গভীর; কখনও অতিনাটকীয় নয়, কিন্তু সর্বদা সত্যনিষ্ঠ। বাংলা ও ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান আজও শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণার উৎস।
তিনি প্রমাণ করেছেন —
“দৃশ্য কখনও কেবল দেখা নয়, তা অনুভব করারও এক শিল্প।”
