হীরালাল সেন

হীরালাল সেন [ Hiralal Sen ] ছিলেন একজন বাঙালি চিত্রগ্রাহক, যাঁকে সাধারণত ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন বলে গণ্য করা হয়। এছাড়া, তাকে ভারতের সর্বপ্রথম বিজ্ঞাপনবিষয়ক চলচ্চিত্রের নির্মাতা বলেও গণ্য করা হয়। সম্ভবতঃ ভারতের প্রথম রাজনীতিক ছবিও তিনিই বানিয়েছিলেন। ১৯১৭ সালে এক অগ্নিকাণ্ডে তার তৈরি সকল চলচ্চিত্র নষ্ট হয়ে যায়।

Hiralal Sen, হিরালাল সেন
Hiralal Sen, হিরালাল সেন

হীরালাল সেনের আদি বাড়ি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে আনুমানিক ৮০ কিলোমিটার দূরে, মানিকগঞ্জের বাগজুরী গ্রামে। যদিও তিনি ঐ অঞ্চলের একজন বৈদ্য জমিদার পরিবারের একজন সফল আইনজীবীর সন্তান, তবুও তিনি বড় হয়েছেন কলকাতায়। যতদুর জানা যায় লেখাপড়ার সুবিধার্থেই তাকে সেখানে রাখা হয়েছিলো। ১৮৯৮ সালে, প্যারিস যাওয়ার পথে একটি চলচ্চিত্র দল কলকাতার স্টার থিয়েটারে স্টেজ শো করে।

তারা সেখানে দ্য ফ্লাওয়ার অফ পার্সিয়া সহ একটি নির্দিষ্ট অধ্যাপক স্টিভেনসনের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে। স্টিভেনসনের ক্যামেরা ধার করে হীরালাল সেন “অপেরা দ্য ফ্লাওয়ার অফ পারস্য” অবলম্বনে তার প্রথম চলচ্চিত্র “এ ড্যান্সিং সিন” তৈরি করেন। এরপর তার ভাই মতিলাল সেনের সহায়তায় তিনি লন্ডনে চার্লস আরবানের ওয়ারউইক ট্রেডিং কোম্পানি থেকে একটি আরবান বায়োস্কোপ কিনেছিলেন। পরের বছর, তার ভাইয়ের সাথে, তিনি রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি গঠন করেন।

হীরালাল সেন সম্পর্কে নির্মাতা শৈবাল চৌধুরী

হীরালাল সেন সম্পর্কে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা শৈবাল চৌধুরী তার আজাদীর নিয়মিত কলামগুলোর সংকলন হিসেবে প্রকাশিত স্ক্রীন বইটিতে “হীরালাল সেন: উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের জনক” শিরনামে ২৯ নভেম্বর ১৯৯৮ তারিখে লিখেছেন:

গত বছর অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে হীরালাল সেনের মৃত্যু বার্ষিকীতে তাঁর গ্রামের বাড়ীতে আয়োজিত হয়েছিল একটি স্মরণানুষ্ঠান। সে অনুষ্ঠানে সরকারি প্রতিনিধি আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে এসে বলেছিলেন তাঁর স্মৃতিতে এটা-সেটা অনেক কিছু করার কথা। আমরা ভেবেছিলাম এটা যেহেতু গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকারি প্রতিনিধির বক্তব্য সেহেতু এটা নিছক কোনো সরকারি আশ্বাস বা ছেলেভোলানো কথা নয়। কিন্তু আমরা যথা পূর্বম তথা পরম’ প্রবাদটি ভুলতে বসেছিলাম। অথচ এই লোকটি তাঁর পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন বাংলার চলচ্চিত্রের সেবায় এবং তিনি জন্ম মৃত্যু ও কর্মসূত্রে ছিলেন আদ্যোপান্ত এক বাঙালি। তিনি হীরালাল সেন। বাংলা তথা উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের অগ্রপুরুষ।

স্টার থিয়েটার, কলকাতায় পারস্যের ফুল চলচ্চিত্রে হীরালাল সেনের অভিনয়শৈলী
স্টার থিয়েটার, কলকাতায় পারস্যের ফুল চলচ্চিত্রে হীরালাল সেনের অভিনয়শৈলী

আমরা সবাই জানি, এই উপমহাদেশে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র (নির্বাক) চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন মুম্বাই -এর দাদা সাহেব ফালকে। তাঁর নামে ভারতে অনেক পুরস্কারাদি প্রদান করা হয়ে থাকে। কিন্তু এই জানায় একটা ভুল থেকে গেছে চিরদিন। সেটা হলো, এই উপমহাদেশে দাদা সাহেব ফালকের পূর্বে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন হীরালাল সেন। এই সত্য অনেক পরে আবিষ্কৃত হলেও তা আর পুনর্বাসিত হয়নি। চলচ্চিত্র বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণামূলক গ্রন্থে এই উল্লেখ থাকলেও তা বলতে গেলে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি।

একমাত্র বাংলাদেশ সরকারই পারেন বাংলাদেশের এই হতভাগ্য সন্তানকে পুনর্বাসিত করতে পারেন বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পুরস্কার হীরালাল সেনের নামে প্রবর্তন করতে যা অবশ্যই উচিৎ ও প্রয়োজনীয়। কেননা তাঁর জন্ম, মৃত্যু ও কর্মকান্ড সবই অবিভক্ত বঙ্গদেশে এবং জন্ম ও কর্মকাণ্ডের অনেকটাই পূর্ববঙ্গে। পাশাপাশি তাঁর পৈতৃক ভিটেবাড়ী উদ্ধার করে সেখানে একটি চলচ্চিত্র জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

১৮৬৬ সালে তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার বগজুড়ি গ্রামে চলচ্চিত্রের কৃতী পুরুষ হীরালাল সেনের জন্ম। তাঁর পিতা ব্যারিষ্টার চন্দ্রমোহন সেন ছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের এক প্রথিতযশা আইনজীবী। হীরালাল সেনের মাতুলালয় দিনাজপুরে। তাঁর মাতামহ শ্যামচাদ সেন ছিলেন সেকালের এক জননন্দিত কবি। হীরালাল শৈশব থেকেই ছিলেন শিল্পানুরাগী। তাঁর পিতাও তাঁকে উৎসাহ দিতেন। প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় মানিকগঞ্জে। এরপর ঢাকায় এবং সবশেষে কলকাতা থেকে তিনি আই এস সি পাশ করেন।

চলচ্চিত্র আবিষ্কার হয় ১৮৯৫ সালে। এর ঠিক পরের বছর ১৮৯৬ সালে কলকাতার ষ্টার থিয়েটারে বিদেশী ষ্টিফেন্স সাহেব বায়োস্কোপ দেখাতে আসেন। হীরালাল ষ্টিফেন্সের বায়োস্কোপ দেখে বিমোহিত হন এবং সিদ্ধান্ত নেন বায়োস্কোপকেই নেবেন পেশা হিসেবে। হীরালাল যোগাযোগ করেন ষ্টিফেন্সের সঙ্গে। কিন্তু ষ্টিফেন্স হীরালালকে আমলই দিলেন না। ওদিকে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অধ্যাপক ফাদার ল্যাফোকে ষ্টিফেন্স বায়োস্কোপের কলাকৌশল বুঝিয়ে দিলেন এবং ফাদার ল্যাফো বায়োস্কোপের যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করে সেন্ট জেভিয়ার্সের ছাত্রদের জন্যে আয়োজন করলেন নিয়মিত বায়োস্কোপ প্রদর্শনী।

হীরালাল সেনের তোলা ছবির জন্য বিদেশ থেকে মুদ্রণ করে আনা বোর্ড পেপার – চিত্র উৎস – বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস – কালীশ মুখোপাধ্যায়, পাবলিক ডোমেন – ইন্ডিয়া
হীরালাল সেনের তোলা ছবির জন্য বিদেশ থেকে মুদ্রণ করে আনা বোর্ড পেপার – চিত্র উৎস – বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস – কালীশ মুখোপাধ্যায়, পাবলিক ডোমেন – ইন্ডিয়া

হীরালাল এবার যোগাযোগ করলেন ল্যাফোর সঙ্গে। ল্যাফো সাদরে গ্রহণ করলেন তাঁকে। তিনি হীরালালকে বুঝিয়ে দিলেন বায়োস্কোপের কলাকৌশল। হীরালাল এতদিনে তাঁর অভীষ্ট খুঁজে পেলেন। তাঁর সঙ্গে এসে যোগ দিলেন কনিষ্ঠ ভ্রাতা মতিলাল। তাঁরা উচ্চ মাধ্যমিকের পর পড়াশুনো ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করলেন বায়োস্কোপে। শিল্পানুরাগী পিতা চন্দ্রমোহন এতে আপত্তিতো করলেনইনা বরং টাকা পয়সা ও নৈতিক সমর্থন দিয়ে ছেলেদের উৎসাহী করে তুললেন নতুন এই শিল্প মাধ্যমের প্রতি পুরোপুরি অভিনিবেশ ঘটাতে।

হীরালাল মতিলাল লন্ডনের জন রেঞ্জ এন্ড সন্স কোম্পানি থেকে সিনেমাটোগ্রাফ মেশিনপত্র আনালেন। তখন আবার সব জায়গায় বিদ্যুৎ ছিল না। তাই তাঁরা উন্নত মানের লাইম লাইট (তখনকার সময়ের জেনারেটর) মেশিনও আমদানি করলেন। সবকিছু যোগাড় করার পর এবার তাঁরা একটি চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন। নাম রাখলেন রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি। প্রথম প্রদর্শনী হলো ১৮৯৮ সালের ৪ এপ্রিল কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারে। এরপর তাঁরা ঘুরে বেড়াতে লাগলেন বাংলার আনাচে কানাচে। এমনকি বাংলার বাইরেও। সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়লো সেন ভ্রাতৃদ্বয় ও রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানির কথা।

প্রথমদিকে আমদানী করা ছবি দেখালেও পরে তাঁরা ছবি নির্মাণে উদ্যোগী হন। ১৯০১ সালে হীরালাল সেন প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব অমরেন্দ্রনাথ দত্তের সহযোগিতায় বাংলায় প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। তিনি বেশ টাকা খরচা করে লন্ডন ও প্যারিস থেকে ক্যামেরা, প্রিন্টিং এবং ডেভলপিং মেশিন আনালেন। তারপর অমর দত্তের ক্লাসিক থিয়েটারে অভিনীত ভ্রমর, আলীবাবা, হরিরাজ, সীতারাম, বুদ্ধচরিত, সরলা, দোললীলা প্রভৃতি জনপ্রিয় নাটকের দৃশ্যাংশ তুলে ছিলেন এবং সেগুলি প্রদর্শন করে দর্শকদের বিস্ময়াবিষ্ঠ করেছিলেন, আর এভাবেই তাঁর হাতে উপমহাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের নান্দীমুখ ঘটে।

এই উপমহাদেশে হীরালাল সেনই প্রথম ব্রতী হন চলচ্চিত্র নির্মাণে। পূর্ণাঙ্গ কাহিনীচিত্র তিনি নির্মাণ করতে পারেননি বটে, তবে তিনিই চলচ্চিত্র নির্মাণে পথিকৃৎ। তাঁরই প্রদর্শিত পথ ধরে ১৯১৩ সালে দাদাসাহেব ফালকে নির্মাণ করেন উপমহাদেশের প্রথম কাহিনীচিত্র (নির্বাক) রাজা হরিশচন্দ্র হিন্দিতে। ১৯১৩ সালের ৩ মে মুক্তি পায় রাজা হরিশচন্দ্র। সেক্ষেত্রে প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাহিনীচিত্র নির্মাণের কৃতিত্ব অবশ্যই দাদাসাহেব ফালকের। তবুও বাঙালি হীরালাল সেন সারা উপমহাদেশে প্রথম- নিজস্ব যন্ত্রপাতি দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে কৃতকার্য হয়েছিলেন।

কৃতবিদ্য হীরালাল সেন ছিলেন স্বভাবশিল্পী ও বেহিসেবী মানুষ। মৃত্যুকাল পর্যন্ত হীরালাল তাঁর প্রাণপ্রিয় শিল্প মাধ্যমটির জন্যে ভাবনাচিন্তা করেছেন এবং অকাতরে অর্থ ব্যয়ে হৃতসর্বস্ব হয়েছেন। তিনি চলচ্চিত্রের সমস্ত কাজই জানতেন। এমনকি হাতে করে ফিল্মে রং পর্যন্ত করতেও পারতেন। বেহিসেবী হীরালাল সর্বদা ব্যস্ত থাকতেন কোম্পানীর যান্ত্রিক ও কলাকুশলতার দিক নিয়ে।

হীরালাল সেনের স্ত্রী হেমাঙ্গিনী দেবী
হীরালাল সেনের স্ত্রী হেমাঙ্গিনী দেবী

কনিষ্ঠ মতিলাল ছিলেন বিষয়বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। তাই তিনি থাকতেন ব্যবসায়িক ও সংগঠনের দিক নিয়ে। চলচ্চিত্র ব্যবসায়ে প্রভূত পসারের কারণে তাঁদের প্রচুর অর্থ সমাগম হতে থাকে। স্বভাবতই বিষয়বুদ্ধি সম্পন্ন মতিলাল সময় সুযোগ বুঝে যন্ত্রপাতি, দলিলপত্র, নির্মিত ও আমদানীকৃত চলচ্চিত্র এবং টাকা পয়সা নিয়ে হীরালালের কাছ থেকে পৃথক হয়ে যান। হৃতসর্বস্ব হীরালাল হয়ে পড়েন অসহায়। বলতে গেলে অনেকটা পথের ভিখিরি।

এদিকে ১৯১৩ সালে মতিলালের বাড়ীতে আগুন লাগে। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানির যাবতীয় নথিপত্র, চলচ্চিত্র ও যন্ত্রপাতি। সাথে পুড়ে মারা যান মতিলালের কন্যা অমিয়া দেবী। ভগ্নহৃদয় হীরালাল ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবশেষে ১৯১৭ সালে তিনি আক্রান্ত হন মরণব্যাধি ক্যান্সারে। ১৯১৭ সালের ২৯ অক্টোবর কলকাতার এক পর্ণকুটিরে পরলোকগমন করেন চলচ্চিত্রের এই পথিকৃৎ কপর্দকহীন অবস্থায়, জীবদ্দশায় যিনি সর্বস্ব ব্যয় করেছিলেন চলচ্চিত্রের সেবায়।

বাংলা চলচ্চিত্র আজ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ সম্মানে অধিষ্ঠিত। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের জনক হীরালাল সেন আজ বিস্তৃত। আমরা তাঁকে একালেও যেমন ভুলেছি তেমনি সেকালেও তিনি পাননি যোগ্য সহানুভূতি ও সমাদর। বাঙালি আত্মবিস্মৃত এক জাতি। অতি সহজেই সে বিস্মৃত হয় তার সুবর্ণ অতীত, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। তবুও প্রয়োজন কিছুটা হলেও আত্মস্মরণের। নিজেকে জানার। এটা দরকার নিজের অস্তিত্বেরই প্রয়োজনে। তাই আসুন আমরা সরব হই আমাদের এই বিস্মৃত সূর্যসন্তানের স্মরণে। মৃত্যুর ৮১তম বার্ষিকীতে আমরা শ্রদ্ধাতপূর্ণ করি আমাদের চলচ্চিত্রের প্রথম পুরুষ হীরালাল সেনের পূণ্যস্মৃতির উদ্দেশে।

 

আরও পড়ুন:

“হীরালাল সেন”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন