আনন্দলোক নিয়ে প্রবোধবন্ধু অধিকারীর সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন সাহিত্যিক দুলেন্দ্র ভৌমিক

আনন্দলোক নিয়ে প্রবোধবন্ধু অধিকারীর সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন সাহিত্যিক দুলেন্দ্র ভৌমিক এই সাক্ষাৎকার বিষয়ে আশিস গোস্বামী লিখেছেন : এই এক দশক জুড়ে নতুন নাট্য আন্দোলন মুখ্য ভূমিকা নিতে চলেছিল। পত্রিকায় তার সংবাদ বা সমালোচনা প্রকাশিত হোক বা না হোক নতুনের প্রাণ প্রবাহকে দমিয়ে রাখা যায়নি। আনন্দবাজার কর্তৃপক্ষ তা টের পেয়েছিলেন বলেই ষাটের দশকের শুরুতেই এই থিয়েটারের জন্য নিয়মিত একটি বিভাগই চালু করলেন ১৯৬০-এর ৩০ জুন।

প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ‘আনন্দলোক’ নামে এই বিভাগটির তৎকালীন বার্তা সম্পাদক সন্তোষ কুমার ঘোষ চালু করেন। পরে অবশ্য বিভাগটি বৃহস্পতিবারের পরিবর্তে শনিবার প্রকাশিত হত। এই উপলক্ষ্যে বিভাগীয় প্রধান প্রবোধবন্ধু অধিকারীর একটি সাক্ষাৎকারও নেন সাহিত্যিক দুলেন্দ্র ভৌমিক। নীচে সাক্ষাৎকারটির কিছু অংশ তুলে দেওয়া হল। পরে সাক্ষাৎকারটি সুনীল দত্তের লেখা নাট্য আন্দোলনের ৩০ বছর বইটির ১৩৩-১৩৭ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে তুলে দেওয়া হল।

Table of Contents

প্রশ্নঃ এই বিভাগটি প্রকাশের পেছনে আনন্দবাজার পত্রিকার কোন উদ্দেশ্য কাজ করেছিল?

উত্তরঃ ১৯৪৭ সালের পর থেকে এদেশে নতুন নাট্যদলের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছিল। ১৯৬১ সালে আমি ১৯৬০-এর সমীক্ষা করে জেনেছিলাম, তখন সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে নাট্যদলের সংখ্যা ছিল প্রায় এগারো হাজারের মতো। অতএব এই নাট্যচর্চায় উৎসাহ দানের জন্যেই মূলত এই বিভাগটির জন্ম।

প্রশ্ন : এই বিভাগটির সম্পাদনার দায়িত্বভার আপনার ওপর পড়লে, আপনি কীভাবে এটি গ্রহণ করেছিলেন এবং কীভাবে কাজ করবেন ঠিক করেছিলেন?

উত্তর : গল্প এবং উপন্যাসের জগৎ থেকে এসে আমি তখন হঠাৎ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হাতে পাওয়ায় খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। তবে লক্ষ্য মোটামুটি আমার ছিল, তাহ’ল এই যে, আমাদের সাহিত্যের অবহেলিত এই শাখাটির উন্নয়ন, প্রচার ও প্রসার এবং নাট্য শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সব সমস্যা আছে সে সম্বন্ধে জনসাধারণকে ওয়াকিবহাল করা।…পরবর্তী কালে এই বিভাগটির অসম্ভব জনপ্রিয়তা দেখে আমার মনে হয়েছে, আমি যা চেয়েছিলাম তা পেয়েছি।

প্রশ্নঃ ‘আনন্দলোক’এ প্রথম কোন নাটকের সমালোচনা প্রকাশিত হয়? ওই নাটকটি কার রচনা, কে প্রযোজনা করেন? আপনি কি সমালোচনার ক্ষেত্রে সেই পুরনো গল্প বলা এবং অভিনয় প্রযোজনা সম্পর্কে দু’চার কথা বলার পক্ষে ছিলেন, নাকি এ সম্পর্কে আপনি অন্যরকম কিছু ভেবে ছিলেন?

উত্তর ঃ ‘আনন্দলোক’-এ প্রথমে যে নাটকটির সমালোচনা প্রকাশিত হয়, তার নাম ‘মরুঝঞ্ঝা’। প্রযোজক পাভলভ ইনস্টিটিউট। নাট্যকার ডাক্তার বীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। প্রথাগত নাট্য সমালোচনার আমি বিরোধী ছিলাম। কারণ একজন নাট্যকার যখন একটি নাটক রচনা করেন তাঁর যে বলার কথা, তথা বক্তব্য সে সম্বন্ধে পাঠকের মনে কোনো চিত্রকলা প্রথাগত সমালোচনা সৃষ্টি করে না—তেমন করে না একজন নাট্য নির্দেশকের সৃষ্টি সম্পর্কেও।

আমি দুটোকেই ‘ক্রিয়েশন’ বলি। যেমন বলি চরিত্র চিত্রণও এক ধরনের সৃষ্টি! সুতরাং আমি সমালোচনা সেইখান থেকে শুরু করেছিলাম যেখানে নাট্যকার তার সমগ্র রচনার মধ্য দিয়ে যে কথাটি বলতে চেয়েছেন, নাট্য নির্দেশক তাঁর সঙ্গে একমত হয়ে তাকে বাস্তবায়িত করতে চেয়েছেন ইত্যাদি। আনন্দলোক-এর প্রথম সমালোচনা থেকেই এই বিশেষ ধারাটি প্রচলিত।”

আনন্দলোক নিয়ে প্রবোধবন্ধু অধিকারীর সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন সাহিত্যিক দুলেন্দ্র ভৌমিক‘আনন্দলোক’ বিভাগের আগে ‘নাট্যলোক ও চিত্রকথা’র পাতায় বেশির ভাগই সিনেমার সমালোচনা এবং নাটকের সংবাদ থাকত এমনকি তখন গণনাট্য উৎসবের সংবাদও (২৯/০৪/৬০) প্রকাশিত হত। সেই সঙ্গে মাঝে মাঝে নাট্য সমলোচনা থাকত—পেশাদার, অপেশাদার সম্প্রদায়ের। যেমন—‘পরমারাধ্য শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ’, ‘শেষ প্রশ্ন’, পঞ্চ মিত্রের ‘জগন্নাথের রথ’, রঙ্গসভার ‘জলরং’ দশরূপকের ‘ডানা ভাঙা পাখি’ ইত্যাদি। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে এই আলোচনা ছিল অপ্রতুল। এবং এ কথা ‘আনন্দলোক’ এর প্রথম দিনের পৃষ্ঠায় স্বীকার করেও নেওয়া হয়েছিল।

“নিত্য নতুন প্রচেষ্টা চলছে, ভাঙছে গড়ছে, উচ্ছ্বাস আনন্দ চলছে, কিন্তু সব প্রচেষ্টাই প্রচারের অভাবে একটা সীমার মধ্যে গণ্ডীবদ্ধ থাকছে। যত বাঙলা পত্র পত্রিকা আছে, তাতে স্থানাভাব। অবশ্য কিছু কিছু সংবাদ যে প্রচারিত হয় না, তা নয়, কিন্তু যা প্রকাশিত হয়, তা সারাংশের মতন।

‘আনন্দলোক’ বিভাগটি সেই অভাব পূরণ করতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস।”

‘আনন্দলোক’ বিভাগটিতে ‘অভিনয় অভিনয়’, ‘অভিনয়ে অফিস কর্মী’, ‘নতুন নাটকের পরিচয়’, ‘কেরানী পাড়ার অভিনয়’ ইত্যাদি কলামে বেশির ভাগ সময়ই সংবাদ থাকত এবং অফিস-মফস্সল-শৌখিন অভিনয়ের রিপোর্টাজ ধর্মী আলোচনার পাশাপাশি নবনাট্য ধারার প্রযোজনাগুলির সমালোচনা থাকত।আনন্দলোক নিয়ে প্রবোধবন্ধু অধিকারীর সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন সাহিত্যিক দুলেন্দ্র ভৌমিক

শুধু তাই নয়, ক্ষীরোদ প্রসাদের শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে পূর্ণ পৃষ্ঠায় তিনটি প্রবন্ধ প্রকাশ (১৪।০৪।৬৪) বা উৎপল দত্তর “নিশীথ চিন্তা’ শিরোনামে বিতর্কিত প্রবন্ধটির প্রকাশের মতো কিছু কাজও এই পত্রিকায় হয়েছিল, যা বিশেষ ভাবেই উল্লেখ করার মতো।

অগ্রণী নাট্যদলগুলির সমালোচনাকেই গুরুত্ব দেওয়া হত বেশি। যেমন– বহুরূপী, লিটল থিয়েটার গ্রুপ, থিয়েটার সেন্টার, গন্ধর্ব, চতুরঙ্গ, নান্দীকার ইত্যাদি। ‘রক্তকরবী’র পর বহুরূপীর উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা অবশ্যই ‘রাজা ওয়েদিপাউস’ ও ‘রাজা’।

এই প্রযোজনা দুটির দীর্ঘ সমালোচনা ‘বহুরূপীর দুটি বিশিষ্ট উপহার’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে লেখা হয় “রানী সুদর্শনার রূপের সাধনা আর অধ্যাত্ম সাধনা, অভিমান আর আত্ম নিবেদনের দ্বন্দ্ব নিয়ে এই প্রতীক নাটক। মানবাত্মার প্রতীক সুদর্শনার রূপতৃষ্ণা তীব্র, এই মোহ আর অহমিকা বোধ জাত। সুদর্শনা ওর অরূপ রাজার (ঈশ্বর) মূর্তি আপনার সীমিত সৌন্দর্যবোধ দিয়ে কল্পনা করে নিয়েছিল।

ক্ষুদ্রবুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে গিয়ে সে ভুল করল। অন্তঃসারশূন্য সুবর্ণর (মেকী ঈশ্বর) বাহিরের রূপে মুগ্ধ সুদর্শনা রাজাকে চিনে নিতে পারল না। তারপর বিপদের মধ্যে আগুনের আলোয় দেখল রাজার ‘কূলশূন্য সাগরের মতো কালো রূপ’ সুদর্শনা সে রূপ সইতে পারল না।

একের পর এক অপমান আর আঘাতের (ওকে নিয়ে যুদ্ধ, হানাহানি, পিতার বন্দীদশা ইত্যাদি) মধ্য দিয়ে সুদর্শনার রূপ কামনার মৃত্যু। ‘আত্মাভিমানেরও’ সকল অহংকার ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে সুদর্শনা যখন পথের ধুলোকে অঙ্গরাগ করে নিতে পারল, বিশ্বরূপের কাছে তখনই তার আত্মদান সম্পূর্ণ।…

‘রাজা’ নাটক সম্পর্কে একটি অভিযোগ, এর দীর্ঘতা নিয়ে। কেউ কেউ একই ভাবের পুনরাবৃত্তির প্রশ্নও তুলতে পারেন। কেউ বা চরম মুহূর্তের (সাত রাজার পরাজয়) পর সমাপ্তির বিলম্ব নিয়ে। উত্তরে বলা যায়, তাৎক্ষণিক প্রমোদ সৃষ্টি করে যে নাটক, তার উৎকর্ষের শর্ত রাজার উপর প্রযোজ্য নয়। মহৎ নাটক ক্ষিপ্রগতি দিয়ে মন ভোলায় না, চিত্ত আবিষ্ট করে তার ভাবসম্পদ দিয়ে, সেই বস্তুর স্বাদ নিতে হয় অল্পে অল্পে। এই শর্তই এখানে পালিত।”

‘রাজা ওয়েদিপাউস’ সমালোচনায় লেখা হল: “বহুরূপীর দেওয়া ‘অন্ধকারের নাটক’ আখ্যাটি ‘রাজা ওয়েদিপাউস’-এর উপর নিঃসন্দেহে প্রযোজ্য। কিংবদন্তীর রাজা ওয়েদিপাউস নিষ্ঠুর অদৃষ্ট চক্রের শিকার, ভাগ্যের হাতের পুতুল, ন্যায়নিষ্ঠ রাজা তার রাজ্য থেকে পাপের অভিশাপ দূর করতে চেয়েছিলেন, সেই প্রয়াসে সত্য উদ্ঘাটিত হল। নির্মম, অসহনীয়, অকল্পনীয় সে সত্য। রাজা জানালেন, তিনিই অপরাধী।

….গ্রীক নাটকের মূল কথা ভাগ্য অথবা নিয়তির চক্রান্ত; প্রধান গুণ সরলতা, মুখ্য উপজীব্য করুণ রস, বহুরূপী প্রযোজিত এই সফোক্লিস নাট্যে এ সবই পরিস্ফুট, এ সবেরও অতিরিক্ত যা পাওয়া গেছে সেটুকু বর্ণনার বস্তু নয়। ট্র্যাজেডির পরেও যা থাকে তাই।

সহজ প্রয়োগরীতির সঙ্গে অসাধারণ অভিনয় প্রায় অসহনীয় এই নাটকটির আবেদন দুর্নিবার করে তুলেছে।” (আনন্দবাজার : ১৯/৬/৬৪) বহুরূপী সমীহ এবং মুগ্ধতাকে আদায় করে নিতে সক্ষম হয়ে ওঠে। তাই ২৬মে ১৯৬৭তে সন্তোষ কুমার ঘোষ অন্য ইতিহাস’ শিরোনামে লিখলেন, ‘অস্পষ্টভাবে মনে পড়ে চল্লিশের দশকে, বোধহয় শেষভাগে, ‘বহুরূপী’কে মঞ্চে আবির্ভূত হতে দেখি, তিনটি নাটক ‘পথিক’, ‘উলুখাগড়া’, ‘ছেঁড়া তার’ ঠিক ঠিক লিখলুম কিনা জানিনে।

তিনটির তিন রকম স্বাদ, বিভিন্ন বিষয়বস্তুও, নাট্যপ্রযোজনায় নতুন পরিচ্ছন্ন আঙ্গিক। নিউ এম্পায়ার প্রেক্ষাগৃহে বসে তখনই অনুভব করেছিলাম। নাট্যালয়ে নতুন যুগের ভোর হল।” মনে রাখতে হবে। ‘বহুরূপী’র কাজ শুরুর প্রায় এক দশক পর এই স্বীকৃতি। এর পর আনন্দবাজার বহুরূপীর নাট্য সমালোচনা বারবারই করেছে। ১৯৬৯ সালেই ১৩ জুন ‘বর্বর বাঁশি’ ২২ আগস্ট ‘ত্রিংশ শতাব্দী’র সমালোচনা পরপর প্রকাশ করে। ‘বর্বর বাঁশি’ সম্পর্কে লেখা হয়,

“তাঁদের নতুন নাটক ‘বর্বর বাঁশি’র ক্ষেত্রে কী অন্য অভিজ্ঞতা ঘটল।…নাটকের অঙ্গসজ্জা, গতিছন্দ, অভিনয় সবই প্রায় নিখুঁত। অভিনয়ের আড়াই ঘণ্টা কাল কোথা দিয়ে যেন কেটে গেল। তা গেল, কিন্তু নাটকটি আমাদের কোথাও পৌঁছে দিল কি? কোনও রসলোকে? মুক্তির সন্ধান দিল কি? অথবা অনুপ্রাণিত করল সদর্থক কোনও ভাবনায়? প্রশ্নগুলো শেষ পর্যন্ত মনে বিধেই থেকেছে।

আজকের যে সমাজে মূল্যহানি ঘটেছে এবং ঘটে চলছে তারই একটি চিত্র তুলে ধরবার চেষ্টা এই নাটকে। নিম্নবিত্ত শ্রেণী থেকে বেছে নেওয়া চরিত্রগুলির প্রায় সকলেই অশিক্ষিত, বিবেকহীন, আত্মমর্যাদাবোধ শূন্য, আপন আপন স্বার্থসিদ্ধির সন্ধানে ব্যাপৃত।….

এ ছবির নাম হয়ত অবক্ষয়। এর কারণ কী? নাট্যকার সম্ভবত বলতে চান, সমাজ ব্যবস্থায় ঘুণ ধরেছে—সমাজের উপর তলায় যাদের বাস সেই বড়লোকেরা নষ্টের মূলে, তারা নিজেরা খারাপ, লোভী; অন্যদেরও তারাই খারাপ করে দিচ্ছে। তথাকথিত প্রগতিমূলক নাটকে এই বার্তাই সোচ্চারে ঘোষণা করা হয়ে থাকে, এখানে ঘোষণাটা এত সোচ্চার না হলেও ওই সরলীকরণের ব্যাপারটা ঠিকই লক্ষ্য করা যায়।…

বস্তুগত বিচারে নাটকটি অগোছালো। একই সঙ্গে নানা দিকে তার লক্ষ্য এবং গতিবিধি ন্যায়নীতির পরিপ্রেক্ষিতে একটি চরিত্রের সততা এবং বিচ্ছিন্নতাবোধের ব্যাপার তো আছেই, সেই সঙ্গে রয়েছে ধর্মের নামে ছলনা, ব্যবসা : স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অত্যাচার (সেই স্বামী আবার পুরুষত্বহীন : বউয়ের সঙ্গে শাশুড়ি-ননদের দুর্ব্যবহারের কথাও বাদ যায়নি) ‘ওই দুঃখী অবোধ মেয়ের সুখের নিস্ফল আকাঙ্ক্ষা : অসামাজিক প্রেম, এছাড়া ছিনতাই, গুণ্ডামি ইত্যাদি ইত্যাদি। সব মিলে কাণ্ডটা হিন্দি সিনেমার গল্পের মতো একটি দুটি নিষ্ঠুর দৃশ্য অন্তত হিন্দি সিনেমাকে মনে করিয়ে দেয়।”

ত্রিংশ শতাব্দী ঃ

“নাটক নির্বাচনে বহুরূপী গোষ্ঠী ইদানিং যেন তেমন দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারছে না। গত ১৯ আগস্ট মুক্ত অঙ্গনে তাঁদের সাম্প্রতিক প্রযোজনা ‘ত্রিংশ শতাব্দী’ (নাটক : বাদল সরকার) দেখে পুনরায় আশাহত হলাম।…এই নাটকটির মূল বক্তব্য যুদ্ধোন্মাদনার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ। যুদ্ধপর্বে আণব অস্ত্রে বিধ্বস্ত হিরোসিমা ও নাগাসাকির মর্মন্তুদ দৃশ্য বর্ণনার পাশাপাশি নাট্যকার আমেরিকাকে (রাশিয়া তখনও তার সঙ্গে যুদ্ধচুক্তির গাঁটছড়ায় বাঁধা) আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কৈফিয়ৎ চেয়েছেন।

(…এবং অবশেষে এ নাটকের নায়ক ত্রিংশ শতাব্দীর মানুষের কাছে বিংশ শতাব্দীর এই পাপের কৈফিয়ৎ স্বরূপ জানিয়েছেন। এ পাপে সাধারণ মানুষের সম্মতি ছিল না। তারা যুদ্ধ চায়নি, শাস্তিই চেয়েছে।

– নাটকটি তথ্য বহুল। তথ্যের পর তথ্যে আদ্যোপান্ত বোঝাই। ফলে রসের দিকটি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। তাছাড়া, সারা পৃথিবীর বীর মানুষের আণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে বার বার ঘৃণা প্রকাশ করেছে। ভারতে তো বটেই, আমেরিকাতেও এর বিরুদ্ধে জনমত জাগ্রত। সেক্ষেত্রে ওই ব্যাপারটি সম্পর্কে বাংলা দেশের মানুষকে নতুন করে সচেতন করার প্রয়োজন আছে কি?…”

‘রাজা’ এবং ‘রাজা ওয়েদিপাউস’ বাদে উল্লিখিত তিনটি সমালোচনাই প্রয়োগগত দিকের প্রশংসা পেলেও বিষয়গত দিকের প্রশংসা পায়নি। ‘রক্তকরবী’তে রক্তের আধিক্য যেমন সমালোচকের অপছন্দ ঠিক একই ভাবে ‘বর্বর বাঁশি’র বিষয় হিন্দি সিনেমার মতো আর ‘ত্রিংশ শতাব্দী’র যুদ্ধ সচেতনতাকে খাটো করে দেখার প্রয়াসটা কৌতূহলকর। পাশপাশি সন্তোষ কুমার ঘোষ ‘বহুরূপী’কে ‘অন্য ইতিহাস’ রচনাকারী বলে যে অভিনন্দন জানান, তাও কিন্তু প্রয়োগগত সফলতার কথা মনে রেখেই বলেন। তাঁর উক্ত আলোচনায় সে বিষয়ের উল্লেখও বারবার করেছেন।

সমালোচকদের বিষয়গত দিকটি ভালো নাও লাগতে পারে—এটা অনেক ব্যক্তিগত এবং সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগত দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। কিন্তু আজকে দাঁড়িয়ে আশ্চর্য হতে হয়, থিয়েটার সেন্টারের প্রযোজনাগুলি তাদেরই ভালো লেগে যায়। কোনো নাট্যসংস্থা ও ব্যক্তি মানুষকে অসম্মানিত না করেও কালের বিচারে বহুরূপীর প্রযোজনার তুলনায় থিয়েটার সেন্টারের প্রযোজনাগুলির কোনোটিই ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি।

থিয়েটার সেন্টার প্রেক্ষাগৃহ তৈরি, সর্বভারতীয় নাট্য প্রতিযোগিতার মতো ঐতিহাসিক কিছু কাজের জন্য তাঁরা অবশ্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, কিন্তু প্রযোজনাগত দিক থেকে বাংলা থিয়েটারকে কতখানি এগিয়ে নিয়ে গেছে তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু বহুরূপীর বেশ কয়েকটি নাট্য সমালোচনার পাশে থিয়েটার সেন্টারের প্রযোজনার সমালোচনাগুলি পাশাপাশি রাখলে তা বোঝার উপায় নেই (সন্তোষ কুমার ঘোষের আলোচনাটি বাদ দিয়ে)। নীচে পরপর কয়েকটি সমালোচনা অংশ তুলে দেওয়া হল।

থিয়েটার সেন্টারের উপহার ‘আর হবে না দেরি’ :

“তিনটি অংক এবং এগারোটি চরিত্র সংবলিত ‘আর হবে না দেরি’ বাস্তব আর রূপকের সমন্বয়ে রচিত। বাস্তব এতে কখনো রূপকে আশ্রয় নিয়েছে কখনো বা রূপক বাস্তবে। বাস্তব রূপকের কখনো সার্থক সমন্বয়, কখনো সংমিশ্রণের মধ্যে ঘটনার কিছু ঘাত প্রতিঘাত এবং মূল চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বে নাট্যরসের বিস্তার।…

বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণে মনে হয়, নাটকটি পুরোপুরি রূপকের আঙ্গিকে রচিত হতে পারত। চরিত্র ও ঘটনাবলী অংশত রূপকগন্ধী হলেও নাট্যকার প্রায়শ তাদের বাস্তবের পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। দেশ-কাল-পাত্রের মধ্যে তাদের পরিচয় কতকটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এরকম না হলেই বরং নাটকের আবেদন আরো গভীর এবং সুদূরপ্রসারী হতে পারত। পাত্র-পাত্রীর সংলাপ সম্পর্কেও এই কথা প্রযোজ্য। অবশ্য মাঝে মাঝে গভীর অর্থব্যঞ্জক সংলাপ, কবিতা ও গানের ব্যবহার আশ্চর্য কয়েকটি মুহূর্ত রচনা করেছে।

সাধারণভাবে নাটকটির গঠন সুন্দর। ঘটনার সংঘাতের মধ্য দিয়ে কাহিনি স্বচ্ছন্দ গতিতে তার অনিবার্য পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। নাট্যমুহূর্তও নাট্য কৌতূহল রচনা এবং ব্যঙ্গকৌতুক উপাদানের প্রয়োগে পরিচালক আশানুরূপ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।” (আনন্দবাজার পত্রিকা: ২৩।১২।৬০)

মুখোশের সাজাহান :

“গত কুড়ি বছরের নবনাট্য আন্দোলন (যে আন্দোলন দ্বিজেন্দ্রলালকে যথোচিত স্বীকৃতি দানে কুণ্ঠিত)। শিল্প বিচারে এর সমতুল্য একটি মৌলিক নাটক উপহার দিতে পেরেছে কি? সম্ভবত একটিও না, যা ‘সাজাহানের পাশে সমান শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারে। মুখোশ সংস্থা (থিয়েটার দলের পূর্বনাম) এই কথাই আজ আমাদের নতুন করে বোঝাবার অবকাশ দিয়েছেন।…তরুণ রায়ের সম্পাদনার কাজ প্রশংসার দাবী রাখে।” (আনন্দবাজার পত্রিকা: ২৩/৮/৬৩)

মুখোশের রহস্য ‘নিশাচর’ :

ঐতিহাসিক পালা শেষ করে ‘মুখোশ’ দল এবার রহস্যের পশরা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। দ্বিজেন্দ্রলাল কৃত ‘সাজাহান’এর থিয়েটার সেন্টার মঞ্চে তাঁদের উপহার ধনঞ্জয় বৈরাগীর ‘নিশাচর’।… ধনঞ্জয় বাবুর প্রথম নাটকের তুলনায় এই দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধা আছে। অপরাধী তার অপরাধের বিশেষ পথটি কেন বেছে নিল।

ব্ল্যাকমেলের অস্ত্রটিকে তার দিক থেকে দুর্জয় মনে করবারও সঙ্গত কারণ ছিল কিনা এসব প্রশ্ন উঠতে পারে।… পরিচালক তরুণ রায়ের প্রয়োগ নৈপুণ্যের গুণে দর্শক উক্ত অথবা অন্য কোনো প্রশ্ন নিয়ে ভাববার বিন্দুমাত্র অবকাশ পাবেন না।…নাটকের বিশেষ রস দর্শকের চিত্তে সঞ্চারিত করে দিয়েছেন ‘মুখোশ’এর শিল্পীরা।

(আনন্দবাজার পত্রিকা: ২৭.৩.৬৪)

মুখোশের ‘পুড়েও যা পোড়ে না’ :

“নাটকের ঘটনাস্থল দগ্ধ রঙ্গমঞ্চ। ওই মঞ্চের শিল্পীরা প্রধান পাত্রপাত্রী। অগ্নিকাণ্ডের পরবর্তী কিছুদিন নিয়ে এর ঘটনাকাল।

বাস্তব ঘটনার সূত্রে মোটামুটি বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতে লেখক কতকটা আত্মবিশ্লেষণ করেছেন এবং গোটা দলটির উপর তাঁর বিচারের আলো ফেলেছেন। কাউকেই রেহাই দেননি, নিজেকেও না।…

এইসব আদর্শের কথা মূল্যবান এবং শিক্ষামূলক। যা কোনও নাটককে সহজেই ভারাক্রান্ত এবং কতকটা বিরস করে তুলতে পারে। কিন্তু নাট্যকারের বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গী এবং আঙ্গিকের অভিনবত্বের গুণে সমগ্র ব্যাপারটি দর্শকের চিত্ত আকর্ষণে সক্ষম। কাহিনির গতির সঙ্গে মুখোশ দলের পুরনো নাটকগুলির অংশ সুন্দরভাবে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাস্তবের সঙ্গে অভিনয় একাকার হয়ে গিয়েছে।” (আনন্দবাজার পত্রিকা: ৮/১/৬৫)

মৃতের ছায়া :

“থিয়েটার সেন্টারের নতুন উপহারেও এই বিচিত্রতার ধারা অক্ষুণ্ণ। ধনঞ্জয় বৈরাগী রচিত এই নাটকটির নাম ‘বিদেহী’–একটি বিদেহী চরিত্রের কখনও দৃশ্য, কখনও অদৃশ্য ক্রিয়াকলাপে, তার আশ্চর্য শক্তিতে, হয়তো বা অতিপ্রাকৃত প্রভাবে নিয়ন্ত্রিত, এ ধরনের নাটক ইতিপূর্বে কলকাতার রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়েছে কি?

…. নাট্যদ্বন্দ্বের নির্মাণ এবং রহস্য উপাদানের বিস্তারের কাজ এক রকম নিপুণ বলা চলে। তবে পোশাকি চরিত্রদের ব্যাপারগুলো আরো কমের মধ্যে রাখা যেত। এককথায় নাটকটিকে আরও সংবদ্ধ করবার অবকাশ আছে। নাটকটির প্রয়োগ কল্পনা সুষ্ঠু, আয়োজনও তদনুযায়ী পরিপাটি। মঞ্চ জুড়ে হাজারিবাগের বাড়িখানির দৃশ্যসজ্জা, সীমিত উপকরণে সাজানো, রুচির দান স্পষ্ট। কিছু প্রত্যক্ষ কিছু আভাসিত, বাকিটুকু দর্শক কল্পনা দিয়ে ভরিয়ে নেবেন, মঞ্চে এবং কখনও কখনও প্রেক্ষাগৃহের কিছু অংশ জুড়েও অভিনয় চলে। ভিতর বাহির একাকার করে।

দেবার আঙ্গিকটি এখানে সুপ্রযুক্ত।” (আনন্দবাজার পত্রিকাঃ ১৯৬৭) এককথায় থিয়েটার সেন্টার তথা ‘মুখোশ’ নাট্যদল সমালোচকের একপেশে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। ‘বহুরূপী’ও পেয়েছিল। তবে নব্য ধারার সূচনাটা তাঁরা করেছিলেন বলে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব পেরিয়ে করা হয়েছিল; আর সেই দ্বন্দ্বের শিকার হয়েছিল বহুরূপীর অনেকগুলি প্রযোজনা—অন্যদিকে অন্য দলের অপেক্ষাকৃত গৌণ প্রযোজনাও সমালোচকের উচ্ছ্বাস লাভ করে যায়।

নবনাট্য ধারার আর এক প্রতিনিধি স্থানীয় নাট্যদল লিটল থিয়েটার গ্রুপের অনেকগুলি সুপ্রযোজনার সমালোচনা আনন্দবাজারে প্রকাশিত হয়েছিল। লিটল থিয়েটার গ্রুপের ইংরেজি ও রবীন্দ্র প্রযোজনা সমালোচনা প্রকাশিত না হলেও পরবর্তীকালে গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনাগুলির সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। এই সমালোচনাগুলি কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে করা হয়েছিল এবং উৎপল দত্তের নেতৃত্বে এই দল যে স্বতন্ত্র এক নাট্যধারা নির্মাণে রত তাও প্রকাশিত ছিল সেই আলোচনাগুলিতে।

বহুরূপীর সমালোচনায় এই স্বাতন্ত্র্যের অনুসন্ধানটাই অনেক পরে করা হয়েছিল। বাংলা নাট্য সমালোচনার এক ট্র্যাজিডি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে এই ঘটনাকে। উৎপল দত্ত যে আনন্দবাজারের কাছে তখন যথেষ্ট গ্রহণীয় তার প্রমাণ তো আগেই পাওয়া গেছে। ‘আনন্দলোক’-এর উদ্বোধনই হয় তাঁর বিতর্কিত ‘নিশীথ চিন্তা’ আলোচনাটি দিয়ে। স্বভাবতই বোঝা যায় লিটল থিয়েটার গ্রুপের সমালোচনা গুরুত্ব পাবেই। নীচে উদাহরণ হিসেবে চারটি প্রযোজনার সমালোচনা অংশ তুলে ধরা হল।

মিনার্ভায় নতুন নাটক ‘ফেরারী ফৌজ’ :

“মিনার্ভা লিটল থিয়েটার দলের নবতম প্রয়াস ‘ফেরারী ফৌজ’-এর মধ্যেও দলটিকে আমরা নতুন করে চিনে নিতে পারি। নাটকের বিশিষ্টতা পাই, প্রথমত এর বিষয়বস্তুর মধ্যে, দ্বিতীয়ত উপস্থাপনায়। নাটকের গঠনগত এবং অন্যান্য ত্রুটি সত্ত্বেও প্রয়াসকে স্বাগত জানাতে দ্বিধা বোধ করি না…

এর ঘটনাপুঞ্জের বিন্যাসের মধ্যে নাটকীয়তা যতখানি আছে, তাদের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে সর্বত্র দর্শকের চিত্তে প্রত্যয় জাগানোর শক্তি আখ্যানভাগের ঠিক ততখানি নেই। আর একটি কথা: রোমান্টিক ভাবালুতার সম্পদে এ নাটক সম্পন্ন নয়। বরং সন্ত্রাসবাদীদের সংগ্রামের একটি সমীক্ষার প্রয়াস এতে লক্ষণীয়।

তাই কাহিনীর বহিরঙ্গের ত্রুটির চেয়ে বড় নাটকের ভাববস্তুর দিকটি। প্রশ্ন ওঠে : ‘ফেরারী ফৌজ’ কী বলতে চেয়েছে? বলতে চেয়েছে সন্ত্রাসবাদ বিপ্লবের পথ নয়। এর আগুনে দাহিকা শক্তি যতটুকু তার চেয়েও কম সেই আগুনের শোধনশক্তি। বলতে

চেয়েছে, ভ্রান্ত উপায়ে মহৎ লক্ষ্যে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। তবু যারা একদা জীবন পণ করে ভুল পথে মহৎ লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হতে চেয়েছিল, তারা যে ভুল করেছিল সে-ও এক মহৎ ভ্রান্তি। মনের দিক থেকে নিদারুণ যন্ত্রণা আর সংশয়ের মধ্য দিয়ে যে সত্য তারা ইতিহাসের কাছে সমর্পণ করে গেছে তা ‘ফেরারী ফৌজ’-এর মর্মকথা। তাদের মৃত্যুহীন প্রাণ এবং মহৎ ভ্রান্তি পরবর্তী কালের জন্য আলোক পথ রচনা করে গেছে।” (আনন্দবাজার পত্রিকা: ৩০/৬/৬১)

মিনার্ভার প্রহসন ভি.আই.পি :

“ভি.আই.পি. নাটকে একাধিক বিদেশি রচনার (তার মধ্যে একটি কি ‘দি ম্যান হু কেম টু ডিনার?) প্রভাব আছে। একথা নাটকের পরিচয় লিপিতেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রসহনধর্মী নাটক অতএব যুক্তি এবং সম্ভাব্যতার প্রশ্ন নিয়ে নাট্যকারকে চিন্তা করতে হয়নি। তিনি লক্ষ্য রেখেছেন, মজাদার পরিস্থিতি রচনার দিকে, আর গতির দিকে। বহু চরিত্র সংবলিত ঘটনার শাখা-প্রশাখায় আকীর্ণ এই নাটক মঞ্চে দৃশ্যত গতিসম্পন্ন, সন্দেহ নেই।…

অভিনয় কালের শুরু থেকে প্রায় শেষ পর্যন্তই প্রেক্ষাগৃহ হাস্যমুখর হয়ে থাকে। কিন্তু এই হাসি বিমল আনন্দের দূত হয়ে আসে না। বরং এক্ষেত্রে অবিশ্রান্ত হাসির অবশেষে যদি কোনো বস্তু দর্শকের চিত্তে স্থান করে নেয়, তবে তা হল অবসাদ। কেন? একটি কারণ, অবশ্য পৌণপুনিকতার দোষ। দ্বিতীয়ত, প্রসহনের পক্ষে নাটকটির অভিনয়কাল একটু বেশি দীর্ঘ। তৃতীয়ত, এ নাটকের শক্তি যেখানে, দুর্বলতাও সেখানে। হাস্যরস রচনার প্রধান উপাদানরূপে নাট্যকার ব্যবহার করেছেন সংলাপকে। সংলাপ সরস, তীক্ষ্ণ এবং তার মধ্যে অংশত স্বতঃস্ফূর্ত ভাব আছে।…

অনেক দিন ধরেই লিটল থিয়েটার দল নাটকে অশ্লীলতার অনুশীলন করছেন। এবারে অশ্লীল ইঙ্গিতে আর কদর্য রসিকতায় তাঁরা নিজেদের পুরাতন সব কীর্তি অতিক্রম করে গেছেন।…

অথচ আশ্চর্য, এই নাটকের অভিনয়েও লিটল থিয়েটার দলকে মঞ্চে চিনে নিতে একটুও ভুল হবে না। সেই চমৎকার, নিখুঁত টিম-ওয়ার্ক, সেই বিস্ময়কর মঞ্চ সজ্জার ব্যবস্থা; সেই অনবদ্য প্রযোজনা।…” (আনন্দবাজার পত্রিকা : ৯/৫/৬২)

সুপ্রযোজিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ :

“মিনার্ভা রঙ্গালয়ের নূতন উপহার ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ওই রচনার মঞ্চরূপ সম্ভব্যতা সম্পর্কে সম্ভবত আগে কেউ নিঃসংশয় ছিলেন না। আর প্রযোজনা যদি দৃশ্যকাব্যের প্রধান কথা হয়, তবে সবিশেষ প্রশংসা এই প্রয়াসের অবশ্যই প্রাপ্য। লিটল থিয়েটার দল তাঁদের স্বীকৃত কৃতিত্ব অতিক্রম করেছেন।

অভিনয়ের আসর কি মিনার্ভার স্থানু মঞ্চ? সেই পরিচিত মঞ্চস্থল তো বটেই, কিন্তু ওই পরিসরের মধ্যেই আসর আবদ্ধ নয়। এ মঞ্চের এখন নানা ব্যাপ্তি। বিশেষভাবে লক্ষণীয় নতুন একফালি মঞ্চ, মূল আসর থেকে যেটি বেরিয়ে এসেছে; প্যাসেজের প্রায় এক তৃতীয়াংশ সেই মঞ্চে জোড়া। অভিনেতাদের আগমন-নির্গমনের বহু পথ।

বলতে গেলে, গোটা প্রেক্ষাগৃহ জুড়েই তাঁদের গতিবিধি। অনুমান করা দুঃসাধ্য কে কখন কোন দিক দিয়ে আসবেন, কোথায় হঠাৎ কথা বলে উঠবেন। এই নাট্য প্রযোজনা যেন তিন ঘণ্টা ব্যাপী এক জটিল কর্মকাণ্ড, বা বুঝি একটি গাণিতিক নিয়মে নিয়ন্ত্রিত। সব মিলয়ে, প্রযোজনা, ঐকতানের সুরে পত্রিকা: ২৯/৩/৬৩) কোথাও তালভঙ্গ হয়নি। (আনন্দবাজার এরপরে ২২.৪.৬৪তে চৈতালি রাতের স্বপ্ন এবং ১৫.৫.৬৪তে ‘ওথেলো’ প্রযোজনার সমালোচনা প্রকাশিত হয়।

আলোচ্য সমালোচনাগুলিতে বারবারই নাটকের কাঠামো এবং সংলাপ সম্পর্কে সমালোচনা থাকলেও সমালোচকের সপ্রশংস দৃষ্টিভঙ্গি ধরা পড়ে অনায়াসে। লিটল থিয়েটারের প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকার এই পৃষ্ঠপোষকতা ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল। ওই বছরে ‘কল্লোল’ প্রযোজনার পর লিট্ল থিয়েটার পৃষ্ঠপোষকতা তো পায়ইনি, বরং নাটকের বিজ্ঞাপন নেওয়া বন্ধ করে দিয়ে চরম অগণতান্ত্রিক কাজটাই করে বসেছিল আনন্দবাজার পত্রিকা। সেই সময়ের বাংলাদেশ সেই উত্তাল সময়ের সাক্ষী বহন করেছিল। স্বভাবতই ‘কল্লোল’ নাটকের সমালোচনায় প্রবল বিরূপতার সাক্ষ্য বর্তমান।

“নাটক হিসেবে এর সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক নামমাত্র। রাজনৈতিক কোলাহলেই তো ভারাক্রান্ত। ১৯৪৬ সনের বোম্বাই নৌবিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত ‘কল্লোল’-এর মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র বিপ্লবের আদর্শ প্রচার স্পষ্টতই নাট্যদলটির প্রধান উদ্দেশ্য।… কিছু সত্য আর কিছু অর্ধসত্য কথা সাজিয়ে কোনো কোনো শক্তিমান বক্তাকে নির্বাচনী প্রচার সভায় সরল শ্রোতাদের আস্থা অর্জন করে নিতে দেখা যায়। তেমন কোনো জোরালো বক্তৃতার সঙ্গে ‘কল্লোল’ তুলনীয়।

… দেখানো হয়েছে জাহাজীদের নেতা শাদুল সিং পোতাশ্রয়ের নিকটে তার বাড়ির কাছাকাছি কোথাও অনেকদিন ধরে গোপনে প্রচুর অস্ত্র সংগ্রহ করে রাখছিল। বিদ্রোহের সঙ্গে কমিউনিস্ট দলকে যুক্ত করার চেষ্টা স্পষ্ট…শুধু তাই নয়, বিদ্রোহীদের দলনেতা শার্দুল সিং এক জায়গায় বলেছে, ওদের লড়াই নিজেদের চাকরির সুবিধা আদায়ের জন্য নয়, স্বাধীনতার জন্যও নয়…এ লড়াই সকল মালিকের বিরুদ্ধে। অর্থাৎ কমিউনিস্ট বিপ্লবের আদর্শের কথাই তার সংলাপে সোচ্চার।” (আনন্দবাজার পত্রিকা: ১১/৬/৬৫)

আনন্দবাজার পত্রিকার বিরোধিতা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, লিটল থিয়েটারের প্রতি যে-কোনো পত্রিকাই যদি সপ্রশংস ভূমিকা নিত তাহলেও তাদের বিরূপতা উক্ত পত্রিকার উপরেও পড়ত। উদারহণ স্বরূপ ‘গন্ধব’র কথা বলা যায়। ‘গন্ধর্ব’ পত্রিকায় দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে লিটল থিয়েটারের ‘স্পেশাল ট্রেন’ নাটিকাটির একটি সমালোচনা প্রকাশিত হবার পর আনন্দবাজার পত্রিকা ‘গন্ধর্ব’ নাট্যদলের প্রযোজনা বিষয়ে শুরু থেকে যে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছিল তা বন্ধ করে দেয়।

আনন্দবাজারের সমালোচনার পৃষ্ঠাতেই তার প্রমাণ মিলে যাবে। প্রসঙ্গত আরও একটি কথা বলা যায় যে, ষাট সালের শুরুতেই যে-উদ্দেশ্য নিয়ে ‘আনন্দলোক’ বিভাগটি চালু হয়, শেষ পর্যন্ত তা কিন্তু বজায় থাকেনি। শুরুর সাক্ষাৎকারে প্রবোধবন্ধু অধিকারী যা বলেছিলেন, পরে তাকে ভিন্নমত জানাতেই হয়। নাট্যকার তাঁর নাটকের মধ্য দিয়ে যে কথাটি বলতে চেয়েছেন, নাট্য নির্দেশক তাঁর সঙ্গে একমত হয়ে তাকে বাস্তবায়িত করবার প্রয়াসে কতখানি সার্থক হয়ে উঠেছেন, সমালোচনায় তাকেই তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

কিন্তু আমরা দেখলাম কিছুদূর পর্যন্ত এই প্রয়াস থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা রক্ষিত হয়নি। তাই নিরপেক্ষ সমালোচনার নামে আনন্দবাজার পত্রিকার ‘কল্লোল’এর সমালোচনার সঙ্গে অতুল্য ঘোষ সম্পাদিত ‘জনসেবক’ পত্রিকার ১৬ ডিসেম্বর ১৯৬৫-তে প্রকাশিত সমালোচনার ভাষায় কোনো তফাৎ থাকে না

“এ নাটকে শুধুমাত্র ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়নি, সত্যের অপলাপ হয়নি, তথ্যকে অস্বীকার করা হয়নি, করা হয়েছে ভারতীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মূলোৎপাটনের অপচেষ্টা…আশ্চর্য হয়ে ভাবি যে নাটকের মোটিভ জানা। যে নাটকে জাতীয় নেতাদের অপদস্ত করা হলো, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জীবনভর বেইমানী করে নৌ-বিদ্রোহের ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’ এজেন্ট সাজান হলো, কমিউনিস্ট ঝান্ডা উড়িয়ে ভবিষ্যতের বিদ্রোহের ইঙ্গিতেও ভবিষ্যৎ বিপ্লবেও ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হলো ভারতীয় ধ্যান-ধারণা ও সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করে।”

উৎপল দত্ত ও তাঁর থিয়েটারের সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার পৃষ্ঠপোষক ভূমিকা আর কখনোই গড়ে ওঠেনি। ফলে আমৃত্যু উৎপল দত্তকে এই পত্রিকার সমালোচনার সঙ্গে বিরূপ মনোভাব পোষণ করেই চলতে হয়েছে। বরং ‘বহুরূপী’র কাজকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হল—যে গুরুত্ব তাদের অনেক আগেই প্রাপ্য ছিল। সেই সঙ্গে নান্দীকার এবং অন্যান্য দলের প্রযোজনাগুলিও নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকল।

প্রায় একই চিত্র ‘যুগান্তর’ পত্রিকাতে স্পষ্ট। বস্তুত ষাটের দশকের আগে কোনো পত্রিকাই নাট্যধারাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। পেশাদার মঞ্চ সম্পর্কে কিছুটা দুর্বলতা দেখালেও অপেশাদার শৌখিনরা তখন দূরাগত। ‘যুগান্তর’ পঞ্চাশের দশকে থিয়েটারের এই দুই ধারাকে কেমন ভাবে দেখত, তার প্রমাণ সমালোচনাগুলিতেই রয়েছে।

মিনার্ভার নতুন নাটক ‘মহানায়ক শশাংক’ :

“ঐতিহাসিক নাটক দেখায় আজকাল দর্শক শ্রোতাদের বোধ করি তেমন উৎসাহ নেই। তা যদি না হবে তবে বিখ্যাত নাট্যকার প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক এবং বিশিষ্ট নাট্যবোদ্ধারা সবাই মিলে যে নাটকের প্রশংসা করলেন বলে শুনতে পাই তা দেখতে তেমন ভিড় হচ্ছে না কেন? কথাটা হচ্ছে মিনার্ভায় চলতি নাটক ‘মহানায়ক শশাংক’ সম্বন্ধে।

ফিল্মের জন্য নাটকের প্রতি মানুষের আকর্ষণ নেই— স্টারে ‘শ্যামলী’ এবং রঙমহলের ‘উদ্ধা’র একটানা অব্যাহত গতি প্রত্যক্ষ করার পর, একথা আজ আর কে বিশ্বাস করবে? তবে কি বুঝতে হবে লোকে শুধু সামাজিক নাটক চাইছে? অথবা চমকপ্রদ অন্য কিছু? এ ধারণাও সম্পূর্ণ সত্য কিনা, তাও ভেবে দেখার বিষয়। কারণ রঙ্গমঞ্চে ঐতিহাসিক নাটকের অবদানের কথা কারো অজানা নয়; তবে একথা মানতে হবে—যুগের পরিবর্তন হয়েছে, আজকের মানুষরা বদলেছে।

অথচ সেই পরিবর্তিত যুগের উপযোগী ঐতিহাসিক নাটক সৃষ্টি হয়েছে কিনা—এটা অবশ্য তর্কের বিষয়। তা যদি না হয়ে থাকে তবে ঐতিহাসিক নাটক দেখিয়ে যদি বর্তমানের দর্শককে আনন্দ ও শিক্ষা দিতে হয়, তবে তার রচনা ও প্রয়োগেও যথেষ্ট পরিবর্তন সাধন করতে হবে।…’মহানায়ক শশাংক’তে সেই পরিবর্তিত যুগ মানসের কিছুটা আভাস পাওয়া যায়, যদিও তা বেশবাস ও অঙ্গসৌষ্ঠবে প্রয়োজনের তুলনায় কিঞ্চিৎ দীন….

অভিনয়, নাচ গান ও মঞ্চসজ্জা সব দিক থেকে মিনার্ভা থিয়েটারে অনেকদিন পর একখানা যুগোপযোগী ঐতিহাসিক নাটক দেখা গেল এবং থিয়েটারের ক্ষেত্রে এক অভিনব ফ্ল্যাশব্যাক পদ্ধতির প্রয়োগ প্রত্যক্ষ করা গেল এই নাটকে। নাটকের সমাপ্তি দৃশ্য অত্যন্ত আধুনিক। শেষ মুহূর্তে শশাংকের কী হলো, সে কৌতূহল থেকেই যায়।” (যুগান্তর পত্রিকা: ১১/১১/৫৫)

সমালোচনাটিতে দুটি ইঙ্গিত আছে। প্রথমত, দর্শক এই ধরনের নাটক চাইছেন না, তাই বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা যতই প্রশংসিত হোক নাটক দেখার মানুষ নেই। সময়টা যে বদলে গেছে, থিয়েটারবোধ পালটে গেছে, সমালোচক অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বেও সে-কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, প্রযোজনাকে আধুনিকতর করে তোলার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে। তৎকালের থিয়েটারের ধারায়, প্রয়োজনায় অভিনবত্বের সমাবেশ প্রয়োজন ছিল, বেঁচে থাকার তাগিদেই ছিল। কিন্তু ‘মহানায়ক শশাংক’র মতো প্রযোজনা তবুও বেঁচে থাকেনি।

অথচ সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় তার গুরুত্ব যতটা নবনাট্যধারার গুরুত্ব ততটা নেই। তাই ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রযোজনার সংবাদই প্রকাশিত হয়, সমালোচনা নয়। “ভারতীয় গণনাট্য সংঘের মধ্য কলকাতা শাখার উদ্যোগে আগামী ২৬শে জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় মুশ্লিম ইনস্টিটিউটে মমতাজ আহমদ খাঁ রচিত ও পরিচালিত নতুন নাটক ‘ইস্পাত’ মঞ্চস্থ হবে।

শ্রীমতী কনক ভট্টাচার্য, কালী সরকার, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, সুধী প্রধান, চারু ঘোষ, মমতাজ আহমদ খাঁ, সঞ্জীব মুখার্জী, আদিত্য পাল, অমল কর, প্রভৃতি বিভিন্ন ভূমিকায় অংশ নেবেন।” ঐতিহাসিকভাবে এই সংবাদটুকুর গুরুত্ব যথেষ্ট হলেও আজ কিন্তু মনে হয়, প্রযোজনাটি কেমন হয়েছিল সেটুকু জানতে পারলে আরও ভালো হত, কিন্তু সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় তখন জায়গা দিত না।

আরও একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, পেশাদার মঞ্চ প্রযোজনায় যত সহজে বিষয়গত মহত্ব খুঁজে পেতেন সমালোচকগণ নবনাট্যধারা নাটকের বিষয়-মহত্ব ততটা তাঁদের আকর্ষণ করত না। পরিবর্তিত নাট্যবিষয়কে মেনে নিতে অসুবিধা বোধ করতেন তাঁরা, ঐতিহাসিক-ভক্তিমূলক-সামাজিক বিষয়ের নেশা কাটাতে একটু সময় তো লাগবেই। তবে এটা ঠিক যে নবনাট্যের প্রয়োগ ও অভিনয় সম্পর্কে তারা প্রশংসনীয় ভাবে সদর্থক ভূমিকা নিয়েছিল।

উদাহরণ স্বরূপ তুলসী লাহিড়ির ‘নাট্যকার’ প্রযোজনাটির উল্লেখ করা যেতে পারে, “ ‘নাট্যকার’ একটি একাঙ্কিকা। মাত্র চল্লিশ মিনিটে এই একাঙ্কিকাটি পরিবেশিত হয়। নাটক যাঁরা লেখেন অর্থাৎ যাঁরা নাট্যকার তাঁদের ধর্ম ও কর্তব্য সম্বন্ধে শ্রী লাহিড়ি এই একাঙ্কিকায় বহু রসপুষ্ট ও সুচিস্তিত সংলাপে তাঁর বক্তব্য পেশ করেছেন।

নিঃসন্দেহে এই নাটিকা দর্শকদের মনোরঞ্জনে সমর্থ হয়েছে। বিশেষত এই নাটিকার প্রধান চরিত্রগুলির সুদক্ষ অভিনয় যে প্রেক্ষক শ্রোতাদের খুশি করেছে তা বলাই বাহুল্য, কেননা এই চরিত্রগুলিতে ছিলেন নাট্যকার তুলসী লাহিড়ী নিজে, কালী সরকার, নিবেদিত দাসের মত খ্যাতনামা শিল্পীরা। শ্রী লাহিড়ী এই নাটিকার একটি বিশিষ্ট চরিত্রের মাধ্যমে বলেছেন : নাট্যকারের যুদ্ধ হচ্ছে সব নাটকেই সত্য কথা বলা। তৎরচিত ‘নাট্যকার’-এ সেই সত্য কথন আছে এবং সে সত্য তিক্ত অথচ চরম সত্য।

কিন্তু এই সত্য কথন কোন ঘটনার দ্বারা বিবৃত নয়। আর এই নাটকের কোন আরম্ভও নেই। অর্থাৎ নাটিকাটি সর্বাংশে রসোত্তীর্ণ নয়। সুতরাং পরিপুষ্ট একাঙ্কিকা হিসাবে ‘নাট্যকার’ বর্তমান লেখককে খুশি করতে পারেনি।” (যুগান্তর : ১৭/০২/৫৬)

তবে নতুন যুগের নাট্যধারাকে এই পত্রিকা উপেক্ষা করেনি। বরং অন্যান্য পত্রিকার অনেক আগেই যুগান্তর নবনাট্যকে গুরুত্ব সহ সমালোচনার পৃষ্টপোষকতা করেছে। সমালোচকদের পছন্দ-অপছন্দ থাকলেও নতুনকে নতুন বলে মেনে নিতে দ্বিধা ছিল না। ‘প্রত্যাবর্তন’ নাটকের সমালোচনা প্রসঙ্গেই এই স্বীকৃতি আছে।

“বাংলা রঙ্গমঞ্চের একটি নতুন যুগের সূত্রপাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই নতুন নতুন যুগে দর্শকদের আরাম-বিরামের সঙ্গে যেমন নতুন উপকরণ নিয়ে মনোরঞ্জনের চেষ্টা চলছে, তেমনি জনকয়েক নামী শিল্পীর বদলে বহুসংখ্যক উদ্যমী শিল্পীর সমাবেশ বৈচিত্র্যময় নাটকোপন্থার সৃষ্টিরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় সন্দেহ নেই। এদিক দিয়ে বিশেষভাবে শেষোক্ত বিষয়ে অগ্রণী হয়েছেন বর্তমান মিনার্ভা থিয়েটার।” (যুগান্তর পত্রিকা : ২৮/১২/৫৬)

১৯৫৭ সালেই ছ-টি প্রকাশিত নাট্য সমালোচনার মধ্যে তিনটি পেশাদার মঞ্চের প্রযোজনার সমালোচনা ও তিনটি নবনাট্য প্রযোজনার সমালোচনা প্রকাশিত হয়। অন্য কোনো সংবাদপত্রে এই সময়ে এমন সমানাধিকার দেয়নি। এসময়ের সবচেয়ে উল্লেখিত প্রযোজনা সমালোচনা লিট্ল থিয়েটার গ্রুপের ‘সিরাজদ্দৌলা’, এই নাটকের সমালোচনা আর কোনো সংবাদপত্রেই প্রকাশিত হয়নি। সেই সমালোচনাটির কিছুটা অংশ তুলে দেয়া হল,

“গত মঙ্গলবার প্রখ্যাত নাট্য সম্প্রদায় লিটল থিয়েটার গ্রুপ রঙমহলে গিরিশচন্দ্রের ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকটি অভিনয় করলেন। পেশাদার মঞ্চে যারা গিরিশচন্দ্রের ‘সিরাজদ্দৌলা’ দেখেছেন, লিটল থিয়েটার গ্রুপের অভিনয় ধারার সঙ্গে তাদের তফাৎটা সহজেই চোখে পড়বে। ইতিহাসকে এঁরা যেমন অনুসরণ করেছেন, তেমনি জনগণের দৃষ্টিতে সেই ঐতিহাসিক বিবর্তনের রূপটি কি ছিল তাও তুলে ধরতে প্রয়াস পেয়েছেন। স্বভাবতই তাতে সাধারণের দৃষ্টিতে নাটকীয় ঘাত-প্রতিঘাত কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে; কিন্তু লিটল থিয়েটারের বৈশিষ্ট্যও প্রকাশ পেয়েছে তাতেই। পারিপার্শ্বিক রচনার দিক থেকেও এ নাটকটিকে এরা সাজিয়েছিলেন চমৎকার। প্রতিটি দৃশ্যেরই অভিনবত্ব লক্ষণীয়। অবিনয়ে লুৎফা, ফকীর, করিম চাচা, এবং ওয়াটস সর্বাধিক প্রশংসার যোগ্য।” (যুগান্তর পত্রিকা : ২৮/৬/৫৭)

একটা ঐতিহাসিক নাটককে সময়োপযোগী করে তুলতে তার সর্বস্তরের পরিবর্তনের প্রয়াস পেশাদার মঞ্চে কখনও ছিল না। সমালোচনা নতুন নাট্যধারার সেই পরিবর্তনের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন অত্যন্ত সঠিক ভাবে। আর কিছুদিন বাদেই বাংলা থিয়েটারে তথাকথিত অপেশাদার সৌখিনেরাই চালকের আসনে বসবে এই ইঙ্গিত নাট্য সমালোচনাগুলির মধ্যে স্পষ্টভাবেই ছিল।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত সমালোচনাগুলির মাধ্যমে ‘যুগান্তর’ই প্রথম সেই ইঙ্গিত দিয়েছিল। যেমন সাজঘর নাট্যদলের ‘মৌচোর’ নাটকের সমালোচনায় লেখা হয়েছিল, “রঙমহল মঞ্চে সাজঘর নামে সদ্য পরিচিত নাট্যসংস্থার নাটক ‘মৌচোর’ প্রথম অভিনীত হল।… ‘মৌচোর’ নাটকখানি রচনা ও পরিচালনা করেছেন সলিল সেন। ‘নতুন ইহুদী’র মত এই নাটকখানিতে তিনি আবার একটা নতুন বিষয়বস্তুকে এনে পাদপ্রদীপের সন্মুখে হাজির করেছেন।

আঠারো ভাটি বাদা অঞ্চলের যে অসহায় মানুষেরা জীবন বিপন্ন করে সুন্দরবনের গভীর দেশে মধু, গোলপাতা বা ঐ জাতীয় পণ্যদ্রব্য আহরণ করতে যায়, তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-ভালবাসাকে নাট্যকার এই নাটকে অত্যন্ত সমবেদনার দৃষ্টি দিয়ে তুলে ধরেছেন। প্রথমতঃ মৌলিক বিষয়বস্তু, দ্বিতীয়ত জোরালো অভিনয়ের গুণে ‘মৌচোর’-এর প্রথম অভিনয় থেকে এই নাটকখানি সম্বন্ধে বেশ একটা সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেল। প্রত্যেক শিল্পী দরদ দিয়ে তাঁর অংশকে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন। তার ফলে নাটকের আবেদন গভীরে গিয়ে পৌঁছেছে।” (যুগান্তর পত্রিকা: ১২/৩/৫৭)

১৯৫৯ সালে বঙ্গ নাট্য সাহিত্য সম্মেলন উপলক্ষ্যে যুগান্তরে ২৭.৩.৫৯ তারিখে প্রকাশিত একটি ক্রোড়পত্রে নারায়ণ চৌধুরী ‘বাংলা নাট্য সাহিত্যের প্রগতি’ এবং দেবব্রত মুখোপাধ্যায় ‘বাংলার সৌখিন নাট্য প্রচেষ্টা’ শিরোনামে দুটি প্রবন্ধ লেখেন। আলোচনা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, বাংলা রঙ্গমঞ্চে পালাবদল ঘটে যাবার অকপট স্বীকৃতি ছিল সেখানে। তখনও পর্যন্ত অন্য কোনো সংবাদপত্র প্রবন্ধ প্রকাশ করে এই ধরনের স্বীকৃতি দেয়নি। নারায়ণ চৌধুরী লিখেছিলেন,

“আজকাল অপেশাদার নাট্যসংস্থাগুলির হাবভাব পেশাদার রঙ্গমঞ্চের উপরও প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে। পেশাদার রঙ্গমঞ্চে পরিচালকেরা নিছক আত্মরক্ষার তাগিদে নবীনত্বের উপাদানগুলিকে আত্মস্থ করবার চেষ্টা করেছেন।… এ থেকে বোঝা যায়, বাংলা থিয়েটারের মোড় ফিরছে। তার ইতিহাসে পর্বপরিবর্তন ঘটেছে, এটি অসংশয় একটি শুভ লক্ষণ।”

আর দেবব্রত মুখোপাধ্যায় লিখলেন, “নবনাট্য প্রচেষ্টা সৌখিন নাট্যদলগুলির মাধ্যমেই অগ্রসর হয়ে চলেছে। বাংলাদেশে নাটকের আদর হচ্ছে না। নাটকের ক্ষেত্রে নতুন কিছু হচ্ছে না বলে কিছু দিন আগে যে হাহাকার উঠেছিল তা এখন অনেক অংশেই কমেছে এক্ষেত্রে সৌখিন নাট্যদলগুলির অবস্থানই নিঃসন্দেহে সর্বাপেক্ষা বেশী।

অনেকে আপত্তি করবেন। বলবেন যে কী কথা। পেশাদার মঞ্চগুলো এত কায়দা কানুন করছে, প্রতিটি নাটকই শত শত রজনী অভিনয় চালাচ্ছে, এবং বাংলাদেশের নবনাট্য আন্দোলনে তাদের কোনো দান নেই? সত্যি কথা পেশাদার নাট্যমঞ্চগুলো দর্শকের অনেক সুখসুবিধার ব্যবস্থা করেছে, প্রতিটি নাটকই রাতের পর রাত চালাচ্ছে.. কিন্তু সত্যি করে বাংলা নাটকের অগ্রগতির পথে ইতিহাসের বিচারে তাদের দাম কতটুকু?….

একথা অস্বীকার করে লাভ নেই যে, পেশাদার মঞ্চে পরীক্ষা নিরীক্ষার আবহাওয়া নেই। বলা বাহুল্য পেশাদার হবার ফলে এঁদের ঝুঁকি নেবার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আর এখানেই সৌখিনতার জিৎ।… পেশাদার রঙ্গমঞ্চে যেখানে বক্স অফিসের দিকে নিবদ্ধ দৃষ্টি, সৌখিনরা তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যস্ত। আর এ পরীক্ষা শুধু আঙ্গিক নিয়েই নয় নাটকের মাধ্যমে জীবনের সত্যকে রূপায়িত করার পরীক্ষাও বটে।”

এই আলোচনা দুটির কয়েকটি লাইন বিশেষভাবে নজর কাড়ে, ‘পেশাদার রঙ্গমঞ্চের পরিচালকেরা নিছক আত্মরক্ষার তাগিদে নবীনত্বের উপাদানগুলিকে আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছেন।’ কয়েকমাস বাদেই আমরা দেখব বিশ্বরূপায় ‘সেতু’ নাটকের জন্য অভিনেত্রী হিসেবে নিয়ে আসা হল তৃপ্তি মিত্রকে এবং আলোক সম্পাতের জন্য তাপস সেনকে; এর ফলে ‘সেতু’ সাফল্য পায়। যুগান্তরে এই প্রযোজনার সমালোচনায় লেখা হল,

“বিশ্বরূপায় তৃতীয় নাট্যোপহার ‘সেতু’ দেখার জন্য নাট্যমোদীদের প্রতীক্ষায় থাকাই স্বাভাবিক। সে প্রতীক্ষা সার্থক হয়েছে তৃপ্তি মিত্রের বিচিত্র সুন্দর অভিনয়ে, তাপস সেনের আলোক সম্পাতের চমৎকারিত্বে এবং আঙ্গিক সৌষ্ঠব ও প্রদর্শন নৈপুণ্যে ‘সেতু’ মনোরঞ্জনকারী রূপ নিয়েই দর্শক সমক্ষে উপস্থিত হয়েছে।….

‘সেতু’ নাটকের সর্বশ্রেষ্ঠ আকর্ষণ অসীমার ভূমিকায় তৃপ্তি মিত্রের অনিন্দ্য সুন্দর অভিনয়।… “সেতু’ নাটকের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ তাপস সেনের অপূর্ব আলোক সম্পাত।

আলোছায়ায় মায়াজাল সৃষ্টি করে ভীমবেগে একটি ট্রেনে আগমন বার্তাসূচক যে অভিনব দৃশ্যটি রচনা করেছেন তিনি, এ নাটকে তা এক অভাবনীয় এফেক্ট সৃষ্টি করেছে।” (যুগান্তর : ১৩/১১/৫৯)

মূলত নবনাট্য আন্দোলনের দুই প্রতিভাকে নিয়ে ‘সেতু’ শত শত রজনী অতিক্রান্ত হলেও সেটা শেষ পর্যন্ত পেশাদার মঞ্চের আত্মরক্ষার তাগিদে নবীনত্বের উপাদান আত্মস্থ করার নজির হিসেবেই থেকে যায়। ফলে দ্বিতীয় আলোচনাটির বলা কথাগুলিই মনে আসে, ‘পেশাদার মঞ্চগুলো এত কায়দা কানুন করছে, প্রতিটি নাটকই শতশত রজনী অভিনয় চালাচ্ছে, আর বাংলাদেশের নবনাট্য আন্দোলনে তাদের কোন দাম নেই।’ সত্যিই বোধ হয় তেমন করে দামী হয়ে ওঠে না।

যে অর্থে প্রায় একই সময়ে ‘অঙ্গার’ যতটা দামী হয়ে ওঠে, ‘সেতু’ হয় না। বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় ‘অঙ্গার’ সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেন, “ ‘অঙ্গার’ সম্ভবত ইউরোপীয় কিম্বা সোভিয়েট রঙ্গমঞ্চের যান্ত্রিকতার দৃশ্যকেও সাফল্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে।…কিন্তু একমাত্র যান্ত্রিকতাই সবচেয়ে বড় কথা নয়, এর আত্মিক দিক কি চিন্তা ও ভাবের দিকও অনন্যসাধারণ।

এ পর্যন্ত বাংলা রঙ্গমঞ্চ বহু পৌরাণিক-ঐতিহাসিক ও সামাজিক নাটকের গৌরবমণ্ডিত অভিনয়ের দ্বারা ধন্য হয়েছে। কিন্তু সর্বপ্রথম একেবারে নিঃস্ব মজুরদের কিম্বা প্রোলেটারিয়েটদের দুঃসহ জীবনসংগ্রামের এক মর্মান্তিক বাস্তব চিত্র। তার নিষ্ঠুরতা ও মানবতা নিয়ে আমাদের মঞ্চে দেখা দিল এবং দেখা দিল সার্থক অভিনয় নিখুঁত প্রযোজনার মাধ্যমে।” (যুগান্তর : ১৮/৩/৬০) এখানেই নবনাট্য ধারার জিৎ।

‘যুগান্তর’-এর (১/১/৬০) তারিখে ‘সাম্প্রতিক বাংলা নাট্য আন্দোলন’ শীর্ষক আলোচনায় সরসিজ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন…“বাংলার নাট্য আন্দোলন পেশাদার ও অপেশাদার এই দুই ধারায় প্রবাহিত হয়ে এসেছে। রঙ্গমঞ্চের মালিকেরা স্বভাবতই তাঁদের নজর রাখেন বক্স অফিসের দিকে।

জনগণের সামনে ভালো নাটক পরিবেশন করার দায়িত্ব তাঁরা নিতে রাজী নন। তাঁরা বাংলা নাটকের উৎকর্ষের জন্য বিন্দুমাত্র ব্যস্ত নন। তাই শ্যামলী, উল্কা, ক্ষুধা, মায়ামৃগের মত নাটক উপস্থিত করতে তাঁরা বিন্দুমাত্র সংকোচ প্রকাশ করেন না। এদের মধ্যে কোনটি আবার ৫৭৩ রজনী অভিনীত হয়ে বাংলা নাটকের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে। শততম রজনীর স্মারক উৎসবে এই সমস্ত তথাকথিত নাটকের প্রশস্তিতে মুখর হয়েছে রঙ্গমঞ্চ।

কিন্তু এই অর্ডার মাফিক নাট্য রচনা যে বাংলা নাটকের ইতিহাসে কোন স্থায়ী কীর্তি রেখে যেতে পারবে না, সে কথা এরা ভুলে যান। সত্যিই রঙ্গমঞ্চের অভিনয় দেখলে নিরাশ হতে হয়। মনে হয়, আমরা এ কোন যুগের রঙ্গমঞ্চে বসে আছি?… কখনও কখনও অবশ্য রঙ্গমঞ্চের মালিকেরা কোন অপেশাদারী দলের অবিস্মরণীয় নাট্য প্রতিভাকে দলে ভিড়িয়ে নতুন চমক দেবার চেষ্টা করেন। কিন্তু এ যেন এক ঝাঁক বকের মধ্যে একটি রাজহাঁস। তাতে মূল সমস্যার কোন সমাধানই হয় না।”

অতএব ‘যুগান্তর’-এও ১৯৫৭ সালের পর থেকে কমতে কমতে পেশাদার মঞ্চ প্রযোজনার সমালোচনার সংখ্যা ১৯৬০-এর পর একেবারে কমে এল। যুগান্তরে ‘বহুরূপী’র তুলনায় লিট্ল থিয়েটার গ্রুপ প্রাধান্য বেশি পেয়েছে। এই দুটি দল ছাড়াও অন্যান্য দলগুলির নিয়মিত সমালোচনা প্রকাশিত হতে থাকল। সাজঘর, রূপকার, অনুশীলন সম্প্রদায় প্রমুখ দলের সমালোচনাগুলি ঐতিহাসিক ভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। নীচে কয়েকটি নাট্য সমালোচনার কিছু অংশ তুলে ধরা হল।

‘সাজঘর’-এর দুটি সুন্দর নাটিকা ঃ

“‘মৌ-চোর’-এর পরে এ দুটি নাটক সাজঘরের সুনাম বৃদ্ধি করবে।

বিশেষ করে প্রথম নাটক ‘সন্ন্যাসী’-তে যে মানবিক মূল্যবোধ আরোপিত হয়েছে তা মননশীল প্রতিটি দর্শককে আনন্দবেদনায় আপ্লুত করে তোলে। একটি প্রণয় ঘটিত আত্মহত্যার যবনিকা বিশ বছর পরে যে রহস্য উদ্বেগ ও আবেগের সঙ্গে উত্তোলিত হয়েছে তা অপূর্ব, চিরন্তন মাতৃত্বের যে ভাবাদর্শ নাট্যকার তুলে ধরেছেন তা তাঁর অন্যান্য নাটকের চেয়েও মহৎ..

দ্বিতীয় নাটকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রসের। এটি সম্পূর্ণ হাস্যরসাত্মক। এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চারটি ভিন্ন ভাষাভাষী ‘ব্যাচেলার’-এর রসকৌতুক ও অপরিচিত ভাষার অনাবিল হাস্যস্রোত প্রেক্ষাগৃহকে হাসির হাটে পরিণত করে।” (যুগান্তর : ১৯/০৫/৬১)

রূপকারের দুটি নাটক :

রূপকার অভিনীত ‘কালের যাত্রা’ ও ‘ব্যাপিকা বিদায়’ দেখে পরম তৃপ্তি লাভ করা গেল। দুটি নাটকেরই উপস্থাপনা দেখে নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই নাট্যগোষ্ঠী অভিনয় বিদ্যায় যথার্থই পারদর্শিতা অর্জন করেছে।…

রবীন্দ্রনাথ নির্দ্বিধায় মহাকালের রথ চালাবার নেতৃত্বও দিয়েছেন শুদ্রদেরই হাতে অর্থাৎ এতদিন সমাজের নীচের তলায় থেকে যারা বঞ্চিত, শোষিত ও নিপীড়িত হয়েছে। এবার তারাই টানবে রথের রশি।

নাটকের এই বক্তব্যকে নিখুঁত ভাবে উপস্থিত করেছেন রূপকার গোষ্ঠী। এমন একটি কঠিন নাটককে দর্শকদের হৃদয়গ্রাহ্য করে তোলা কম কৃতিত্বের কথা নয়।… ‘ব্যাপিকা বিদায়’ রসরাজ অমৃতলালের একটি ব্যঙ্গনাটক। ইংরেজী ভাষায় এক অর্ধ

শিক্ষিতা বাঙালি নারী স্ত্রী স্বাধীনতার নামে কিরূপ বিসদৃশ অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। তাই দেখানো হয়েছে মিসেস পাকড়াশী নাম্নী এক উদ্ভট স্ত্রী চরিত্র চিত্রণের দ্বারা। ….হাস্যরসাত্মক নাটকে যে আঙ্গিক ও বাচনভঙ্গীর প্রয়োজন তার অনুশীলিত প্রয়োগ দেখা গেল প্রতিটি শিল্পীর অভিনয়ে। (যুগান্তর : ৯/৬/৬২)

মিনার্ভার নতুন নাটক ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ :

লিটল থিয়েটার গ্রুপের নবতম অর্ঘ্য ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নাট্য জগতে নতুন আঙ্গিকের দাবী নিয়ে উপস্থিত …. কাহিনীর পরিপ্রেক্ষিতে নাটকের উপাদান চয়ন এবং সংযোজন করে এ ধরনের এক আঞ্চলিক ভাষা নির্ভর প্রায় অজানা-অচেনা মানুষদের গোষ্ঠীতে পূর্ণাঙ্গ জীবন ধারা মঞ্চনাট্যে প্রতিফলিত করার প্রয়াস অসম সাহসের পরিচয় সন্দেহ নেই।… পূর্ববাংলার একটি অঞ্চলের নদী তিতাস। সেই অঞ্চলের ধীবর সম্প্রদায়ের জীবন যাত্রার কাহিনী নিয়ে এই নাটক।…

নাটকের মঞ্চব্যাপ্তির উদ্ভাবন অভিনব। সমস্ত প্রেক্ষাগৃহ জুড়েই এই রঙ্গমঞ্চ। শিল্পীদের কখন কোথা দিয়ে আবির্ভাব ঘটবে অনুমান করা শক্ত। এই নাট্য সংযোজন কিছুটা যাত্রাধর্মী হলেও এটি গতানুগতিক ধারার এক অভিনব ব্যতিক্রম বলতে হবে। নতুন আঙ্গিকে নাট্য প্রযোজনার ভিতর দিয়ে আঞ্চলিক ভাষী বহু শিল্পীর ঐক্য সমাবেশের ফলে যে সমতানের রেশ মনে লেগে থাকে, তাও অনবদ্য মনে হয়।” (যুগান্তর : 05/০৪/৬৩)

রূপান্তরীর কর্ণিক :

“গোটা নাটকে শ্রমজীবীদের প্রতি নাট্যকারদের আন্তরিক সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রকাশ পেয়েছে; কিন্তু তা প্রকাশ করতে গিয়ে সর্বত্র তিনি স্থান কাল-পাত্রের সামঞ্জস্য রক্ষা করতে পারেননি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিত্রাঙ্কনে তিনি এত চড়া রং ব্যবহার করেছেন যে শিল্প বিচারে তা গিয়ে পোষ্টারের পর্যায়ে পড়ে। শোষণ ও নির্যাতন প্রায় সরলরেখা ধরে এগিয়েছে তার ফলে কাহিনী কৌতূহলোদ্দীপক হয়নি।

দুর্নীতির কতগুলি মামুলি নিদর্শন এসেছে নাটকে—যেমন, সিমেন্টে গঙ্গামাটি মেশানো, কালোবাজারে সিমেন্টের বস্তা পাচার করা ইত্যাদি। এগুলি শুনে শুনে লোকের কান পচে গেছে। এর দ্বারা আর নাটকীয় কৌতুহল সৃষ্টি করা যায় না। নাটকের প্রথমাংশে গতি ও ভারসাম্য আছে; পরে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ভারসাম্য হারিয়ে শিথিল ও মন্থর হয়ে যায়।” (যুগান্তর : ০৩/১১/৬৩)

শৌভনিকের ‘ঝাসীর রাণী’ ‘ঝাঁসীর রাণী শৌভনিকের সময়পোযোগী একটি নতুন উপহার। এবং এই নাটকটিও শৌভনিকের বৈশিষ্টে চিহ্নিত। তদুপরি এতে রয়েছে দেশপ্রেমের মহৎ আবেগ। অতএব নির্দ্বিধায় বলা যায়, এ নাটকটিও দর্শকদের সমাদরে ধন্য হবে।” (যুগান্তর : ১৭/০৪/৬৪)

নান্দীকারের ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’ :

…. এর আগে নান্দীকার নাট্যগোষ্ঠী নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইতালীয় নাট্যকার পিরানদেল্লোর ‘সিক্স ক্যারেকটারস ইন সার্চ অফ অ্যান অথর’ অবলম্বনে রচিত ‘নাট্যকারের সন্ধানে ‘ছ’টি চরিত্র’ মঞ্চস্থ করে বাংলাদেশের

রসিক দর্শক মহলের মনোরঞ্জনে সক্ষম হয়েছেন। তাঁদের এই নতুন অবদানও দর্শক

আকর্ষণে সক্ষম হবে বলে বিশ্বাস।

…‘চেরী অচার্ড’ রাশিয়ার সামন্ত্রতান্ত্রিক অবস্থা থেকে শিল্পায়নে উত্তরণের ক্রান্তিকালীন নাটক। চেকভ কালটিকে চিহ্নিত করেছেন ১৮৬১ সালে সেখানকার ভূমিদাস প্রথা রহিতের দ্বারা। বাংলা নাট্য রূপদাতা সেটিকে চিহ্নিত করেছেন ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের দ্বারা। তিনি এর দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন যে, এদেশে প্রকৃত শিল্পায়ন শুরু হয়েছে এর পরেই।

এই ঐতিহাসিক অনিবার্যতার পটভূমিতে দাঁড়িয়ে কেউ যদি সামস্তযুগীয় অভিজাত শ্রেণীর চিন্তা নিয়ে বাঁচতে চায় তবে তার জীবনে আঘাত আসবেই। পরিস্থিতি যতই বেদনাদায়ক হোক, ইতিহাস তার পথ করে নেবেই। চরিত্র মাদাম রানেভস্কায়ার মধ্যে চেকভ এ বেদনাকে প্রকাশ করেছেন, কিন্তু ইতিহাসের অনিবার্য গতিতে ভাঙা-গড়ার জন্যে লেখকের চিন্তায় কোন হাহাকার নেই। তিনি যেন কালের একজন দ্রষ্টামাত্র। এখানেই ‘চেরী অর্চাডে’র বৈশিষ্ট্য। বাংলা নাট্যরূপে সেই বৈশিষ্ট

অক্ষুণ্ণ আছে।…. মূল নাটকের সঙ্গে না মিলিয়ে একটি বাংলা নাটক হিসেবে দেখলে ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জুরী’ সবারই ভালো লাগবে। (যুগান্তর : ১৬/১/৬৫)

বহুরূপীর ‘বাকি ইতিহাস :

“মঞ্চ কাহিনী প্রয়োগ এবং আঙ্গিক বিন্যাসে নব নব। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে বহুরূপীর ভূমিকা সৃজনমুখী বিপ্লবের ভূমিকা। বাকি ইতিহাসের’ মঞ্চ রূপ এই বিপ্লবেরই এক অভিনব প্রতিফলন বললে অত্যুক্তি হবে না।” (যুগান্তর : ০২/০৬/৬৭)

বহুরূপীর ‘বর্বর বাঁশী’ :

বহুরূপীর ছোটখাটো প্রচেষ্টার মধ্যেও প্রযোজনার বিশেষত্ব থাকবেই। বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন এই নাট্যগোষ্ঠীর প্রখর দৃষ্টি থাকে নিখুঁত উপস্থাপনার প্রতি। তাছাড়া বহুরূপী অভিনীত বেশীর ভাগ নাটক বিষয় ও বক্তব্যে এমনিভাবে ভিন্ন যে দর্শকচিত্তে তা নাড়া দেবেই…

নাটকটির বাঁধুনি এমন যে আগাগোড়া রুদ্ধশ্বাসে দেখতে হয়। উত্তেজক ঘটনাও যথেষ্ট। নাট্যকারের সংলাপ রচনার ভাষ্যটিও পরিপাটি। তদুপরি নাটকের মূলকথা যে নাটকীয়তা সৃষ্টি সে গুণ এ নাটকে আছে। (যুগান্তর : ২৫/৬/১৯৬৯)

আনন্দবাজার, যুগান্তর, প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে ধারাবাহিক ভাবেই নাট্য সমালোচনা প্রকাশ করে নব্য ধারার থিয়েটারকে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে, লোকসাধারণের সঙ্গে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছিল। বাংলা সংবাদপত্র হিসেবে এই দুটি সর্বাধিক প্রচারিত থাকায় থিয়েটারকে সহজগামী করে তুলতে সাহায্য করেছিল।

পাঠক তৈরি করে নিতেও সক্ষম হয়েছিল পত্রিকা দুটি। যুগান্তরে সমালোচনা সম্পর্কে মতামত সম্বলিত লেখাও প্রকাশিত হত। যেমন, ১৯৬৫ সালের ২৬ জুন, ‘পণ্ডিতমন্যতায় রসের হানি : সমালোচনা কৃত্রিম ভাষায়’ ‘শিরোনামে লেখা হয়, “আজকাল নাটক ও নাট্যকলার সমালোচনা ক্ষেত্রেও এ রোগ খানিকটা দেখা দিয়েছে। সহজ জিনিসকে তাঁরা সহজভাবে বলতে পারেন না— সব কিছুর মধ্যে একটা গভীর তত্ত্ব খুঁজে বেড়ান এবং ভাষার কুষ্মাটিকা সৃষ্টি করে বক্তব্যকে দুর্বোধ্য করেন। কিছুদিন আগে কোন একটি নাট্য পত্রিকায় একজন অধ্যাপকের নাট্য সমালোচনা পড়ে আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল। তাঁর ভাষার প্রহেলিকা থেকে অর্থোদ্ধার করা শক্ত। পড়লেই বোঝা যায়, লেখার সময় বক্তব্যকে বোঝাবার চেয়ে ভাষার কসরৎ-এর দিকেই তাঁর নজর ছিল বেশী।” নাট্য সমালোচনার মান উন্নয়নের জন্য এই ধরনের সমালোচনার সমালোচনা খুবই জরুরি ছিল।

সংবাদপত্রে সমালোচনার ধারা গড়ে তুলতে এই দুটি পত্রিকা ছাড়া অন্য পত্রিকাগুলিও যথেষ্ট সফল ভূমিকা নিয়েছিল। তবে এ কথা ঠিক, বহুল প্রচারিত পত্রিকার অনুসরণকারী হিসেবেই তারা কাজ করেছে। অন্য কাগজগুলিরও পঞ্চাশের দশকের ভূমিকা যথেষ্ট আশাপ্রদ নয়, যেমন ছিল আনন্দবাজার, যুগান্তরের, তেমনই দৈনিক বসুমতী, স্বাধীনতা, সত্যযুগের ভূমিকা। বরং সমালোচনার মান কারও কারও যথেষ্ট খারাপই ছিল। তবে প্রত্যেক সংবাদপত্রেরই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল; নিজস্ব ভাবনার নিরিখে বসুমতীর সঙ্গে স্বাধীনতার নাটক নির্বাচন ও সমালোচনার তফাত গড়ে উঠেছিল।

পুরো পঞ্চাশ দশক জুড়ে বসুমতীর ‘চিত্রমায়া ও নাট্যকলা বিভাগের পৃষ্ঠায় হিন্দি বাংলা সিনেমার সমালোচনা ও সংবাদেরই আধিক্য ছিল। তার মাঝে কখনো কখনো নাট্য সমালোচনা, অফিস ক্লাবের অভিনয় সংবাদ, হেমেন্দ্র কুমার রায়ের ধারাবাহিক প্রবন্ধ, পেশাদার-অপেশাদার নাট্য সংবাদ ইত্যাদি প্রকাশিত হত। যেমন ২৯/১/৫৪ তে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের স্মরণসভার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এবং ওই বছরেই রঙমহলের ‘দূরভাষিণী’র নাট্য সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল।

এই সমালোচনার শুরুতেই সমালোচক নব্য নাট্যধারার প্রতি তার দ্বিধাদ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করেছেন, “বাংলা থিয়েটারের একটা নবজাগরণ হয়েছে—এমন কথা লোকের মুখে মুখে শুনতে পাচ্ছি। মঞ্চাভিনয় সম্বন্ধে শিল্পী এবং দর্শক উভয় সম্প্রদায়ই অধিকতর সজাগ হয়েছেন বাংলা থিয়েটার আবার তার মর্যাদার আসন লাভ করেছে—এটাও দেখতে পাচ্ছি, যা শুনছি এবং যা দেখছি, তা খুবই আনন্দের ও খুবই ভরসার। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই যে তথাকথিত নবজাগরণ, এটা হ’ল কি কোরে? নবজাগরণ তো মাঝামাঝি ক্ষমতার দ্বারা হয় না, এটা প্রতিভাদের দ্বারাই সম্ভব হয়। কোন্ বিশেষ প্রতিভা এর পিছনে কাজ করেছে?

শিশিরকুমার এক সময় বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের নবজাগরণ এনেছিলেন। তাঁর প্রতিভা অভিনয়ের ধারায় আমূল একটা পরিবর্তন এনেছিল; প্রয়োগ পদ্ধতিতেও এসেছিল সেদিন নতুন ইঙ্গিত।

আজ সেরকম বড় রকমের ধারা পরিবর্তন তো চোখে পড়ে নি। তবে কি বলবো, শুধু ঐ ‘Renovation’ টাই রঙ্গালয়ের স্তিমিত প্রদীপটিকে জ্বালিয়ে তুললে এমন কোরে? হালে এই সেদিনও শ্রীরঙ্গমে বিপ্রদাস, বিন্দুর ছেলে, দুঃখীর ইমান; পূর্বতন রঙমহলের নিষ্কৃতির মতো নাটক তো কৈ বাংলার নাট্যশালাকে ঠিক এ জাতীয় অনুপ্রেরণা দিতে পারে নি। সে সব নাটকের তুলনায় আজকের নাটক তো ক্ষীণজ্যোতি।” (বসুমতী :

২৭/৮/৫৪)

চুয়ান্ন সালের সমালোচনায় এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও পঞ্চাশের শুরুতে কিন্তু বহুরূপীর কাজকে তারিফ করা হয়েছিল। সেখানে লেখা হয়েছিল, “আজকের দিনে বাংলা মঞ্চ জগতের জরাজীর্ণ এবং মধ্যযুগীয় ব্যবস্থাটাকে কোন রকমে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা হচ্ছে সর্বত্র। এই জরাজীর্ণ শরীরের মধ্যে নতুন রক্ত সঞ্চার করিয়ে বাংলার নাট্যকুঞ্জকে পুনর্জীবিত করার চেষ্টা কোথাও নেই।

ঠিক এই সময়ে বহুরূপী নাট্য সম্প্রদায় নতুন ও পুরাতন শিল্পীদের একত্রিত করে নিউ এম্পায়ার মঞ্চে নতুন নাটক নিয়ে Experiment আরম্ভ করেছেন। যাঁরা বহুরূপীর নবনিবেদিত তিনটি নতুন নাটকের অভিনয় দেখেছেন তাঁরা এই

আশা ও আশ্বাস নিয়ে ফিরে গেছেন যে, নূতন ধরনের নাটককে কলোত্তীর্ণ করবার মতো

প্রতিভা ও শক্তি আজও আছে বাংলাদেশে।” (বসুমতী : ২৬/১২/৫০)

পঞ্চাশের এই সমালোচনার পর চুয়ান্নর দ্বিধা নিয়ে আমাদেরই সংশয় জাগে। সঠিকভাবে কোন্ নাটককে ‘ক্ষীণজ্যোতি’ বলা হয়েছিল? বহুরূপীর প্রযোজনা দেখার পরেও ‘Renovation’ কেই প্রধান ভাবা হল কেন? বা শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত প্রমুখদের কাজ দেখার পরেও প্রতিভার অনুসন্ধানের কারণটা আলোচ্য সমালোচনায় ছিল না। কোনো এক প্রযোজনার সমালোচনা করতে গিয়ে আলটপকা মন্তব্যটা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

যাই হোক, ষাটের আগে নবনাট্য ধারা গুরুত্বহীন থেকে যায় এমনকি তখনও ‘সৌখিন নাট্যসংস্থা’র কলামে অফিস ক্লাবের নাটকের সমালোচনা বেশিই প্রকাশিত হত। ইনস্পেকটর এমপ্লয়িজ রিক্রিয়েশন ক্লাবের প্রযোজনা মহেন্দ্র গুপ্তর ‘কঙ্কাবতীর ঘাট’ বা এগরা সোস্যাল ক্লাবের ধনঞ্জয় বৈরাগীর ‘ধৃতরাষ্ট্র’র সমালোচনা প্রকাশিত হত। এ ছাড়া কাঁচরাপাড়া আর্ট থিয়েটারের ‘ছেঁড়া তার’ বা থিয়েটার ইউনিটের নাট্যাভিনয়ের রিপোর্টাজধর্মী সমালোচনা প্রকাশিত হতে শুরু করে ১৯৬১ সাল থেকে। তবে ওই বছরে বছরূপীর ‘কাঞ্চনরঙ্গ’ নাটকের একটি বড়ো সমালোচনা প্রকাশিত হয়।

“ ‘কাঞ্চনরঙ্গ’ নাটকটিতে বর্তমান কালের মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সঠিক চিত্র অঙ্কিত করা হয়েছে। শুধু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ই বা বলি কেন, বৰ্ত্তমান জগতে যা ঘটেছে, নাট্যকারদ্বয় তাই এ নাটকে দেখিয়েছেন…সকল শ্রেণীর ও সকল স্তরের লোকই এ নাটকখানি দেখে পরিতৃপ্ত হবেন। তাদের মন খুশীতে ভরপুর হয়ে উঠবে, একথা বলতে আমাদের এতটুকুও দ্বিধা নেই। ‘কাঞ্চনরঙ্গ’ নাটকখানি পরিচালনার জন্য আমরা শম্ভু মিত্রকে আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি।

…নাটকটি ব্যঙ্গধর্মী বলে চরিত্রগুলিতে যথেষ্ট বাস্তব উপাদান থাকলেও তাদের বহিঃপ্রকাশ আতিশয্য লক্ষণীয়। অবশ্য এটা অবাঞ্চিত নয়, এর মধ্য দিয়েই এ নাটকের সৃষ্টি। শম্ভুবাবু ও অমিতবাবু অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এ নাটকখানিতে। প্রতিটি চরিত্র চিত্রণে ও মধুর সংলাপ সংযোজনে তাদের কল্পনাশক্তির সামঞ্জস্য বিধানের প্রশংসা না করে উপায় নেই।” (বসুমতী : ১৭/১/৬১)

এই সংবাদপত্রের আর একটি উল্লেখযোগ্য সমালোচনা লিটল থিয়েটার গ্রুপের ‘ফেরারী ফৌজ’। “লিটল থিয়েটার গ্রুপ মিনার্ভা রঙ্গমঞ্চে ‘অঙ্গার’ নাটকটি অভিনয় করে যে খ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেছিলেন ও আর্থিক সাফল্য লাভ করেছিলেন, ‘ফেরারী ফৌজ’ নাটকটি অভিনয়ে তারা সে খ্যাতি ও সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবেন কিনা সে বিষয়ে গভীর সন্দেহ আছে।…

এ নাটকটি যে, সময়োপযোগী হয়নি একথা আমরা অবশ্য বলবো। …আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহু সমস্যা দেখা দিয়েছে। অন্ন সমস্যা, গৃহ সমস্যা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, বেকারী প্রভৃতি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সকল সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে নাটক রচিত হলে জনসাধারণের স্বীকৃতি সহজেই আকর্ষিত হয়। এদিক থেকে বিবেচনা করলে আলোচ্য নাটকখানির সার্বজনীন আবেদন খুঁজে পাওয়া যাবে না।

অভিনেতা যদি নাট্যকার হতে সচেষ্ট হন, তারই ফল হয় ‘ফেরারী ফৌজের মত নাটক। অর্থাৎ নাটক হিসাবে সফল হয় না।”

‘ফেরারী ফৌজ’ সম্পর্কে সমালোচকের এই মতামতগুলির সঙ্গে অন্যান্য সমালোচনাগুলির আশ্চর্য বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। আর কোনো সমালোচক এই নাটকের এমন তীব্র অপ্রয়োজনীয়তার কথা বলেননি; এমনকি উৎপল দত্তের মতো নাট্যকারকে, নাট্যকার নয় বলার চেষ্টাটাও যথেষ্ট অজ্ঞতাপূর্ণ বলে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মনে হয়। সেদিনও এ কথা অন্য কোনো সমালোচক বলেননি। সেদিক থেকে ‘ফেরারী ফৌজ’ নাট্য সমালোচনাটি কৌতূহল পূর্ণ সন্দেহ নেই।

‘বসুমতী’র প্রায় প্রত্যেকটি নাট্য সমালোচনার শুরুতেই ভূমিকা হিসেবে নাট্যধারার তৎকালের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করার প্রবণতা ছিল। সংবাদপত্রে কতটা জায়গা দেওয়া হবে আলোচনার জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। তার ওপরেই নির্ভর করে আলোচনার পরিধি। ‘বসুমতী’ যথেষ্ট জায়গাও দিত। তা ছাড়া এই পত্রিকায় সমালোচকরা প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিতেন বলেই বসুমতীর সমালোচনার স্বাতন্ত্র্যও গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। যেমন অনুশীলন সম্প্রদায়ের ‘শেষসংবাদ’ নাট্য সমালোচনার শুরুতে লেখা হল,

“বৰ্ত্তমান প্রগতিশীল মঞ্চাভিনয়ে যাঁরা অংশগ্রহণ করছেন তাঁরা সাধারণ বিষয়বস্তুকে পরিত্যাগ করে নূতন নূতন বিষয়কে নিয়ে নাটক সৃষ্টি করছেন একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে। কিন্তু এই নাটক সৃষ্টির পথে তাঁরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিদেশী কাহিনী থেকে বিষয়বস্তু অবলম্বন করে অথবা অনুবাদ করে নাটক রচনা করছেন, এই থেকে মনে হয় আমাদের দেশে মৌলিক নাটক করবার শক্তি শেষ হয়ে গেছে। বঙ্গ রঙ্গমঞ্চে এক সময়

 

[ অভিনয়, অভিনয় দর্পণ পত্রিকা, নাট্যপত্র – আশিস গোস্বামী ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন