নাট্য সমালোচনার লক্ষ্য – আশিস গোস্বামী

আশিস গোস্বামীর “বাংলা নাট্য সমালোচনার কথা” বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে “নাট্য সমালোচনার লক্ষ্য” নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন:

নাটক প্রয়োগ বিজ্ঞান। প্রয়োগ বিজ্ঞান বলেই নাটকের সাফল্য নির্ভর করে বিদ্বজ্জনের পরিতুষ্টির মধ্যে। সামন্ততন্ত্রে রাজানুকুল্য লাভই ছিল নাট্যকারদের সাফল্যের চাবিকাঠি। কিন্তু গণতন্ত্রে গণরুচিই নাট্যধারাকে নিয়ন্ত্রিত করে। এই গণরুচির প্রতিফলন ঘটে নাটক সমালোচনার দর্পণে। তাই নাটক প্রযোজনায় সমালোচকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

“The reviewer is often called a parasite. I prefer the more down right words, thief, Shakespeare in Timon of Athens, described the whole cycle of nature in terms of theft, and the same applies to the creative cycle by which the author steals from life, the theatre steals from the writer making his work its own and finally if he is upto it the critic steals from the theatre.”

(Theatre criticism: Irving Wardle-page 11)

এইভাবেই নাটক ও নাট্য প্রয়োগকলা, শিল্পী-কলাকুশলী-দর্শক এই ত্রয়ীর সামাজিক সম্পর্ককে পারস্পরিক আদান-প্রদানের ভিত্তিকে উন্নত করে তুলতে পারেন সমালোচক। “…All a critic has to do is choose between two statements. It is a good show, go see it, it’s a dodgy show, don’t go see it. Everything else is padding” (Theatre criticism: Irving Wardle-page 5)

[ নাট্য সমালোচনার লক্ষ্য – আশিস গোস্বামী ]

থিয়েটারের ভালো-মন্দের বিচার করে তাকে চালিত করার দায়িত্বই সমালোচকের একমাত্র কাজ নয়, তার দুটি সত্তাকেও সচেতন ভাবে চালনা করবার দায় আছে। কারণ, “The critic is a divided man, writing simultaneously for todays theatre goer and tomorrows theatre historian.” (Theatre critism: Irving Wardle page 13)

আশিস গোস্বামী [ নাট্য সমালোচনার লক্ষ্য - আশিস গোস্বামী ]
আশিস গোস্বামী
নাট্য সমালোচকের এই ঐতিহাসিক কর্তব্যের পথ তৈরি করে দিয়ে গেছেন, Leigh Hunt Hazlitt, G.H. Lewis, Bernard Shaw-এর মতো দিপাল সমালোচকেরাই। তারাই দেখিয়েছেন, কীভাবে থিয়েটারকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চেতনার মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হয়। যে-কোনো থিয়েটারই তার আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে। কিন্তু সমালোচক সেই থিয়েটারকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চেতনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করবেন।

শেকসপিয়র, শেখভ, ব্রেশ্টের নাটক সারা পৃথিবী জুড়েই নানা আঞ্চলিকতার ভিত্তিভূমিতে প্রযোজিত হয়ে চলেছে; কিন্তু সমালোচক যখন সেই সমস্ত প্রযোজনাগুলির সমালোচনা করবেন, তখন প্রযোজনার আঞ্চলিকতার সঙ্গে ওই মহান নাট্যকারদের আন্তর্জাতিক চেতনাকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা না করলে সমালোচকের দায়িত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। হয়তো এই ধরনের কোনো অসম্পূর্ণতা থেকেই ব্রেখটের ক্রুদ্ধ ঘোষণা শোনা গিয়েছিল, “What they say about my plays doesn’t matter, my play will survive the critics.” (Theatre Criticism: Irving Wardle-page 13)

সমালোচকদের সঙ্গে নাট্যকার ও প্রযোজকের মধ্যে এই দ্বন্দ্বটা প্রায় চিরন্তন বলা যেতে পারে। সহযোগী ও অসহযোগী—এই দ্বান্দ্বিক ভূমিকার মধ্য দিয়েই নাট্য সমালোচনার অগ্রগতি ঘটেছে। সমালোচককে কখনো কখনো নাট্যকার এবং প্রযোজকরা যতই অবজ্ঞা করুন শেষ পর্যন্ত কোনো-না-কোনো ভাবে সমালোচকের ভূমিকাকে অগ্রাহ্য করা যায়নি।

অ্যানথ্রোপলজিস্ট Robert Redfield সর্বপ্রথম ‘Great’ এবং ‘Little’ ট্র্যাডিশনের বিষয়ে আলোকপাত করলেও থিয়েটারের প্রেক্ষাপটে তাকে দেখার প্রথম চেষ্টা করেছিলেন। Richard Schechner আর নাট্য সমালোচক বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন Little tradition-কে সঙ্গে নিয়েই Great tradition-এর কাছে থিয়েটারকে পৌঁছোতে হবে। পৃথিবীর সমস্ত নাট্যচর্চাই এই দুটি ভাগে বিভক্ত- Little tradition অর্থাৎ লোক নাটক আর Great tradition অর্থাৎ শিষ্ট নাট্যধারা—যাকে আমরা ধ্রুপদি নাট্যধারা বলেও অভিহিত করতে পারি—সমালোচকই স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এর কোনোটিকেই বাদ দেওয়া যাবে না।

[ নাট্য সমালোচনার লক্ষ্য – আশিস গোস্বামী ]

অতীতের সঙ্গে সংযোগ পুনরাবিষ্কার করতে হবে, আবার হারাতেও হবে। এই পুনরাবিষ্কারের কোনো মোহ বা অতীত মায়া নেই, এই পুনর্বিরহে কোনো বেদনা বিধুরতাও নেই, থিয়েটারের পক্ষে দুটোই সমান সত্য, এই পুনরাবিষ্কার আর পুনর্বিরহ। পুনরাবিষ্কার ছাড়া আমাদের অস্তিত্বের শিকড় খুঁজে পাব না। চিরকাল শহুরে সংস্কৃতির পরগাছা হয়ে থাকব আর পুনর্বিরহ ছাড়া আমাদের অস্তিত্বের নতুন কথা পাব না। চিরদিন ঐতিহ্যবিলাসী হয়েই থাকতে হবে। নাট্য সমালোচনার লক্ষ্য এই দুইকে সচেতন ভাবে ব্যাখ্যা করা।

জনৈক বিশেষজ্ঞ সমালোচনার লক্ষ্য বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনটি সূত্র দিয়েছিলেন। সেই সূত্র তিনটির উল্লেখ করে এই আলোচনা শেষ করা যাক। (ক) সমালোচনা যেন যথাসম্ভব সমালোচনার বিষয়বস্তুর ভিত্তিকে কেন্দ্র করেই গড়ে

ওঠে। (খ) খাঁটি সমালোচকের বিষয়বস্তু সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সচেতন থাকতে হবে।

(গ) যার যতটুকু প্রাপ্য তাকে ঠিক ততটুকু দিতে হবে। তার কমও নয়, আবার বেশিও নয়, অর্থাৎ একদিকে ‘দারুণ হয়েছে’ নীতিটিকে সমূলে উচ্ছেদ করতে হবে, অপরদিকে তেমনি সেটা যাতে আবার নিছক চাটুকারিতায় পর্যবসিত না হয়ে পড়ে তাও দেখতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সমালোচকদের মধ্যে ব্যাপক সুন্দর সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। (পরিচয়—পৌষ ১৩৫৪)

এই সূত্র তিনটি নাট্য সমালোচনা ও সমালোচকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আলোচ্য লক্ষণগুলি কতখানি সঠিক ভাবে পালিত হয়েছে তা আমরা পরবর্তী আলোচনাগুলিতে দেখার চেষ্টা করব। যদিও ওই তিনটি সূত্রকে একমাত্র সত্য বলেও মনে করছি না। কারণ একমাত্র সত্য বলে কিছু নেই।

[ নাট্য সমালোচনার লক্ষ্য – আশিস গোস্বামী ]

আরও পড়ুন:

“নাট্য সমালোচনার লক্ষ্য – আশিস গোস্বামী”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন