হুমা কুরেশির বিকল্প পথ: সাহস, সততা ও আত্মবিশ্বাসের এক যাত্রা

বলিউড মানেই স্বপ্ন, গ্ল্যামার, আলো, ক্যামেরা আর প্রতিযোগিতা। কিন্তু এই স্বপ্নরাজ্যে নিজের জায়গা তৈরি করা মোটেও সহজ নয়— বিশেষ করে যদি কেউ হন “আউটসাইডার”, অর্থাৎ চলচ্চিত্র জগতের বাইরের মানুষ। আর যদি সেই ব্যক্তি হন নারী, তাহলে পথটা হয়ে যায় আরও বন্ধুর, আরও জটিল।
তবুও সেই কঠিন পথেই দৃঢ় পায়ে হাঁটছেন অভিনেত্রী হুমা কুরেশি, যিনি নিজের প্রতিভা, আত্মবিশ্বাস ও চরিত্র নির্বাচনের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বলিউডে এক আলাদা অবস্থান গড়ে তুলেছেন।

বলিউডে প্রবেশ—পথটা সহজ ছিল না

দিল্লির মেয়ে হুমা কুরেশি শুরু করেছিলেন থিয়েটার ও বিজ্ঞাপন জগৎ থেকে। তাঁর প্রথম বড় সুযোগ আসে অনুরাগ কাশ্যপের হাতে— “গ্যাংস অব ওয়াসেপুর” (২০১২) সিনেমায়। সেখান থেকেই শুরু তাঁর অভিনয়যাত্রা। কিন্তু এই পথ একেবারেই মসৃণ ছিল না।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে অকপট হুমা বলেন,

“ইন্ডাস্ট্রির বাইরের একজন নারী হিসেবে আমার যাত্রাটা একদম সহজ ছিল না। অনেক চরিত্র আছে, যেগুলো আমি মনপ্রাণ দিয়ে করতে পারি, তবু আমাকে ডাকা হয় না। কিন্তু আমি বসে থাকব না, কাঁদবও না— আমি আমার শর্তে কাজ করছি, এবং তাই করে যাব।”

এই কথাতেই যেন ফুটে ওঠে তাঁর দৃঢ়তা— তিনি শুধুমাত্র সুযোগের অপেক্ষায় থাকা কোনো অভিনেত্রী নন, বরং নিজের পথ নিজেই তৈরি করা এক স্বনির্ভর শিল্পী।

“তুমি এত সুন্দর, তবু এমন চরিত্রে কেন অভিনয় করো?”

হুমা কুরেশির অভিনয়জীবনের আরেকটি দিক হলো তাঁর চরিত্র বেছে নেওয়ার সাহস। তিনি বাণিজ্যিক ছবির চকচকে চরিত্রে সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং বেছে নিয়েছেন এমন সব চরিত্র, যেগুলোর মাধ্যমে সমাজ, রাজনীতি, কিংবা নারীর সংগ্রামকে প্রতিফলিত করা যায়।

তিনি বলেন,

মহারানী বা তরলা-এর মতো সফল কাজের পরও এক কাস্টিং ডিরেক্টর আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘তুমি এত সুন্দর, কেন এমন চরিত্রে অভিনয় করো যেখানে নিজেকে বয়সী দেখাও?’ পরিচালকেরা নাকি আমাকে তরুণী চরিত্রে কাস্ট করতে চান না, কারণ আমি বাস্তবধর্মী চরিত্রে অভিনয় করি! এটা কী অদ্ভুত মানসিকতা না?”

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,

“কেন মেয়েদের সব সময় ১০ বছর কম বয়সী দেখানোর চাপ দেওয়া হয়? আমরা কি বাস্তব চরিত্রে থাকতে পারি না? একজন পুরুষ অভিনেতা ৫০ বছরেও ২৫ বছরের চরিত্রে অভিনয় করতে পারেন, কিন্তু একজন নারী একটু বয়সী দেখালেই তাঁর সুযোগ কমে যায়— এই ধারণাটা বদলাতে হবে।”

চরিত্রই তাঁর নায়ক

হুমা কুরেশি এখন এমন এক পর্যায়ে, যেখানে তিনি শুধুমাত্র ক্যামেরার সামনে নাচা বা গ্ল্যামারাস চরিত্রে অভিনয় করে তৃপ্ত নন। বরং তিনি চান এমন গল্পে কাজ করতে, যেখানে আছে গভীরতা, সমাজের প্রতিফলন, আর নারী-পুরুষের সমান অবস্থান।

তিনি বলেন,

“গাছগাছালির পাশে দাঁড়িয়ে নাচের দৃশ্য করেছি আমি, কিন্তু এখন আর সেই পথে হাঁটতে চাই না। ভালো চিত্রনাট্য পেলে আমার বয়সের চেয়েও বড় চরিত্রে অভিনয় করব, তাতে কোনো ভয় নেই।”

এই মন্তব্যের মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, হুমা কেবল নিজের সৌন্দর্য নয়, বরং নিজের মেধা ও অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিতে চান।

নিজের শর্তে বাঁচা

নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে হুমার ভাবনা একেবারেই স্পষ্ট।
তিনি বলেন,

“আমার সামনে দুটি রাস্তা ছিল—
এক, সৌন্দর্য বাড়াতে একের পর এক কসমেটিক সার্জারি করা, পরিচালকের কলের অপেক্ষায় থাকা;
আর দুই, ভালো গল্প হাতে নিয়ে সাহসী চরিত্রে কাজ করে যাওয়া।
আমি দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিয়েছি।”

এই সাহসী অবস্থানই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। তাঁর মতে, একজন অভিনেত্রীর সৌন্দর্য নয়, বরং তাঁর চরিত্রের সত্যতা ও অভিনয়ের গভীরতাই তাঁকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

সামনে আসছে নতুন কাজ

দর্শকরা খুব শিগগিরই হুমা কুরেশিকে দেখতে পাবেন “জলি এলএলবি ৩”-এ, যেখানে তাঁর সহশিল্পী থাকবেন অক্ষয় কুমার ও আরশাদ ওয়ারসি। পাশাপাশি জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ “মহারানী”-এর চতুর্থ কিস্তিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করবেন।
এছাড়া, শোনা যাচ্ছে তিনি একটি আন্তর্জাতিক প্রজেক্টেও কাজ করতে যাচ্ছেন, যেখানে তাঁকে এক রাজনৈতিক নেত্রীর ভূমিকায় দেখা যেতে পারে।

হুমা কুরেশি—অনুপ্রেরণার নাম

সমালোচকদের মতে, হুমা কুরেশি বলিউডে এমন এক মুখ, যিনি কখনো ভেসে যাননি ট্রেন্ডের জোয়ারে। তাঁর ক্যারিয়ারের প্রতিটি পদক্ষেপে আছে সচেতনতা, আত্মসম্মান ও শিল্পচেতনা।

তিনি প্রমাণ করেছেন, তারকা হওয়া মানেই গ্ল্যামার নয়, বরং নিজের মতো করে পথ তৈরি করা— সেটাই আসল সাহস।
যেখানে বলিউডে আজও অনেকে নাম, চেহারা বা ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর নির্ভর করেন, সেখানে হুমা কুরেশি হয়ে উঠেছেন “নিজের শর্তে বেঁচে থাকা” শিল্পীর প্রতীক।

বলিউডের প্রথাগত রূপের বাইরে এসে, নিজস্ব ভাবনা ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে হুমা কুরেশি তৈরি করেছেন এক বিকল্প পথ— যেখানে প্রতিভা, আত্মসম্মান ও বাস্তবতার জয়। তাঁর এই যাত্রা শুধু নারীদের নয়, পুরো চলচ্চিত্র জগতের জন্যই এক অনুপ্রেরণা।