বহুরূপী পত্রিকা, নাট্যপত্র – আশিস গোস্বামী

বহুরূপী পত্রিকা, নাট্যপত্র [ আশিস গোস্বামী ]: বহুরূপী নাট্যদল যখন সাত বছরে পড়ল তখন তাঁদের নিজস্ব ‘মুখ-পত্র’ হিসেবেই ‘বহুরূপী’ পত্রিকা প্রকাশ করল। বাংলা নাট্যপত্র ইতিপূর্বেও প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু একটি নাট্যদল তাদের নিজস্ব চিন্তা চেতনাকে প্রকাশ করার জন্য একটি নাট্যমুখপত্রর আত্মপ্রকাশ নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা সংযোগ করেছে। ‘বহুরূপী’ নাট্যপত্র ১৯৫৫ সালের ১ মে প্রকাশিত হয় কিছু ‘কৈফিয়ত’ জানিয়ে। সংস্থার তৎকালীন সভাপতি গঙ্গাপদ বসু লেখেন, “…আর্টের শ্রীক্ষেত্রে লোক জড়ো করবার ভালো উপায় হচ্ছে ভালো করে ভালো খেলা দেখানো; বড়ো জোর আমরা যে ভালো খেলা দেখাতে পারি তার বিজ্ঞাপন কাগজে লিখে রসিক লোকেদের বাড়ি পৌঁছে দেবার একটা ব্যবস্থা করতে পারি। কিন্তু তার বেশি কিছু নয়।

অর্থাৎ এখানেও প্রচারের প্রয়োজন আছে, কিন্তু তার ধরনটা হবে আলাদা। এই ধরন অর্থাৎ ‘ফরম’ নিয়ে তর্ক উঠতে পারে, কিন্তু তবু, ‘বহুরূপী’র রূপকারদের মনে গোড়া থেকেই একখানা পত্রিকা প্রকাশের ভাবনাটা ছিল। মহর্ষি প্রায়ই বলতেন : ‘দেখ তোমাদের কথা জানবার একটা আগ্রহ লোকের হয়েছে, কিন্তু জানাবে কি করে? এই জন্যই কাগজ একখানা থাকা খুব দরকার।’

আজ মহর্ষি নেই, কিন্তু তাঁর অভীপ্সিত পত্রিকা আমরা করলাম। দৈনিক নয়, সাপ্তাহিক নয়, মাসিক নয়, – আমাদের পত্রিকা নিতান্তই আকস্মিক। দরদীদের কাছ থেকে উৎসাহ পেলে নিয়মিত ভাবে পত্রিকা প্রকাশের কল্পনা তো রয়েছেই–কেননা আমরা বিশ্বাস করি দরদীদের আগ্রহ এবং উৎসাহই যে কোনো শিল্প সংস্থার অগ্রগতির পথের পাথেয়। আমাদের দেশেও যেমন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও তেমনই, সৌখিন মঞ্চই পেশাদার মঞ্চের জনক। এই সৌখিন মঞ্চ দেশের জনসাধারণের অর্থানুকলো পুষ্ট হত এবং দরদীরাই ছিলেন এর প্রকৃত পরিচালক। সেদিনকার সৌখিন মঞ্চের সঙ্গে আজকের সৌখিন মঞ্চের স্বভাবতই কোনো মিল নেই।

আশিস গোস্বামী [ Ashish Goswami ] - বহুরূপী পত্রিকা, নাট্যপত্র
আশিস গোস্বামী [ Ashish Goswami ]
সেদিনকার আবেদন ছিল: ‘অনুগ্রহ করে অভিনয় দেখে আমাদের উৎসাহ দিন।’ আর আজকের আবেদন হল: ‘আমাদের অভিনয় দেখার মত বলেই দেখুন।’ দরদীদের মনোভাবের তাই আজ পরিবর্তন হয়েছে। আজ তাঁরা অপেশাদার সম্প্রদায়ের অভিনয় নিছক অর্থ সাহায্য করবার বা আর্থিক অপব্যয় করবার মনোভাব নিয়ে দেখতে আসেন না, পেশাদার রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে অপেশাদার সম্প্রদায়ের তুলনা করেই তাঁরা অভিনয় দেখে থাকেন, অর্থাৎ পেশাদার না হলেও তাঁরা আমাদের কাছে আশা করেন পেশাদারী যোগ্যতা, হয়ত তার চেয়েও কিছু বেশী। তাঁদের এই আশা আমাদের পূর্ণ করতে হবে সব বিষয়েই, এমন কি বহুরূপীর নিজস্ব পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশের যে কল্পনা ব্যক্ত করলাম সে সম্পর্কেও। উভয় পক্ষের কল্যাণে, নাট্য আন্দোলনের প্রগতির প্রয়োজনে একখানি সুরুচিপূর্ণ পত্রিকা থাকা বহুরূপীর দরকার। এই বোধ সৃষ্টি করতে পারলেই কল্পনা বাস্তবে রূপ সংগ্রহ করবে, এ আত্মপ্রত্যয় নিরর্থক নয়।”

“এই ঘোষণা সামনে রেখে ‘বহুরূপী’ প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় কেবলমাত্র সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের বিনামূল্যে দেবার জন্য। অর্থাৎ প্রথম সংখ্যাতে বৃহত্তর দর্শক সাধারণকে নিজেদের কথা পৌঁছে দেবার বাসনাটা ছিল না, ছিল নিজেদের কাজটাকে যাচাই করে নেবার ইচ্ছা। অনেকের কাছে পৌঁছে যাবার সদর্থক ভীরুতা হয়তো তাদের ছিল, নাটক প্রযোজনার ক্ষেত্রে যে ভীরুতা বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন তাঁরা, এক্ষেত্রেও সমানভাবে এগিয়ে যাওয়া যাবে কি না সেটা পরীক্ষা করে নেবার প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল শুভানুধ্যায়ীদের পরামর্শ। অচিরেই তাদের প্রচেষ্টার সফলতাও তারা টের পেয়েছিলেন বলে মনে হয়। এক বছর বাদে যখন দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হল তখন ‘আমাদের কথা’ শিরোনামে কার্যকারী সমিতির সম্পাদক অমর গঙ্গোপাধ্যায় লিখলেন,

“শেষ পর্যন্ত ‘বহুরূপী’র দ্বিতীয় সংখ্যা বার করা গেল, প্রথম সংখ্যার পর এক বছর গত হয়েছে। প্রথম সংখ্যায় আমরা অনেক আশা আকাঙ্খার কথা শুনিয়েছিলাম। বলেছিলাম উৎসাহ পেলে ‘বহুরূপী’ নিয়মিত বার করার চেষ্টা করবো। কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। এরপর অবশ্য প্রশ্ন ও উত্তর দুটোই মামুলি হবে–অতএব সে চেষ্টার অবকাশ না দিয়েই বলি, এবার থেকে ‘বহুরূপী’ নিয়মিত বার করা হবে। অত্যন্ত সাধু মন নিয়েই বলছি, চেষ্টার ত্রুটি থাকবে না, আন্তরিকতার অভাব ঘটবে না। যেমন ঘটেনি আর সব কাজের বেলায়। দেরী হয়ত একটু হয়েছে কিন্তু তা অনিবার্য কারণেই। ‘বহুরূপী’ কিন্তু রসিক-জন-চিত্তকে খুশী করতে পেরেছে। আর সেই ধারাটাই শিল্পের ক্ষেত্রে সফলতা। তাই রসিক মনকে খুশী করার লোভ নিয়েই বলছি, পত্রিকা আমরা প্রকাশ করবো।”

এই কৈফিয়ত থেকে সহজেই অনুমেয় প্রাথমিক সংশয় কেটে গেছে তাঁদের, তাঁরা পত্রিকা প্রকাশের স্বপক্ষে অভিমত জুটিয়ে নিতে সক্ষম এবং কাজটা জরুরি ও নাটকের কাজকে বিস্তৃত ও ত্বরান্বিত করতে থিয়েটারের কাগজ প্রকাশ করাটা প্রয়োজনীয় কর্ম এ বিষয়েও তাঁরা সুনিশ্চিত। তাই যেমন দাবি হিসেবে ওই একই লেখায় তারা লিখলেন, “এ পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগটা আমাদের বাংলাদেশে প্রথম থিয়েটার প্রসঙ্গে সত্যকার কিছু বলবার এবং শোনবার প্রচেষ্টায়। সেই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল ‘বহুরূপী’ পত্রিকা কেবলমাত্র নিজেদের দলের কথাই নিজেরা বলবে না অন্যের মতামতকেও গুরুত্ব দিতে চায় – কিন্তু পত্রিকা শুধু বহুরূপীর মতামত প্রকাশের জন্যই নয়—যাঁরাই এ সমস্যা নিয়ে ভেবেছেন এবং সমাধানের সংকল্প নিয়ে এগিয়ে এসেছেন তাদের সকলের মতামতের স্বাতন্ত্র্যকেই আমরা মর্যাদা দিতে চাই।” প্রথম সংখ্যায় ঘনিষ্ঠ অনুরাগীদের কাছে পৌঁছোনোর চেষ্টা দ্বিতীয় সংখ্যায় আরও

ব্যাপকতা পাবার চেষ্টায় তৎপর হল। পত্রিকাকে টিকিয়ে রাখতে হলে ক্রেতার পরিধি বাড়াতেই হবে,–এই স্বতঃসিদ্ধ কাজটিই তাঁরা করলেন। সেই সঙ্গে পত্রিকা প্রকাশনা একটি নাট্য দলের দ্বিতীয় শ্রেণির কাজ যে নয় বরং তা নাট্য প্রযোজনার মতই সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। তাও বোঝা যায় দ্বিতীয় সংখ্যায় বহুরূপী গোষ্ঠীর সম্পাদকের স্বাক্ষরিত একটি আহ্বানে। বছরে একটির বদলে দুটি সংখ্যা প্রকাশের ইচ্ছা ঘোষিত হয়েছে সেখানে। এবং কেন তাঁরা দুটি সংখ্যা প্রকাশ করতে চাইছেন তাও স্পষ্ট সেই ঘোষণায়—

সবিনয়ে নিবেদন,

এই সংখ্যা নিয়ে ‘বহুরূপী’ দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হল। আমাদের অনেক দিনের ইচ্ছা নিয়মিত আমাদের কাগজ প্রকাশ করা, যার মাধ্যমে আমাদের কথা আপনাদের জানাতে পারব এবং আপনাদের কথা আমরা জানতে পারব; সেখানে সহজভাবেই সমস্ত আলাপ আলোচনা চালানো যেতে পারবে। তাই আমরা ঠিক করেছি এবার থেকে ষাণ্মাসিক ক্রমে আমরা ‘বহুরূপী’ প্রকাশ করবো। পরবর্তী সংখ্যা বেরুবে ‘ডিসেম্বর ৫৬-এ। অনুগ্রাহক ব্যবস্থা প্রবর্তন করার সময় আমরা আপনাদের কাছে যে শুভেচ্ছা ও সাহায্য পেয়েছিলাম আশা করি এবারেও তা পাবো। এ বিষয়ে আপনাদের কাছ থেকে সক্রিয় পরামর্শ চাইছি।

অমর গাঙ্গুলী

সম্পাদক

‘বহুরূপী’ নাট্যপত্র ষাণ্মাসিকের চেহারা নিল। ষষ্ঠ সংখ্যা পর্যন্ত সঠিক সময়ে প্রকাশিত না হলেও তারপর থেকে বছরের সংখ্যা দুটি ১ মে নাট্যদলের প্রতিষ্ঠা দিবসে এবং অক্টোবর মাসে শারদকালে পত্রিকা প্রকাশের সময় নির্দিষ্ট হয়ে গেল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে এখনও পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতা বর্তমান।

প্রথম কয়েকটি সংখ্যার বিষয়সূচি লক্ষ করলে দেখা যাবে পত্রিকাটির সঠিক চেহারা কী হবে তা নিয়ে এক ধরনের অন্বেষণের চেষ্টা আছে। খুবই স্বাভাবিক যে নতুন একটা নাট্যপত্র—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যার পাঠক শুভানুধ্যায়ী নাট্যবন্ধুরা তাদের চাহিদা কী? অর্থাৎ বিষয়ের কোন কোন দিকে নিজেদের আলোচনার পরিধি বাড়িয়ে নেওয়া যাবে— তা নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান নানা পথে চলবে। আর চলতে চলতে পথও মিলে যাবে এই বিশ্বাসেই বহুরূপী এগিয়েছে।

অচিরেই তাঁরা বুঝলেন নাট্য বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশই নাট্যপত্রের প্রধান কাজ হতে পারে না, বাংলা মঞ্চের মৌলিক নাটকের জোগান দিতে হবে, নিজেদের সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর নানা প্রান্তকে ছুঁয়ে যেতে হবে। তাহলে তুলনামূলক বিচার সম্ভব, নিজেদের পারা না-পারার ক্ষমতাকে বুঝে নেওয়া যাবে। অর্থাৎ বিশ্ব নাট্যের সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াটা জরুরি। ‘বহুরূপী’ চেষ্টা করেছিল সেই দায়িত্ব পালনের। আমরা যদি ‘বহুরূপী’তে প্রকাশিত লেখাগুলির তালিকাতে চোখ রাখি তাহলেই তাঁদের প্রচেষ্টার প্রমাণ মিলে যাবে। তবে পত্রিকা প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই তাদের সামনে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়াল মুদ্রণযোগ্য নাটকের অভাব।

কেবলমাত্র নাটক বিষয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করে একটি পত্রিকা চালানো যায় না। নাটক চাই, মুদ্রণযোগ্য ভালো নাটক। তার অভাব হেতু সমস্যার কারণ খুঁজতে তৎপর হলেন তাঁরা। কারণ অনুসন্ধান করতে প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের দিয়ে পরপর কয়েকটি লেখা প্রকাশ হল। বনফুল, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সুবোধ ঘোষ, সমরেশ বসু, বিমল কর প্রমুখ নিবন্ধ রচনা করে তাঁদের মতামত জানালেন। এই পরিকল্পনার কারণ সম্পর্কে পত্রিকা সম্পাদক লিখলেন—

“কাব্যে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, ছোটগল্পে, রস রচনায় আমাদের সাহিত্যের ঐশ্বর্য-সম্পদ ঝলমল করছে। অথচ আমাদের ভালো নাটক নেই। আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকরা নাটক লিখছেন না। নানা প্রবন্ধে নিবন্ধে সভাসমিতির বক্তৃতায় কেবল ‘নাটক লেখা হচ্ছে না’ এই নেতিবাচক সলজ্জ স্বীকৃতিই ধ্বনিত হচ্ছে। কিন্তু কেন লেখা হচ্ছে না। তার কারণ অনুসন্ধানে কেউ প্রস্তুত হয়েছেন বলে শুনি নি। অনেকে বলেছেন, সাহিত্য কর্ম হিসাবে নাটক লেখা হোক, মঞ্চের কথা না ভেবেই। তাহলেই একদিন সত্যিকারের ভালো নাটক লেখা হবে। কথাটার সত্যতা প্রমাণ সাপেক্ষ। তাই আমরা আমাদের দেশের প্রধান সাহিত্যিকদের মতামত প্রকাশের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।” ‘বহুরূপী’ এই প্রচেষ্টার নিদর্শন হিসেবে সমসাময়িক কালে বেশ কিছু নাটক মুদ্রিত করে।

তবে লক্ষ করা যায় যে ‘বহুরূপী’ পত্রিকায় নিজেদের প্রযোজনা বিষয়ে যেমন কোনো সমালোচনা থাকত না তেমনি সমকালের অন্যান্য প্রযোজনা বিষয়েও আশ্চর্য নীরব ছিল। এমনকি নাট্য বিষয়ক কোনো বই বা মৌলিক নাটক নিয়েও কোনো সমালোচনা তাঁরা প্রকাশ করেননি। তবে ১৯৬৮ সালের জুন সংখ্যায় অর্থাৎ ২৮-২৯ যুগ্ম সংখ্যায় নেমিচাদ জৈনের ‘রঙ্গদর্শন’ বইটির একপাতা সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সেটা অবশ্য ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য হবে; কারণ ওই একটি ছাড়া অন্য কোনো সমালোচনা প্রকাশিত হয়নি। হয়তো সমালোচনা ছেপে বিতর্কে জড়াতে চাননি তাঁরা কিংবা প্রকৃত সমালোচনার অভাব হেতু এড়িয়ে গেছেন তাঁরা। অবশ্য এর কারণ হিসেবে ১৯৬৩ সালের অক্টোবরের সংখ্যায় গঙ্গাপদ বসু একটি যুক্তিও দেখিয়েছিলেন—

“…লোকের ভাল লাগা না লাগার দিকে তাকিয়ে অর্থাৎ জনরুচি তোষণ করে। পৃথিবীতে কখনই কোনো মহৎ শিল্প সৃষ্টি সম্ভব হয়নি, ইতিহাস তার সাক্ষী। মহৎ শিল্প যুগের দ্বারা প্রভাবিত হয় না, যুগকে প্রভাবিত করে। যাঁরা যুগের হুজুগের সঙ্গে সম্পর্কহীন এই ধরনের সৃষ্টিকে উপলব্ধি করতে পারেন তারাই প্রকৃত রসবেত্তা। আর যিনি এই উপলব্ধির পথে লোককে সাহায্য করতে পারেন তিনিই খাঁটি শিল্প প্রচারক, গুণী সমালোচক এই নিগূঢ় শিল্প পরিচয়ের দুর্লভ সূক্ষ্মদৃষ্টি সমালোচকের পক্ষে অনায়াস লভ্য নয়, কঠোর প্রস্তুতি দ্বারা তাকে আয়ত্ত করতে হয়। আর এই জন্যেই নাটকের শিল্প

বিচারের ক্ষেত্রে আজ সমালোচকের ভূমিকা নিয়ে এত কথা উঠছে দেশে এবং বিদেশে। আমাদের দেশে নাট্য সমালোচনার কোনো মান গড়ে ওঠেনি, এ অনুযোগ দীর্ঘদিনের। দেশে নাট্যানুষ্ঠানের প্রসার যে কারণেই হোক বিশেষ ভাবে ঘটেছে। এই দেশব্যাপী বিপুল

নাট্যোদ্দমকে গঠনমূলক পথে পরিচালনা করার দায়িত্ব ছিল সমালোচকদের মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকের মত যে সব অসাধারণ নাট্য প্রযোজনার দৃষ্টান্ত দেখা গেছে তাদের পথ সুগম করে সাধারণভাবে নাট্যশিল্পের অগ্রগতিকে সাহায্য করার দায়িত্ব ছিল সমালোচকদের, বিশ্বনাট্যের প্রগতির ইতিহাসের সঙ্গে তাল রেখে এদেশের নাট্য সংস্কৃতির প্রগতির ইতিহাস কেমন করে এগিয়ে চলেছে বা আদৌ এগিয়ে চলেছে কিনা তার প্রতি অঙ্গুলি সংকেতের দায়িত্ব ছিল সমালোচকদের সর্বোপরি এদেশে যে সব সৎ এবং মহৎ নাট্য প্রচেষ্টা হয়েছে তা বোঝবার এবং বোঝাবার মত আত্মপ্রস্তুতি থাকার দরকার ছিল সমালোচকদের। কিন্তু তারা যে নিজেদের এই সব দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন, একথার কোনো বিশেষ প্রমাণ পাওয়া যায় নি।”

গঙ্গাপদ বসুর এই অভিযোগ যথার্থ মনে করেও বলতেই হয়, বহুরূপী যথার্থ সমালোচনার মান নির্ণয়ে কোনো ভূমিকাই নেয়নি। ‘গন্ধর্ব’ পত্রিকা প্রকাশের আগে নাট্য সমালোচনা সম্পর্কে নবনাট্যধারার মানুষেরা খুব সচেতন ছিলেন তার প্রমাণ কিন্তু কোথাও নেই। বস্তুত ষাটের দশকের আগে কি সংবাদপত্র, কি সাময়িক পত্র বা নাট্যপত্র কোথাও আধুনিক সমালোচনার ধারা গড়বার প্রয়াস নেই। বহুরূপী নাট্যপত্র নানা দিগন্তকে ছুঁয়ে গিয়েছিল; তারই কিছু উদাহরণ আমরা পূর্বোক্ত আলোচনায় করার চেষ্টা করেছি।

পরবর্তী কালে কম বেশি প্রায় সব নাট্যপত্রই বহুরুপী পত্রিকার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেই। তাই নাট্যপত্র সম্পর্কিত আলোচনার শুরুতে বহুরূপীর অবদান বিশ্লেষণটা জরুরি ছিল। নাট্য সমালোচনা নেই বলে তাকে অবজ্ঞা করলে পরবর্তী আলোচনাটা অসমীচিন হয়ে পড়বে। বহুরূপী নাট্যসমালোচনা প্রকাশ না করলেও বিভিন্ন প্রযোজনা ভিত্তিক আলোচনা প্রকাশ করে নাট্য সমালোচনার পথকে সুগম করে দিয়েছিলেন, এই ঐতিহাসিক সত্যটা আমরা যেন না ভুলি।

[ বহুরূপী পত্রিকা, নাট্যপত্র – আশিস গোস্বামী ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন