রূপমঞ্চ পত্রিকা, নাট্যপত্র – আশিস গোস্বামী

রূপমঞ্চ পত্রিকা, নাট্যপত্র [ আশিস গোস্বামী ] : কালীশ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘রূপমঞ্চ’ পত্রিকায় মূলত সিনেমা ও পেশাদার মঞ্চের নাট্য সমালোচনাই প্রকাশিত হত। দীর্ঘদিন ধরে এই দুই শিল্প মাধ্যমের পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে এই পত্রিকাটি যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। যথার্থ ভাবে রূপমঞ্চকে নাট্যপত্র বলা যাবে না, বরং সিনেমা ও থিয়েটার বিষয়ক সাময়িক পত্র বলাই সংগত।

সিনেমা ও পেশাদার মঞ্চের নানা খবরাখবর, ছবি এ সম্পর্কিত ধারাবাহিক রচনা ইত্যাদি প্রকাশিত হত। তবে কম বেশি নবনাট্য আন্দোলন সম্পর্কেও খবরাখবরও নাট্য সমালোচনায় প্রকাশিত হত। বিশেষ করে লিটল থিয়েটার গ্রুপের প্রতি রূপমঞ্চের যথেষ্ট পক্ষপাত ছিল। তা ছাড়া ‘রূপমঞ্চ’ কখনোই সার্বিক ভাবে নতুন থিয়েটার আন্দোলনকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে চায়নি। সেখানেই বড়ো বড়ো নাট্যদলের সমালোচনা ও সংবাদই প্রাধান্য পেত। বাজারে জনপ্রিয়তা বজায় রাখবার দিকে যতটা দৃষ্টি ছিল, অন্যদিকে ততটা ছিল না—এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

রূপমঞ্চ পত্রিকা, নাট্যপত্র - আশিস গোস্বামী [ Ashish Goswami ]
আশিস গোস্বামী [ Ashish Goswami ]
পেশাদার মঞ্চের নাট্য প্রযোজনার প্রতি এক ধরনের উদার প্রশংসাই চোখে পড়ে। অনেকটা জায়গা জুড়ে বিভিন্ন সমালোচনায় উচ্চস্তরের সমালোচনার ছোঁয়া না থাকুক, প্রশংসার ঢেউ আছে। যেমন বিশ্বরূপার ‘আরোগ্য নিকেতন’ নাট্য সমালোচনার শিরোনামে লেখা হল—

“বাংলার নব নাট্য-দেউল ‘বিশ্বরূপা’র নব নাট্য নিবেদন ‘আরোগ্য নিকেতন’ বা ‘আধুনিক সমাজের গড্ডালিকা প্রবাহে পারিবারিক জীবনের সুখ ও শান্তি লাভের ইঙ্গিতবাহী নাট্য নিবেদন ‘শ্রেয়সী’, স্টার রঙ্গমঞ্চ বাংলার ঐতিহ্যময়ী নারীত্বের মহিমায় শ্রীমণ্ডিত—

চার লাইনের শিরোনাম থেকেই বোঝা যায় পত্রিকার দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল! আমাদের আলোচ্য সময়সীমার মধ্যে উল্লেখিত প্রযোজনাটি ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছিল—ক্ষুধা, এক মুঠো আকাশ, ডাক বাংলো, দাবী, চক্র, সেতু, শেষাগ্নি, একক দশক শতক, রাধা, বেগম মেরী বিশ্বাস, হাসি প্রভৃতি পেশাদার মঞ্চ প্রযোজনার সমালোচনা। সমালোচনার নামে পাতার পর পাতা জুড়ে নাট্য কাহিনির সংক্ষিপ্তসার এবং চরিত্র, মঞ্চ, আলো, পোষাকের প্রশংসা। নীচে দু-একটি উদারহণ দেওয়া হল :

১৩৬৮-র আষাঢ়ে প্রকাশিত চক্র : “ ‘চক্র’ নাটকে যে উচ্চতর, বৃহত্তর আদর্শ নিয়ে সামাজিক সমস্যার ভিত্তি গড়ে উঠতে পারতো, কাহিনীকার সে পথ পরিহার করে রহস্য কাহিনীর মত ষড়যন্ত্র, রোমাঞ্চ নিয়ে নাটক গড়ে তুলেছেন।…তবে এই সকল ঘটনা ও চরিত্রের ভিড়ে মূল নাট্যকাহিনী পথ হারিয়ে যায়নি। খণ্ড খণ্ড ঘটনাগুলিতে দর্শক মন প্রথম থেকেই যে রহস্যের সন্ধান পায়—তার শেষ পরিণতি দেখার কৌতূহল উত্তরোত্তর ক্রমবর্ধমান হতে থাকে। এই কৃতিত্ব যেমন নাট্যকারের তেমনি নাট্য পরিচালকের অবশ্য প্রাপ্য।”

১৩৭৩-এর আষাঢ় মাসে প্রকাশিত দাবী ‘দাবী’ নাটকে নাট্যকার সমসাময়িক কালের একটি সামাজিক সমস্যাকেই শুধু তুলে ধরেননি—তার সুষ্ঠু সমাধানও করেছেন। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত ঘটিয়ে শুভ আর অশুভকে এমনভাবে পাশাপাশি তুলে ধরেছেন—যা দেখে নাট্যমোদীরা সহজেই নির্দেশ পাবেন—কোনটিকে গ্রহণ করা উচিত আর উচিত নয়। প্রগতির নামে যে অশান্তির শিখা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাকে ঘিরে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে দেখা যাচ্ছে—সেই অশান্তি থেকে কীভাবে আত্মরক্ষা করা যেতে পারে, সে বিষয়েও নাট্যকার নির্দেশ দিয়েছেন। ‘দাবী’ এদিক থেকে কেবলমাত্র হৃদয়গ্রাহী নাটক হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেনি—দাবী সমাজ সচেতনতার দাবী নিয়েও আত্মপ্রকাশ করেছে।…’

১৩৭৩-এর মাঘ মাস সংখ্যায় বেগম মেরী বিশ্বাস : “ইতিহাসের চির পরিচিত অধ্যায় ও চরিত্রগুলির সঙ্গে উপন্যাসের পরিবেশ ও চরিত্রগুলি মিশে ‘বেগম মেরী বিশ্বাস’কে এক স্বপ্ন মধুর ব্যথাতুর কাব্য নাট্যরূপে আমাদের মুগ্ধ করেছে। বিরাট উপন্যাসখানিকে নাট্যকার রাসবিহারী সরকার এমন সুনিপুণ ভাবে নাট্যরূপ দিয়েছেন যে তাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। অতিরিক্ত কোনো কিছুর ভিড় করে নাটককে ক্লান্তিকর করে তোলেনি।”…

এর পাশাপাশি কেবলমাত্র লিটল থিয়েটার গ্রুপের প্রযোজনাগুলির সমালোচনা উল্লেখ করা যায়। আগেই বলা হয়েছে অন্য দলগুলি অত্যন্ত গৌণ তাদের কাছে। বহুরূপীর দু একটি সমালোচনা ও সংবাদ পাওয়া গেলেও লিট্ল থিয়েটারের তুলনায় তা যথেষ্ট গৌণ। তাই লিট্ল থিয়েটারে তিনটি প্রযোজনার কিছু অংশ তুলে ধরা হল।

১৩৬৭-র ভাদ্র সংখ্যায় প্রকাশিত অঙ্গার : “ ‘অঙ্গার’ কেবল অভিনব নাট্য সৃষ্টিই নয়, অভূতপূর্বও বটে। বাংলাদেশে ওই বিষয়বস্তু নিয়ে আগে কখনো কোন নাটক রচিত এবং অভিনীত হয়েছে বলে আমার জানা নেই।… উৎপল দত্ত এর চেয়েও বড় শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। তা বঞ্চিত, শোষিত, আশা ও নিরাশায় সতত আন্দোলিত, কখনো কলহরত, কখনো পরস্পরের প্রতি আন্তরিক প্রীতি ভাবাপন্ন, কখনো স্বার্থে লুব্ধ, কখনো পরার্থের উদারতায় উদ্বুদ্ধ, কখনো স্বপ্নাবিষ্ট, কখনো বাস্তবতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত মন্দ ভাগ্য ওই মানব মুখের অন্তরের নানা সংঘাতের সহায়তায় নাটকে একটি স্পিরিচুয়াল শক্তি সৃষ্টি করেছেন, যা নাটককে এমনিই একটা

স্তরে তুলে ধরেছে যেখানে বিসর্জনই হল প্রতিষ্ঠা, মরণই দেয় নব জীবন।… ১৩৬৮-র আষাঢ় সংখ্যা প্রকাশিত ফেরারী ফৌজ: “স্বাধীনতা আন্দোলনের বিস্মৃতপ্রায় এক গৌরবময় অধ্যায়কে ফেরারী ফৌজের মধ্য দিয়ে লিটল থিয়েটার গ্রুপ অপূর্ব নিষ্ঠার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। পরিবেশ ও চরিত্রকে যতখানি বাস্তবানুগ করা সম্ভব তাতে বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সদস্যরা এবং প্রতিজন শিল্পীই অপূর্ব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।…লিটল থিয়েটার গ্রুপ ফেরারী ফৌজের মধ্য দিয়ে নতুন করে আমাদের শ্রদ্ধার্জন করলেন, তাই সমগ্র ইউনিটকেই আর একবার অভিনন্দন জানাচ্ছি।”

১৩৭০-এর জৈষ্ঠ্য সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তিতাস একটি নদীর নাম “…আগাগোড়া নাটকটির ভেতর প্রথম যে জিনিসটা মনে দাগ কাটে—সেটা হচ্ছে অশিক্ষিত গ্রাম্য মানুষ—চতুর সুবিধাবাদীদের হাতে ক্রীড়নক মাত্র। দ্বিতীয়ত অলিখিত মানুষ শুধু সরল হয় না—দেবদেবীর পূজাকে কেন্দ্র করে কুসংস্কারকে যেমন তারা জীবনের একটি অপরিহার্য অঙ্গ রূপে দেখে—তেমনি বীভৎস নির্মম হতেও তাদের এতটুকু ক্লেশ বোধ হয় না।

নাটকটির আগাগোড়া এই নিষ্ঠুরতার বীভৎস লীলা মনকে পীড়িত করে অথচ সাসপেন্স বা রহস্যের আবরণে একমাত্র কিশোরের বউয়ের কাহিনীটুকু মনকে নাড়া দেয়। অন্যত্র কঠিন বাস্তবের ঘাত-প্রতিঘাত থাকা সত্ত্বেও মন বিচলিত হয় না। সাধারণ গ্রাম্য জীবনের খুঁটিনাটি রস পরিবেশনে নাটকটি যতখানি সমৃদ্ধ, নাটকীয়

অভিব্যক্তিতেও ততখানি সমৃদ্ধ।…” লক্ষণীয়, সমস্ত সমালোচনাগুলিই বিষয়কেন্দ্রিক এবং সেটাই ছিল সমালোচকদের অভীপ্সিত পথ। তাই থিয়েটারের উন্নয়নে যতটুকু কাজে লেগেছে তার চেয়ে বেশি কাজে লেগেছে ‘রূপমঞ্চ’র জনপ্রিয়তা অর্জনের কাজে।

[ রূপমঞ্চ পত্রিকা, নাট্যপত্র – আশিস গোস্বামী ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন