আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী

আশিস গোস্বামীর “বাংলা নাট্য সমালোচনার কথা” বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে “আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য” নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন:

বাংলা নাট্য সমালোচনার ক্ষেত্রে আধুনিক সময়ের হিসেব ১৯০১ থেকে। ‘বহুরূপী’ পত্রিকার প্রকাশ ১৯৫৫ সালকেই ধরব। কারণ তার আগে নাট্য সাংবাদিকতা থাকলেও নাট্যপত্র ছিলই না। নাট্য সাংবাদিকের ভূমিকার রূপরেখা আগের অধ্যায়ে কিছুটা পাওয়া গেছে। বাংলা থিয়েটারে অমরেন্দ্র নাথ দত্ত অবশ্য স্মরণীয় কৃতী মানুষ হয়ে আছেন। থিয়েটারকে জনপ্রিয় করার তাগিদে মঞ্চকে অভিনবভাবে ব্যবহারের কৃতিত্বে এবং প্রথম নাট্যপত্র ‘রঙ্গালয়’ স্থাপনের মধ্য দিয়েই তিনি পথিকৃৎ হয়ে আছেন। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় দু-বছর প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকাটি। ওই দু-বছরেই অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল পত্রিকাটি। এখানেও নাট্য সমালোচনার চেয়ে নাট্য সংবাদেরই প্রাধান্য ছিল। তবে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিল নাট্যপত্র প্রকাশের প্রয়োজনীয়তাকে।

মিনার্ভা থিয়েটার কোলকাতা
মিনার্ভা থিয়েটার কোলকাতা

তারপরের পঁচিশ বছরে প্রায় এগারো-বারোটি পত্রিকা প্রকাশিত হল। নীচে একটি অসমাপ্ত তালিকা দেওয়া হল ভবিষ্যতে হয়তো সম্পূর্ণ হবে। তালিকাটি অসম্পূর্ণ লিখছি এই কারণে যে, বিভিন্ন সূত্র ধরে অনেকগুলি নাম পেয়েছি। অনেক পত্রিকা চোখেই দেখিনি। অসম্পূর্ণ হলেও একটা তালিকা থাক যার সূত্র ধরে ভবিষ্যতেও সম্পূর্ণতা আসবে।

১. রঙ্গালয় (১৯০১-০৪) – পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত

২. বঙ্গভূমি (১৯০১) – মিনার্ভা থিয়েটার থেকে প্রকাশিত

৩. রঙ্গমঞ্চ (১৯১০) – মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত

৪. নাট্যমন্দির (১৯১০-১৫) – অমরেন্দ্র নাথ দত্ত সম্পাদিত

৫. নাট্যপত্রিকা (১৯১৩) – নারায়ণ চন্দ্র সেন সম্পাদিত

৬. থিয়েটার (১৯১৪) – অমরেন্দ্র নাথ দত্ত সম্পাদিত

৭. নাট্যপ্রতিভা (১৯১৮) – সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত

৮. সচিত্র শিশির (বাংলা ১৩৩০) – বিজয়রত্ন মজুমদার, পরে শিশির কুমার মিত্র সম্পাদিত

৯. নাচঘর (১৯২৪-২৬) – হেমেন্দ্রকুমার রায় ও প্রেমাঙ্কুর আতর্থী সম্পাদিত

১০. রূপ ও রঙ্গ (১৯২৪) – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও নির্মল চন্দ্র সম্পাদিত

১১. বঙ্গদর্শন (১৯২৫) – অমরেন্দ্র নাথ দত্ত সম্পাদিত

১২. নটরাজ (১৯২৫) – শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত সম্পাদিত

১৩. বঙ্গ রঙ্গালয় (১৯২৬) – শৈলেন্দ্র নাথ ঘোষ সম্পাদিত

১৪. অভিনয় (বাংলা ১৩৩০) – তিনকড়ি চক্রবর্তী সম্পাদিত

১৫. ভগ্নদূত () – জানা যায়নি

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

‘রঙ্গালয়’ পত্রিকার প্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যে মিনার্ভা থিয়েটার কর্তৃপক্ষ ‘রঙ্গভূমি’ সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করে। জানা যায় যে, চার-পাঁচ মাসের বেশি পত্রিকাটি স্থায়ী হয়নি। ওই একই বছরে ‘নাট্যমন্দির’ এবং ‘রঙ্গমঞ্চ’ পত্রিকা দুটিও প্রকাশিত হয়। ‘নাট্যমন্দির’ গিরিশচন্দ্র ঘোষের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল বলে অর্ধেন্দু শেখরের উদ্যোগে তাই ‘রঙ্গমঞ্চ’র প্রকাশ ঘটে। ‘রঙ্গালয়’ ও ‘রঙ্গভূমি’ দুটি পত্রিকাই স্বল্পস্থায়ী কিন্তু প্রভাবিত করেছিল যথেষ্ট। প্রসঙ্গত স্মরণীয় দুটির কোনোটিতেই নাট্য সমালোচনা ছিল না।

‘রঙ্গালয়’ অনিয়মিতভাবে দু-বছর এবং ‘রঙ্গভূমি’ চার-পাঁচ মাস স্থায়িত্ব পেয়েছিল। এই দুটি পত্রিকা সম্পর্কে ‘রঙ্গমঞ্চ’ পত্রের প্রথম ‘সম্পাদকীয়’তে লেখা হয়েছিল, “রঙ্গমঞ্চের কার্য অত্যন্ত কঠিন। ইতিপূর্বে এরূপ উদ্দেশ্যে এ দেশে কোনও সাময়িক পত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। ‘রঙ্গভূমি’ ও ‘রঙ্গালয়’ নামে দুইখানি সাপ্তাহিক পত্র কিছুদিনের জন্য কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিল সত্য; কিন্তু অল্পদিনের জন্য উহা জলবিম্ববৎ জলেই মিলাইয়া গিয়াছে। উহাদের লেখকরা সাহিত্যক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাপন্ন ছিলেন। তথাপি উক্ত পত্রদ্বয় স্থায়িত্ব লাভ করে নাই। সেইজন্য এইরূপ বিষয়ের আলোচনাৰ্থে কোনো সাময়িক পত্র প্রকাশে অনেকে হস্তক্ষেপ করিতে সাহসী হন নাই।”

রঙ্গালয় পত্রিকা [ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য - আশিস গোস্বামী ]
রঙ্গালয় পত্রিকা
পরবর্তী অনেক পণ্ডিতেরাই মনে করতেন, যে প্রয়োজনের দিকে তাকিয়ে এই নাট্যপত্রগুলির প্রকাশ ঘটেছিল তা পুরোপুরি ফলপ্রসূও হয়নি। যেমন ধনঞ্জয় মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘বঙ্গীয় নাট্যশালা’ গ্রন্থে লিখেছিলেন—“সাধারণের মতামত সাধারণ্যে প্রকাশ করিতে হইলে, সংবাদপত্রকেই যানবাহনের কার্য্য করিতে হয়, কিন্তু সংবাদপত্র সম্পাদকগণ নাট্যশালা সম্বন্ধে এতটা নিৰ্ব্বাক যে, বাহিরের লোকের লিখিত কোন সমালোচনাও তাঁহারা পত্রস্থ করিতে প্রস্তুত নহেন।

অন্যের কথা দূরে থাকুক, ‘রঙ্গালয়’ নামে পত্রখানি দুই বৎসর প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহাতেও কখনও রঙ্গালয়ের সমালোচনা স্থান পায় নাই, ইহা অপেক্ষা আশ্চর্য্যের কথা—আশ্চর্য্যকর্তব্য বুদ্ধির কথা আর কি হইতে পারে?” নাট্যপত্রগুলির এহেন ‘কর্তব্য বুদ্ধির’ ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের ভূমিকা কিন্তু এতটা নির্বাক মনে হয়নি। কারণ তখন নিয়মিত ভাবে স্টেটসম্যান, অমৃতবাজার পত্রিকা, বেঙ্গলী-তে নাটকের বিজ্ঞাপন, সংবাদ এবং সমালোচনা প্রকাশিত হত। বস্তুতপক্ষে এই সমস্ত নাট্যপত্রের তুলনায় সংবাদপত্রই তৎকালীন থিয়েটারকে বুঝতে অনেক বেশি সাহায্য করে আমাদের।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

১৯০১ সালেই স্টেটসম্যান পত্রিকায় মিনার্ভা থিয়েটারের ‘প্রাণের হাসি’ নাটকের সমালোচনা ১২ অক্টোবর ১৯০১-এ প্রকাশিত হয়েছিল—“The first performance of ‘Praner Hasi’ was given at this Theatre last Saturday before a large andand

enthusiastic audience. The piece appears to have been modelled on one of the tales in the ‘Arabian Night’, and deal with Love-Story at a prince and the daughter of the Uzir. Their trails and difficulties are sympathetically treated, and the part of ‘Delmor’ was well represented. The dancing couple ‘Aliyar’ and ‘Jumala’ performed some smart dances, and their comic duets and confrontations kept the audience in nears of laughter.”

ওই একই পত্রিকায় স্টার থিয়েটারের সম্পর্কেও ২৫ ডিসেম্বর ১৯০১-এ লেখা হয়েছিল,

“These was a bumper house and Babu Bunkim Chander’s “Bisha-Briksha’ was played with great success. Tonight the theatre will be again illuminated, and an opera ‘Ananda Mangal’ to be followed by Babu A.L.Bose’s new christmas sketch ‘Avatar’will be introduced under the patronage of the Maharaja of Burdwan. It is certain to be a success, as in finite pains have been bestowed on the production, and the large number of attractive melodies it contains uld appeal to all sections. of the community.”

কিন্তু এই ধরনের সমালোচনা ও সংবাদে থিয়েটারওয়ালারা সম্ভবত তুষ্ট ছিলেন না। তাই নিজস্ব নাট্যপত্রের তাগিদটা ছিল। যেমন ‘নাট্যমন্দির’-এর সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল— “বঙ্গদেশেও সেই আনন্দ প্রদায়িনী ‘নাট্য-মন্দির’ হইয়াছে। এ ‘নাট্য-মন্দিরের যে অনেক ত্রুটি রইয়াছে, এবং উন্নতির যে অনেক অপেক্ষা, তাহা মন্দির অধ্যক্ষেরা অকপটে স্বীকার করেন। কিন্তু তাঁহাদের প্রাণপণ উদ্যম ও আজীবনের আকিঞ্চন, নিন্দার বিষদত্ত হইতে পরিত্রাণ পায় না। নিন্দুকের এক আশ্চর্য শক্তি! তাহারা একরূপ সর্বজ্ঞ।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

নাট্যাচার্য্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী জাহাঙ্গীরের বেশে
নাট্যাচার্য্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী জাহাঙ্গীরের বেশে

সমুদ্রের গর্জন না শুনিয়াও – ফরাসি দেশের নাট্য-মন্দির কিরূপে চলিতেছে, তাহা তাঁহারা জানেন, এবং আমাদের দেশের নাট্য-মন্দির যে ফরাসি দেশের নাট্য-মন্দির নয়, তজ্জন্য ঘৃণা করেন। গৃহে বসিয়া বিলাতের ‘ডুরিলেন’ থিয়েটারও দেখিয়াছেন। স্যার হেনরি আরভিংকে তথায় আনাইয়া, তাহার অভিনয়ও শুনিয়াছেন, সুতরাং কথায় কথায় বিলাতের নাট্য-মন্দিরের সহিত আমাদের নাট্য-মন্দিরের তুলনা করিয়া ঘৃণা প্রকাশ করেন। আমাদের দৃশ্যপট সেরূপ নয়, আমাদের সাজ সরঞ্জাম সেরূপ নয়, অভিনয় সেরূপ নয়। এই নিমিত্ত নাসিকা উত্তোলন করিয়া থাকেন। কিন্তু দেখা যায় যে, ঐরূপ নাসিকা উত্তোলনের বাক্যচ্ছটা ব্যতীত, ফরাসি, ইংলণ্ড বা আমেরিকার কিছুই নাই।

তাহার প্রাসাদ তুলনায় কুটিরও নয়…কপির লাঙ্গুলের ন্যায় তাহার নাসিকা তিনি যতদূর উত্তোলন করিতে পারেন—করুন, তাহাতে আমাদের আপত্তি নাই। কিন্তু তাহাদের বিষ উদ্গীরণ বহু অনিষ্ট সাধক। আমরা অপক্ষপাত সমালোচকের পদধূলি গ্রহণ করি। কিন্তু এরূপ সমালোচকের অনিষ্টকর কার্যে বড়ই দুঃখিত। তাঁহাদের কলুষ বাক্যে অপরের মন কলুষিত করিতে পারেন, সেই নিমিত্ত এই মাসিক ‘নাট্য-মন্দির’ সাধারণকে উপহার দিবার জন্য আমরা যত্ন করিতেছি। ‘নাট্য-মন্দিরের’ দুরূহ অবস্থা, কুটীর হইতে অট্টালিকা পর্যন্ত জ্ঞাপন করিতে আমরা উৎসুক। ‘নাট্য-মন্দিরের’ স্তম্ভে সাধারণ রঙ্গালয়ের অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণিত থাকিবে। সকল সম্প্রদায়ের মুখপাত্র স্বরূপ সংবাদপত্র আছে, কিন্তু রঙ্গালয়ের

কিছুই নাই। টিকিট না পাইয়া বিরক্ত হইয়া যাহা লেখেন, তাহাও শুনিতে হয়, কিন্তু অনেকদিন শুনিয়া আসিতেছি, আর শুনিতে ইচ্ছুক নহি। আমরা আপনাদের আপনি সমালোচক হইয়া ‘নাট্য-মন্দির’ প্রকাশিত করিব।”

‘নাট্য-মন্দির’ এই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবার জন্য যথেষ্ট সচেষ্ট ছিল। বিদেশী থিয়েটারের তুলনায় বাংলা থিয়েটার যে ভালো নয় এমত প্রচারের বিরোধিতা করে, সেই সমস্ত সমালোচকদের বারংবার সমালোচনা করা হয়েছে এই ‘নাট্য-মন্দিরে’। যেমন, মনমোহন গোস্বামী তার ‘কলা-বিদ্যাবিপর্যয়’ শিরোনামে দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যায় লিখেছিলেন—“ ‘রঙ্গালয়ের অবনতি’, ‘রঙ্গালয়ের অবনতি’ বলিয়া এক সম্প্রদায়স্থ। লোক প্রায়ই তারস্বরে চিৎকার করিয়া থাকেন… ‘নাটক’ বা ‘অভিনয়’ শব্দ উচ্চারিত হইলেই তাঁহারা লাফাইয়া উঠেন এবং নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া নিজেদের সুরুচি জাহির করিতে থাকেন। বিলাতি রঙ্গালয়ের সহিত যে আমাদের রঙ্গালয়ের তুলনা হয় না, একথা আমরা সম্পূর্ণ অবগত, কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, বিলাতি রঙ্গালয় কি একদিনেই এই উন্নতি শীর্ষে আরোহণ করিয়াছে?”

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

এই ধরনের পালটা সামগ্রিক সমালোচনার পাশাপাশি খুব অল্প কয়েকটি প্রযোজনার সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন, তৃতীয়বর্ষ প্রথম সংখ্যায় শরৎচন্দ্র ঘোষাল এমএবিএল সরস্বতীর লেখা গিরিশচন্দ্রের ‘মায়াকানন’ নাটকের সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। প্রায় চোদ্দো পৃষ্ঠা জুড়ে নাটকের গল্প কাঠামো নিয়েই আলোচনা করেছেন এবং শুরুতেই নাটকটির প্রযোজনীয়তা সম্পর্কে লিখেছেন— “…’বলিদানে’ কন্যাদায় সমস্যা, ‘শাস্তি কি শান্তি’তে বিধবা বিবাহ সমস্যা যেরূপ স্থান পাইয়াছে, ‘মায়াবসান’ নাটকেও সেইরূপ কতগুলি বিষয়ের অবতারণা করা হইয়াছে; প্রথমে রাজনৈতিক আন্দোলন ও কংগ্রেসের কার্য্য।… গিরিশচন্দ্রের বিদ্রুপ এই ভক্তগণের প্রতি, তাঁহার তীব্র আক্রমণ বৈধ রাজনৈতিক উন্নতির বিরুদ্ধে নহে।”

সেই সঙ্গে গিরিশচন্দ্র এই নাটকে শেকসপিয়রের দ্বারা কতখানি প্রভাবিত ছিলেন সে আলোচনাও করেছেন। যেমন ‘মায়াবসান’-এর প্রধান চরিত্র কালীকিঙ্করের সঙ্গে টেমপেস্ট নাটকের প্রসপেরো চরিত্রের মিল খুঁজে পেয়েছেন। আবার মায়াবসানের দ্বিতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় গর্ভাঙ্কের আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছেন, “গিরিশচন্দ্র শেকসপিয়র কৃত Merry wives of windsor নাটকের উল্লেখ এই দৃশ্যে করিয়াছেন। সেই নাটকে ফলস্টাফ Mrs Ford ও Mrs Page নাম্নী ভদ্রমহিলাদ্বয়ের অবৈধ প্রণয় প্রার্থনা করে। মহিলাদ্বয় উভয়েই সাধ্বী। কৌতুক করিবার জন্য ফলস্টাফকে গৃহে আনাইয়া ছিলেন। এই সময় সত্যই Mrs Ford এর সন্দিগ্ধ চিত্ত স্বামী সিয়া পড়ায় ফলস্টাফকে এক ঝুড়িতে পুরিয়া রজক গৃহে প্রেরণযোগ্য মলিন বস্ত্ৰে ঢাকিয়া ভৃত্যস্কন্ধে চালান দেওয়া হয়। পূর্ব হইতে শিক্ষিত ভৃত্যগণ ফলস্টাফকে ঝুড়িশুদ্ধ জলে ফেলিয়া দেয়।” এই দৃশ্যের উল্লেখ করেছেন।

এই ধরনের নাট্য সমালোচনা ‘নাট্যমন্দির’-এ প্রকাশিত হতে থাকে দ্বিতীয় বর্ষের ষষ্ঠ সংখ্যা থেকে। ‘নাট্যানন্দের পত্রে’ জনৈক নাট্যরসিক অমরেন্দ্র নাথ দত্তর কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন নাটকের সঠিক সমালোচনা প্রকাশ করার জন্য। কারণ, “বঙ্গীয় নাট্যশালা

সমূহের আবর্জনা দূর করিবার কোনও উপায় নাই। এ দেশের নাট্যকলা বেওয়ারিশ লুচির ময়দায় পরিণত হইয়াছে; অভিনেতা অভিনেত্রীগণ ইচ্ছামত ইহাকে ঠাসিতেছে— আপত্তি করিবার কেহই নাই, বিলাতের সমালোচকের সম্মার্জনী আছে, এদেশে সমালোচক নাই।” দ্বিতীয় বর্ষের ষষ্ঠ সংখ্যায় এই মতামত প্রকাশিত হলেও সমালোচনা সম্ভবত প্রথম প্রকাশিত হল দ্বিতীয় বর্ষ অষ্টম, তৃতীয় বর্ষ নবম ও দ্বাদশ সংখ্যায় চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় ও ষষ্ঠ সংখ্যায়। ১৩১৯-এর বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘শাস্তি কি শান্তি’র (দ্বিতীয় বর্ষ অষ্টম সংখ্যা) সমালোচনাটির উল্লেখ পাওয়া গেলেও সমালোচনাটি উদ্ধার করা যায়নি। কিন্তু দ্বিতীয় আলোচনা ‘মায়াবসান’-এর উদ্ধৃতি পূর্বেই দেওয়া হয়েছে। আবার যেমন জানা যায়।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

নাট্যাচার্য্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী
নাট্যাচার্য্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী

চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায়, ১৩২০-র ভাদ্র মাসে, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় ‘প্রফুল্ল’ নাটকের সমালোচনা করেছিলেন, এবং এই শেষ সমালোচনাটি ‘নাট্যানন্দের পত্র’-তে প্রকাশিত হয়—“ক্ষীরোদবাবুই এক্ষণে নাট্য জগতের নাট্যসম্রাট; মিনার্ভায় ক্ষীরোদবাবুর পৌরাণিক পঞ্চাঙ্ক নাটক ‘ভীষ্ম’ অভিনীত হয়।… ক্ষীরোদপ্রসাদ এই নাটকে ভাষার ঝংকার যেমন চরমে তুলিয়াছিলেন—সকল চরিত্র এবং নাটকের উপাখ্যান অংশ কিন্তু তেমন ফুটাইতে পারেন নাই; ক্ষীরোদবাবুর মতন নাট্যসম্রাটের নিকট আমরা ইহা অপেক্ষা কিছু অধিক আশা করিয়াছিলাম। মোটের উপর ভীষ্ম’ ‘হাতের পাঁচ’ এবং ‘দুকুড়ি সাতের খেলা’ বজায় রাখিয়াছে।”

এ ছাড়াও সমালোচনা হিসেবে প্রকাশিত না হলেও কিছু কিছু আলোচনা তৎকালের নাট্যবিষয় সম্পর্কে হয়েছিল। যেমন ১৩১৯ বঙ্গাব্দে শ্রাবণ-ভাদ্র মাসের তৃতীয় বর্ষ প্রথম-দ্বিতীয় সংখ্যায় মনমোহন গোস্বামী তাঁর ‘কলাবিদ্যার বিপর্যয়’ শিরোনামাঙ্কিত আলোচনায় তখনকার দিনের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পর্কে লেখেন, “আজ যে অভিনেতাকে যে পরিচ্ছদে শ্রীরামচন্দ্র দেখিলাম; কলা তাঁহাকে সেই সজ্জায় জাহাঙ্গীর এবং পরশু সেই মূর্তিকেই সেইভাবে যশোবন্ত সিংহ দেখিলাম… অভিনেত্রী একইভাবে একই সজ্জায় সীতা, নূরজাহান ও সংযুক্তার ভূমিকায় অভিনয় করিয়া থাকেন।…রঙ্গালয় দৃশ্যকাব্যের স্থল, সুতরাং বেশভূষার স্বাভাবিক পারিপাট্যের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বিশেষ প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ অভিনেতা আপনাকে এরূপ সুপুরুষ ঠাওরান যে সৌন্দর্যবৃদ্ধিকল্পে রঙ বা পাউডার লেপন করাটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করেন।”

তবে এ কথাও ঠিক যে ‘নাট্যপত্র’ নিরপেক্ষ ও নির্ভীকভাবে চলেনি। সমালোচনা যখনই তীব্র হয়ে উঠবার উপক্রম করেছে তখনও সেই সমালোচনাকে প্রকাশিত করেননি তাঁরা এমন কথাও জানা যায়। জনৈক নাট্যানন্দ তার পত্রে এই পত্রিকার ভূমিকা সম্পর্কে লেখেন, “আপনার ‘নাট্যমন্দির’ বঙ্গের রঙ্গালয় সমূহের মুখপত্র। দেশ-বিদেশের নাট্যশালা সমূহের ইতিহাস এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীগণের জীবনবৃত্ত প্রকাশিত করাই নাট্যমন্দিরের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। যাহাতে বঙ্গীয় রঙ্গালয়ের সংস্কার সাধিত হয়, অভিনয়ের সমালোচনা হয়, অভিনেতা-অভিনেত্রীগণের ত্রুটি সমূহ নির্দেশ করিয়া দেখান হয়, তাহারও ব্যবস্থা করা নাট্যমন্দিরের উদ্দেশ্যের অন্তর্গত।”

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

এই পত্রের উত্তরে নাট্যমন্দিরের সহকারী সম্পাদক শ্রী মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, “আপনার তীব্র সমালোচনা আমরা পত্রস্থ করিতে পারিলাম না। কারণ, নাট্যমন্দিরের সম্পাদক স্বতন্ত্র রঙ্গালয়ের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে সংসৃষ্ট; সুতরাং যদি তাঁহার সম্পাদিত পত্রে অপর রঙ্গালয়ের জনৈক প্রসিদ্ধ অভিনেতার উদ্দামতা ও অশিষ্টতা সম্বন্ধে তীব্র সমালোচনা প্রকাশিত হয়, তাহা হইলে তাহাকে সাধারণের নিকট নিন্দাভাজন হইতে হইবে। বিশেষত ‘নাট্যমন্দির’ এ পর্যন্ত অভিনয় সমালোচনায় হস্তক্ষেপ করে নাই; কাজেই সহসা একেবারে একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ অভিনেতা সম্বন্ধে তীব্র মন্তব্য প্রকাশিত করা এ অবস্থায় নাট্যমন্দিরের পক্ষে সঙ্গত কি না আপনিই তাহা বিবেচনা করিয়া দেখুন।”

এই সময়ের উল্লেখযোগ্য আর একটি পত্রিকা ‘নাচঘর’, ‘সচিত্র শিশির’ ছাড়া অন্যান্যগুলি বেশির ভাগই ছিল ক্ষণস্থায়ী। ফলে দীর্ঘ প্রভাব ছিল না সেইসমস্ত পত্রিকাগুলির। ‘ভগ্নদূত’, ‘নটরাজ’-এর মতো পত্রিকায় নাট্য সমালোচনা গুরুত্ব পেলেও এবং অন্যান্য পত্রে প্রয়োজনীয়তা অনুভব হলেও কার্যকারী ভূমিকা নেয়নি পত্রিকাগুলি। বেশির ভাগ সময়ই প্রবন্ধের মাধ্যমেই সেই সময়ের প্রযোজনাগুলির সমালোচনা করা হত। ‘নাচঘর’ পত্রিকায় অধ্যাপক মন্মথমোহন বসু সমালোচিতের তিন অবস্থা’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। তাতে অসাধারণ ভাবে সমালোচনা সম্পর্কে কিছু মতামত পাওয়া যায়।

আলোচনাটির কিছু অংশ তুলে দেওয়া হল “সমালোচকেরা বোলতার জাত, তারা কেবল হল ফোটাতে পারে, মৌচাকের মতো মধুর কিছু গড়তে পারে না। কবি গৌড়জনের ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবারণের জন্য কত কষ্ট ক’রে—অথবা বাগদেবীর কৃপায়, একটা মধুচক্ৰ নিৰ্ম্মাণ করলেন, আর কোথা থেকে সমালোচক ছুটে এসে নাক সিঁটকে বললেন কিনা, এও কি একখানা বই হয়েছে, এর জন্য এত জারিজুরি”—ইত্যাদি, ফলে মধুকরও প্রত্যুত্তরে একটা খোঁচা দিয়ে বুঝিয়ে দেন যে তার মুখে যতই মধু থাকুক, তার পিছনের হুলটা বোলতার হুলের চেয়ে কম তীক্ষ্ণ নয়।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

এ ব্যাপারটা শুধু সাহিত্য জগতে নয়, রঙ্গজগতেও যথেষ্ট ঘটতে দেখা যায়। সেখানেও নটের সঙ্গে সমালোচকের এইরকম ঠোকাঠুকি লাগে। কবি যেমন বলেছেন, নটও তেমন বিরোধী সমালোচককে বলে থাকেন, “বাপু হে, সমালোচনা করলেই হল না, একবার অভিনয় করে দেখিয়ে দাও না।” কখনো কখনো এ বিরোধটা এমন বক্রভাব ধারণ করে যে, দেখে বোধহয় যেন সমালোচিত লেখক বা নট সমালোচক নামধারী জীবটিকে ইহলোক থেকে অপসারিত করতে পারলেই নিশ্চিত্ত হন। কিন্তু এটা বাস্তবিক তাঁদের মনের কথা নয়, তাঁদের মনের অন্তস্থলের দিকে নিরীক্ষণ করলে বেশ স্পষ্ট করে।

দেখা যায় যে, সমালোচক তাঁদের অতি প্রিয়জন। মুখে সমালোচককে তাঁরা যত গালাগালই দিন না কেন, সমালোচকদের মতামত জানতে ব্যাকুল নন, এমন লেখক বা নটের সংখ্যা বোধহয় খুব বিরল। তবে সে ব্যাকুলতা প্রকাশের ভঙ্গি নানারকম হতে পারে। কেউবা সরল সুবোধ্য ভাষায় তা ব্যক্ত করেন, আবার কেউবা অনাসক্তির ভাব দেখিয়ে মনোভাবকে চাপতে গিয়ে সেটাকে আরও স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তোলেন। যখন কেউ লোক জানিয়ে চেঁচিয়ে বলেন, ‘আমি তোমায় গ্রাহ্য করি না’, তখন বেশ বোঝা যায় তিনি তাঁর অগ্রাহ্যের পাত্রকে বিলক্ষণ গ্রাহ্য করেন।

শুনতে পাই সেদিন নাকি কোনো রঙ্গালয়ে এই রকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। তা যদি হয়ে থাকে তাহলে সমালোচক মহাশয় আশ্বস্ত হতে পারেন যে, নট তাঁর প্রতি এরূপ উক্তি করে তাঁর মতের প্রতি শ্রদ্ধাই প্রকাশ করেছেন। সমালোচনা সম্বন্ধে নট বা লেখকদের মনোভাব বিশ্লেষণ করলে তার ত্রিবিধ অবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। এবং এই অবস্থাটি পরপর উপস্থিত হয়। যথাক্রমে তিন অবস্থার নাম দেওয়া যেতে পারে, (১) তামসিক (২) রাজসিক (৩) সাত্ত্বিক।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

প্রথম তামসিক অবস্থা। এ সময় লেখক বা নটের অজ্ঞতাবশত তমঃ’ পূর্ণ থাকে— নিজের লেখা বা অভিনয়ের উপর তাঁর এত অতিরিক্ত শ্রদ্ধা থাকে যে, বিরুদ্ধ সমালোচনা তিনি একেবারেই সইতে পারেন না। সমালোচনা শুনবার জন্য তার আগ্রহ খুবই থাকে, কিন্তু এখন তাঁর নিকট সমালোচনার অর্থ নিছক প্রশংসা। যদি দুর্ভাগ্যক্রমে কেউ কিছু বিরুদ্ধ সমালোচনা করেন, তখন তিনি হন রেগে কাই—বলেন, ‘ও লোকটা সমালোচনার জানে কি? সাইবিরিয়া ও হনলুলুর বিখ্যাত সমালোচকেরা এ সম্বন্ধে কি বলেন, শুনবে?’ ইত্যাদি। মোটের উপর তাঁর স্থির ধারণা এই যে, বিরুদ্ধবাহী সমালোচনা, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

সৌভাগ্যক্রমে অভিজ্ঞতালাভের সঙ্গে সঙ্গে অনেক লেখক ও নট এই শোচনীয় অবস্থাটা ক্রমশ অতিক্রম করে যান ও দ্বিতীয় বা রাজসিক অবস্থায় উপনীত হন। তখন তাঁদের মনে ‘তমঃ’ অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। তাঁরা বুঝতে পারেন যে, বিরুদ্ধ আলোচনা মাত্রই বিদ্বেষপ্রসূত নয়, সমালোচকও সত্যবাদী হতে পারেন। এ অবস্থায় তাঁরা গর্ব অহংকার সংস্কার প্রভৃতি কতকটা দূরে রেখে সমালোচনার প্রকৃত মূল্য অবধারণ করতে সমর্থ হন। তাঁরা তখন সমালোচককে শ্রদ্ধার চক্ষে দেখতে শেখেন ও বিরুদ্ধ সমালোচনাকেই তাঁদের উন্নতির পক্ষে বেশি ফলপ্রদ বলে মনে করেন।

নাট্য রচয়িতা শিশির কুমার ঘোষ [ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য - আশিস গোস্বামী ]
নাট্য রচয়িতা শিশির কুমার ঘোষ
অবশ্য প্রশংসাত্মক সমালোচনা হতে তাঁরা যথেষ্ট আনন্দ ও উৎসাহ লাভ করে থাকেন, তাতে সন্দেহ নেই; কিংবা সে সমালোচনা তাঁদের উন্নতির পক্ষে ততটা অনুকূল হয় না, যতটা হয় বিরুদ্ধ সমালোচনায়। নিছক প্রশংসার আবরণে তাঁদের দোষাংশটুকু চাপা পড়ে যাওয়াতে তার আর সংশোধন হয় না—ক্রমে সেটা চিরস্থায়ী হয়ে পড়বার উপক্রম হয়। বিরুদ্ধ সমালোচনা অন্যায় হলেও তা থেকে উপকার পাওয়া যায়। অনেক ভালো লেখক ও নটেরও এক অনিচ্ছা মুদ্রাদোষ দেখতে পাওয়া যায়। সেটা তারা নিজেরা বুঝতে পারেন না, পরের বিরুদ্ধে সমালোচনা সেটা যখন তাঁদের গোচরীভূত করে তখন তাঁরা সাবধান হয়ে সেটাকে বর্জন করতে পারেন।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

এইরূপে ক্রমশ তাঁরা সকল দোষমুক্ত হয়ে তৃতীয় বা সাত্ত্বিক অবস্থা প্রাপ্ত হন। তখন সমালোচকের চোখা চোখা বাণগুলোও তাঁদের অঙ্গ স্পর্শ করতে গিয়ে প্রতিহত হয়ে ফিরে আসে—–কিছুতেই তাঁরা বিচলিত হন না—তাঁরা একেবারে স্তুতি নিন্দার অতীত স্থিতধী মুনি হয়ে পড়েন। তখন তাঁরা নিজের আনন্দের জন্যই কলা সৃষ্টি করেন। অন্যে তা পছন্দ করলে বা না করলে তাঁদের কিছু আসে যায় না। কিন্তু প্রকৃত এইরূপ অবস্থা প্রাপ্তির পূর্বে যদি কোনো লেখক বা নট অহংকার বশে মনে করেন যে, এই অবস্থায় তিনি উপনীত হয়েছেন; অতএব সমালোচনায় কর্ণপাত করবার তাঁর আবশ্যকতা নেই–তিনি যা লিখবেন বা বলবেন সেটাকেই লোকে আদর্শ বলে গ্রহণ করবে, তাহলে সে অবস্থাটা হয়ে দাঁড়াবে ঘোর তামসিক।

খুব ভয়ানক অবস্থা। প্রথম অবস্থার তামসিকতা থেকে নিস্তার আছে। কিন্তু এই শেষ অবস্থার তামসিকতা থেকে একেবারেই উদ্ধারের আশা নেই। অনেক বড়ো বড়ো লেখক ও নট এই গহ্বরে পড়ে নিজের সর্বনাশ সাধন করেছেন। এ শোচনীয় ব্যাপারের উদাহরণ আমরা নিত্য দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং এ সকল উদাহরণ দিয়ে প্রবন্ধের কলেবর বাড়াবার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু এই প্রসঙ্গে সমালোচক মহাশয়গণকে দু-একটা কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত মনে করি। সমালোচনার প্রকৃত অধিকারী সকলে নয়। অবশ্য এ কথা স্বীকার করা যায় না যে, বোলতা মৌচাক গড়তে পারে না বলে মৌচাকের গঠন সম্বন্ধে তার কোন মন্তব্য প্রকাশ করবার অধিকার নেই।…সমালোচকের কাজ রস সৃষ্টি নয়—সৃষ্ট রসের পরিচয় দান করাই তাঁর ব্যাবসা। অতএব তাঁর প্রধান গুণ হচ্ছে রসঞ্জতা। এই গুণের তারতম্যের ওপরেই তাঁর মতের মূল্য নির্ভর করে।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

অনেক সময় দেখতে পাই, অবিমিশ্র স্তুতি বা নিৰ্জ্জলা নিন্দাকে সমালোচনা নামে চাপিয়ে দেওয়া হয়, এতে করে সমালোচিত ব্যক্তির কতটা উপকার বা ক্ষতি হয় তা বলতে পারি না। তবে সমালোচকের যে খুব অনিষ্ট হয়, তাতে সন্দেহ নেই। এরূপ সমালোচকের ওপর লোকেদের বিশ্বাস সহজেই নষ্ট হয়ে যায় — তাঁর সমালোচনা যে কেবল বন্ধুত্ব বা বিদ্বেষ প্রণোদিত সে কথা বুঝতে তাঁদের বেশি বিলম্ব হয় না। সুতরাং সমালোচকের উদ্দেশ্য যে একেবারেই ব্যর্থ হয়ে যায় তা বলাই বাহুল্য।

নাট্যাচার্য্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী [ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য - আশিস গোস্বামী ]
নাট্যাচার্য্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী
সমালোচকের মনে রাখা উচিত যে, সমালোচ্য ব্যক্তিকে তুলে ধরা বা তাকে নামিয়ে দেওয়া প্রকৃত সমালোচনার উদ্দেশ্য নয়, সমালোচকের সমালোচ্যের প্রতি যেমন কর্তব্য আছে, সাধারণ ও নিজের প্রতিও তেমনই কর্তব্য আছে।…প্রায় পুরো আলোচনাটিই নিজের ভাষায় তুলে দিলাম এই কারণে যে কথাগুলি আজও সঠিক এবং নির্ভুল সত্য। ‘নাচঘর’ পত্রিকায় নাট্য সমালোচনার মান সম্পর্কে বারবারই এ ধরনের আলোচনা হয়েছে।

কম বেশি সমস্ত নাট্যপত্রেই এই ধরনের আলোচনা থাকলেও তখন পর্যন্ত ‘নাচঘর’ এবং কিছুটা ‘সচিত্র শিশির’ বেশ সোচ্চার ছিল বলে মনে হয়। ‘নাচঘর’ অষ্টম বর্ষ আটত্রিশ সংখ্যার উপরোক্ত সমালোচনা ছাড়াও স্বয়ং শিশির কুমার ভাদুরির সহযোগী অভিনেতা ললিত মোহন লাহিড়ির মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে নাচঘর এ লিখেছিলেন—“আমার বিশ্বাস আমাদের দেশ এখনও যথার্থ অভিনয় সমালোচনা করতে শেখে নি; নটের দোষ-গুণ বিচার করবার মত সূক্ষ্ম দৃষ্টি খুব অল্প লোকেরই আছে, ফলে সাধারণত নটের প্রশংসা বা নিন্দা অধিক সময় নির্ভর করে যে শ্রেণীর চরিত্র তিনি অভিনয় করেন তার উপর।”

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

শিশির কুমার সমালোচকদের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করলেও এটা সত্য যে ‘নাচঘর’ পত্রিকাতেই শিশির কুমারের নাট্য সমালোচনা সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়েছিল। ‘নাচঘর’ ছাড়া শিশির কুমারকে জানা প্রায় অসম্ভব। সেদিক থেকে নাট্য সমালোচনার ক্ষেত্রে ‘নাচঘর’ এর ভূমিকা অসাধারণ। প্রকৃতপক্ষে শিশির কুমারের কাজকে যথাযথভাবে তুলে ধরার জন্যই এই পত্রিকাটি প্রেমাঙ্কুর আতর্থী ও হেমেন্দ্র কুমার রায়ের সম্পাদনায় ৯মে ১৯২৪-এ প্রকাশিত হয়। “পুরানো থিয়েটারওয়ালারা প্রচার পত্রের সাহায্যে শত্রুতা সাধন করতে পারে—অতএব তাদের পক্ষে লড়বার জন্য আমাদের প্রয়োজন নাট্যকলা সম্বন্ধে বাংলা সাপ্তাহিক পত্র প্রকাশ করা।”—মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ইচ্ছারই প্রকাশ দেখেছিলাম শিশির সমালোচনায়।

হেমেন্দ্রকুমার রায়
হেমেন্দ্রকুমার রায়

‘জনা’ নাটকে শিশির কুমারের প্রবীর চরিত্রের অভিনয় প্রসঙ্গে ‘নাচঘর’ লিখেছিল, “তিনি তাঁর পূর্ববর্তী প্রবীরের পদাঙ্কের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে অগ্রসর হয়েও বহু খ্যাত ভূমিকাটির যশ-গৌরব কোথাও ক্ষুণ্ণ করা দূরে থাক, বরং দ্বিগুণ সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলেছিলেন। তাঁর মাতৃসন্নিধানে এসে বীরপুত্রের দুর্জয় অভিমান প্রকাশ, তাঁর প্রিয়তমা পত্নী সকাশে প্রেমের অনবদ্য সহজ লীলা, তাঁর নায়িকার রূপমোহ কামাতুর ও অসহায় অবস্থা, পরিত্যক্ত শ্মশান প্রান্তে জীবনের ধিকৃত মুহূর্তে তাঁর সেই শ্লেষাত্মক ‘কৃষ্ণার্জুন’ সম্ভাষণ—সবই অনুপম কলানৈপুণ্যের পরিচয় বহন করে এনেছিল বিমুগ্ধ দর্শকদের সামনে।”

শিশির কুমারের ‘বিসর্জন’ প্রযোজনার জয়সিংহ চরিত্র সম্পর্কে ‘নাচঘর’ লিখল, “..নগ্নপদে সেই সুধীর সুব্রত ব্রহ্মচারী যখন রঙ্গভূমে প্রবেশ করলেন—সেই সুঠাম সুকান্ত সুবেশ সাধকের তপ্তকাঞ্চনকান্তি তরুণ মূর্তি প্রথম সন্দর্শন করেই দর্শকচিত্ত যুগপৎ মুগ্ধ ও উল্লসিত হয়ে উঠল।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

…সেই প্রথম দৃশ্যের করুণ কোমল অভিনয় থেকে শুরু করে তারপর রাজার ব্যবহারে, গুরুর ছলনায় তাঁর সেই দ্বিধা-সন্দেহ, সংশয় অবিশ্বাস, তার প্রেম, ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সাধনার ভিত্তি মূলে যে প্রচণ্ড ভূকম্পন লাগিয়ে দিলে—–দারুণ দ্বন্দ্বের চাপে, মর্মান্তিক বজ্রঝংকার বিপুল সংঘাত তার সেই তিনটি দেবতার প্রত্যেকটির অন্তরের বেদী হতে কেমন করে বিচূর্ণ হয়ে ধুলায় লুটিয়ে গেল, তার আশৈশবের শিক্ষা ও সংস্কার কেমন করে বিচূর্ণ আঘাতের পর আঘাত খেয়ে দুর্বল হয়ে তার নিজের বিরুদ্ধে তাকে বিদ্রোহী করে তুললে, উন্মত্ত জয়সিংহ কেমন করে শেষে দেবীর পায়ে রাজরক্ত নিবেদন করে দিতে শ্রাবণের শেষ রাত্রে আপনাকে আহুতি দিলে, নিপুণ রূপদক্ষ শিশির কুমার সেই অভিশপ্ত জীবনের প্রত্যেকটি পলে যা কিছু ব্যথা, যা কিছু আনন্দ – যেটুকু হাসি—যতখানি অশ্রু ছিল একেবারে উজাড় করে আমাদের দেখিয়েছেন।

তাঁর এই জয়সিংহের ভূমিকায় সর্বাঙ্গসুন্দর অভিনয়, রঘুবীর, আলমগীর প্রভৃতি তাঁর অভিনীত প্রসিদ্ধ ভূমিকার ন্যায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

সাধারণ রঙ্গালয়ে ভীম, কৃষ্ণ ও বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ চরিত্রে অভিনয় সম্পর্কে ‘নাচঘর’ লিখেছিল, “তিনটি বিভিন্ন ভূমিকায় তাঁর বিস্ময়কর অভিনয় শিশির প্রতিভার অপূর্ব অভিব্যক্তি। ভীষ্ম, শ্রীকৃষ্ণ ও ব্রাহ্মণ এই তিনটি পরস্পর বিরোধী চরিত্রের যে বিভিন্ন মূর্তি রঙ্গমঞ্চের ওপর ফুটিয়ে তুলেছিলেন তা একমাত্র তাঁর মতন প্রতিভাবান নটের পক্ষেই সম্ভব ছিল।”

…আবার গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘প্রফুল্ল’ নাটকের যোগেশ চরিত্র সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, “…আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল’—এই কথাগুলি বলবার সময়ে শিশির কুমার তাঁর মুখ বারংবার যে কান্নামাখা হাসির অবতারণা করেছিলেন তা যেমন বিচিত্র, তেমনি অপূর্ব। এ হাসি তাঁর নিজের সৃষ্টি।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

কথিত আছে, গিরিশচন্দ্র এখানে প্রস্তুরীভূত মূর্তির মত স্তম্ভিত হয়ে থাকতেন, অর্ধেন্দুশেখর মুখ ঢেকে রোদন করতেন, অমরেন্দ্র নাথ অধীরভাবে চেঁচিয়ে উঠতেন এবং দানীবাবু অর্ধচেতন ও অর্ধ অচেতন মতন হয়ে থাকতেন। কিন্তু শিশির কুমার এই দৃশ্যে যোগেশ চরিত্রের যে Conception বা ধারণা করেছিলেন তাতে এই অর্ধ উন্মাদের মত কান্না মাথা হাসি তাঁর মুখে চমৎকার মানিয়েছিল।”

এই সমালোচনাটির গুরুত্ব আলাদা করে নিতে হয় এই কারণে যে এখানে অভিনয় প্যাটার্নকে কীভাবে সচেতন ভাবে বদলে নেবার চেষ্টা করেছিলেন শিশির কুমার সেটাই অতন্ত জরুরি হয়ে ওঠে এখানে। কিন্তু আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, সমালোচনার বেশির ভাগ অংশই অভিনয়কে কেন্দ্র করে। কীভাবে একটি নাটক, নাট্য হয়ে উঠছে তার কোনো হদিশ নেই। আবার অভিনয় বলতে কেবলমাত্র শিশির ভাদুড়ি; অন্যরা অনুপস্থিত। সহ অভিনেতা ললিত মোহন লাহিড়ির মৃত্যুর পর ‘নাচঘর’-এর পাতাতেই সমালোচকদের প্রতি কটাক্ষ করেছিলেন ললিত মোহনের অভিনয় মূল্যায়ন না হবার জন্য।

আবার অন্য দিক থেকে ভাবলে দেখা যাবে শিশির কুমারের প্রযোজনায় তাঁর অভিনয়টাই ছিল মুখ্য। তাই দিগিন্দ্র চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতামতটাই সঠিক মনে হয়। তিনি লিখেছিলেন, “শিশির কুমারের অভিনয় যাঁরা নিয়মিতভাবে দেখেছেন তাঁরাই একথা স্বীকার করবেন। অনেক নাটকেই কতগুলি দুর্বল স্থান থাকে; অথচ কাহিনি বিন্যাসের প্রয়োজনে সেগুলি অপরিহার্য। শিশির কুমার তাঁর অসাধারণ অভিনয় কুশলতা দিয়ে সে সমস্ত দুর্বল স্থানকে তুলে দিতে পারতেন।” এই কারণেই সমালোচকদের দৃষ্টি তাঁর অভিনয় প্রতিভার দিকেই বিশেষভাবে নিবদ্ধ ছিল। এই আকর্ষণ কেবলমাত্র ‘নাচঘর’ নয় ‘শিশির’, ‘সচিত্র শিশির’, ‘ভগ্নদূত’ ইত্যাদি পত্রিকাগুলিরও ছিল। তবে সেখানে শিশির কুমারকে এককভাবে দেখা হয়নি।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

‘শিশির’ পত্রিকায় ‘জনা’-র সমালোচনায় ৬ জুন ১৯২৫-এ লেখা হল, “…প্রবীরের ভূমিকা—শিশির কুমার স্বয়ং এই ভূমিকা লইয়াছেন— যৌবনের দানীবাবুর সঙ্গে তাঁহার তুলনা না করিয়াও একথা বলিতে পারি তাঁহার অভিনয় সর্বাঙ্গ সুন্দর হইয়াছিল।” অথবা ‘আলমগীর’-এর ২৮ নভেম্বর ১৯২৫ সালে প্রকাশিত সমালোচনা প্রসঙ্গে লেখা হল – “শিশিরবাবু এবং তারাসুন্দরী উভয়েরই বৈশিষ্ট্য ‘আলমগীরে’ খুবই বেশি ফুটিয়া উঠিয়াছিল। অভিনয়ের কোথাও দোষ-ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় নাই—প্রতি মুহূর্তেই মনে হয় বুঝিবা একজন আর একজনকে ছাড়াইয়া যাইতেছে।

Old Fort Play House, by Thomas Daniell
Old Fort Play House, by Thomas Daniell

তারাসুন্দরী বেশ শান্ত সংযত ভাবে সম্রাজ্ঞীর ন্যায়ই অভিনয় করিতেছিলেন; তাঁহার স্বরে, ভাবে, ভঙ্গীতে সেই ভাব স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছিল। ভাদুড়ী মহাশয়ের অভিনয়েও সেই চিত্তচাঞ্চল্য, বিবেকের কষাঘাতে অধীরতা প্রতি মুহূর্তে ফুটিয়া উঠিয়াছিল।” লক্ষণীয় ‘নাচঘর’-এর উচ্ছ্বাস এখানে নেই। বরং প্রতি তুলনায় সমালোচনাটি অন্য মাত্রা পেয়ে যায়। সমালোচনাকে যথার্থ করে তুলতে ‘সচিত্র শিশির’-এর ভূমিকা এদের তুলনায় অনেক বেশি ফলপ্রদ বলে মনে হয়।

যেমন স্টারে আর্ট থিয়েটার কোম্পানির ‘কর্ণার্জুন’ অভিনয় প্রসঙ্গে ‘সচিত্র শিশির’-এর প্রথম বর্ষ সপ্তম সংখ্যায় শ্রী রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “ ‘বাসন্তী’ নাম্নী সাপ্তাহিক পত্রিকায় ২য় বর্ষের ২ খণ্ডের ২৩ সংখ্যায় শ্রী অতুল সেন ‘সীতা অভিনয় নাম দিয়া একটি প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন, প্রবন্ধটি অধ্যাপক শিশিরকুমারের নাট্য সম্প্রদায় সম্বন্ধে। লেখকটির থিয়েটার সম্বন্ধে কতদূর অভিজ্ঞতা আছে তাহা জানি না কিন্তু তিনি প্রবন্ধের আরম্ভেই যে কথা বলিয়াছেন তাহা পড়িয়া তাঁহার কথা বিশ্বাস করা কঠিন!

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

…. Wings ও অন্যান্য দৃশ্যপটে যে সকল স্থপতির অঙ্কন দেখিলাম সবই খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ হইতে ৬০০ বৎসর পূর্বেকার।…সেন মহাশয় বোধ হয় জানেন না যে আমাদের দেশে ২৬১ খ্রিস্ট পূর্বের কোনো ইমারত নাই এবং ৬৫ খ্রিস্টপূর্বের ‘স্থপতির অংকন’ নাই। ….রঙ্গমঞ্চে ঐতিহাসিক নাটক অভিনয় কালে সেই যুগের দৃশ্য, সেই যুগের পরিচ্ছদ, সেই যুগের আচার ব্যবহার অনুকরণ করা উচিত।…ভারতবর্ষে মুসলমান আসিবার বহু পূর্ব্বেই রাজসভায় রাজার সম্মুখে যাইতে হইলে পায়ের জুতা খুলিয়া মাথায় পাগড়ী বাঁধিয়া যাইতে হইত। কিন্তু ‘কর্ণার্জুনের’ অভিনেতারা ধৃতরাষ্ট্রের সভায় জুতা পায়ে দিয়া খালি মাথায় বসিয়া থাকেন।

শুধু তাহাই নহে, অভিনেতারা অনেকে মনে করেন যে, সমস্ত ভারতবর্ষটাই বাংলাদেশে এবং বাঙালির আচার ব্যবহারেই সমস্ত ভারতবর্ষ চলিত এবং চলে। ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে চাণক্য ও কাত্যায়ণ খোলা মাথায় মহারাজ নন্দ ও মহারাজ চন্দ্রগুপ্তের সভায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং যেহেতু দানীবাবু এবং অধ্যাপক শিশির কুমার ভাদুড়ী খালি মাথায় বাহির হন। সেইহেতু তিনকড়িবাবু ও নরেশবাবু বাহির হইলেন ইহার কারণ, যে ইংরাজের আমরা অনুকরণ করি তাহারা রাজসভায় যাইতে হইলে শূন্য মাথায় টুপি খুলিয়া যান।”

একটি নাটক সম্পর্কে আলোচনার সূত্রে আরও কয়েকটি নাটকের কথা উঠে আসে, ফলে সেই সঙ্গে তৎকালীন অর্থাৎ প্রযোজনার টাইপটাও বুঝে নেওয়া যায় এতদিন পরেও সমালোচককে যে দূরদর্শী হয়ে উঠতে হয়, এ ধরনের আলোচনাগুলিই তার সাক্ষ্য বহন করে আসছে। প্রথম বর্ষ দশম সপ্তাহ, ৫ মাঘ ১৩৩০-এ স্টারের ‘চন্দ্রগুপ্ত’ প্রযোজনার আলোচনাতেও দৃশ্যসজ্জা, পোশাক ও নাটক কতখানি ইতিহাস সম্মত হয়ে উঠেছে সেই আলোচনাটাই প্রাধান্য পেয়েছে। “

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

…এই জগদ্বিজয়ী সম্রাট (সেকেন্দর শাহ) সিন্ধু নদের তীরে শিবিরের সম্মুখে একা দাঁড়াইয়াছিলেন এই চিত্রটার কল্পনাই অসম্ভব। তাঁহার চারিপার্শ্বে হাবসী কৃতদাস, মিশর দেশীয় নর্তকী, পারস্যের বীণাবাদক, নানাদেশের চাটুকার প্রভৃতি উপস্থিত থাকা আবশ্যক। নাটককার যাহা লিখিয়া যান নাই, উন্নত অভিনেত্রী সম্প্রদায় বহুবার অভিনয়কালে তাহা দেখাইয়া গিয়াছেন।…তৃতীয় দৃশ্যেও মহারাজ নন্দের প্রমোদোদ্যানে নর্তকীগণের ও পরীষদবর্গের পোশাকেও এই ত্রুটি দেখিতে পাওয়া যায়।

সখী ও নর্তকীর পোশাক বঙ্গ রঙ্গমঞ্চে “গিরিশচন্দ্র, অমরেন্দ্র নাথ, অমৃতলাল মিত্র যেভাবে আঁকিয়া গিয়াছেন, স্টার থিয়েটারের কর্তৃপক্ষগণ এই বিংশতি শতাব্দীতে চতুষষ্ঠি কলার নামগ্রহণ করিয়াও তাহার কোন পরিবর্তন করিতে পারে নাই।…চন্দ্রগুপ্ত নাটকের দ্বিতীয় অংকের প্রথম দৃশ্য, আর একটা ঐতিহাসিক সমস্যা। “দ্বিজেন্দ্রলাল সে অংশের ইতিহাস পড়েন। নাই। পড়িলে তিনি সেলুকসকে হিরাটের প্রাসাদে বসাইয়া আলেকজাণ্ডারের মৃত্যু সংবাদ

তাঁহার মুখ দিয়া বলাইতেন না।…হেলেনের ভূমিকায় শ্রীমতী নীহার বালা নিতান্ত মন্দ অভিনয় করেন নাই, তবে সে অভিনয় উচ্চ অঙ্গের বলা যায় না।…এবং ব্যক্তি বিশেষের অভিনয় পটুত্ব সম্বন্ধে আলোচনা করা নিষ্প্রয়োজন।”

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

এই সমালোচনাটি যথেষ্ট উঁচু দরের হলেও যাদের জন্য এতকিছু বলা তারা খুব কর্ণপাত করত বলে মনে হয় না, অর্থাৎ সমালোচকদের সমালোচনা থিয়েটারকে যথেষ্ট প্রভাবিত করছিল না। সেই কারণে সমালোচকদের পক্ষ থেকেও কিছু বলার থেকেই যায়। তাই ‘চন্দ্রগুপ্ত’ প্রযোজনার সমালোচনার শুরুতে লেখা হয়েছিল, “আমাদের দেশে সমালোচনা জিনিসটা এখন আর বড় কেহ সহ্য করিতে পারে না।

… রঙ্গমঞ্চের সমালোচনা এদেশে প্রাণ খুলিয়া কেহ কখনো করে নাই। পূজ্যপাদ পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু দিন করিয়াছিলেন বটে কিন্তু তিনিও একপ্রকার অমরেন্দ্র নাথ দত্তের বেতনভোগী ছিলেন সুতরাং পক্ষপাতবিহীন সমালোচনা তাঁহার নিকট কেহই আশা করে নাই। সমালোচনা করা আমাদের দেশে একটা পাতকের মত অন্যায় হইয়া দাঁড়াইয়াছে, সাহিত্যই হৌক আর রঙ্গমঞ্চেই হৌক, সমালোচনা যে অপক্ষপাতী হইতে পারে একথা দু’একজন ছাড়া আর কেহ স্বীকার করিতে চাহে না। অথচ সকল বিষয়েই সমালোচনা প্রয়োজন।”

কিন্তু সমালোচকের মন্তব্যগুলি থিয়েটারওয়ালারা কেন মেনে নিতে পারছে না সে সম্পর্কে অমৃতলাল বসু ‘পত্রিকা ও নাট্যশালা’ শিরোনামে একটি আলোচনায় বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলেন।

‘সচিত্র শিশির’-এর দ্বিতীয় বর্ষের সপ্তম সপ্তাহে অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর ১৯২৪-এ প্রকাশিত সেই আলোচনায় লিখেছিলেন,

“সে আজ কত কালের কথা, যখন এদেশে আমরা প্রথম প্রকাশ্য নাট্যশালা খুলি, তখন শহরে যে কয়খানি সংবাদপত্র ছিল, তাহার সম্পাদকেরা যথা শিশির ঘোষ, মনোমোহন বসু ও নবগোপাল মিত্র প্রভৃতি মহাশয়গণ আমাদের সহিত নিতান্ত আত্মীয়ের ন্যায় ব্যবহার করিতেন, রিহার্সালে আসিতেন, স্টেজের ভিতরেও যাইতেন, সুপরামর্শ দিতেন, এমন কি ইংরেজের কাগজ ইংলিশম্যানে তখন স্বত্বাধিকারী ও সম্পাদকগণ সাধারণভাবে বাঙালির মতের পোষকতা না করিলেও নাট্যশালার কার্য সম্বন্ধে আমাদের অনেক সাহায্য করিতেন, ব্যক্তিগত ভাবে তাঁহারা রীতিমত শিষ্টাচার সম্পন্ন ভদ্রলোক ছিলেন।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

মধ্যে একটা সময় যায় যখন বাঙ্গালা পত্রের সম্পাদকেরা সময় সময় নাট্যশালার কথা বা অভিনয় সমালোচনা করিলেও একটু বেশি সুরুচি ভাবাপন্ন হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। স্বভাবতঃ নটেরা একটু আদুরে গোপাল হয়, আদরে গলিয়া যায়, স্নেহের ভাবে শিক্ষা দিলে মাথা পাতিয়া শোনে, কিন্তু গোঁফ মুচড়ে জ্যাঠাম করিলে তাদের গায়ের পাতলা চামড়া চিড়চিড় করিয়া উঠে; তাহা ছাড়া তাঁদের কি প্রশংসা কি নিন্দায় আমরা কি যে সুখ্যাতি কি যে দোষ দেখানটা খুঁজি তাহা না পাওয়ায় কে কি লিখিলেন কি না লিখিলেন তাহার দিকে বড় নজরও দিতাম না।

কোলকাতায় বিলেতি থিয়েটার
কোলকাতায় বিলেতি থিয়েটার

কিন্তু দুঃখ হইত যখন বিলাতী কাগজ পড়িতাম আর দেখিতাম তাঁহারা কিভাবে অভিনয়ের সমালোচনা করেন। আর আমাদের এখনকার লেখকেরা সেসব আদর্শের দিকে দৃষ্টিপাত না করিয়া একশ্রেণীর ব্রাহ্মণেরা যেমন মনে করেন যে পাণ্ডিত্য তাঁহাদের জন্মগত অধিকার তেমনি কোন কোন তরুণ সম্পাদক মনে করিতেন যে যখন সম্পাদক হইয়া বসা গিয়াছে লর্ড রবার্টসনকে সৈন্য সংস্থাপন প্রণালী শিক্ষা দেওয়া হইতে জন লরেন্স টুলকে রঙ্গমঞ্চের শিক্ষা দেওয়া পর্যন্ত সকল অধিকার আপনা আপনি জন্মিয়া গিয়াছে।”

মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা জাত এই সত্য উপলব্ধি থেকে আজকে আমরা বুঝে নিতে পারি ১৯০১ পূর্ববর্তী সমালোচনার পরবর্তী সমালোচনার পার্থক্যের কারণ। যে সময় সহজ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সমালোচনার ধারা মানের দিক থেকে উন্নত না হলেও আন্তরিকতার ছোঁয়ায় থিয়েটারকে সচল রাখতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু পরবর্তী কালে সেই সহজ সম্পর্ক ছিল না। তুমুল রেষারেষির মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হত নতুন নতুন নাট্যপত্র। প্রত্যেক পক্ষ নিজের ঢাক নিজেরাই পেটাতেন, বিপক্ষকে নস্যাৎ করে দিতে কলম একটুও কাঁপত না। ফলে নিরপেক্ষ বিচার সম্ভবই ছিল না।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

শিশির ভাদুড়িকে কেন্দ্র করে বহু কৃতবান মানুষেরা থিয়েটারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন ঠিকই, তাতে আমাদের থিয়েটার কিছু সময়ের জন্য লাভবানও হয়েছিল কিন্তু মনে রাখতে হবে তাদের অনেকে থিয়েটারের মানুষ নন। ফলে তাদের আলোচনা যতটা অ্যাকাডেমিক ততটা থিয়েটার কেন্দ্রিক নয়। ‘নাচঘর’-এর আলোচনাতেও এই প্রবণতা দেখা গেছে, ‘সচিত্র শিশির’-এও দেখি সমালোচনায় প্রযোজনার তুলনায় ইতিহাসের স্থান বেশি। আগেই আমরা সেটা দেখেছি। উদাহরণ হিসেবে আরও একটি সমালোচনার কিছুটা তুলে দেওয়া হল, “এই ললিতাদিত্য যদি ঐতিহাসিক নাটক হয় তাহা হইলে বাঙ্গালায় আর ঐতিহাসিক নাটকের প্রয়োজন নাই।

… Mad Scene না হইলে শুনিয়াছি নাটক চলে না, গ্রন্থকার সেইজন্যই বোধহয় তৃতীয় অংকের শেষ দৃশ্যে Mad Scene এর ছড়াছড়ি দেখাইয়াছেন কিন্তু Mad Scene-এর প্রাদুর্ভাবে ললিতাদিত্য নাটকখানি যে পাগলা গারদে পরিণত হইয়াছিল তাহা বোধহয় কেহ ভাবিয়া দেখেন নাই।… দৃশ্য পরিবর্তিত (১ম অংকের ৩য় দৃশ্য) হইলে দেখিতে পাওয়া যায় যে কর্ণাটের রাণী রট্টা একখানি পালঙ্কে শুইয়া আছেন। পালঙ্কখানি বহুবাজারের তৈয়ারী, কারণ এরকম পালঙ্ক কর্ণটি দেশে এখনও কেহ দেখে নাই।

কর্ণাটের রাণী রট্টার বোধহয় তখন ভারী দুরবস্থা, বেচারার একখানার অধিক বস্ত্র ছিল না—এবং শয়নকালে স্ত্রীলোক যে কর্ণাট দেশেও মাথার চুল খুলিয়া শুইতে যায় তাহা বোধহয় সে জানিত না, সুতরাং যেভাবে ও যে বেশে রাণী গৌড়ের রাজপুত্রকে অভ্যর্থনা করিতে গিয়াছিল, সেই ভাবেই এবং সেই বেশেই সে দ্বিপ্রহর রাত্রিতে নিজের শয়নকক্ষে শুইয়াছিল।

…পরিশেষে দুঃখিত হইয়া বলিতে বাধ্য হইতেছি যে দানীবাবু, ক্ষেত্রবাবু ও শ্রীমতী কুসুম কুমারীর ভাল অভিনয় সত্ত্বেও নাট্যকার ও Producer-এর দোষে সমষ্টি হিসেবে ললিতাদিত্য নাটকের অভিনয় অত্যন্ত কদর্য হইয়াছিল।” এই সমালোচনাটিতে ইতিহাসবোধের সঙ্গে পরিচালকের প্রতি ঈষৎ শ্লেষ মিশে আছে। সমালোচনা হিসেবে যথেষ্ট প্রয়োজনীয়। কিন্তু এখানে ‘অভিনয় অত্যন্ত কদর্য’ কথাটুকু ছাড়া অভিনয় সম্পর্কে কোনো মন্তব্য নেই। তবে ‘সচিত্র শিশির’ এর সব সমালোচনাই অভিনয়কে কম গুরুত্ব দিয়ে করা হত না, তারও প্রমাণ অনেক আছে।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

কেবলমাত্র একটি উদ্ধৃতি দিয়ে এই পত্রিকার আলোচনার ইতি টানছি, “স্টারে এই ভূমিকাটি (রাণা-প্রতাপ নাটকে মেহেরুন্নিসা) বিখ্যাত অভিনেত্রী শ্রীমতী নরীসুন্দরী অভিনয় করিতেছিলেন কিন্তু কে বলমাত্র এক সপ্তাহের মহলায় শ্রীমতী সুশীলার অভিনয় তাহা অপেক্ষা শতগুণ শ্রেষ্ঠ হইয়াছিল। মেহেরুন্নিসা ভূমিকায় অভিনয় কত সুন্দর ও কত স্বাভাবিক হইয়াছিল তাহা যিনি না দেখিয়াছেন তাহাকে বুঝান কঠিন, এইটুকু বলিলেই বোধহয় যথেষ্ট হইবে—’বসিয়া বিজন ঘরে’ এই প্রথম গানেই তিনি দর্শকগণকে মুগ্ধ করিয়া দিয়াছিলেন। তাঁহার এই অভিনয় আমরা বহুদিন দেখি নাই।”

সমসাময়িককালে আর একটি পত্রিকাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের সম্পাদনায় ‘নটরাজ’ ১৩৩৩ সালে প্রকাশিত হয়। এখানে সম্পাদক নিজেই একাধিক সমালোচনা লিখেছিলেন, এবং অন্যের লেখা সমালোচনা প্রকাশিত করেছিলেন। যেমন, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের ‘নটীর পূজা’-র অভিনয় দেখে জনৈক ভারত বসু সমালোচনা করে লেখেন,

“জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির শিক্ষিত সুরুচি সুচারু শিল্পানুরাগী নরনারী যে নিঃস্বার্থ অপেশাদারী অভিনয়ের দ্বারা রবিবাবুর নটীর পূজাকে দর্শকচিত্তে অনাবিল আনন্দদান করেছিলেন, পেশাদারী সাধারণ রঙ্গমঞ্চের অভিনেতা অভিনেত্রীদের পক্ষে তা সম্ভব নয়, কেননা অভিনেতাদের বহুলাংশ অর্থনৈতিক চাপে রঙ্গ শালাকে ভালোবাসতে বাধ্য হয়েছে।

শিক্ষাদীক্ষা তাদের অধিকাংশের উপযুক্ত নয়, যে কারণে অভিনয়ের সার্থকতা দেখা যায় না।…অঙ্গরাগের স্পর্শবীণা যাঁরা এক মুহূর্তের জন্যও মঞ্চে আবির্ভূত হতে পারেন না। ‘অঙ্গবৈশিষ্ট্য’ যাঁদের কাছে প্রচুর আর যাঁদের মুখে অলয়-তুলিকায় ফুটে আছে অভিশপ্ত তাঁদের জীবনের পাণ্ডুর ছবিখানি, স্ফূর্তির অভিনয়, প্রাণের অভিনয়, ‘সুন্দরের’ অভিনয় তাঁরা করবেন কি করে?… জোড়াসাঁকোর আদর্শ পেতে তাঁদের অপেক্ষা করতে হবে অনেক যুগ এবং রসগ্রাহী দর্শক পাওয়ার সৌভাগ্য হবে তখনই।” এই আলোচনায় শিল্পের সমালোচনার তুলনায় শিল্পীর জীবন ও জীবিকাই বড়ো হয়ে উঠেছে।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

সমালোচক তার এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে সমালোচনাটি করেছেন যদিও এই আলোচনায় সেই সময়ের পেশাদার থিয়েটারের অবস্থানের পাশাপাশি নতুন ধারায় থিয়েটার যে গড়ে উঠেছে তার ইঙ্গিত আছে। নতুনকে নতুন হিসাবে মেনে নিতে চাইছেন এই সমালোচক তবুও শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত এই সমালোচনাটি সম্পূর্ণত মেনে না-নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে বলেছিলেন—“নাট্যপ্রতিভা ছাড়া সংস্কৃতজ্ঞ সুশিক্ষিত ব্যক্তিও মঞ্চের উপযুক্ত নন। আবার অশিক্ষিত পতিতা নারী অধ্যবসায়ের জোরে এবং মৌলিক নাট্য প্রতিভার জোরে মঞ্চ পাদপীঠকে উজ্জ্বলতর করতে সক্ষম।”(নটরাজ : প্রথম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা)

Bijou Grand Opera House Calcutta
Bijou Grand Opera House Calcutta

সম্পাদক মঞ্চগতের হিতৈষী হিসেবেই ‘নটরাজ’কে চালনা করতে চেয়েছিলেন। তাই সমসাময়িক প্রবণতাকে কখনও সমালোচনা কখনও প্রশংসা করেছেন পত্রিকার মাধ্যমে। নিজের এই মনোভাবকে অন্য সমালোচকদের মধ্যেও সংক্রমিত করিয়েছিলেন। যেমন রাধিকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের একটি মূল্যবান আলোচনা তুলে ধরা যায়। যদিও আলোচনাটি সরাসরি কোনো নাটকের সমালোচনা নয়, ‘নটরাজ’ শারদীয়াতে একটি সামগ্রিক আলোচনা, কিন্তু তৎকালীন নাট্যবিষয়ক প্রবণতা নিয়েই আলোচনাটি সমৃদ্ধ ছিল।

“পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক নাটক অভিনয় দেখবার আগ্রহ কতগুলি লোকের থাকবেই কিন্তু তাই বলে কেবল যদি ওই দুই রকম নাটকের অভিনয়ই আমরা করি তাহলে দর্শকদের অরুচি কেন জন্মাবে না? আমার বিশ্বাস পৌরাণিক প্রীতি দর্শকদের আর নেই। কিন্তু তা নেই বলেই যে অন্য নাটক জমবে সে কথাও আমি বলি না, না বলার সঙ্গত কারণ রয়েছে। পৌরাণিক নাটক অভিনয় করে খুব জাঁকালো দৃশ্যপট দেখিয়ে দেখিয়ে খুব উত্তেজনাপূর্ণ বড়ো বড়ো বক্তৃতা শুনিয়ে আমরা দর্শকদের এমন করে ফেলেছি যে জীবত্ত নাটক আর তাদের উত্তেজনার খোরাক যোগাতে পারছে না।

এই-ই হয়েছে এখনকার অবস্থা।” লক্ষণীয়, আলোচনার ভাষা অনেক বেশি আধুনিক হয়ে উঠেছে, কোনো পক্ষ অবলম্বন নয়, সদর্থক কিছু কথা বেরিয়ে আসছে। মঞ্চের মানুষেরা প্রভাবিত হচ্ছেন এই ধরনের আলোচনায়।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

এই সময়ের আরও কিছু পত্র-পত্রিকার উল্লেখ করা যায় যেগুলি আজ পাওয়া দুষ্কর। বিভিন্ন আলোচনার সূত্রে জানা যায় যে সেই সমস্ত সাময়িক পত্র ও নাট্যপত্রে নাট্য সমালোচনা প্রকাশিত হত। বেশির ভাগ পত্রেরই প্রথম প্রকাশকাল জানা যায় না। কিন্তু সমালোচিত নাটকের নিরিখে বুঝে নেওয়া যায় যে পেশাদার রঙ্গমঞ্চের একচেটিয়া আধিপত্যের সময়েই এই সমালোচনাগুলি প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ধরনের কিছু সমালোচনার উল্লেখ করা হল।

‘’নবযুগ’ পত্রিকায় ১৯২৪-এর জুলাই-আগস্ট সংখ্যায় শিশির কুমারের ‘সীতা’ নাটকের রাম চরিত্র সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, “...রামের অংশে শিশিরকুমারের অভিনয় কেবল বাঙ্গালার নয়, সমস্ত জগতে অতুলনীয়। হৃদয়ের ঘাত-প্রতিঘাতগুলি, কণ্ঠের স্বর বৈচিত্র্যের ও মুখমণ্ডলের ভাববৈচিত্র্যে ফুটাইয়া তোলা যে কত বড় হৃদয়বানের কাজ তাহা বলা কঠিন। অভিনয়ে শিশির কুমার আপনাকে হারাইয়া, তাঁহার মস্তিষ্কপ্রসূত রাম চরিত্রে মিশিয়া গিয়াছেন তাহা কাহারও বুঝিতে বাকি ছিল না।

নারী চরিত্রের মধ্যে শ্রীমতী প্রভা ‘সীতা’ রূপে অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়াছেন—পরলোকগত অভিনেত্রী শ্রীমতী সুশীলার ক্ষতিপূরণ করিবার ইনিই একমাত্র যোগ্যা। ভরত ও লক্ষ্মণের অংশ শিশিরবাবুর ভ্রাতাদ্বয় তাঁহার সম্মান রক্ষায় অকৃতকার্য হয়েন নাই।… আশ্চর্য হইলাম শত্রুঘ্নের অভিনয়ে–শিশির কুমারের অপূর্ব শিক্ষা কৌশলে ইহার অভিনয়ে একটা বেশ উচ্চাঙ্গের গাম্ভীর্য (dignity) দেখিতে পাইলাম। দুর্মুখের অংশও অতি সুন্দর হইয়াছিল। মহর্ষি বাল্মীকির অভিনয়ে অভিনেতা নিজের ক্ষমতা ও শান্ত স্বাভাবিকতার পরিচয় দিয়াছেন।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

বশিষ্ঠের অংশ অত্যুত্তম না হইলেও তজ্জন্য নাট্য সৌন্দর্য্যের কোন ক্ষতি হয় নাই। লবকুশের অভিনয় কেবল যে স্বাভাবিক হইয়াছিল তাহা নহে অদ্ভুত অপ্রত্যাশিত রূপে প্রতিভালোক দীপ্ত হইয়া মর্ম স্পর্শ করিয়াছিল। …পুরাতন যুগের অভিনয়ের মত ইহাতে নৃত্যগীতের প্রাচুর্য্য না থাকিলেও দু-খানি নৃত্যগীত অতীব সুন্দর হইয়াছিল।…’ 33 আবার শিশির কুমারের ‘পাষাণী’র অভিনয় প্রসঙ্গে ডিসেম্বর ১৯২৪-জানুয়ারি ১৯২৫ এ লেখা হয়েছিল “শিশিরবাবুর ইন্দ্রের ও গৌতমের ভূমিকা ভালই হইয়াছিল; ইন্দ্ৰবেশে

অহল্যা পরিত্যাগ, দুইটি দৃশ্যেই তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ বিশেষত্ব দেখা গিয়াছিল। গৌতমের ভূমিকায় পুত্রের নিকট বিদায় দৃশ্যটিও বেশ মর্মস্পর্শী হইয়াছিল।” ৪ ডিসেম্বর ১৯২৫ এ ‘আলমগীর’ সম্পর্কে লেখা হয়, “আলমগীর দেখিয়া আমরা পরম আনন্দ লাভ করিয়াছি। উদিপুরীর ভূমিকায় তারাসুন্দরী বিজয়িনীরূপে দেখা দিয়াছেন।…ভাদুড়ী মহাশয়ের আলমগীরও রূপ রসে পরিপূর্ণ। অন্যান্য ভূমিকার মধ্যেও এরাদৎ খাঁ, ভীমসিংহ ও বিক্রম সোলাঙ্কী অতি সুন্দরভাবে অভিনীত হইয়াছিল।… মনোরঞ্জন বাবুর কামবকসের অভিনয় ভাল হইয়াছিল।…দর্শকদের তৃপ্তি দিবার জন্য এই ঐকান্তিক প্রয়াস ও যত্ন নাট্যমন্দিরকে জয়যুক্ত করুক।”

‘ধূমকেতু’ পত্রিকার একটি সমালোচনা গেছে। শচীন্দ্রনাথ সেন প্তের রাতে প্রযোজনার এই সমালোচনায় লেখা হয়েছিল—“ঝড়ের রাতে…প্রযোজনার দিক থেকে শ্রী সতু সেন শুধু যে সাফল্য লাভ করেছেন তাই নয়, বঙ্গ রঙ্গমঞ্চে এ ধরনের প্রযোজনা আর ইতিপূর্বে হয়েছে বলে মনে পড়ে না। ঝড়ের শব্দ এবং বৃষ্টির আবহাওয়া এমন চমৎকার ভাবে বাইরে জমে উঠেছিল যে তা এখনও কানে বাজে।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

…ঝড়ের রাতের কথা বলতে গিয়ে প্রথমে এই কথাটিই বলা প্রয়োজন মনে হয় যে, এই বিশিষ্ট নাটকখানি হয়ত সর্বসাধারণের জন্য নয়। যাঁরা ঘন ঘন কামান গর্জন, মুহুর্মুহু পতন ও মূৰ্চ্ছা এবং বেগে প্রবেশ-প্রস্থান দেখে অভ্যস্ত। তাঁরা সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্রযোজিত এই নাটকখানি দেখে বোধকরি একেবারে হতাশ হয়ে ঘরে ফিরবেন।… প্রকৃত রস সৃষ্টিকে উপভোগ করার শক্তি এবং ধৈর্য যাদের আছে তারাই শুধু এই বইখানি দেখে আনন্দিত হবেন।” (ধূমকেতু: নবম সংখ্যা)

এই সমালোচনায় অভিনয় নিয়ে ‘নবযুগ’-এর মতো উচ্ছ্বাস নেই বরং প্রযোজনাগত দিক থেকে ‘ঝড়ের রাতে’ যে সমসাময়িকের তুলনায় অন্যরকম সেটাকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন। সমালোচনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এটাই হওয়া উচিত। এরপর থিয়েটার নতুন খাতে বইতে শুরু করে। থিয়েটারের সামাজিক ভূমিকাও বদলে যায়। ফলে সমালোচনার ভাষা, সমালোচনার প্রয়োজন-অপ্রয়োজনীয়তার নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও দেখা দিতে শুরু করে।

[ আধুনিক নাট্য সমালোচনার বৈশিষ্ট্য – আশিস গোস্বামী ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন