গণনাট্য পত্রিকা, নাট্যপত্র – আশিস গোস্বামী

ভারতীয় গণনাট্য সংঘের মুখপত্র হিসেবে ‘গণনাট্য’ পত্রিকা পঞ্চাশের দশকেই সলিল চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির কোনো সংখ্যাই আজ আর পাওয়া যায় না। তবে দুটি সমালোচনার সন্ধান পাওয়া গেছে। লিটল থিয়েটার ‘আর্মস অ্যান্ড দি ম্যান’ এবং বহুরূপীর ‘দশচক্র’। এই দুটি সমালোচনার থেকে স্পষ্ট যে তখনও পর্যন্ত লিট্ল থিয়েটার বা বহুরূপীর প্রযোজনাকে গণ্যনাট্য ধারার বিরোধী বলে ভাবা হত না। অগ্রহায়ণ ১৩৫৯-এ ‘আর্মস অ্যান্ড দি ম্যান’-এর সমালোচনায় লেখা হয়েছিল,

সলিল চৌধুরী [ গণনাট্য পত্রিকা, নাট্যপত্র - আশিস গোস্বামী ]
সলিল চৌধুরী
“আর্মস এ্যান্ড দি ম্যান’—বার্ণাড শ লেখেন ১৮৯৪ খ্রীস্টাব্দে। যুদ্ধবাদীদের তথাকথিত বীরত্বকে ব্যঙ্গ করা হল এই নাটকে অননুকরনীয় শেভিয়ান ভঙ্গিতে।… ইংরেজি শিক্ষিত দর্শকদের জন্যে এই নাটকটির নির্বাচন লিটল থিয়েটারের সভ্যদের সুরুচির পরিচয় দেয়। সামগ্রিক ভাবে নাট্যানুষ্ঠানকে ভাল বলেও দু’একটি ছোটখাট বিষয়ের প্রতি প্রযোজককে লক্ষ্য করতে বলছি। প্রথমতঃ দু’একজনের বাচনভঙ্গী স্বাভাবিক বলে মনে হল না—যেমন, সার্জিয়া সারানভের ভূমিকায় প্রতাপ রায়ের। দ্বিতীয়তঃ প্রথম দৃশ্যে

কাপ্তেন ব্লুনৎস্নির ভূমিকায় উৎপল দত্ত সত্যিকারের চরিত্রের সঙ্গে কতকাংশে তাল মিলিয়ে চলতে পারেননি। এবং সর্বশেষে, স্ত্রী চরিত্রগুলির সাজসজ্জা ঠিক মত নির্বাচন করা হয়নি।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ‘দেশ’ পত্রিকাতেও প্রায় একই মতামত জানিয়ে অনুরূপ সমালোচনাই প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত অন্য সমালোচনাটিতে কিন্তু কেবলই প্রশংসা, “বাঙলা নাট্য জগতে বহুরূপী সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় হাল আমলের ইতিহাসে সত্যই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

উৎকৃষ্ট কলা নৈপুণ্যের সমাদর যে সর্বত্র, বিগত কিছুকাল ধরে যেখানেই তাঁরা অভিনয় করতে গেছেন, যে বিপুল সম্বর্ধনা দর্শক সমাজ থেকে পেয়েছেন, তার থেকেই বোঝা যায়। যারা নাট্যজগতে একঘেঁয়েমির বিরক্তিকর পুনরাবৃত্তি দেখে দেখে অতিষ্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত হয়তো নাট্যজগতের ওপরে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, বিষয়বস্তু, শিল্প নৈপুণ্য এবং পরিচালনার অনবদ্য অর্থে ‘বহুরূপী’ সে দর্শক-সাধারণের মনে যথেষ্ট আশার সঞ্চার করতে সমর্থ হয়েছেন।

অতীত অবদানের মধ্যে ছেঁড়া তারের অভূতপূর্ব সাফল্য এঁদের কৃতিত্বের যেমন পরিচায়ক, তেমনি তাঁদের সাম্প্রতিক নাটক ‘দশচক্র ও আংশিক ত্রুটি বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও অভিনয় এবং রুচিগত উৎকর্ষে সমুত্তীর্ণ। অনাড়ম্বর আয়োজনের মধ্যে অতি সামান্য মঞ্চসজ্জা ও আলোক-ব্যবস্থার সাহায্যে এতো সার্থক নাট্যরূপ বহুদিন বাঙলার তৃষিত জনসমাজের চোখে পড়ে নি।”

আজকে এই সমালোচনা দেখে বিস্মিত হতে হয়। কারণ, যে-কোনো কারণেই হোক গণনাট্য ও বহুরূপীর ভূমিকা এখন অনেকটাই দূরের হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো একসময় গণসঙ্গ সম্পর্কটা শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার ছিল তা প্রত্যক্ষ করা যায় এই আলোচনা দেখে। যাই হোক, গণনাট্য পত্রিকা প্রথম পর্যায়ে বেশি দিন প্রকাশিত হয়নি।

‘গণনাট্য’ পত্রিকা দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকা বহুরূপীর প্রশংসা করলেও বাংলা নাট্যের ‘নবনাট্য’ রীতির সরাসরি বিরোধী ভূমিকা নিয়েছিল। ওই ধরনের কোনো অভিধাতেই বিশ্বাসী ছিল না। বস্তুত গণনাট্য সংঘ থেকে সরে এসেই নতুন ধারার নাট্য আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এমন বিশ্বাস তাদের ছিল না। তাই যখন নাট্য আন্দোলনের নতুন তক্‌মা লাগানো হল তখন বিরোধিতার পথই নিলেন। কাজেই নবনাট্য ধারার বিরোধী শিবিরের মুখপত্র হিসেবেই গণনাট্য পত্রিকা তার ভূমিকা নির্দিষ্ট করেছিল।

গণনাট্য সংঘ [ গণনাট্য পত্রিকা, নাট্যপত্র - আশিস গোস্বামী ]
গণনাট্য সংঘ
আগেই বলেছি, আজকের দৃষ্টিতে দেখলে বিস্ময় জাগলেও ঐতিহাসিক ভাবে সত্য যে নাট্যসমালোচনার ক্ষেত্রে এই পত্রিকা সেই বিরোধকে বড়ো করে দেখেনি। নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করেছে নাট্য প্রযোজনাকে। তাতে দ্বিমত দেখা দিয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া উচিত। তবে সেই বিচার মেনে না নিলেও গণনাট্য পত্রিকার দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়াসকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। ১৯৬৪-৭৩-এর মধ্যে আমরা শেকস্‌পিয়ার, চেখভের নাটক সম্পর্কে যেমন আলোচনা পেয়েছি তেমনি গণনাট্যের

শাখা দলগুলির প্রযোজনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। শেকস্‌পিয়ার-এর নাটক সম্পর্কে আলোচনা কোন দৃষ্টিতে করেছিল এই পত্রিকা তা আমরা জানতে পারি গণনাট্য শেকস্‌পিয়ার সারণী সংকলন ১৯৬৪ সংখ্যাটির

সম্পাদকীয় ‘বক্তব্য’ এর মধ্যে। “…সংকলনের সমস্ত লেখাগুলোকে আমরা একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গীতে প্রকাশ করতে চেয়েছি আর তা হল গণনাট্য আন্দোলনের অংশীদার বৃহত্তর সংখ্যক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গীতে। কেননা আমরা মনে করি গণজীবনই শিল্প সংস্কৃতির প্রাণ। গণজীবনের সত্যিকার অনুভূতি চেতনাকে বাদ দিয়ে কোনো শিল্প জীবিত থাকতে পারে না, চিরায়ত অক্ষয় আখ্যা পেতে পারে না। এ কথার পক্ষে সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ উইলিয়াম শেকসপীয়র, যতই কথা থাক, আজ এ কথা সত্য যে দরিদ্র নির্যাতিত ও শোষিত জনগণই তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে; কাল, দেশ ইত্যাদির প্রাচীর ভেঙ্গে যুগে যুগে আপন সত্তার সাথে আপন করে নিয়েছে–কেননা শেকসপীয়রের চেতনায় প্রতিফলিত হয়েছিল সাধারণ জনগণের জীবন ও দর্শন। গণজীবনের প্রতিনিধি এই মহান নাট্যকার ও কবিকে আমাদের শ্রদ্ধা জানাই।”

এই পত্রিকায় ১৯৭০ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত নাট্য সমালোচনাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল :

১) চেখভের নাটকের রূপান্তর ‘মও আমের মঞ্জুরী’–অরিন্দম সান্যাল।

২) একজন দর্শকের চোখে সীমান্তিকের নাট্য উৎসব—সৃজন চৌধুরী।

৩) ‘১৪ই জুলাই’ প্রসঙ্গে প্রমোদ সেনগুপ্ত।

৪) শিল্পী মনের তিনটি একাংক—–শান্তিময় গুহ।

জানুয়ারি ১৯৬৫-তে প্রকাশিত নান্দীকার প্রযোজিত ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জুরী’ নাটকটির সমালোচনাটি পড়লেই বোঝা যাবে প্রযোজনার তুলনায় নাটকের বিষয়টিই সমালোচককে বেশি আকর্ষণ করেছিল। বিশেষত চেখভ যে-পটভূমিতে এই নাটক রচনা করেছিলেন, সমালোচনায় তা দেখানো হয়েছে বলে সমালোচনার মাত্রা অন্যতর ভূমিকা নিতে পেরেছে, “মূলত ‘চেরি অর্চার্ড’ ঊনবিংশ শতাব্দীর রুশসমাজ-চিত্র। যখন সামন্ততন্ত্রের উদ্ধত প্রতিভূ দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের স্বৈরী শাসন কায়েম।

ইয়ান্টার গ্রামে চেখভ গ্রামীণ পটে সামন্তবাদের অস্তগামী সংস্কার, বনিয়াদের সাথে নতুনতর সভ্যতার সংঘর্ষণ নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। একদিকে গির্জার অন্ধধর্মভাব, অন্তঃসারশূন্য বনিয়াদি চিন্তার বন্ধন, কুসংস্কার আবর্তে পচনশীল আমলাতান্ত্রিক ঠাঁট, অপরদিকে নয়া যান্ত্রিক সভ্যতার উদ্বেল কলতান, নতুন ভাবধারা বাহিত যুগের প্রতিযোগিতায় অগ্রসরমান। এই সমাজ ও কালের দ্বন্দ্ব সংঘর্ষণ চেখভ তুলে ধরলেন ‘চেরি অচার্ড-এ। কিন্তু সামন্ততন্ত্রের বুকের পাঁজরে যান্ত্রিক সভ্যতার আকাশচুম্বী স্বপ্নের সত্যটাই তিনি তুলে ধরেননি, যে কাল আসছে প্রলয়ের মেঘের মতো, শোষণ নিপীড়নের বেড়াজালে বঞ্চিত সর্বহারার প্রতিধ্বনিও তিনি শুনেছেন।

সেই সংবর্তকে তিনি উদাত্তভাবে আহ্বান জানিয়েছেন নাটকে, ‘Welcome new life welcome’. এখানেই বাস্তবতার দিক থেকে তিনি কত দূরদর্শী, নির্ভীক ও ঋজু ছিলেন তার জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া যায়।

শাশ্বতী সান্যাল বাংলা গণনাট্যের প্রবাদ পুরুষ [ গণনাট্য পত্রিকা, নাট্যপত্র - আশিস গোস্বামী ]
শাশ্বতী সান্যাল বাংলা গণনাট্যের প্রবাদ পুরুষ
‘মঞ্জুরী আমের মঞ্জুরী’ এই বিষয় বক্তব্যেরই বাংলা অনুকৃতি। ‘নান্দীকার’ গোষ্ঠীর শিল্পীরা এই বক্তব্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য গভীর নিষ্ঠা দেখিয়েছেন। চেখভের যা বিশেষত্ব অর্থাৎ আশ্চর্য রকম দূরত্ব সংক্ষেপ, অদৃষ্টপূর্ব কৌতূহলী সৃষ্টি, গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে অতিতুচ্ছ ব্যাপারকেও নিগূঢ় রসে জমিয়ে রাখা, চরিত্রকে অত্যন্ত সিরিয়াস মুডে রেখেও দুঃসাহসিক হাস্যরসের সংলাপ ব্যবহার করা, যখন কিছুই ঘটছে না তখনও দর্শককে কিছু একটা ঘটবে এই আকাঙ্ক্ষায় বসিয়ে রাখা— অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে অনুসরণ করা হয়েছে। চেখভের শান্ত সমাহিত ভাব ব্যঞ্জনা বা জগত আশ্চর্য সুন্দরভাবে পরিব্যক্ত হয়েছে বাংলা অভিযোজনায়। পুরুলিয়ার পটভূমিকায় ‘চেরি অচার্ড’ জীবন্ত হয়ে উঠেছে আমের মঞ্জুরীতে।

নাট্যকার পরিচালক অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন কম্পোজিশন ও সিম্বলের মাধ্যমে সামন্তবাদ ও যন্ত্র সভ্যতার দ্বন্দ্বকে পরিস্ফুট করেছেন। আবহ স্বর প্রয়োগরীতিতে বাস্তবতার স্পর্শ প্রখর হয়ে উঠেছে। তবে রূপান্তরের শিল্প বিপ্লবের কালকে ধরা হয়েছে স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে, বরং সেটা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর কাল নির্দেশ করলে ইতিহাসের দিক থেকে ব্যস্তবসম্মত হত।”

এই সমালোচনার পরের অংশ অভিনয় সম্পর্কে। তাই সহজেই অনুমেয় যে এই সমালোচনা মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিজাত। নাটকের প্রয়োগকৌশলের কোনো ব্যাখ্যাই এখানে নেই। প্রয়োগক্ষেত্রের মার্কসবাদী ব্যাখ্যাটাও জরুরি ছিল। সেটা নেই বলে আজ আর বুঝে ওঠা সম্ভব নয় সদর্থক বিষয়টি কতখানি সদর্থক ভাবে উপস্থিত হতে পেরেছিল, কীরকম ছিল তার প্রয়োগ কৌশল? ঠিক একই ধরনের আলোচনা পাই প্রমোদ সেনগুপ্তর ১৪ই জুলাই প্রসঙ্গে। সেখানে প্রযোজনা সংবাদটুকু ছাড়া কোনো কথাই নেই। সম্পূর্ণই বিষয়ভিত্তিক সমালোচনা, থিয়েটার শিল্পের কোনো কথা নেই। তাই সমালোচনাটি অবশ্যই।

কৌতূহলপ্রদ “৩০ শে আগষ্ট, ১৯৬৬তে ভারতের রমা রল্যা সমিতি ও লিট্ল থিয়েটার গ্রুপের উদ্যোগে মিনার্ভা থিয়েটারে রল্যার বিখ্যাত নাটক ‘১৪ই জুলাই’ মঞ্চস্থ হয়েছিল। ১৪ই জুলাই’ নাটকটি মঞ্চস্থ করা খুবই কঠিন কাজ। প্রযোজনা সামগ্রিকভাবে উত্তীর্ণ হতে পারেনি কিন্তু তা সত্ত্বেও যে রকম সাহস ও উৎসাহের সঙ্গে শিল্পীরা এই দুরূহ কাজে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তা সত্যই প্রশংসনীয়। নাটকের পটভূমি, বিষয়বস্তু পোষাক-পরিচ্ছদ, রীতিনীতি ভাষা সব কিছুই সাধারণ বাঙালির নিকট অপরিচিত।

তাছাড়া রল্যা এ নাটক লিখেছিলেন একটা এক্সপেরিমেন্টাল নাটক হিসাবে এবং এতে তিনি মঞ্চের পুরাতন কলাকৌশল ও অভিনয় শিল্পকে উপেক্ষা করে জনগণের জন্য নূতন ধরনের নাটক সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। এইসব নানা কারণে ইয়োরোপের শ্রেষ্ঠ ডাইরেক্টরদের পক্ষেও এ নাটক মঞ্চস্থ করা সহজ নয়। এই অবস্থায় ‘১৪ই জুলাই’ নাটক মঞ্চস্থ করে শুধু দুঃসাহসই দেখান নি, তাঁরা যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

রল্যা যখন এই নাটক লেখেন তখন ফ্রান্সে চূড়ান্ত অবনতির যুগ। ১৮৭০ সালে জার্মানীর নিকট পরাজয় ও ১৮৭১ সালে পারী কমিউন ও শ্রমিক শ্রেণীর রক্তাক্ত পরাজয়—এই দুইটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া ফরাসী সমাজের সকল শ্রেণীর সংস্কৃতিকেই অধঃপতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। এই অবস্থায় তখন ফ্রান্সের সাহিত্যের মতোই নাটকও হয়ে দাঁড়িয়েছিল অধঃপতিত বুর্জোয়া সমাজের চিত্ত বিনোদনের জন্য অবৈধ প্রেম ও যৌনতাকেন্দ্রিক। এই প্রবল দূষিত স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রল্যা শুরু করেছিলেন তাঁর গণনাট্যের (People’s Theatre) অভিযান।

রল্যার যৌবনের প্রারম্ভে শেক্‌সপীয়র ছিলেন সব থেকে প্রিয়পাত্র। শেকসপীয়রের থেকেই রঁল্যা বুঝতে পেরেছিলেন নাটকের গুরুত্ব। তাছাড়া ফ্রান্স মলিয়ের (Moliere) ও রাসিনের (Racane) দেশ। ফ্রান্সে বহুকাল থেকেই নাটক ও মঞ্চ সাহিত্যিক ঐতিহ্যে একটা প্রধান স্তম্ভ হিসেবেই বিকশিত হয়ে এসেছে। ফরাসী সভ্যতার যা কিছু মহৎ ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, তার পৌরুষ ও মনুষ্যত্ব, তার শিল্প প্রতিভা সব কিছুই ফরাসী মঞ্চে প্রতিফলিত হয়েছে। ফ্রান্সের অবনতির যুগে এই নাটক ও মঞ্চ অবক্ষয়ী বুর্জোয়াশ্রেণীর হাতে তাদের লালসা ও লোভের রঙ্গভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।…

আশিস গোস্বামী [ Ashish Goswami ]
আশিস গোস্বামী [ Ashish Goswami ]
রল্যা আরও বললেন নাটক ও মঞ্চ জনসাধারণকে শুধু আনন্দই দেবে না, তাকে শিক্ষাও দেবে–কি করে চিন্তা করতে কি করে কর্ম করতে হয়; মঞ্চ আনাজ ভবনই হবে না, তাকে শিক্ষালয়ও হতে হবে, অবক্ষয়ী বুর্জোয়া মানুষের জটিল যৌন সম্বন্ধীয় শিক্ষালয় নয় সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য, তার মনুষ্যত্ব স্থাপনের জন্য শিক্ষালয়, সহজ মনুষ্যত্ব বোধের শিক্ষালয়, এবং এ শিক্ষা হবে ‘সরল’ সমস্ত সাধারণ মানুষের পক্ষে বোধগম্য ও উদ্দীপনাদায়ক। কিন্তু তাহলে শিল্পকে কি নিম্ন স্তরে নেমে আসতে হবে? শিল্প কি তবে শুধু প্রচারমূলক হবে? শিল্পের উচ্চমান বলে কিছু থাকবে না?

তাহলে কি দুইটি মানদণ্ড হবে—একটি অর্ধশিক্ষিত অশিক্ষিত জনসাধারণের জন্য নিম্নমান, আর একটি বুদ্ধিজীবী এলিতদের জন্য উচ্চমান?…

‘১৪ই জুলাই’ নাটকের মধ্য দিয়ে রল্যা এই সমস্যা সমাধানের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। এই নাটকের ভূমিকায় রল্যা লিখেছিলেন: ‘এই নাটকে আমি মানুষের বীরত্বকে পুনরুজ্জীবিত এবং বিপ্লবরত একটা জাতির আত্মবিশ্বাসকে পুনঃস্থাপন করার চেষ্টা করেছি, যাতে করে ১৭৯৪ সালে যে বিপ্লব বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল তাকে পরিসমাপ্তির দিকে অগ্রসর করে নিয়ে যেতে পারে। শিল্পের লক্ষ্য স্বপ্ন নয়—জীবন। কর্মের দৃশ্য থেকেই কর্মের প্রেরণা জাগে…ফরাসী বিপ্লবের অন্যতম নেতা কামীলা ডেমুলার (Camilla Desmoulin) মধ্য দিয়ে রল্যা তাঁর নাটকের শেষে সমগ্র নির্যাতিত মানবজাতিকে আহ্বান জানিয়েছেন : ‘এক বাস্তীলে কারাদুর্গ ধ্বংস হয়েছে। আরও অনেক বাস্তীল আছে আক্রমণে আক্রমণে এগিয়ে চলো।’ (গণনাট্য পত্রিকা : শারদীয় ১৯৬৬)

প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যেই গণনাট্য পত্রিকা একটি নাট্য সমালোচনা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। প্রথম বর্ষ জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল শান্তিময় গুহর ‘শিল্পী মনের তিনটি একাংক’-র সমালোচনাটি। এই তিনটি একাংকের মধ্যে উৎপল দত্তর লেখা ‘দ্বীপ’ নাটকটির সমালোচনা নিয়েই এই বিতর্ক। ওই সমালোচনার প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৬-র শারদীয় ‘প্রসেনিয়াম’ পত্রিকায়। প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সমর মিত্র।

সেই প্রতিবাদের একটি অসাধারণ দীর্ঘ উত্তর দিয়েছিলেন শান্তিময় গুহ ‘একটি সমর্থন-ভাববাদ’ আলোচনায় গণনাট্যের দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যায়। প্রথমে গণনাট্য পত্রিকায় ১৯৬৫ এর জুলাইয়ে প্রকাশিত ‘দ্বীপ’ সম্পর্কে শান্তিময় গুহ-র আলোচনাটি তুলে ধরা যাক,

“আজ দুই দেশ, দুই মানুষ। সংশোধনবাদ ও মার্কসবাদ। ‘দ্বীপ’ এই দুই যুদ্ধের শিবির। চারিদিকে এই মত প্রচলিত ও প্রচারিত। স্বভাবতই ‘দ্বীপ’ যে কোন মার্কসবাদীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং বিচারের জন্য উপস্থিতও হবে। নাটকে মিলন সরকার ও সুপ্রিয়া বাগল এবং কপিল, জনার্দন ও ইউনুস বিভক্ত চরিত্র। মিলন সরকার অতীত জীবনে কমিউনিষ্ট ছিল। বর্তমানে দলত্যাগী এবং বুর্জোয়া কাগজের সাংবাদিক। আজ সে মালিকের আদেশে দাংগা সংগঠিত করার জন্য কাল্পনিক সংবাদ তৈরী করে আসে। মিলন সরকারের অতীত জীবনের সাথী ও শহীদ কপিল, জনার্দন ও ইউনুস বিবেকের প্রতীক হিসাবে নাটকে এসে অভিযোগ করছে।

…চাকরী থেকে ইস্তফা দাও তাহলে বিপ্লব হবে। বিপ্লবের এমন উন্মার্গ পথ নির্দেশের নাম বামপন্থী বিশৃঙ্খলা। চাকরীতে ইস্তফা দেওয়া না দেওয়ার উপর বিপ্লব নির্ভর করে না। মার্কসবাদ বলে বাস্তব পরিস্থিতি ও শ্রেণী সচেতন শক্তির মিলিত পরিণতি বিপ্লব। নাটকের চরিত্র বিপ্লবের পক্ষে উপস্থিত না হয়ে উপস্থিত বিপ্লব বিরোধী শিবিরে। নাটক সংশোধনবাদী ও অতি বিপ্লবী শ্লোগানে সচেতন এবং মার্কসবাদী বিরোধিতায় অবতীর্ণ। অথচ যার জন্য উৎপলবাবুর এত পথ পরিক্রমা সেই মিলন সরকার নিজের অন্তর্দ্বন্দে বেরিয়ে এল Idealist-এর মত।…

মিলন সরকার প্রতিবাদ ও মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের বিরোধিতায় অবশেষে অবতীর্ণ; সমগ্র নাটকের পরিণতি উপস্থিত হল সংগ্রাম বিমুখ, আত্মকেন্দ্রিক এবং ব্যক্তিগত সুবিধাবাদী মিলন সরকারের পক্ষে। এই নাটক দেখে সন্তুষ্ট হবে তারা যারা আজ দলত্যাগী ও সুবিধা ভোগী। কারণ দূরে সরে গেলেও প্রয়োজনে আবার মানুষের স্বপক্ষে তাঁরা উপস্থিত হবে। নাটকে এই বক্তব্যকে প্রমাণ করেছে। কিংবা মার্কসবাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে যুক্তি হাজির করা হয়েছে তা অত্যন্ত জোলো। বুর্জোয়া দার্শনিকরাও

মার্কসবাদ খণ্ডন করতে এত জোলো যুক্তি হাজির করেন না। উৎপল দত্তকে আমরা যে মত ও পথে জানি তাতে এই নাটকটি বিভ্রান্তি মূলক। জানি

না উৎপল বাবু মার্কসবাদী হয়েও এই বিপরীত সিদ্ধান্তে উপস্থিত হলেন কেন? বক্তব্য ও বিচারে ‘দ্বীপ’ মার্কসবাদকে অনুসরণ করেনি, শোধনবাদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম পরিচালনা করেনি।”

এই সমালোচনার প্রতিবাদ জানিয়ে সমর মিত্র যা বলেছিলেন তাঁর কিছুটা তুলে ধরা গেল,

শ্রী শান্তিময় গুহ শিল্পীমন প্রযোজিত তিনটি একাংকের (আমরা মূলত ‘দ্বীপ’ নিয়ে আলোচনা করব—প্রাবন্ধিক) এক হাস্যকর সমালোচনা করেছেন। হাস্যকর এই কারণে যে শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদীদের দ্বারা নির্দেশিত প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ কোনও ব্যক্তি যখন কোনও শিল্প-সাহিত্যের সমালোচনা করতে উপস্থিত হন এবং তাঁর সমালোচনাকে মার্কসবাদী বলে দাবী করেন, তখন সত্যিই এক হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

তিনটি নাটক সম্পর্কেই তাঁর সমালোচনা প্রমাণ করেছে যে মার্কসবাদ এবং শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে হয় ইনি অজ্ঞ অথবা নাটকে যা আছে তার সমালোচনার পরিবর্তে নিজের মস্তিষ্ক প্রসূত কোনও ধারণাকে ব্যক্ত করাই তার আসল উদ্দেশ্য।…দ্বীপ নাটকে আমরা কোথাও মার্কসবাদের সমগ্র তত্ত্ব হাজির হতে দেখিনি; দেখেছি মার্কসীয় দর্শন সম্পর্কে এবং খানিকটা সমাজতন্ত্র সংক্রান্ত তত্ত্বের কয়েকটি বিশেষ বিষয়ে (সমস্ত নয়) যে সুবিধাবাদী বা শোধনবাদী বিকৃতি চলেছে তারই বিরুদ্ধে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা।…

শোধনবাদকে নিন্দা করতে হলে শান্তিবাবুর দেখা কোনও শোধনবাদীর হুবহু প্রতিচ্ছবি নাটকের কোনও একটি চরিত্রকে হতে হবে তার কোনও মানে নেই। আসল কথা মিলন সরকারের মুখে যে সমস্ত কথা বলান হয়েছে বা সে যে ধরনের জীবনযাপন করছে অথবা তার মানসিক দ্বন্দ্বগুলি ও সমস্তের অস্তিত্ব সমাজে ছড়িয়ে আছে কি না?….

গণনাট্য সংঘ
গণনাট্য সংঘ

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের আবিষ্কার কোথা থেকে অর্থাৎ ‘ভিত্তিটা কি’? কার্ল মার্কসের মস্তিষ্ক। এখন যদি কার্ল মার্কসকে শান্তিবাবু বলেন মানুষ দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ তবে তো আমরা নাচার। এখন দেখা যাচ্ছে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ আবিষ্কৃত হয়েছে মানুষেরই মস্তিষ্ক থেকে আবার বিশ্ব পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসাবে তাকে ব্যবহার করছে মানুষ। তারই জন্য মার্কসবাদের গোড়ার কথা হচ্ছে মানুষ। মার্কসবাদ রক্তশূন্য কচকচি নয়। মানুষকে বাদ দিয়ে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ আলোচনা করতে গেলে যা খুসি তাই প্রমাণ করা যায়।”

এর উত্তরে শান্তিময় গুহ আবার ‘গণনাট্য’ পত্রিকায় ১৯৬৬তে লিখলেন, …সমরবাবুর আলোচনার এই পদ্ধতিকে একটি ঐতিহাসিক অবস্থার সাথে মিলিয়ে বিচার করলেই সঠিক হবে। সোভিয়েত রাশিয়ার শিল্প ও সাহিত্য জগতকে একদিন ওই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। শিল্প ও সাহিত্য সৃষ্টি, প্রকাশনা এবং সমালোচনায় মার্কসবাদ লেনিনবাদের মূল নীতিগুলি গ্রহণ না করে, ভাববাদী বুর্জোয়া এবং পেটি বুর্জোয়া সুলভ ঝোঁক, ব্যক্তিগত পরিচয়, বন্ধুত্ব ও ব্যক্তিগত স্বার্থ, প্রধান এবং মূল নিয়ন্তা রূপে প্রকাশিত হয়েছিল।

শিল্প ও শিল্পী মিলিতভাবে জনগণের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি এবং পার্টির প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য বিস্মৃত হয়েছিল। তখন কমিউনিষ্ট পার্টি এই ভাববাদ এবং বুর্জোয়া ঝোঁকগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিত করে। সমরবাবু এই পরিস্থিতির প্রতিনিধিত্ব করছেন, তিনি মার্কসবাদ লেনিনবাদ বিচ্যুত বুর্জোয়া এবং পেটিবুর্জোয়া মানসিকতার শিকার হয়েছেন। বুর্জোয়া সাংবাদিকতার ব্যক্তিগত আক্রমণ,

তাঁর (সমরবাবুর) অবলম্বন। …’দ্বীপ’ নাটকের নাট্যকার দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী অথবা সংশোধনবাদী এবং দলত্যাগীর মধ্যকার পার্থক্যকে ধরতে পারেন নি। সেজন্য দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী অথবা সংশোধনবাদী এবং দলত্যাগী রাজনীতি, দ্বন্দ্ব ও সামাজিক অবস্থাকে এক করে ফেলেছেন। মিলন সরকার যে সংশোধনবাদী নয় ‘দ্বীপ’ নাটক সেই কথাই প্রমাণ করেছে।….

সমরবাবু সেই একই ভুলের জোয়াল কাঁধে নিয়ে চলছেন। দলত্যাগী আর সংশোধনবাদীকে একই পর্যায়ভুক্ত করে উপস্থিত করছেন এবং তার দ্বন্দ্বগুলিকে গাণিতিক নিয়মে বিচার করছেন। এই পদ্ধতি ভুল। সর্বহারা শ্রেণী এবং বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যকার যে দ্বন্দ্ব তা হচ্ছে বিরোধীতামূলক৷ সংশোধনবাদীরা বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্দেশ্যকেই সফল করে এবং বুর্জোয়াদের হাতিয়ার হিসাবেই কাজ করে।…তাই সংশোধনবাদী মিলন সরকার বিরোধী শক্তি। নাটকে মিলন সরকার সে বিরোধী শক্তিরই প্রতিনিধিত্ব করত।… তাই নাট্যকার এবং সমরবাবুর কাছে মার্কসবাদের গোড়ার কথা হোলো মানুষ আর

এখানেই বিকৃতি—যা মূলতঃ মার্কসীয় দর্শনের উপর আক্রমণ… অতএব যে উদ্দেশ্যেই হউক না কেন মার্কসবাদের গোড়ার কথা মানুষ, মার্কসীয় দর্শনের ভুল এবং বিকৃত ব্যাখ্যা—এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সোচ্চার হবেই….তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবেনই, সংগ্রাম করবেনই এবং সে সংগ্রাম মার্কসবাদের সংগ্রাম।”

উপরোক্ত বিতর্ক থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না যে নাটক বিষয়ে উৎপল দত্তর মত ও পথের বিরোধী ছিল গণনাট্য পত্রিকা। উৎপল দত্ত সরাসরি গণনাট্য সংঘে বেশিদিন থাকেননি কিন্তু তাঁর নাট্যকে গণনাট্যসংঘ গণনাট্যের উত্তরসূরী হিসেবে ঘোষণা করেছে বারবার। ‘গণনাট্য’ পত্রিকাও তাঁর সমালোচনা যেমন করেছে তেমনি তাঁর কাজ নিয়ে সদর্থক ভূমিকাও পালন করেছিল। তারই উল্লেখযোগ্য নিদর্শন শান্তিময় গুহ’র ‘কল্লোল’ সমালোচনায়, ‘দ্বীপ’ নাটক নিয়ে শান্তিময় গুহর তীব্র বিরোধিতা এখানে নেই বরং উৎপল দত্তের পাশে যোদ্ধার ভূমিকা নিয়েছেন সমালোচক। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালের অক্টোবর সংখ্যায়। সেখানে ‘কল্লোল’ সম্পর্কে লেখা হয়েছিল,

“কল্লোল, ১৯৪৬-এর বিস্ফোরক দিবসের ইতিহাস। কল্লোল নৌ-বিদ্রোহের প্রতিচ্ছবি। বিদ্রোহের স্পন্দিত ১৯৪৬ এই প্রথম শিল্পে ছাড়পত্র পেল। আর সে পত্র হাজির করল লিটল থিয়েটার গ্রুপ। তাই আজ ‘লিটল থিয়েটার গ্রুপ’-এর প্রতি আমাদের বিপ্লবী অভিনন্দন।…

আজ সংগ্রাম মুখর ১৯৬৫। মুখোমুখি দুই শ্রেণী। সহ অবস্থানের আসন ক্রম অপসৃয়মান। শ্রেণী-সংগ্রামের এইটাই নিয়ম। দুই শ্রেণীর মাঝে সে সুস্পষ্ট রেখা চিহ্নিত করে। চরম পরিণতির মুখে পরস্পরের স্থানকে নির্দিষ্ট করে। সংগ্রামের এই চিহ্নিত রেখা বুকে আজকের ভারতবর্ষ। আজকের কলকাতা তাই বুর্জোয়া মতবাদের ধারক আনন্দবাজার-দেশ গোষ্ঠীর পাশে উপস্থিত পরিচয় মেইন স্কীম। ঘটনার ভিয়ানে পড়ে তাদের চটকদার রঙ জ্বলে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেল।

একই সঙ্গে গলায় প্লাকার্ড ঝুলিয়ে স্লোগান তুলল, এ বিকৃতি, এ রাজনৈতিক অভিসন্ধি, কল্লোল অনৈতিহাসিক—নৌ বিদ্রোহে স্বাধীনতার দাবী ছিল কিন্তু বিপ্লবের কোন আওয়াজ কখনই ছিল না। অথচ তাঁরা ভাল জানেন নৌ-বিদ্রোহে যেমন স্বাধীনতার দাবী ছিল তেমনি বিপ্লবের আওয়াজও ছিল। আজ তাঁরা একথা বলতে পারেন না নিজেদের বাঁচার প্রয়োজনে বুর্জোয়া শ্রেণী স্বার্থেরই প্রয়োজনে।… ইতিহাসের কি নিষ্ঠুর বিচার, বিশ বৎসর আগে আর বিশ বৎসর পরে একই সূত্রে দুই বিরুদ্ধতার সূত্র আবদ্ধ।

সেদিন একদিকে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ কংগ্রেস মুসলিম লীগ আর একদিকে নৌ-বিদ্রোহী আর ভারতের মানুষ, আর আজ একদিকে পরিচয়, দেশগোষ্ঠী। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ। কল্লোলের হাল শক্ত হাতে ধরেছে এই সাধারণ মানুষ।…তাই আজ ‘কল্লোল’-এর জয় কমিউনিষ্ট আন্দোলন ও গণনাট্য আন্দোলনের জয়।…

মঞ্চস্থাপত্য ও যন্ত্রকুশলতায় ‘কল্লোল’ এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। দীর্ঘকাল বাংলা ও ভারতের নাট্যমঞ্চকে কল্লোলের মঞ্চস্থাপত্য প্রভাবিত করে রাখবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। সমগ্র মঞ্চটি যেন এক বিশাল রণক্ষেত্র। প্রতিটি দর্শক সে যুদ্ধের সাথে একাত্ম হয়ে পড়ে। আলোক সম্পাতে, সঙ্গীতে অভিনয়ে দর্শকের সমগ্র চিত্ত সচেতন হয়ে ওঠে। এখানেই ‘লিটল থিয়েটার গ্রুপ’-এর কৃতিত্ব।”

সমগ্র প্রযোজনাটি নিয়ে উচ্ছ্বাস লক্ষণীয়। সমগ্র কলকাতা এই উচ্ছ্বাসে আন্দোলিত ছিল। তাই সমালোচকের আবেগও স্বাভাবিক। কিন্তু লক্ষণীয় হল আনন্দবাজার-দেশ পরিচয় পত্রিকার বিরুদ্ধাচরণ করাটা। ‘কল্লোল’ নিয়ে তাদের ভূমিকা যে সঠিক ছিল না। তার বিরুদ্ধে গণনাট্য সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়েছিল। সমালোচকের ভূমিকা কেবলমাত্র নাট্যের সমালোচনা নয়, সেই নাট্যকে কেন্দ্র করে পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়াকে ব্যক্ত করা— বিশেষত তা যদি হয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের পরিপন্থী তাহলে অবশ্যই সমালোচক তার বিরুদ্ধে কলম ধরতে পারেন—তাতে সমালোচকের ভূমিকা আরও বৃহত্তর হয়ে ওঠে। কল্লোল সমালোচনা সেই বৃহৎ ভূমিকা পালন করেছিল।

তবে গণনাট্যের সামগ্রিক সমালোচনার প্রসঙ্গে বলা যায়, যে-কোনো প্রযোজনাকেই মার্কসীয় দৃষ্টির দ্বারা বিচার করতে গিয়ে কখনো কখনো শিল্পের ভূমিকাকে একপেশে ভাবে দেখার প্রবণতা ছিল। যদিও গণনাট্য পত্রিকা মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতেই নাট্যশিল্পের বিচার করতেই প্রকাশিত হয়েছিল। তাই সাধারণ দৃষ্টিতে একপেশে মনে হলেও তাদের পথে তারা চলেছিল—এই চলাকে মেনে নিতেই হবে সমালোচনার ইতিহাসের স্বার্থে। ১৯৭০-এর সময়সীমার মধ্যে এই আলোচনা করা হল কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই কাজ করে চলেছে এই পত্রিকা। সেই হিসেবে এই পত্রিকার ভূমিকা অনেকখানি।

[ গণনাট্য পত্রিকা, নাট্যপত্র – আশিস গোস্বামী ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন