বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসা নাট্যব্যক্তিত্ব ড. সৈয়দ জামিল আহমেদ-এর পদত্যাগপত্র এখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে ঝুলে আছে। একাডেমির সচিব মোহাম্মদ ওয়ারেছ হোসেন পদত্যাগপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রণালয়ে জমা দিলেও, সেটি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান—কোনো দিকেই এখনো সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয় বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। ড. জামিল আহমেদের পদত্যাগ কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও এক বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, তিনি বাংলাদেশের সমকালীন নাট্যচর্চা, একাডেমিক থিয়েটার শিক্ষা ও মঞ্চ-নন্দনতত্ত্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলক ও গবেষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেশে-বিদেশে খ্যাত।
পদত্যাগের প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, ‘মুনীর চৌধুরী প্রথম জাতীয় নাট্যোৎসব’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে হঠাৎ করেই ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে তিনি লিখিত পদত্যাগপত্র একাডেমির সচিবের হাতে তুলে দেন। তাঁর দাবি, সংস্কৃতি উপদেষ্টা তাকে একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পে আর্থিক অনুদান প্রদানের জন্য চাপ দেন, কিন্তু তিনি প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়াই অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেন। এই অবস্থান নেওয়ার পর থেকে তিনি প্রশাসনিক অসুবিধা ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন বলে অভিযোগ তোলেন।
সংস্কৃতি উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়া
ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার ঝড় তোলে। সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিজের ফেসবুক পেজে লিখেন—
“একজন ভালো শিল্পী হওয়া আর সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিতে হলে ধৈর্য, প্রাতিষ্ঠানিক বোধ ও প্রশাসনিক দক্ষতা প্রয়োজন। নাট্যচর্চার আবেগ দিয়ে সবসময় প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়।”
এই মন্তব্যের পর সাংস্কৃতিক মহলে মতবিরোধ আরও তীব্র হয়। অনেকে মনে করেন, ফারুকীর মন্তব্য প্রশাসনিক বাস্তবতা প্রতিফলিত করলেও তা শিল্পীসমাজের আবেগকে উপেক্ষা করে করা হয়েছে।
প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
৩ মার্চ (রবিবার) পদত্যাগপত্রটি মন্ত্রণালয়ে পৌঁছালেও, সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এটি এখনো গ্রহণ করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, “এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ; তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন।”
একাডেমির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, ড. জামিল আহমেদের ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তিনি সবসময়ই প্রশাসনিক জটিলতার চেয়ে শিল্পচর্চায় বেশি মনোযোগী ছিলেন। তাঁর এই শিল্পমনা স্বভাব ও নীতিনিষ্ঠতা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়েছিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে শিল্পকলা একাডেমির চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দীর্ঘদিন ধরেই নানা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার অভিযোগে জর্জরিত। প্রাক্তন মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকি-র সময়ে যেভাবে দীর্ঘমেয়াদী নেতৃত্ব এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাতে নতুন নেতৃত্বের প্রতি সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু ড. জামিল আহমেদের পদত্যাগ সেই প্রত্যাশাকে আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রতিক্রিয়া
নাট্যজগৎ ও সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই মনে করছেন, এটি কেবল একজন ব্যক্তির পদত্যাগ নয়—এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রশাসনের জটিল কাঠামোর প্রতিফলন। বিশিষ্ট নাট্যকাররা বলছেন, “একজন শিল্পীর সততা ও পেশাগত স্বাধীনতার জায়গা যেন প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে সংকুচিত না হয়।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কী সিদ্ধান্ত নেবে—তা এখন সবার নজরে। ড. সৈয়দ জামিল আহমেদের পদত্যাগ যদি গৃহীত হয়, তবে এটি শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং বাংলাদেশের সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
সময়ই বলবে—এই অস্থিরতার মধ্যে থেকে কি নতুন কোনো সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্বের সূচনা হবে, নাকি শিল্পকলা একাডেমি আবারও অতীতের চেয়ে বেশি প্রশাসনিক জটিলতার আবর্তে আটকে পড়বে।
