বিমল রায়

বিমল রায় [ Bimal Roy ] একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভারতীয় বাঙালি চিত্র পরিচালক এবং প্রযোজক। তিনি দো বিঘা জমি, পরিণীতা, বিরাজ বাহু, দেবদাস, মধুমতি, সুজাতা, পরখ এবং বন্দিনির মতো বাস্তববাদী এবং সমাজবাদী চলচ্চিত্রের জন্য বিশেষভাবে সুপরিচিত। এসব সৃষ্টি তাকে হিন্দি সিনেমার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব করে তুলেছিল। ইতালীয় নিও-রিয়ালিস্টিক সিনেমা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, তিনি ভিত্তোরিও ডি সিকার বাইসাইকেল থিভস (1948) দেখার পর দো বিঘা জমিন তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার কর্মজীবনে এগারোটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবের আন্তর্জাতিক পুরস্কার সহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার জিতেছেন। মধুমতি ১৯৫৮ সালে ৯ টি ফিল্মফেয়ার পুরষ্কার জিতেছিল, এটিই ছিল পরবর্তি ৩৭ বছরের রেকর্ড।বিমল রায়, Bimal Roy

বিমল রায় সম্পর্কে গুলজার

গুলজার তার পান্তা ভাতে বইয়ে লিখেছিলেন – আমি আসলে একজন বাঙালি যে কিনা বাই চান্স জন্মে গিয়েছি একটা পঞ্জাবি পরিবারে। রবীন্দ্রনাথ আমায়, বা আমি রবি ঠাকুরকে পাকড়েছিলাম সেই ক্লাস এইট-এ। আর তার পর থেকে বাংলা আমার ওপর, না কি আমি বাংলার ওপর ভর করলাম ঠিক বলতে পারব না। ক্লাস টেন পাশ করার আগে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র পড়ে ফেলেছি। স্কুলে বাঙালি বন্ধুদের মধ্যে বাংলায় কথাবার্তা শুনে আরও লোভ হল বাংলা শেখার। শিখতে শুরু করলাম।

পাশাপাশি চলল সাহিত্যপাঠ। মনে মনে তখনই ঠিক করেছিলাম, সাহিত্যিক হবই। কলেজে পড়তে পড়তে আমায় পাঠিয়ে দেওয়া হল বম্বে। আমার বড় দাদা থাকতেন সেখানে। জীবনে যাতে কিছু করেকম্মে খেতে পারি, জীবনটা যাতে বেমক্কা খরচ না হয়ে যায়, সে সব ভেবেই বোধ হয়।

আমার ভারী লাভ হল। আমি বম্বে আসার কিছু দিনের মধ্যেই প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন, আই পি টি এ, এ সব সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম। সেখানকার লোকজন, চর্চা, বুদ্ধির শান, তর্কের উন্মাদনা আমায় নেশা ধরিয়ে দিল। আরও দুটো কাজ করলাম। এক, দাদার আস্তানা থেকে বেরিয়ে এলাম, ওঁর সঙ্গে আমার সাহিত্যিক মনের ঝঞ্ঝাট হল, আর দুই, নিজের পেট চালানোর জন্য মোটর গ্যারাজে কাজ নিলাম।

এই সময় আমি থাকতাম চার বাংলা বলে একটা জায়গায়। এই সময়টায় আমার আরও অনেক বাঙালি বন্ধুবান্ধব হল। আমি বাংলা কবিতার প্রতি আরও আকৃষ্ট হলাম। তখন ফাঁকা সময় পেলে জানলার ধারে বসে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা অনুবাদ করতাম।

বিমল রায় [ Bimal Roy ]
বিমল রায় [ Bimal Roy ]
আমার ঘরে থাকতে এল দেবু সেন। বিখ্যাত চিত্র পরিচালক বিমল রায়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট। অবশ্য আমরা তখন সবাই আই পি টি এ-তুতো গুরুভাইও। আমি, দেবু, সলিলদা, প্রেম ধবন, রুমা গুহঠাকুরতা। এ ছাড়া আমি পার্ট টাইম স্ট্রাগলিং সাহিত্যিকও বটে।

দেবু ঘরে ফিরে এসে বিমল রায় সম্পর্কে অনেক কথা বলত। আমি দেবুর সঙ্গে মাঝে মাঝে স্টুডিয়োয় যেতাম। মুভিওয়ালায় এডিটিং সেট আপ-এ সিনেমাও দেখতাম। দ্য বিমল রায় সম্পর্কে তখন বম্বের আকাশ-বাতাস মুখরিত ছিল। আমার একটা আলাদা ইন্টারেস্ট ছিল বিমল রায়ের প্রতি তাঁর সব সিনেমাই বাংলা সাহিত্যকে ভিত্তি করে, আর আমি যেহেতু সাহিত্যের পোকা, তাই তাঁর প্রতি আরও একটু বেশি শ্রদ্ধা বরাদ্দ হয়েছিল।

এক দিন দেবু এসে আমায় বলল, ‘কাল চলো, বিমলদার সঙ্গে দেখা করতে।’ প্রথমটায় আমি অ-স্ট্রাক, কিন্তু দ্বিতীয়টায় করি প্রত্যাখ্যান। ‘না রে, আমি যাব না দেখা করতে। আমি তো ফিল্মে কাজ করব না। তা হলে শুধু শুধু গিয়ে কী করব? আমি তো সাহিত্যিক হব।’ বকুনিটা খেলাম বিখ্যাত গীতিকার শৈলেন্দ্রর কাছে, ‘কী মনে করিস? যারা সিনেমায় কাজ করে তারা সবাই অশিক্ষিত?

বিমল রায়ের সঙ্গে কাজ করবে বলে ঝালানি (বিমল রায়ের অন্যতম সহকারী) পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে বাংলা নিয়ে পড়েছে, বাংলা শিখেছে আর তুই কোনও পরিশ্রম ছাড়া একটা সুযোগ পাচ্ছিস, সেটা নিচ্ছিস না?’ আমি গেলাম একটা গান লেখার কাজে, যে গানটা লেখার কথা ছিল শৈলেন্দ্রর। এস ডি বর্মনের সঙ্গে একটু মন কষাকষি হওয়ায় সেটা হচ্ছে না। আর তাই আমি।

বিমল রায় [ Bimal Roy ]
বিমল রায় [ Bimal Roy ]
গেলাম। বিমল রায়ের আলোর বলয়ে ঢুকতেই যে চোখ ধাঁধানোর কথা ছিল, সেটা তো হলই না, বরং এক জন নেহাতই সরল স্বাভাবিক লোককে দেখে মন ঠিক কেমনভাবে রিঅ্যাক্ট করবে বুঝে উঠতে পারল না। দেবু বলল, ‘বিমলদা, আমার বন্ধু গুলজার।

বিমলদা বললেন, ‘হুঁ’। এই হচ্ছে বিমলদার সেই বিখ্যাত ‘ই’। যে ‘ই’ কিনা রাগ, ভাল লাগা, বিরক্তি, কষ্ট, চিন্তা এ রকম যে কোনও অনুভূতির ক্ষেত্রে প্রয়োগ হতে পারে। এই হুঁ বুঝে আমরা সারাক্ষণ আমাদের কাজ বা যে কোনও কিছুর গতিপ্রকৃতি ঠিক করতাম। সে বড় কঠিন কাজ ছিল। তবে বিমলদাকে যারা কাছ থেকে চিনেছে, তাদের হুঁ বুঝতে খুব সময় ভুলিনি।

এখন ভাবলে দেখতে বিমলদা প্রায়শই লজ্জা পেতেন। বিমলদা বললেন, ‘তুমি বাংলা করে জানলে?’ বললাম, ‘আমি বন্ধুদের থেকে শিখেছি, পড়েছি।’ বিমলদা জিজ্ঞেস করলেন, ‘পড়তে পারো?’ বললাম, ‘পারি, একটু একটু লিখতেও পারি।’ ‘কাবুলিওয়ালা পড়েছ?’ বললাম, ‘পড়েছি। প্রথমে উর্দুর্তে, তার পর ইংরেজিতে, তার বাংলায়। ঠিক আমি গানটা লিখব।

গানটা নিয়ে শচীনদা বিমলদা দিন বসলেন। বিমলদা বলছেন, মেয়েটি কখনও বাইরে বেরোয় না। তার বাবার কাছে লোকজন আসে, সেখানে বৈষ্ণব কবিতা হয়। উত্তেজিত, ‘বলো কী? মেয়েটা ঘরের বাইরে না বেরোলে করে হবে? তো সুর করিনি। না তুমি ওকে বলো ঘরের বাইরে বেরোতে।’ আমরা অবাক। শচীনদা চরিত্রকেই উদ্দেশ করে বলছেন, ‘ওকে বেরোতে বল, আর কিছুতেই করবেন শচীনদা বলছেন, ‘বলছি না, ওকে পাঠিয়ে দাও।”

বিমলদা বললেন, ‘বলো আমি ক্যারেক্টারকে বলব, যে তুমি বাইরে যাও?’ বার একটু রেগেই বললেন, ‘এ রকম সিচুয়েশন হলে তুমি সব সময় সলিলকে মিউজিক করতে বলো।’ বিমলদা তখন কষ্ট হাসি চাপার চেষ্টা করছেন। সিনেমার আর এক রাইটার সে তখন ‘বিমলদা, করে রোম্যান্টিক গান গাইবে?’ শচীনদা হাতে তালি মেরে বললেন, ‘অ্যাই মানে উনি সাজেশন-এর দিকে লোক পেয়ে গেছেন, পাল্লা ভারী হয়ে গেছে। দু’জন বয়স্ক মানুষ খুঁতখুঁত প্রায় ঝগড়া করছেন একটা গানের সিকোয়েন্স নিয়ে, আমরা জুনিয়ররা শুনছি। খুঁতখুঁতটাই শেখার মতো। গানটা তৈরি হল বন্দিনী সিনেমায়, নূতনজির লিপে, ‘মোরা গোরা অঙ্গ লে’।

বিমলদার ধারণা উনি সং-সিকোয়েন্স নাকি ভাল তুলতে পারেন আর একটা সং-সিকোয়েন্স-এ এত মাঝখানে যদি কোনও বদল বা নতুন কোনও বাজনা জুড়ত, তখনই বিমলদা বলতেন, ‘শট বদলাও, কী করে একই শটের মধ্যে লয় বদল বা ইনস্ট্রুমেন্ট বদল হতে পারে? বিমলদার সিনেমায় প্রথম সাউন্ডস্কেপ শুরু হয়। গানের মধ্যে কোথায় ঘণ্টা বেজে উঠল বা কুকুর ডেকে উঠল, সেটাও কিন্তু বিমলদার সাউন্ডস্কেপে ধরা থাকত। একটা লোক সারাক্ষণ সিনেমার সঙ্গে ঘর করত। যাকে বলে নাওয়া-খাওয়া শোয়া সবই সিনেমার সঙ্গে।

বিমল রায় [ Bimal Roy ]
বিমল রায় [ Bimal Roy ]
এক বার হয়েছে কী, আমরা দু-শিফটে কাজ করছি বেশ কয়েক দিন। রাত দশটা নাগাদ কাজ শেষ হয়েছে। আমরা বাড়ি যাওয়ার তোড়জোড় করছি। এমন সময় বিমলদা ডাকলেন মধুকরকে, এডিট করত মধুকর। বললেন, ‘আচ্ছা, তুমি গিয়ে এ বার ট্র্যাক বানাও।’ মধুকর তো খুব রেগে গেল। ওঁর সামনে তো কিছু বলার সাহস নেই, কিন্তু গজ গজ করতে লাগল, ‘এই লোকটার না নিজের কোনও জীবন আছে, না আমাদের কোনও জীবন রাখতে দেবে। বউকে আগেই বলে দিতাম, বাপু বিয়ে কোরো না, আমি বিমল রায়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট।” এ তো গেল মধুকরের কথা।

তার পরেই বিমলদা আমায় ডেকে বললেন, ‘গোলজার’, হ্যাঁ ঠিক এই নামটায়, এ রকম বাঙালি মেশানো ভঙ্গিতেই আমায় ডাকতেন বিমলদা। বললেন, ‘তুমি মধুকরের সঙ্গে থাকো, ওকে সাহায্য করো।’ অগত্যা, বেজার মুখে আমরা কাজ করতে লাগলাম।

রাত দু’টো নাগাদ হঠাৎ একটা টেলিফোন এডিটিং রুমে। ও প্রান্তে উত্তেজিত বিমলদা, ‘শোনো, এই ট্র্যাকে যেখানে টিকটিকির সাউন্ডটা আছে, ওখানটায় হোয়াইট পিস দিয়ে ছেড়ে দাও। আমি এখুনি টিকটিকির আওয়াজ রেকর্ড করেছি। দারুণ হয়েছে। কাল সকালে ওটা আমরা ডেভেলপ করে বসিয়ে দেব।’ তার মানে, আমরাই কেবল দু’শিফট কাজ করার পরেও কাজ করছি না, বিমলদাও করছে। আসলে, বিমলদা জীবনযাপন করতেন না, সিনেমাযাপন করতেন।

আমার বাবা যখন মারা গেলেন তখন আমি সিনেমার কাজে ব্যস্ত যথারীতি। এমনকী ঠিক সময়ে খবরও পাইনি। আমার বড়দা থাকতেন বম্বেতেই। তিনি খবর পেয়েছিলেন কিন্তু আমায় সেটা জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি। বাড়ির উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলের কাছে বাবার মৃত্যু কি ইম্পর্ট্যান্ট হতে পারে? অন্তত আমার পরিবার তা-ই ভেবেছিল।

দিন চারেক পর একটা পোস্টকার্ড পেলাম, দিল্লির এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে। ওঁর মনে খটকা লেগেছিল বাবার শেষকৃত্যে আমি না যাওয়ায়। ছেলেকে বলেছিলেন, ‘ও তো তেমন ছেলে নয় যে খবর পেলেও আসবে না। ওকে একটা চিঠি লেখো তো।’ চিঠিটা যখন পেলাম তখন রাগে, অভিমানে কান্নায় আমার ভেতরে একটা তোলপাড় চলতে লাগল। চিটেড ফিল করলাম। বিমলদার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।

তখুনি বিমলদা ম্যানেজারকে বললেন আমার টিকিট ও যাওয়ার ব্যবস্থা করতে। আমি দিল্লি গেলাম। বাবা ছাড়া আর সবার সঙ্গেই দেখা করলাম, শোক ভাগ করে নিলাম। কিন্তু দাদার প্রতি সেই অভিমান আমার গেল না। বম্বে ফিরে এলাম। মনের সেই তোলপাড় আস্তে আস্তে একটা বড় বুদ্বুদ হয়ে বুকের কোথাও আটকে থাকল। আমি ফের কাজে মেতে উঠলাম।

বিমল রায় [ Bimal Roy ]
বিমল রায় [ Bimal Roy ]
হাসলাম, বকুনি খেলাম, ঠাট্টা-ইয়ার্কি করলাম। আর বেশ মনে হচ্ছিল বিমলদার ছায়াটা আমার ওপর ক্রমশই বড় হচ্ছে। বেশ আরাম হত। যদিও বিমলদার ব্যবহারে সে কথা বুঝতে পারতাম না। কেবল একটা অদৃশ্য টান ছিল কোথাও। একটু পার্শিয়ালিটিও ছিল বোধ হয়। তার একটা কারণ যদি হয় আমার সাহিত্যিক হওয়ার বাসনা, তা হলে অন্যটা হল আমার বাংলা সাহিত্যের প্রতি ভাল-লাগা।

ইতিমধ্যে আমার বোনের বিয়ে ঠিক হল। আমি গিয়ে বললাম, ‘বিমলদা, আমার বোনের বিয়ে, আমার ক’দিন ছুটি চাই।’ বিমলদা, হুঁ, তুমি বরং এডিটিং-এ অ্যাসিস্ট করো।’ আমি মুখ নিচু করে চলে এলাম। দিন দুই পর আবার গেলাম। ‘বিমলদা, ছুটি… বোনের বিয়ে। বিমলদা, ই, সাউন্ড এফেক্টগুলো লিস্ট করো তো গিয়ে।’ পাংশু মুখে ফিরে এলাম আমি।

একদিন দেখি, ঝালানি, মানে বিমলদার চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট গিয়ে বিমলদাকে বলছে, ‘আমার বিয়ে। ছুটি চাই।’ বিমলদা, ‘ই’ (স্মিত মুখে)। পরের দিন ঝালানি বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে চলল। আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, “কিন্তু বিমলদা তো এখনও হ্যাঁ বলেনি।’ ঝালানি বলল, ‘ভাই, আমার বিয়ে। আর তোর বোনের বিয়ে। আমি না গেলে আমার বিয়ে হবে না রে। বিমলদা হুঁ হুঁ করতেই থাকবে, আর সময় পেরিয়ে যাবে। আমি তো চললাম।’

আমি ব্যাজার মুখে কাজ করেই চললাম। বোনের বিয়ের এক দিন আগে বিমলদা আমায় ডাকলেন, আর ম্যানেজারবাবুকে বললেন, ওর জন্য একটা প্লেনের টিকিট কেটে দিন তো দিল্লির। আর শোনো গোলজার, তুমি বিয়ের দু’দিন বাদেই ফিরে আসবে। এখানে অনেক কাজ।’ আমি বিস্মিত, মুগ্ধ, আপ্লুত। বিমলদা আমায় এত ভালবাসেন? প্লেনের টিকিট। আর সেটা ষাটের দশক! ফিরে এসে কাজে ঢুকে গেলাম।

আমার আর বিমলদার অন্যান্য কাজের সঙ্গে একটা কনটিনিউয়াস কাজ চলছিল—’অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’র স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ। বইটি পড়িয়েছিলেন বার বার। যাতে একটা পাকাপোক্ত স্ক্রিপ্ট হয়। তর্কবিতর্ক চলত, লেখালিখিও। বিমলদা বইটার মার্জিনে এত নোট লিখেছিলেন যে সেটা থেকে আরও বই লেখা যায়। তার সঙ্গে খুচরো কাগজের নোট। আমি বলতাম, বইটা আরও একটা নিয়ে সন্তানসম্ভবা। এক দিন স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনার সময় দেখলাম বইয়ের একটা জিনিস কিছুতেই পছন্দ হচ্ছে না।

বলরাম নামের একটি চরিত্র মেলা শুরুর প্রথম দিনই মারা যায়। বিমলদা বললেন, ‘কী করে হবে গোলজার? আরও আট দিন পর যোগ স্নান। প্রথম দিনেই যদি এই ক্যারেক্টার মারা যায় তা হলে চিত্রনাট্য টানটান হবে না। আমি অনেক কিছু বললাম, কিন্তু বিমলদার মনঃপুত হল না।

সেই সময় আমরা আশাপূর্ণা দেবীর একটা উপন্যাস থেকে ‘সাহারা’ সিনেমার শুটিং শুরু করেছিলাম। কথা ছিল এটা শেষ হলে ১৯৬৬ সালের পূর্ণকুত্তের সময় অমৃতকুত্তের সন্ধানের শুটিং হবে। এক দিন সাহারা-র সেট রেডি হচ্ছে, বিমলদা সব বলে দিয়ে নীচে নেমে এলেন। কমলদা শট রেডি করে আমায় বললেন, ‘যাও, বিমলদাকে ডেকে নিয়ে এসো। আমি নীচে এসে বললাম, ‘দাদা, রেডি।’ কিছু ক্ষণ মাথা নামিয়ে চুপ করে থাকলেন, তার পর বললেন, ‘কমলকে বলো, নিয়ে নিতে।’

মাথা ঝনঝনিয়ে উঠল। মানে? যে লোকটা অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকার সময়ও একটা শট মিস করেননি, সে আজ অন্যকে বলছে শট নিতে? রোবটের মতো এসে কমলদাকে বললাম, ‘দাদা শট নিয়ে নিতে বলেছেন।’ কমলদা বিশ্বাস করলেন না। বিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না। নীচে গিয়ে কমলদা বললেন, শট রেডি। ‘তুমি নিয়ে নাও কমল।’ আমরা চুপ।

বিমল রায় [ Bimal Roy ]
বিমল রায় [ Bimal Roy ]
কোথা থেকে একটা অদৃশ্য ঠান্ডা তরোয়াল আমার ঠিক মাথায় ঝুলে পড়ল, হঠাৎ। কমলদা শট নিতে শুরু করলেন। শর্মিলাজি ছিলেন সেই শটে। শট শুরু হওয়ার এক সেকেন্ডের মধ্যে পেছন থেকে শুনতে পেলাম, রিঙ্কু, প্রথমে ব্যাকে এসে তার পর আলোটা নাও তোমার মুখে।’ বিমলদার গলা। যাক্।

কিন্তু সেই দিন বিমলদা শেষ সেট থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর ফিরলেন না। তারপর কয়েকদিন জ্বর। শরীর খারাপ। এবং অমোঘ ছুরি আমাদের বুকে। ক্যানসার। সুধীশদা, মানে সুধীশ ঘটক, ঋত্বিক ঘটকের দাদা, ছিলেন ওঁর ছায়াসঙ্গী। জিজ্ঞেস করলাম, বিমলদা জানেন? এখনও না।

বিমলদার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস দুটো ছিনিয়ে নেওয়া হল। চা আর সিগারেট। বিমলদা লন্ডন গেলেন চিকিৎসার জন্য। হতাশ হয়ে ফিরে এলেন। তবু অমৃতকুম্ভের সন্ধানের চিত্রনাট্য নিয়ে খুঁতখুঁত গেল না। আমরা ওঁর বাড়ি গিয়ে কাজ করা শুরু করলাম। বলরামের মৃত্যু অনেক টানাহেঁচড়া করে মেলার পঞ্চম দিনে নিয়ে যাওয়া হল। আমি তর্ক করতাম তখনও। কিন্তু তর্ক করার জন্য এক রাশ ব্যথা আমার বুকে হাতুড়ি মারত। আর কিছুদিন পর বিমলদাকে দেখতেও পাব না? কাজ থামেনি তবুও।

এক দিন ডেকে বললেন, ‘শোনো এলাহাবাদে গিয়ে কিছু শট তুলে নিয়ে এসো। আমি যেতে পারব না তো।’ আদেশ পালন করলাম। আমি আর কমলদা। কিন্তু সাত-আট দিন শুটিং-এ দু’জনে প্রায় কোনও কথা বললাম না। কেন? কী বলতাম? কী বলতাম না? সবটাই আমিও জানতাম, কমলদা-ও।

ফিরে এলাম। এবং বিমলদার কাছে গিয়ে সে দিনই যা কাজ করার করে এলাম। আমি আর ফেরত যেতে পারলাম না। বিমলদা কুঁকড়ে গেছেন, ছোট্ট হয়ে গেছেন। যেন সোফার মধ্যে একটা কুশন। আমি বীরপুরুষ নই, আমি পারব না বিমলদাকে এ রকম দেখতে। বেশ ক’দিন পর এক দিন হঠাৎ ফোন। উত্তেজিত গলা, ঠিক বিমলদার মতো। ‘গোলজার, এসো। অমৃতকুম্ভ নিয়ে আলোচনা আছে।

আমি তখন জেনে গিয়েছি, এই সিনেমা হবে না। বিমলদা থাকবেন না। তবু, গুরু আমার। আমি গেলাম। উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘বুঝলে, যোগস্নান-এর দিন বলরাম মারা যাবে। প্রথম মৃত্যু। এখান থেকে স্ট্যাম্পিড-এর দৃশ্যটা শুরু হবে। সব শুনলাম আর মাথার ওপর তরোয়ালের ঠান্ডা অনুভূতি নিয়ে ফিরে এলাম।

৮ জানুয়ারি ১৯৬৬। বিমলদা চলে গেলেন। খবর পেলাম। প্রথমেই মনে হল, যাক, তরোয়ালটা খসে গেল আমার মাথার ওপর থেকে। সেন্স ফিরে এল অসহা কষ্ট আর বুকে দামামা বাজার অনুভূতিতে। ছুটলাম বিমলদার বাড়ি। তার পর শ্মশান। শ্মশানে আমার বুকের মধ্যে ওঠানামা করা, কিছুটা ঘুমন্ত কিন্তু অ্যাকটিভ সেই বুদ্বুদটা ফাটল। জোরে। আমি কাঁদলাম, খুব কাঁদলাম, আরও কাঁদলাম। আমার বাবার জন্য তুলে রাখা কষ্টটা পূর্ণ করে দিয়ে গেলেন বিমলদা। সে দিন ছিল পূর্ণকুম্ভের যোগস্নানের দিন।

বিমল রায় [ Bimal Roy ]
বিমল রায় [ Bimal Roy ]

বিমল রায় এর জন্ম:

বিমল রায় ১৯০৯ সালের ১২ জুলাই তারিখে ঢাকার সুয়াপুরে একটি বাঙালি বৈদ্য জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যেটি তখন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের অংশ ছিল এবং বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ।

Bimal Roy 2007 Film Director Filmmaker 2 বিমল রায়
বিমল রায় [ Bimal Roy ]

বিমল রায় এর কর্মজীবন :

বাবা অকালে মারা যাওয়ায় বিমল রায় কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় এসে নিউ থিয়েটার্স প্রাইভেট লিমিটেডের ক্যামেরা সহকারী হিসেবে সিনেমার ক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। এই সময়ে তিনি পরিচালক পি.সি. বড়ুয়া পাবলিসিটি ফটোগ্রাফার হিসাবে কাজ করেন। তার সেইসব কাজের মধ্যে রয়েছে কে.এল সায়গাল অভিনীত হিট ছবি দেবদাস (১৯৩৫)। ১৯৪০ এবং ১৯৫০ এর দশকে রায় যুদ্ধোত্তর ভারতে সমান্তরাল সিনেমা আন্দোলনের অংশ ছিলেন। তিনি নিউ থিয়েটারের শেষ প্রধান চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে অঞ্জনগডড়ে (১৯৪৮) এ কাজ করেন।

এসময় কলকাতা-ভিত্তিক চলচ্চিত্র শিল্প ভাটির দিকে নামছিলো। সার্বিক চিন্তা করে বিমল রায় তার দল সহ বোম্বেতে (বর্তমানে মুম্বাই) স্থানান্তরিত হন। তার দলে ছিলেন হৃষিকেশ মুখার্জি (সম্পাদক), নবেন্দু ঘোষ (চিত্রনাট্যকার), অসিত সেন (সহকারী পরিচালক), কমল বোস (সিনেমাটোগ্রাফার) এবং পরে, সলিল চৌধুরী (সঙ্গীত পরিচালক)। ১৯৫২ সালের মধ্যে তিনি তার কর্মজীবনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু করেন। তিনি বোম্বে টকিজের জন্য মা নির্মান করেন ১৯৫২ সালে। তিনি তার রোমান্টিক-বাস্তববাদী মেলোড্রামাগুলির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। আজও বলতে গেলে সেসব প্লট বিনোদনের জন্য জনপ্রিয় রয়েছে। তিনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন যিনি মানুষের শক্তি এবং দুর্বলতা সম্পর্কে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। ১৯৫৯ সালে তিনি 1ম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জুরির সদস্য ছিলেন।

বিমল রায় এর প্রয়াণ :

তিনি ৫৬ বছর বয়সে ৭ জানুয়ারী ১৯৬৬ সালে ক্যান্সারে মারা যান। তার ৪ সন্তান – কন্যা রিঙ্কি ভট্টাচার্য, যশোধরা রায় এবং অপরাজিতা সিনহা এবং তার একমাত্র পুত্র জয় রায়। তার বড় মেয়ে রিঙ্কি ভট্টাচার্য তাদের উভয় পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিচালক বাসু ভট্টাচার্যকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়েটি কয়েক বছরের মধ্যে ভেঙ্গে যায়, কিন্তু তার ফলে একটি ছেলের জন্ম হয়, সেই ছেলেটি অভিনেতা এবং চিত্রনাট্য লেখক আদিত্য ভট্টাচার্য। রিঙ্কি ভট্টাচার্য এখন বিমল রায় মেমোরিয়াল কমিটির প্রধান।

বিমল রায় [ Bimal Roy ]

বিমল রায় এর প্রতি পুরস্কার :

বিমল রায় প্রচুর পুরস্কার পেয়েছেন।

ফিল্মফেয়ার পুরস্কার :
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার – দো বিঘা জমিন (১৯৫৩)
শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার – দো বিঘা জমিন (১৯৫৩)
শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার – পরিণীতা (১৯৫৪)
শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার – বিরাজ বাহু (১৯৫৫)
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার – মধুমতি (১৯৫৮)
শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার – মধুমতি (১৯৫৮)
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার – সুজাতা (১৯৫৯)
শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার – সুজাতা (১৯৫৯)
শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার – পরখ (১৯৬০)
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার – বন্দিনী (১৯৬৩)
শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার – বন্দিনী (১৯৬৩)

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার :
সেরা ফিচার ফিল্মের জন্য অল ইন্ডিয়া সার্টিফিকেট অফ মেরিট – দো বিঘা জমিন (১৯৫৩)
সেরা ফিচার ফিল্মের জন্য অল ইন্ডিয়া সার্টিফিকেট অফ মেরিট – বিরাজ বাহু (১৯৫৪)
হিন্দিতে সেরা ফিচার ফিল্মের জন্য মেরিট সার্টিফিকেট – দেবদাস (১৯৫৫)
হিন্দিতে শ্রেষ্ঠ ফিচার ফিল্মের জন্য রাষ্ট্রপতির রৌপ্য পদক – মধুমতি (১৯৫৮)
তৃতীয় সেরা ফিচার ফিল্মের জন্য অল ইন্ডিয়া সার্টিফিকেট অফ মেরিট – সুজাতা (১৯৫৯)
হিন্দিতে সেরা ফিচার ফিল্ম – বন্দিনী (১৯৬৩)

কান চলচ্চিত্র উৎসব:
আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছেন:
দো বিঘা জমিন (১৯৫৩) এর জন্য।

উৎসবের গ্র্যান্ড প্রাইজের জন্য মনোনীত:

দো বিঘা জমিন (১৯৫৩)

পালমে ডি’অরের জন্য মনোনীত:

বিরাজ বাহু (১৯৫৫)
সুজাতার(১৯৬০)

 

আরও পড়ুন:

সিনেমা, নাটক, থিয়েটার সহ অভিনয়ের বই এর তালিকা

“বিমল রায়”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন