বাংলা ছায়াছবিতে যে কয়েকজন বিশিষ্ট অভিনেত্রীতাঁদের স্নিগ্ধ অভিনয়ে চলচ্চিত্রের আঙ্গিনাকে আলোকিত করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন দীপ্তি রায়। দীপ্তি রায় এর জন্ম ১৯২৯ সালে কলকাতায়। পিতার নাম অসিতরঞ্জন রায়। দীপ্তি রায় প্রথাগত শিক্ষা ম্যাট্রিক পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন।। অবশ্য সমস্তটাই ঘটেছিলো পারিবারিক কারণে। প্রথম চলচ্চিত্রাভিনয় নরেশচন্দ্র মিত্র পরিচালিত স্বয়ংসিদ্ধা (১৯৪৭) ছবির নায়িকা চণ্ডীর ভূমিকায়। ৬০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন।

অভিনেত্রী দীপ্তি রায়
পরিচালক নরেশ মিত্র দীপ্তি রায়ের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘স্বয়ংসিদ্ধা’-য় দীপ্তিরায় উচ্চপ্রশংসিত অভিনয় করেছিলেন। তবে দীপ্তি রায় অভিনীত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি ‘দাবী’। ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা মণিকা গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীপ্তি রায়ের স্নেহমধুর সম্পর্কছিলো। এরপর বিভিন্ন ছবিতে দীপ্তি রায় অভিনয় করেছিলেন। বৈপ্লবিক ছবি ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ ছবিতে এই অভিনেত্রীর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলো। ‘সতীর দেহত্যাগ’ ছবিতে তিনি সতীর ভূমিকায় ঐতিহাসিক অভিনয় করেছিলেন। ‘বড়দিদি’ ছবিতে দীপ্তি রায় মহানায়কের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ‘বিচারক’ ছবিতে ‘সুমতি’-র চরিত্রে দীপ্তি রায় যে দুর্ধর্ষ অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন সেই সুবাদে তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কার লাভ করেছিলেন। মহানায়কের সঙ্গে তাঁর দাপুটে অভিনয়ের কথা একবার মনে করে দেখুন তো ! যেন প্রত্যেকেই ‘এ বলে আমায় দ্যাখ তো ও বলে আমায় দ্যাখ’।
‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ছবিতে খোকার মায়ের চরিত্রে এই অভিনেত্রী যে অভিনয় করেছিলেন তা দর্শকদের নয়নকে সিক্ত করেছিলো। ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবিতে তিনি যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তার নাম ‘চারু’। তিনি ছবির নায়ক ধীরাপদ-র চারুদি। এই চরিত্রে এক অভিজাত মহিলার চরিত্রকে তিনি বাস্তবযোগ্য করে তুলেছিলেন। ‘চৌরঙ্গী’ ছবির ‘মিসেস পাকড়াশী’ ভূমিকায় তাঁর অভিনয় কি কখনও ভোলা যাবে ? ‘সবরমতী’ ছবিতে দীপ্তি রায়ের ভূমিকা ছিলো উত্তমকুমারের দিদির। একজন স্নেহশীলা দিদির চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেখে আমরা মোহিত হয়েছিলাম। ‘রাজকুমারী’ ছবিতেও তিনি উত্তমকুমারের দিদির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ‘অনিন্দিতা’ ছবিতে একজন সাধিকার চরিত্রে দীপ্তি রায় অভিনয়
করেছিলেন। তাঁর লিপে ‘কেমনে তরিব ত্বরা/ ভাবি তাই দিন রজনী’ এখনও দর্শকদের কানে গুঞ্জরিত হয়। বিভিন্ন ছায়াছবির জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী জীবনের প্রান্তসীমায় পৌঁছে চরম আর্থিক দুরবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন। এই শিল্পী অবিবাহিতা ছিলেন এবং ল্যান্সডাউন টেরেসে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। দীপ্তি রায়ের আর্থিক অনটনের সময় বিভিন্ন সংগঠন থেকে শিল্পীকে কিছু আর্থিক সাহায্য করা হলেও প্রশ্নটা তো থেকেই যায়—এটাই কি ভবিতব্য ! অবশেষে, কিছুদিন অসুস্থতার পর ২০১২ সালের মাঝামাঝি দীপ্তি রায়ের প্রয়াণ ঘটে।
অভিনীত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র উমা (সাধারণ মেয়ে, ১৯৪৮), হৈমন্তী (কালো ঘোড়া, ১৯৪৮), জ্যোৎস্না (নিরুদ্দেশ, ১৯৪৯). রাধারাণী (রাধারাণী, ১৯৫০), শুভা (গরবিনী, ১৯৫০), সুষমা (আঁধি, ১৯৫২), লাবণ্য (শেষের কবিতা, ১৯৫৩), অলকা (ষোড়শী, ১৯৫৪); সবিতা (জীবনতৃষ্ণা, ১৯৫৭); সুমতি (বিচারক, ১৯৫৯): উমা (দর্পচূর্ণ, ১৯৬২), চারু (কাল তুমি আলেয়া, ১৯৬৬), নায়কের দিদি (রাজকুমারী, ১৯৭০), ইত্যাদি।

দীপ্তি রায় যে সব পরিচালকদের সাথে কাজ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন নরেশ মিত্র, নীরেন লাহিড়ী, অগ্রদূত, মধু বসু, অজয় কর, অসিত সেন, প্রভাত মুখোপাধ্যায়, দীনেন গুপ্ত, পশুপতি চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি। চলচ্চিত্রে শেষ কাজ দীনেন গুপ্ত পরিচালিত নটী বিনোদিনী (১৯৯৪) ছবিতে। এই ছবিতে তিনি নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসাবে কাজ করেছেন। বাংলা ছাড়াও কয়েকটি হিন্দী ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন।

দীপ্তি রায় এর চলচ্চিত্রপঞ্জি —
- ১৯৪৭ স্বয়ংসিদ্ধা
- ১৯৪৮ সাধারণ মেয়ে, কালো ঘোড়া,
- ১৯৪৯ হেরফের, নিরুদ্দেশ, যা হয় না, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন
- ১৯৫০ রাধারাণী, জাগ্রত ভারত, সীমান্তিক, গরবিনী,
- ১৯৫১ সংকেত
- ১৯৫২ পাশের বাড়ী, প্রার্থনা, আঁধি,
- ১৯৫৩ শেষের কবিতা,
- ১৯৫৪ এটম বম, সতীর দেহত্যাগ, শিবশক্তি, ষোড়শী,
- ১৯৫৫ কালিন্দী:
- ১৯৫৬ লক্ষীরা, সিঁথির সিঁদুর,
- ১৯৫৭ বড়দিদি, বড়মা, হরিশ্চন্দ্র, নীলাচলে মহাপ্রভু, গড়ের মাঠ, দাতা কর্ণ, জীবনতৃষ্ণা,
- ১৯৫৮ পুরীর মন্দির, কংস,
- ১৯৫৯ বিচারক:
- ১৯৬০ খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন।
- ১৯৬১ মা:
- ১৯৬২ মায়ার সংসার, দর্পচূর্ণ, ধূপছায়া:
- ১৯৬৪ দ্বীপ নেভে নাই,
- ১৯৬৫ দেবতার দীপ, তৃষ্ণা,
- ১৯৬৬ কাল তুমি আলেয়া;
- ১৯৬৮ চৌরঙ্গী,
- ১৯৬৯ সাবরমতী, আঁধার সূর্য,
- ১৯৭০ রাজকুমারী
- ১৯৭২ অনিন্দিতা, নায়িকার ভূমিকায়, নতুন দিনের আলো,
- ১৯৭৪ দাবী,
- ১৯৭৫ শর্মিলা, উমনো ও ঝুমনো;
- ১৯৭৬ সুদূর নীহারিকা
- ১৯৭৭ বাবুমশাই,
- ১৯৭৮ সিংহদুয়ার
- ১৯৭৯ যত মত তত পথ, নবদিগন্ত, শ্রীকান্তের উইল, নৌকাডুবি,
- ১৯৮০ দুই পৃথিবী, সীতা,
- ১৯৮১ সেই সুর:
- ১৯৮২ মায়ের আশীর্বাদ;
- ১৯৮৩ সুপর্ণা:
- ১৯৮৪ সমর্পিতা, অগ্নিশুদ্ধি:
- ১৯৮৬ অনুরাধা, মুক্ত প্রাণ,
- ১৯৮৭ লালন ফকির, দেবিকা, টুনিবউ
- ১৯৮৮ মধুগঞ্জের সুমতি,
- ১৯৯০ সংক্রান্তি:
- ১৯৯৪ অন্তরীণ, নটী বিনোদিনী।
