গন্ধর্ব পত্রিকা , নাট্যপত্র – আশিস গোস্বামী

গন্ধর্ব পত্রিকা , নাট্যপত্র [ আশিস গোস্বামী ] গন্ধর্ব নাট্যদল গঠনের সময়েই সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় ‘গন্ধর্ব’ নাট্যপত্র প্রকাশের। ‘বহুরূপী’ নাট্যপত্র ততদিনে তার প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। তবে বহরূপী তার নিজস্ব নাট্যচর্চা এবং দর্শনের কথা প্রচারেই ব্যস্ত। সামগ্রিক থিয়েটার আন্দোলনের তুলনায় তাঁদের কাছে যে থিয়েটারের পথ ছিল অন্বিষ্ঠ তারই আলোচনা ছিল মুখ্য। কোথায় তাঁরা স্বতন্ত্র এবং থিয়েটারের লক্ষ্য তাঁদের মতে কী হওয়া উচিত বলে মনে করতেন। কীভাবে সেই পথকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, সে কথাই বারবার বলার চেষ্টা করেছে বহুরূপী।

‘গন্ধর্ব’ তাই প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই স্বতন্ত্র পথ খোঁজার জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠে। সে সামগ্রিক নাট্য আন্দোলনের মুখপত্র হবার চেষ্টা করল। এর আগে প্রকাশিত নাট্য, লোকনাট্য, নাট্যলোক-এর মতো ক্ষীণজীবী পত্রিকাগুলিও তো গণনাট্য ধারার প্রচারকে বড়ো বলে মনে করেছিল। তাই গন্ধর্ব দুটি পথের মিলন সাধনে যেমন তৎপর হল, তেমনি সামগ্রিক চেহারাটা থিয়েটার মনস্ক মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার দায়ও নিল। তাই নির্দিষ্ট কোনো মত নয়, সামগ্রিকতার মধ্য দিয়ে থিয়েটারের অন্বেষণটাই গন্ধর্ব পত্রের লক্ষ্য হয়ে উঠল। এই কাজে তারা অত্যন্ত সফল হয়েছিল, আজ বহুদিন পরেও এ কথা অনস্বীকার্য।

আশিস গোস্বামী [ Ashish Goswami ]. গন্ধর্ব পত্রিকা , নাট্যপত্র - আশিস গোস্বামী
আশিস গোস্বামী [ Ashish Goswami ]
তৎকালীন নাট্য আন্দোলন নিয়ে এত বিতর্কমূলক লেখা বা সমালোচনা অন্য কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। যেমন উদাহরণ হিসেবে গন্ধর্ব একাদশ সংখ্যার সপ্তম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত দীপেন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘স্পেশাল ট্রেন’ নাটকটির সমালোচনার কথা উল্লেখ করা যায়। “তবু সুচিন্তিত নাট্য রচনা ও সুঅভিনয়ে ‘স্পেশাল ট্রেন’ সার্থক এ কথা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করছি। কারণ হিন্দমোটর কারখানার ধর্মঘট এই নাটকের বিষয়।

নাটকটি দেখে কলকাতার উপকণ্ঠের একটি কারখানার নিতান্ত স্থানীয় সমস্যার সামগ্রিক চেহারা বুঝতে বুঝতে আমরা ক্রমে তার বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতটিকে দেখতে পেলাম। আন্তর্জাতিক ধনতন্ত্রের ষড়যন্ত্র ও মানুষের অজেয় সংগ্রাম—এই তো আসলে ‘স্পেশাল ট্রেন’।

তা ছাড়া প্রতিটি দর্শক যেমন এই সাতান্ন দিনের ধর্মঘটের যাবতীয় খুঁটিনাটিও প্রসঙ্গত সরকার, পুলিশ বিভাগ, বিড়লা ও বামপন্থী রাজনীতি সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা পাবেন; শ্রমিক আন্দোলনের প্রকৃতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হবেন; তেমনই তাঁরা অজ্ঞাতে এই সংগ্রামী শ্রমিকদের পক্ষে এক ধ্রুব আবেগ বোধ করবেন।

হাসতে হাসতে জ্বলে উঠে প্রতিটি দর্শকই শেষ পর্যন্তও অনির্বাণ প্রতিজ্ঞার আবেগ বোধ করেছেন।…আর নাটকের পাত্রপাত্রীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমরাও যখন মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে চিৎকার করে উঠেছি—তখন আমরাও এক মহত্তর নাটকের অংশীদার হয়েছি। এই কৃতিত্ব বড়ো সামান্য নয়, এই ভাবেই শিল্প জীবন হয়ে ওঠে।

নবনাট্য আন্দোলন ক্রমে ক্রমে এইভাবেই জীবন শিল্প হয়ে উঠুক। সংকীর্ণতা অহমিকা ও আত্মপরায়ণতার সীমা ভেঙে দর্শক আর শিল্পী এমনি একাত্ম হোন। অভিনয় শিল্পের তথাকথিত বিশুদ্ধতার উচ্চ মিনার থেকে নেমে এসে এইভাবেই তাঁরা আমাদের হৃদয়ে অধিষ্ঠান করুক। সে বিচারে ‘স্পেশাল ট্রেন’ সত্যিই এক দিক্‌দর্শন থাকবে।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে ‘বহুরূপীর’ কথা। অনেক বছর আগে তাঁদের ‘বিভাব’ নাটক দেখেছিলাম। সে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। পথনাটিকার সমস্ত উপাদানই তাতে ছিল। কিন্তু কোথায় সেই শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, অমর গঙ্গোপাধ্যায়? তাঁদের বাদ দিয়ে নবনাট্য আন্দোলন সফল হবে কী করে? জাতীয় বিকাশের আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁরাই বা বাঁচবেন কীভাবে?”

কোন একটি পত্রিকায় এতটা গুরুত্ব দিয়ে পথ নাটকের আলোচনা এই প্রথম হল। পথ-নাটকও যে মঞ্চ-নাটকের মতো সমালোচনার যোগ্য এই বোধটা জাগিয়ে দিয়েছিল ‘গন্ধর্ব’। দ্বিতীয়ত, নবনাট্য আন্দোলনের মূল স্রোত থেকে যে এই নাট্যধারা আলাদা নয় সেটাও সমালোচক বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাই ‘স্পেশাল ট্রেন’ প্রসঙ্গে ‘বিভাব’কেও নিয়ে আসেন আলোচনার মধ্যে।

এই সমালোচনাটি সে সময় বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। আনন্দবাজার পত্রিকা ‘গন্ধর্ব’র জন্মলগ্ন থেকে যে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছিল এই সমালোচনাটি প্রকাশের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। অথচ ‘গন্ধৰ্ব’ কিন্তু কোনো হীন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এ কাজ করেনি। নাট্য আন্দোলনের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরাই তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল। সেই জন্যই ‘গন্ধব’র ওই একই সংখ্যায় (একাদশ সংখ্যায়) ‘স্পেশাল ট্রেন’ আলোচনার পরে বহুরূপী ‘বিসর্জন’ প্রযোজনার সমালোচনাটি প্রকাশিত হয়।

যদিও ‘বিসর্জন’ বহুরূপীর অন্য রবীন্দ্রনাটক প্রযোজনার তুলনায় অতখানি জনপ্রিয় ও দিক্ নির্দেশক হয়ে উঠতে পারেনি। এবং সমালোচকের মাধ্যমে সে কথাও জানতে পারি আমরা।

“রবীন্দ্রনাট্য প্রযোজনায় ‘বহুরূপী’র দক্ষতা রসিকজন বিদিত। ইতিপূর্বে উক্ত সংস্থা প্রযোজিত যে রবীন্দ্রনাটকাবলী (চার অধ্যায়, রক্তকরবী, স্বর্গীয় প্রহসন, ডাকঘর ও মুক্তধারা) দর্শক সমক্ষে উপস্থাপিত তন্মধ্যে ‘রক্তকরবী’ ও ‘চার অধ্যায় তাদের খ্যাতির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্পর্শ করেছে

পরন্তু রবীন্দ্র নাট্যের প্রতি সাধারণ দর্শক ও উত্তরসূরী নাট্যসংস্থাকে আগ্রহী এবং আস্থাশীল করে তুলেছে। রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে এবারে তাঁরা কলকাতার নাট্যরসিক জনমণ্ডলীকে পাদপ্রদীপের আলোয় এসে অভিবাদন জানিয়েছেন কবিগুরু রচিত অমর ধ্রুপদী কাব্যনাট্য ‘বিসর্জন’ নিয়ে। বাহাত্তর বছর পূর্বে (১২৯৬) যে নাটকের জন্ম, এতকাল পরেও তার আধুনিক যুগচেতনা সমন্বিত বক্তব্য সবিস্ময়ে লক্ষণীয়।

…কিন্তু এতদ্‌সত্ত্বেও বহুরূপীর এ নাটক নির্বাচনে কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়েছি। কারণ ইতিপূর্বে যে পাঁচখানি রবীন্দ্র নাটক তাঁরা অভিনয় করেছেন তা আঙ্গিক এবং নাট্যকর্মে যে অভিনবত্ব এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হয়েছে তার সুযোগ এ নাটকে প্রায় অনুপস্থিত। তবে মনে হয় এ নাটকের সহজ ভঙ্গীকে আশ্রয় করে বহুরূপী তাঁদের জনপ্রিয়তাকে অক্ষুণ্ণ রাখবার প্রয়াস পেয়েছেন।”

সমালোচক দেখাবার চেষ্টা করেছেন কেন এই নাটক আগের রবীন্দ্র প্রযোজনার তুলনায় যথেষ্ট সমৃদ্ধ নয়। আমরা সমালোচকের মতামত সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করতেই পারি কিন্তু ‘গন্ধব’র দৃষ্টিভঙ্গিটা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। ‘স্পেশাল ট্রেন’-এর সঙ্গে ‘বিসর্জন’ প্রযোজনা যে একই আন্দোলনের শরিক এটা বোঝা যায়।

শুধু তাই নয় ওই একই সংখ্যায় অর্থাৎ চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় ওই দুটি সমালোচনা ছাড়াও ছিল ‘পঞ্চমিত্রম প্রযোজিত দু-খানি উজ্জ্বল প্রহসন’, ‘থিয়েটার গ্রুপ প্রযোজিত সূর্যায়ণ’, ‘নাটমহল প্রযোজিত মোকাবিলা’, ‘নটরূপ প্রযোজিত দুটি প্রহসন’, ‘দশরূপক প্রযোজিত কালপুরী’, ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং ঘুম নেই-এর অভিনয়’, ‘রূপদক্ষের প্রযোজনায় মরা স্রোত’, ‘নব্য রীতির প্রযোজনায় আলমগীর’— প্রভৃতি প্রযোজনার রিপোর্টাজ ও সংক্ষিপ্ত সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল।

‘গন্ধব’ এই সমস্ত সমালোচনার স্বপক্ষে জানিয়েছিল—“রাজনৈতিক মূল্যবোধ মানুষের কাছে আর পাঁচটা নৈতিক মূল্যবোধের মতোই। তাই থিয়েটারে রাজনীতির প্রবেশ অনধিকার জাত নয় বলেই মনে করি।”

তাই রাজনৈতিক থিয়েটারের মহান পুরুষ উৎপল দত্তের লিট্ল থিয়েটার গ্রুপের ঐতিহাসিক প্রযোজনাগুলির সমালোচনা একের পর এক প্রকাশিত হয়েছে গন্ধর্ব পত্রে। আগেই বলা হয়েছে বহু বিতর্কমূলক আলোচনা এই পত্রিকায় হয়েছে। এদিক থেকে পরবর্তীকালের ‘থিয়েটার’ পত্রিকার ভূমিকাও ‘গন্ধব’র মতোই উদাহরণযোগ্য বলা যায়।

সেই বিতর্ক সম্পর্কে সচেতন নাট্য সমালোচক ‘অঙ্গার প্রসঙ্গে’ সমালোচনা করতে গিয়ে তৃতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যার ১০৪ পৃষ্ঠায় লেখেন, “কিছু লিখতে গিয়ে মন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। মিনার্ভা মঞ্চে এ নাটক প্রযোজনায় যে তর্ক বিতর্কের ঝড় উঠেছে—স্রোতের টানে তার যে কোন একদিকে রায় দিয়ে হাততালি কুড়োনো খুবই সহজ ব্যাপার, কিন্তু তা বাঞ্ছনীয় নয়। তবু দায়িত্ব রয়েছে আমাদের বিচার বুদ্ধি অনুসারে এই দর্শক অভিনন্দিত নাটকের মূল্যায়নে।

…মিনাভায় লিট্ল থিয়েটার গ্রুপের প্রযোজনা বাংলার পেশাদার মঞ্চকে আর এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গ্যাছে। একই সঙ্গে জনাপঞ্চাশেক কর্মিষ্ঠ চরিত্রকে মঞ্চের ওপর পরিচালনা করা বা পিট হেডের (অঙ্গার) মঞ্চস্থাপত্য নিঃসন্দেহে বাংলার পেশাদারী মঞ্চকে প্রভাবিত করবে। যেমন বহুরূপীর আলোক সম্পাতের নতুনত্ব আজ বাংলা নাট্যমঞ্চের সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অগ্রগতি এমনি করেই হয়। অবশ্য হওয়া উচিত আরো সহজে আরো সরল রেখায়। ‘দুঃখীর ইমান’ বাংলা নাটকের একটি পদক্ষেপ কিন্তু তা ছিল Sporadic– তার পেছনে সংঘবদ্ধ পরিকল্পনা ছিল না। পরবর্তীকালে ‘নবান্ন’ উপস্থিত হল— তার পেছনে সংঘবদ্ধ পরিকল্পনা ছিল। তার নাট্যকার পরিচালক সংগঠক প্রত্যেকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছেন নাট্য প্রযোজনাকে।

তাই এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নতুন চেতনা জীর্ণ অচলায়তনের প্রাচীরকে ভেঙ্গে দিতে পেরেছিল। সেদিন শুধু বক্তব্যের বলিষ্ঠতায় দর্শকের মন জয় করা গেল। সেদিন মঞ্চস্থাপত্য, আলোক সম্পাত ইত্যাদির ঘাটতি পীড়িত করেছে আমাদের মনকে। গুণীজনেরা নাটকের অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন, তারই সঙ্গে নিন্দা করেছেন প্রোডাকসনের।

আজ লিট্ল থিয়েটার গ্রুপ আমাদের সবার হয়ে উত্তর দিয়েছেন সেই চ্যালেঞ্জের। সবাইকে এক বাক্যে স্বীকার করতে হয়েছে এমন প্রোডাকসন বাংলাদেশে এই প্রথম। এটা কিন্তু কিছুতেই সম্ভব হত না। যদি তারা মিনার্ভার মতো একটি স্থায়ী মঞ্চ নিয়মিত ব্যবহার করার সুযোগ না পেতেন।

অবশ্য পাশাপাশি আমরা বলব মিনার্ভা থিয়েটারে অঙ্গারের ব্যবসায়িক সাফল্যে উদ্দীপ্ত হয়ে যেন তারা ভুলে না যান যে পেশাদার মঞ্চে সর্বহারা মানুষের এই প্রথম পদক্ষেপ হলেও বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে এমন দাবী তারা করতে পারেন না ইতিপূর্বে বাংলা অপেশাদার মঞ্চে ‘নবান্ন’, ‘মশাল’, ‘ইস্পাত’, ‘মৌচোর’, ইত্যাদি আরো অনেক নাটক প্রযোজিত হয়েছে যেখানে আমরা সর্বহারা মানুষের দৃঢ় পদক্ষেপ দেখতে পেয়েছি।”

সমালোচক সেই সময়ের সার্বিক থিয়েটারের প্রেক্ষাপটে অঙ্গারের গুরুত্ব বিচার করে দেখার পরে নাটকের আঙ্গিক ও বিষয় সম্পর্কে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন,

“গোটা নাটক স্তব্ধ হয়ে দেখতে দেখতে শেষ দৃশ্যে যখন জলপ্লাবন মঞ্চকে ভাসিয়ে দেয়, তখন আর্ত চিৎকারের পরিবর্তে প্রত্যহ যখন সমাজ থেকে পায়রা ওড়ান হাততালি বেজে ওঠে তখন কি ভেবে দেখছেন—কেন? কেন এই উচ্ছ্বাসপূর্ণ Chearing Up!

দর্শকরা বোকা–সামাজিক শক্তি সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই তাদের—এটাই কি উত্তর? লিটল্ থিয়েটার গ্রুপের সদস্যরা যদি এ কথা মনে করেন তবে বলব তাদের অধঃপতন ঘটেছে—বলব মিনার্ভা মঞ্চ তারা ছাড়ুন বা নাই ছাড়ুন নবনাট্য আন্দোলনের প্রতিভূ সেজে বড়ো বড়ো বাত আওড়াবার কোনো অধিকার নেই।…বিশ্বাস করুন উৎপলবাবু, শেষ দৃশ্যে যখন হাততালি পড়ল—শতাধিক রজনী প্রযোজনার পরেও আমার হাসতে ইচ্ছা করছিল উঁচু সুরে–ঠিক যেমন আপনার হাসি পেত স্টার ইত্যাদি রঙ্গমঞ্চে ঐতিহাসিক নাটকের অভিনয় দেখতে গিয়ে।

..অঙ্গার নাটকের অন্য ছোটখাট ত্রুটি বিচ্যুতির কথা বাদ দিয়ে তার মধ্যেকার মৌল যে সংঘাত দেখানোর চেষ্টা হয়েছে তার দিকে নজর দিলে দেখা যাবে সংঘাতের স্থানচ্যুতি ঘটেছে। অর্থাৎ গোটা নাটকের বুনুনের মধ্যে যাদেরকে এই ভয়াবহ জীবন্ত সমাধির জন্য দায়ী করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্বল হয়ে পড়েছে নাট্যকারের সিচুয়েশন তৈরির দুর্বলতায়।”

উৎপল দত্তের ‘স্পেশাল ট্রেন’ নাটকের সমালোচনার উচ্ছ্বাস এখানে নেই বরং আছে তীব্র সমালোচনা। পত্রিকার পক্ষ থেকে উভয় মতামতকেই শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখা হয়, “সমাজ মানসের বিশেষ এক দর্পণ স্বরূপ তার নাট্য-নাট্যসংস্কৃতি। সময়ের বিশেষ পরিধিতে তার কতকগুলি লক্ষণ সচরাচর লক্ষিত হয়ে থাকে। সেই লক্ষণগুলি সব সময়েই আলোচনার অপেক্ষা রাখে।

সকলেই যে এসব আলোচনায় একমত হবেন, তা কোনমতে যুক্তি সঙ্গত নয়। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষ দর্পণে তার বিভিন্ন আয়তনিক প্রতিফলন ঘটতে বাধ্য। বর্তমানের নাট্য প্রযোজনায় শিল্পরীতির যে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়, সেই বিচিত্র ও বিশিষ্ট সব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বর্তমান আলোচনা সন্নিবিষ্ট হল। সম্পাদক তাঁর পত্রিকার আলোচকদের সঙ্গে সর্বত্র মতৈক্য না ঘটিয়েও এই সব আলোচনা পত্রস্থ করেছেন এই যুক্তিতে যে এগুলির পেছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে ও সততা চিহ্নিত বক্তব্য রয়েছে।”

এই নিরপেক্ষ ভূমিকা কেবলমাত্র আমন্ত্রিত লেখকদের ক্ষেত্রেই বজায় রাখা হত না, গন্ধর্ব-র মানুষেরাও যখন সমালোচকের ভূমিকা নিত তখন তাঁদের ব্যক্তিগত মতামতকেও অক্ষতভাবে প্রকাশ করা হত। যেমন শ্যামল ঘোষের তৃতীয় বর্ষ নবম সংখ্যায় সপ্তম পৃষ্ঠায় ‘ফেরারী ফৌজ’-এর আলোচনাটি স্মরণ করা যেতে পারে।

“এক বিশ্বত-প্রায় গৌরবময় অতীতকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব দেবার প্রচেষ্টায় দুঃসাহসিক রীতিতে সাম্প্রতিক কালের পেশাদার মঞ্চে উপস্থিত করার জন্য নাট্যকার উৎপল দত্ত তথা লিট্ল থিয়েটার গ্রুপকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

যদিচ কাহিনী-বিন্যাস ঘটনার আকস্মিকতা এবং মঞ্চ উপস্থাপনার প্রতি নাট্যকার ও নির্দেশক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে আংশিক সফলতা লাভ করেছেন তবু বলবো নাট্যরচনার দক্ষতায় উৎপলবাবু তাঁর পূর্বসুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন নি। বেশকিছু ত্রুটি এবং অসংগতি নাটকের কক্ষপথে দাঁড়িয়ে তার চলিত সুগমতাকে বিব্রত পরন্তু নাট্য দর্শকের রসগ্রহণে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। …নাট্য প্রযোজনা এবং নির্দেশনায় শ্রীযুক্ত উৎপল দত্ত যে নিষ্ঠা এবং দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তার দৃষ্টান্ত বিরল।

নাটকের আরম্ভ থেকে শেষ পর্যন্ত রুদ্ধ নিঃশ্বাসে দর্শককে বসে থাকতে হয়।” উৎপল দত্ত কখনও তাঁর নাট্য রচনা সম্পর্কে কখনও প্রযোজনা সম্পর্কে বিতর্কে জড়িয়েছেন বারবার। নাট্য সমালোচনায় সেই বিতর্কের প্রতিফলন ছিল। ‘গন্ধর্ব’র কয়েকটি সমালোচনা বিশেষভাবে উল্লেখ্য এই কারণে যে এই সমালোচনা মূলক বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছেন নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষেরাই। কখনও নাট্যকার গিরিশঙ্কর, কখনও পরিচালক শ্যামল ঘোষ বা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মানুষেরা।

আগের উদ্ধৃতিগুলি এই অভিমতের স্বাক্ষর বহন করে। প্রসঙ্গত পঞ্চম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যায় ৬৭ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ প্রযোজনাটির সমালোচনাও উল্লেখযোগ্য। “পেশাদারী রঙ্গমঞ্চে তিতাস একটি নদীর নাম প্রযোজিত হতে পারল, তিনি নাট্যরূপ করেছেনও নিজস্ব ভঙ্গীতে।

এই ভঙ্গী এতাবৎকাল বাংলাদেশে অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু এই প্রশ্ন যে শিল্পের দিক থেকে এই ভঙ্গী কি খুব জরুরি ছিল? অথবা এই ভঙ্গী থিয়েটারকে কি এমন কোনও মুক্তির পথ দেখাতে পেরেছে, যে কারণে একে প্রগতিশীল ও অভিনন্দনীয় বলা যেতে পারে।

নিশ্চয়ই না, এই নাটকে প্রযোজনার ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে একটি প্যাটার্ণ কিন্তু সামগ্রিকভাবে নাট্য-প্রযোজনার ক্ষেত্রে এটি ফলপ্রসূ নয়, পিকচার ফ্রেম থেকে নাট্যশিল্পকে মুক্তি দেবার প্রচেষ্টা এবং চতুর্থ দেওয়ালকে অস্বীকার করে মঞ্চকে দর্শকদের মধ্যে প্রসারিত করে তাঁদের অভিনীত নাটকে অংশীদার করে তোলার প্রচেষ্টা এদেশেও আগে হয়েছে কিন্তু তাতে মঞ্চ স্থাপত্যের ভূমিকা অনুপস্থিত ছিল। আলোচ্য নাটকটির ক্ষেত্রে সেই ভূমিকা উপস্থিত।…

এই প্রচেষ্টা মঞ্চস্থাপত্যের ক্ষেত্রে কতটা সাফল্যমণ্ডিত বিচার করা যাক। শ্রী নির্মল গুহরায়ের প্রচেষ্টায় লিট্ল থিয়েটারের নাটকগুলিতে মঞ্চস্থাপত্যের ক্ষেত্রে শিল্পরীতির যে গণ্ডগোল অন্যান্য নাটকে ঘটে থাকে এ নাটকেও সেটি বর্তমান।

মঞ্চস্থাপত্যে কখনও Suggestive, কখনও naturalistic, কখনো বা কিছুই না এবং কল্পনার বাধাস্বরূপ… শিল্পের দিক থেকে এগুলির কোনও যৌক্তিকতা নেই, একই নাটকের ব্যবহৃত সেটে শৈল্পিক চিন্তা ও মেজাজ এক নয়। বিভিন্ন সেটে অভিনয় ধারারও কোনও পরিবর্তন নেই। সুতরাং মঞ্চস্থাপত্যে এই বৈষম্য অত্যন্ত স্পষ্ট।…

বিরাট পটভূমিকায় বিধৃত জীবনকে দেখানোর জন্যে প্রয়োগ প্রধান সমগ্র পরিকল্পনাকেও ব্যাপক করেছিলেন কিন্তু মঞ্চের বাইরের বিরাটত্ব থেকে বারবার তাঁকে picture frame-এ আনাগোনা করতে হয়েছে।…যাঁদের কাজ থেকে বাংলাদেশ আধুনিক নাটক আশা করে শ্রী উৎপল দত্ত তাঁদের একজন। প্রয়োগ রীতির দিক থেকেই আধুনিক নয়। কেননা সে কাজ সহজ, চিত্তবৃত্তি ও আত্মিক দিক থেকে আধুনিক নাটক।”

এলটিজির এই সমস্ত প্রযোজনার সমালোচনাগুলি ছাড়া ওই নাট্যগোষ্ঠীর আর মাত্র একটি প্রযোজনার সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল—’জনতার নাটক কল্লোল’। কিন্তু ‘গন্ধর্ব’-র সমালোচনা ধারায় আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, বহুরূপীর তিনটি অসাধারণ নাট্য প্রযোজনার সমালোচনা। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বহুরূপীর দশচক্র’ এবং বিষ্ণু বসুর ‘রাজা ওয়েদিপাউস ও বহুরূপী’।

গন্ধর্বের পঞ্চম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যার ৭১পৃষ্ঠায় ‘দশচক্র’র সমালোচনার শুরুতেই সমালোচক লেখেন, “এ নাটকের দরকার ছিল। এই মুহূর্তেই দরকার ছিল। জন্মলগ্ন থেকেই নাটক মানুষের সমাজ ও পরিবার সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে দর্শক সাধারণকে ভাবিয়ে তুলেছে। থিয়েটার সেই নাটকেরই বাহন থেকেছে—অবশ্য একথাও সত্য যে, থিয়েটারেই সেই নাটক যথার্থ পূর্ণতা পেয়েছে।…

নাটকের পরিবেশনায় গাণিতিক শৃঙ্খলার ঐক্যই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। স্তানিস্লাভস্কির লেখা পড়ে মনে হয়, তিনি ‘এনিমি অফ দি পিপল’ প্রযোজনা কালে ডাক্তার স্টকম্যানের চূড়ান্ত একাকীত্বের দিকেই নাটককে এগিয়ে নিয়ে গেছলেন, এবং এই একাকীত্বের উপরেই জোর দিয়েছিলেন। বহুরূপীর প্রযোজনায় শেষ দৃশ্যে বাস তোরঙ্গে যখন সকলেই হাত লাগায়, তখন সমগ্র পরিবার এবং বাইরের সমাজ থেকে অন্তত একজন (সমরেশ) একটি সংহত ইউনিট রচনা করে।

‘দশচক্র’ প্রসঙ্গে আলোচনাকালে শ্রী শম্ভু মিত্রের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাব, আমাদের মঞ্চে সত্যিকারের শিক্ষিত চরিত্রকে ফিরিয়ে আনলেন বলে। রীতিমতো নাটকে’ নাট্যাচার্য শিশিরকুমারের অধ্যাপক দিগম্বর চরিত্রের পর এ জাতীয় চরিত্র যেন আমাদের মঞ্চ থেকে উধাও হয়ে গেছে।”

বর্তমানে দাঁড়িয়ে আমরা অতীতের যে প্রযোজনাগুলির জন্য গৌরব বোধ করি, সমসাময়িক কালে সেই প্রযোজনাগুলি বিতর্ক এড়াতে পারেনি। এলটিজি-র প্রযোজনাগুলির বিতর্কের উল্লেখ আগেই করা হয়েছে, বহুরূপীও এড়াতে পারেনি। বিতর্কের ঝড়। ‘রক্তকরবী’-তে যে বিতর্ক উঠেছিল ‘রাজা ওয়েদিপাউস’-এ তার রেশ এসে পড়েছিল।

সমালোচক সেই বিতর্কের উল্লেখ এবং তার নিজস্ব মতামত অনুযায়ী উত্তর দেবার চেষ্টা করেছেন গন্ধর্ব ২৬তম সংখ্যার ১২৩ পৃষ্ঠায়, “বহুরূপীর ‘রাজা ওয়েদিপাউসে’ গত একবছরে সুধীজনের ভেতর নানা মতের ঝড় তুলেছে।…তা হল এক, রাজা ইডিপাস গ্রীক ট্র্যাজেডি, অর্থাৎ সেখানে দৈবই প্রধান, মানুষ অসহায় ক্রীড়নক। কাজেই বর্তমান মানুষের কাছে তার আবেদন অচল, এবং প্রগতির যুগে অন্ধ দৈবশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ প্রতিক্রিয়াশীলতার নামান্তর।

মানুষ নিজের ভাগ্য নিজে রচনা করে, অতএব ঐশীশক্তির স্বীকৃতি অনুচিত; দুই ইডিপাসের ঘটনা বর্তমান যুগের রুচি বিরোধী পুত্র কর্তৃক পিতৃহত্যা এবং মাতৃগমন অশ্লীলতার চূড়ান্ত। …এখন রাজা ইডিপাসের বিরুদ্ধে বক্তব্যগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।

কালজয়ী সাহিত্যের অর্থ (Significance) বিশেষ কাহিনী বা চরিত্রের স্থির নির্দিষ্ট গভীর ভেতর আবদ্ধ থাকে না, সে যুগের এমন কিছু তাৎপর্য তার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। যে সে হয়ে ওঠে Symbol। তাই সে বিশেষ হয়েও সাধারণ, সাধারণ হয়েও বিশেষ। ফলে তার প্রভাব সেই বিশেষ যুগকেও ছাড়িয়ে যায়, হয় সর্বযুগের সাধারণ সম্পদ।…

সমাজে অনেক সময় এমন অনেক অন্যায় অথবা দুর্নীতি দেখা যায়, যা দূর করবার জন্যে শুভবুদ্ধির সম্পন্ন কোন মানুষ আন্তরিক ভাবে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে। কিন্তু সাধারণত কোনো অন্যায় স্বতন্ত্র বা বিচ্ছিন্ন কিছু একক পদার্থ হিসেবে বসবাস করে না। সচরাচর তা এমন কতগুলি সূত্রে বাঁধা থাকে যার মূলোচ্ছেদ করা শক্ত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ এটাকে একটা Chain of Corruption বলা যেতে পারে।

এমন কি, উৎসাহী ব্যক্তি হিসেবে অন্যায়ের উৎস সন্ধানে যাত্রা করে বিস্ময়ে এমন আবিষ্কার নিশ্চয়ই অসম্ভব নয় যে সমাজের সভ্য হিসেবে সে অন্যায়ের সঙ্গে অজানিত ভাবে তিনি নিজেই জড়িত। বরং তার ভূমিকাই হয়ত প্রধান বলে প্রতীয়মান হতে পারে।… কাজেই কোনো দুর্যোগে অপরকে দোষী সাব্যস্ত করে চোখ ঠেরে যতই না আত্মপ্রসাদ লাভ করা যাক, সামাজিক নিয়মমতে তার অনাবৃত প্রকাশ অবশ্যম্ভাবী।

…‘রাজা ইডিপাসে’ও তাই ঘটেছে। আর সেজন্যই এ নাটক বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে Symbol হয়ে উঠেছে।…পরিশেষে একটি কথাই বলা যায়, বহুরূপীর এ প্রযোজনা বাঙলাদেশের নাট্য ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য অবদান এবং এর ফলে বাঙলা মঞ্চের ভৌগোলিক সীমা অনেক বেশি প্রসারিত হল। বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব, আন্তর্জাতিকতার অংশীদার ইত্যাদি মহৎ কথা শুধুমাত্র মুখের বুলি হয়ে থাকলেই চলে না, তার জন্য যে শিল্পীসুলভ প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়, বহুরূপীর ‘রাজা ওয়েদিপাউস’ তারই উজ্জ্বলতম স্বাক্ষর।”

প্রসঙ্গত আরও দুটি নাট্য সমালোচনার উল্লেখ করা হল—যা নাট্য সমালোচনার ক্ষেত্রে ‘গন্ধব’র ভূমিকাকেই বড়ো করে তোলে। যেমন, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর ‘ওয়েটিং ফর গোডো: সাম্প্রতিক’ এবং গৌতম সান্যালের ‘মঞ্জুরী আমের মঞ্জুরী’, সাম্প্রতিক নিবেদিত ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ সম্পর্কে গন্ধর্ব সপ্তম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় —–সমালোচক লিখেছেন—“প্রথমত, আপামর দর্শক সাধারণ এ নাটকে তৃপ্তি লাভ নাও করতে পারেন।

কিন্তু যাঁরা সাহিত্য, ইতিহাস ইত্যাদির মাধ্যমে য়ুরোপীয় জীবনের চেহারার সঙ্গে পরিচিত ওয়েটিং ফর গোডোর অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁরা য়ুরোপীয় জীবনের এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশের নাট্যায়িত দলিল পাবেন। এছাড়াও নাট্যতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও নাটকে উদ্ঘাটিত হওয়ায় এই নাটকের প্রযোজনা অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। নাট্যতত্ত্বের গতানুগতিক প্রথাগুলিকে লঙ্ঘন করেও সার্থক নাট্য সৃষ্টি যে সম্ভব—তার স্বাক্ষর ‘ওয়েটিং ফর গোডো’।

এ নাটকে প্লট নেই, শুরু নেই, শেষ নেই, বিষয় বস্তু নেই….তবুও এ নাটক থিয়েটার হিসেবে সার্থক, বাংলাদেশের যে নাট্যকারেরা প্রথাসিদ্ধ নাট্যকলার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন তাঁরা প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে সার্থক নাটক সৃষ্টি করার উৎসাহ ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ থেকে পেতে পারেন।”

ওই পৃষ্ঠা সংখ্যায় মঞ্জুরী আমের মঞ্জরী নিয়ে লেখা হয়, “ ‘মঞ্জুরী আমের মঞ্জরী’ আন্তন চেকভের নাটকের ইংরেজি অনুবাদ ‘দ্য চেরী অর্চার্ড’-এর বাংলা অনুবাদ এটি। সুনির্বাচিত বিদেশী নাটকের বাংলা রূপান্তরের অভিনয় বাঙালি দর্শকের সামনে উপস্থাপিত করার প্রচেষ্টার জন্য নান্দীকার ধন্যবাদাহ।…নাটক যতক্ষণ চলে তখন কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া দর্শককে মোটামুটি অভিভূত হয়ে থাকতে হয় এবং সামগ্রিক ভাবে নাটকটি রসোত্তীর্ণ বলে মনে হয়।”গন্ধর্ব পত্রিকা , নাট্যপত্র – আশিস গোস্বামী

[ গন্ধর্ব পত্রিকা , নাট্যপত্র – আশিস গোস্বামী ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন